ঢাকা, ৪ অক্টোবর ২০২২, মঙ্গলবার, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

স্মৃতিতে-স্মরণে-কর্মে উদ্ভাসিত মেজর খন্দকার নুরুল আফসার

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ বায়েজিদ সরোয়ার

(২ সপ্তাহ আগে) ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার, ৫:১২ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৮:০৯ অপরাহ্ন

সাবেক সেনা কর্মকর্তা, রাওয়া এর সাবেক চেয়ারম্যান আফসার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এক্সিম ব্যাংকের পরিচালক ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক মেজর খন্দকার নুরুল আফসার গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ঢাকার ইউনাইটেড হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে এই সাহসী ও মানব দরদী সেনা কর্মকর্তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৬৮ বছর।

খন্দকার নুরুল আফসার ১৯৫৪ সালের ১লা জানুয়ারী কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ফরদাবাদে। তিনি ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গ্রাজুয়েট। তরুন আফসার চট্টগ্রামেরভাটিয়ারিস্থ বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমী (বিএমএ) হতে ৩য় শর্ট সার্ভিস কমিশন (এসএসসি-৩) এর সঙ্গে কমিশন লাভ করেন। তিনি সেকেন্ড লেঃ হিসেবে ২৪ ইষ্ট বেঙ্গলে যোগদান করেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেজর আফসার একজন চৌকস ও প্রতিশ্রুতিশীল অফিসার ছিলেন। মেজর পদবীতে বিএমএ’র প্রশিক্ষক (প্লাটুন কমান্ডার) ও ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডেরব্রিগেড মেজরের মতো মর্যাদাবান পদে তিনি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি চীনের নানজিং সামরিক একাডেমী থেকে ক্ষুদ্র অস্ত্রের উপর বিশেষায়িত প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন। একটি দূর্ঘটনার কারনে, দুঃখজনকভাবে ১৩ বছরেরচাকুরীতেই তাকে সামরিক জীবনের সমাপ্তি টানতে হয়েছিল।

১৯৯০ সালে মেজর আফসারের কর্মজীবনের ২য় ইনিংশ শুরু হয়। তবে প্রথম দিকে এটি ছিল অকল্পনীয় কঠিন এক জীবন সংগ্রাম।

বিজ্ঞাপন
পরবর্তীতে ঢাকা সিটি করর্পোরেশনের জোন-১০ এর জোনাল এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর নেমে পড়েন নিজস্ব ব্যবসায়। প্রচন্ড পরিশ্রম , অধ্যবসায়, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সাহস, মেধা ও ব্যবস্থাপনা গুনের সমন্বয়ে নিজেকে ধীরে ধীরে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আফসার গ্রুপ এখন একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এই গ্রুপে ১০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। “বানিজ্যে বসতি লক্ষী” কথাটি তার জীবনে ফলেছে। এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন পুরোপুরি “সেলফ মেড ম্যান”।কর্মজীবনের ২য় ইনিংসের প্রথম দিকে স্লো রান করলেও শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি করেন।এই সাফল্যের গল্পটি অনুপ্রেরনার।

মেজর আফসারের মুত্যর পর, তার পরিচিত মানুষের মাঝে বিশেষত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সামরিক সার্কেল/কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমেছে। তাঁকে শ্রদ্ধা-স্মরনে ভাসছিল সোশাল মিডিয়া বিশেষত ফেসবুক। প্রিয়জন, বন্ধু, সহকর্মী, সামরিক কর্মকর্তা, সহযোদ্ধা, শুভ্যানুধায়ীগন মেজর আফসারকে নানা অভিধায় অভিসিক্তকরেছেন: একজন মানবিক মেজর, সত্যিকারের ব্রাদার অফিসার, মানবিকতার সেতু, নিঃস্বার্থ জনদরদী, গতিশীল নেতা। ইংরেজীতেও অনেকে লিখেছেনঃ রিয়েল গুড কমরেড, লিজেন্ড, জেম অব এ পারসন, বেনোভেলেন্ট পারসোনালিটি, পোল ষ্টার অব রাওয়া, দি শাইনিং ষ্টার...। ফেসবুকের কল্যানেই গুনী এই মানুষটির যাপিত জীবনের কর্মময় পূর্নাঙ্গ অবয়ব প্রস্ফুটিত হয়েছে।

চমৎকার নেতৃত্বগুন ও সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী মেজর আফসার রাওয়ার (রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন) চেয়ারম্যান হিসেবে অসাধারণ কিছু পদক্ষেপ গ্রহন ও উন্নয়ন করে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের অকৃত্রিম আন্তরিক ভালোবাসা অর্জন করেন। বিশেষত করোনাকালে রাওয়ার উদ্যোগী ভূমিকা উদাহরণ হয়েই থাকবে। ২০২০ সালের ৩১ জুলাই তারিখে কক্সবাজারে মেজর সিনহা মোঃ রাশেদ খান এর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর, হত্যার বিচার চেয়ে তিনি অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যা পরবর্তীতে এই বিচারটি সঠিকভাবে এগিয়ে নিতে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছিল। এছাড়াও ডিওএইচএস মহাখালি পরিষদের সভাপতি হিসেবে অসাধারন ভূমিকা পালন করেন।অত্যন্তবন্ধুত্বপুর্ণ, সামাজিক,  বন্ধু বৎসল, সদা হাস্যজ্বল ও প্রাণবন্তমেজর আফসারঅবসরপ্রাপ্তদের সামরিক কমিউনিটিতে স্বাভাবিক নেতায় পরিণত হন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত পরোপকারী, সদালাপী,বিশাল হৃদয় ও মানবিক গুনাবলীর অধিকারী খুবই শ্রদ্ধাভাজন একজন সেনা অফিসার ছিলেন।আত্মীয়-স্বজন, কোন সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবার কোন সমস্যায় পড়লে এই মানব দরদী ব্যক্তি সর্বদাই তাদের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতা করতেন। তিনিনিঃস্বার্থ দানশীল এবং পরোপকারী মানুষ ছিলেন। সুযোগ পেলে গোপনে মানুষের অনেক উপকার ও দান করতেন। এর স্বাক্ষী হয়ে রইলো বিকাশ মোবাইল ব্যাংকিং।

মেজর আফসার সমাজ সেবা বিশেষত শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। ঢাকায় ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ফরদাবাদে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও ডাইবেটিক সেন্টার স্থাপন করেছেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো- উত্তরায় প্রতিষ্ঠিত আধুনিক নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- “আনোয়ারা-মান্নাফ স্কুল এন্ড কলেজ”। তাছাড়া আরও অনেক সেবামূলক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে এই উদার দানশীল ব্যক্তির উল্লেখযোগ্য পদচারনা ছিল।

আমাদেরব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও দুঃখজনকভাবে ক্রমাগত নৈতিক অধপতন দৃশ্যমান। দিন দিনআমরা স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি। এরকম সময়ে, মেজর আফসার ছিলেন উজ্জল ব্যতিক্রম। মৃত্যুর পর একজন সেনা সহকর্মী লিখেছেন-“আফসারের জীবনের মিশন বা ব্রত ছিলো অন্যদের বিশেষত সমস্যাগ্রস্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটানো”। তিনি চারপাশের মানুষকে নিয়ে আনন্দে থাকতে চাইতেন। এক্ষেত্রে নিজের আর্থিক সঙ্গতিও ভাবতেন না। ভাবা যায়?

মেজর আফসার নিজে একজন ভালো খেলোয়াড় ও  অত্যন্ত ক্রীড়ামোদি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ফুটবল ও ক্রিকেট দুটিতেই বিশ্ববিদ্যালয় টিমে খেলেছেন। সেনাবাহিনীতেও  সেনাবাহিনী পর্যায়ে ফুটবল খেলেছেন। পরবর্তী জীবনে গলফ খেলা ছিলো সবচেয়ে প্রিয় হবি। যা তার প্যাসানে পরিনত হয়। তিনি ‘ক্রেজী গলফার্স’ এসোসিয়েশন এর সভাপতিও ছিলেন। কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের ‘ভোরের পাখিদের’ অন্যতম ছিলেন মেজর আফসার। তিনি “খিউ কুশিন কারাতে বাংলাদেশ” এর সভাপতি ছিলেন।

এসবের পাশাপাশি মেজর আফসারের ছিলো প্রবল জ্ঞান স্পৃহা। আধুনিক মনের অধিকারী ও প্রগতিশীল খন্দকার নুরুল আফসার ফেসবুকে শিক্ষা,সামরিক, খেলাধুলা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, কৌশলগত, জাতীয় ও বৈশ্বিক সমসাময়িক বিষয়ের উপর সহজ ভাষায় অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও জ্ঞানগর্ভ পোষ্ট দিতেন। ফেসবুক বন্ধুদের কাছে যা ছিলো অত্যন্ত আকর্ষনীয়।

পরোপকারী, মানুষ-দরদী এই ব্যক্তিটি ছিলেন জীবন মুখী ও প্রান-প্রাচুর্যে ভরা। চলমান সমাজ সময়কে জীবনের সঙ্গে একিভূত করে সুখ দুঃখ হাসি কান্না ও জীবনের আনন্দ বেদনার মধ্য দিয়ে মানিয়ে নেয়ার চমৎকার ক্ষমতা ছিল। জীবনকে কর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যদিয়ে আনন্দময় ও উপভোগ্য করে তুলতেন। সে যাত্রায় অবশ্যই সঙ্গে নিতেন চারপাশেরবন্ধু ও স্বজনদের: দলবেধে ভ্রমণ,পিকনিক করা, গলফ খেলা, মাছ ধরা... । মেজর আফসার ছিলেন উদ্যোমি ভ্রমন পিয়াসী। মৃত্যুর দুই মাস আগে দীর্ঘ সময় ধরে ভ্রমণ করেছেন কানাডা ও আমেরিকার নগর প্রান্তরে। সেটিছিল তাঁর জীবন সঙ্গীনির সঙ্গে“দি লাষ্ট রাইড টুগেদার” । তার ভ্রমণ মানেই নিজের ফেসবুকে অসংখ্য ছবি আপলোড করা। কখনোঅটোয়ার ফ্যানকন রিজ গলফক্লাব, রিডো নদীর ধারেব্রিটানিকা পার্কে হাটাহাটি, লেক অন্টারিওর নীল জলে মাছ ধরার তুমুল উৎসব। আনন্দনগর লসএঞ্জেলস এর ওয়াক অব ফেম,ওকলেন্ড বে ব্রীজ, নিউইয়ক মহানগরীর টাইমস স্কোয়ার ভ্রমন...।পথ চলাতেই ছিল তার আনন্দ।

সামরিক জীবনের ঠিকপ্রথম দিন থেকেই বিএমএ’তে মেজর আফসার আমাদের ১২তম লং কোর্সের প্লাটুন কমান্ডার (প্রশিক্ষক) ছিলেন। এই সময় আমাদের টার্ম কমান্ডার ছিলেন মেজর আলাউদ্দিন মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ, বীর প্রতিক (পরে মেজর জেনারেল, বর্তমান রাওয়া চেয়ারম্যান)। বিএমএ’তে প্লাটুন কমান্ডারদের বলা হয় “মেকারস অব লিডার্স”। মেজর ওয়াদুদ, মেজর আফসারসহ এক ঝাক তারকা প্রশিক্ষক ছিলেন আমাদের “দ্রোনাচার্য”। আজ একথা ভাবতেই গর্ব হয়।

কত কথা মনে পড়ছে...। ১৯৮৩ সালের ২ অক্টোবর। নবীন ক্যাডেটদের, দুই মাস পর প্রথম আউটডোর এক্সারসাইজ- ‘পদক্ষেপ’ এর ৩য় দিন। ইতোমধ্যে ভাটিয়ারী-হাটহাজারি-গহীরা-রাউজান-রাঙ্গুনিয়া-কাপ্তাই রোড-জানালিহাট হয়ে আমরা চট্টগ্রাম শহরের ফয়স লেক পাহাড়ের পাদদেশে। ইতোমধ্যে হেঁটেছি ৮০-৮৫ কিলোমিটার। খাকিডাংরিপরা ক্যাডেটদের হাতে রাইফেল, কাঁধে ভারি প্যাক- ০৮ বা হ্যাভার স্যাক। ক্লান্ত ক্যাডেটদের পা যেন চলছে না। কিন্তু সামনেই পাহাড়। হঠাৎ সেখানে কালো কমবেট পরা স্মার্ট তরুণ মেজর আফসার হাজির। চোখে কালো সানগ্লাস। হাতে শুটিং স্টিক। আমার সামনের ক্যাডেটের হ্যাভার স্যাকে শুটিং স্টিক ঠেকিয়ে বললেন- “কাম অন মুভ, ইউ কেন মেক ইট-  “তুমি এগিয়ে যাও, তুমি পারবে”। টনিকের মতো কাজ হলো। ফয়স লেকের পাহাড়ে হেটে আমরা এগিয়ে যাই কেবল্যধামপাহাড়ের মন্দিরের দিকে।

২য় টার্মে তিনি ছিলেনসরাসরি আমাদের প্লাটুনের ‘প্লাটুন কমান্ডার’।মেজর আফসার ছিলেন নিষ্ঠাবান সিরিয়াস টাইপের “২৪ ঘন্টার প্রশিক্ষক”। কখনো ইয়ামাহা মটর সাইকেল চালিয়ে ক্যাডেট ব্লকে আসতেন আমাদের কর্মকান্ড মনিটর করতে। প্রশিক্ষনের সময় আমাদের দূর্বলতাগুলো কাটাতে আমাদের বিশেষ অনুপ্রেরনা ও গাইডেন্স দিতেন। তবে কখানো কখনো তার নির্দেশগুলো ছিলো বেশ কাঠিন্যে ভরা!

কমিশন পাওয়ার ১৮/১৯ বছর পর আবার দেখা। শান্তি চুক্তির পর তখন পার্বত্য চট্ট্রগামেধীরে ধীরে শান্তি ফিরছে...। পাহাড়ের ভেতরের হিংসার ঝর্ণাধারাগুলো ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের সকল মানুষকে নিয়ে একত্রে হাঁটার চেষ্টা শুরু হয়েছে। আমি তখন রাঙ্গামাটিতে একটি পদাতিক ব্যাটালিয়নে কাজ করছি। আমাদের দেখা হলো রাঙ্গামাটির অপরূপ এক প্রাকৃতিক পরিবেশে। রাঙ্গামাটি শহরের পূর্বদিকে অপরূপ কাপ্তাই হ্রদের ওপারে বসন্তপাড়া মইনের (পাহাড়ের) পাদদেশে পেদা টিং টিং (ভরপুর পেট) নামে একটি রেষ্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। এর পাশ দিয়েই সুবলং ঝর্ণায় যেতে হয়। পেদা টিং টিং  এ মেজর আফসার এসেছেন তাঁর প্রিয় বন্ধু ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফকরুদ্দিন হায়দার এর অতিথি হিসেবে। আফসার স্যার এসেছিলেন সপরিবারে।সঙ্গে তাঁর জীবন সঙ্গীনী সোমা নাসরিন, দুই রাজপুত্র- খন্দকার জুনায়েদ তামিম ও খন্দকার জুনায়েদ তাওসিন। আর তাদের মিষ্টি রাজকন্যা- জাসিয়া আমরিন। পুরো সময়টা তিনি মাতিয়ে রেখেছিলেন। ফেরার সময় আমাকে আশ্চর্যরকম একটা দায়িত্ব দিলেন। একটি খামে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে বললেন- “পাহাড়ী জনপদের একটি গ্রামে ওষুধ কিনে পৌঁছে দিতে হবে”। ততক্ষনে পশ্চিমের ফুরোমন পাহাড়ে সূর্য ঢলে পড়েছে। মেজর আফসার ও জেনারেল হায়দার স্পীড বোটেরওনা হলেন কাপ্তাইয়ের দিকে। খানিক পর আমরাও রাঙ্গামাটির পথে স্পীড বোটে এগিয়ে যাই। যেতে যেতে ভাবি, আমার এই প্রশিক্ষকের হৃদয়টি হয়তো এই কাপ্তাই হ্রদের চেয়েও অনেক গভীর...।

বহুমাত্রিক গুনের অধিকারী মেজর আফসারকে সমাজের বিভিন্ন মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানোর বিষয়টি আশা জাগায়। সমাজের দুর্ধর্ষ স্বার্থপর আগাছোগুলো ধেয়ে আসছে সৌরভময় গোলাপ বাগানের দিকে। সমাজে মেজর আফসারের প্রতি ভালবাসা জানান দেয় যে, মানুষ সৌরভ ছড়ানো গোলাপ বাগানই চায়, পরোপকারী ভালো মানুষ চায়। স্বার্থপর আগাছা চায় না।

৬ সেপ্টেম্বরবাদ যোহর মহাখালি ডিওএইচএস মসজিদে মেজর আফসারের জানাজা। ডিওএইচএস এর তুলনায় প্রায়- জন সমুদ্র। তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা দেখে, অভিভূত হলাম। এরপর তাঁর মরদেহ আনা হলো বনানী সামরিক কবরস্থানে। মৃত্যুঞ্জয়ী পঁচিশ নামে পরিচিত ২৫ ইষ্ট বেঙ্গল এর একটি স্মার্ট কন্টিনজেন্ট মরনোত্তর সালাম দিলো, এমন একজন সেনাকর্মকর্তাকে যিনি এসএসসি পাস করেছিলেন ময়মনসিংহের “মৃত্যুঞ্জয় স্কুল” থেকে। আজ সারাদিন ঢাকার আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল। কিছুক্ষন বৃষ্টি হলো। অবশেষে আমাদের সঙ্গে শোকের মিছিলে দাঁড়ালো বনানীর প্রকৃতি। সবশেষে বেজে উঠলো বিউগলের করুন সুর- দি লাষ্ট পোষ্ট। এভাবেই সেনা বাহিনীর মর্যাদায় মনে প্রানে সৈনিক মরহুম মেজর আফসারের সামরিক ফিনারেল বা দাফন সম্পন্ন হলো। ঘড়ির কাটায় তখন বিকেল তিনটা পনেরো মিনিট।

মানুষের শ্রদ্ধা, সম্মান ভালোবাসা আর চোখের জলে বিদায় নিলেন খন্দকার নুরুল আফসার। ফেরার আগে শেষ বারের মতো তাকালাম ফুলে ফুলে ভরা কবরের দিকে। হঠাৎ মনে হলো, নতুন কবরেই যেন একটা এপিটাফ লেখা আছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা....।
“মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদেরই লোক”। ওপারে ভালো থাকুনশান্তিতে থাকুনপ্রিয় আফসার স্যার। স্যালুট টু ইউ। অভিবাদন....।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক।
[email protected]

পাঠকের মতামত

মেজর আফসার ছিলেন সামরিক অফিসারদের মধ্যে একজন আশা জাগানিয়া নেতা। উনি তাঁর কর্মজজ্ঞ ও পরোপকার মানসিকতা দিয়ে হাজারো অফিসারদের অনুপ্রানিত করতে পেরেছিলেন। কিভাবে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হয় তার উদাহরন তৈরী করেছিলেন। আপনার লেখায় মেজর আফসারের ব্যক্তিত্ব, মানসিকতা ও কর্মজজ্ঞতার কথা সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। দুঃখজনক ভাবে তাঁকে আমরা হারিয়ে ফেল্লাম একটু তাড়াতাড়িই, যখন মেজর আফসারদের মত লোকের প্রয়োজন সমাজে অনেক বেশী। আল্লাহ তাঁকে পরকালের জীবনে চিরশান্তি দান করুন। লেখক কে তাঁর এই অসাধারন লেখাটির জন্য ধন্যবাদ।

আব্দুল মোনায়েম
১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, রবিবার, ৭:৩৩ অপরাহ্ন

মেজর আফসার অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। তিনি মিলিটারি একাডেমিতে আমার প্রশিক্ষক ছিলেন, পরে সহকর্মী হিসাবে তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি। লেখক চমৎকার ভাবে মেজর আফসারের জীবন সংগ্রামের উপর আলোক পাত করেছেন। ধন্যবাদ।

সাইদুল ইসলাম
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ২:০০ পূর্বাহ্ন

মেজর আফসার স্যার এর কথা শুনেছি বহুবার বহু মানুষের কাছ থেকে। তিনি অত্যন্ত পরোপকারী, সদালাপী, বিশাল হৃদয় ও মানবিক গুনাবলীর অধিকারী খুবই শ্রদ্ধাভাজন একজন সেনা অফিসার। তিনি রাওয়া এর চেয়ারম্যান থাকা কালীন সকল স্তরের কর্মকর্তাদের মাঝে একটা আনন্দ বা ওপেননেস ছিল যা এখন অনুপস্থিত আমার দৃষ্টিতে। মহান আল্লাহ মেজর আফসার স্যারকে জান্নাত বাসি করেন এই প্রার্থনা করি।

Sabina Yesmin
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার, ৯:১০ অপরাহ্ন

স্যার খুবই বিচক্ষণ একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ পাক স্যারকে বেহেশতের উচ্চ মর্জাদা দান করুক। আমিন

ফারহানা বেগম
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

Assalamu Alaikum and thank you for the wonderful reflection on Major Afser (Pintu Bhai). Every single thing you mentioned here are true. Indeed he was an exceptional person and a sincere Muslim. May Allah grant him higher Darajay in Jannatul Ferdous in Sha Allah, Ameen.

Anam
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার, ৯:৪৩ পূর্বাহ্ন

মেজর আফছার স্যারের বিষয়ে আমার বলার কোন ভাষা নাই । কি দিয়ে শুরু করব আর কি দিয়ে সেষ করব। সেই শক্তি আমার নাই। নিশ্চই আল্লাহ পাক ওনাকে উচ্চ মজ্জাদায় রাখবেন । এবং তিনি তার যোগ্য ।

মোঃ শাহেন শাহ সরকার
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার, ৯:৪১ পূর্বাহ্ন

মেজর আফছার স্যারের বিষয়ে আমার বলার কোন ভাষা নাই । কি দিয়ে শুরু করব আর কি দিয়ে সেষ করব। সেই শক্তি আমার নাই। নিশ্চই আল্লাহ পাক ওনাকে উচ্চ মজ্জাদায় রাখবেন । এবং তিনি তার যোগ্য ।

মোঃ শাহেন শাহ সরকার
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার, ৮:১৪ পূর্বাহ্ন

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status