ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, বুধবার, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

সমঝোতা স্মারক সই, তবুও সীমান্তে গুলি-হত্যা

হাসান আল বান্না

(২ সপ্তাহ আগে) ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২, রবিবার, ৫:২৯ অপরাহ্ন

সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রত্যাশা এবং অঙ্গীকার নতুন নয়। দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ভারত এই প্রতিশ্রুতি অনেক দিন ধরেই দিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের সচিব কিরীটি রায় একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, ভারতের সাথে পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান সীমান্তে হত্যাকা- হয় না। শুধু বাংলাদেশ সীমান্তেই হচ্ছে। ভারত সরকার কথা দিয়ে কথা রাখছে না। বিএসএফ কথা শুনছে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ সরকারের এটা নিয়ে আপত্তি নেই সেরকমভাবে। ভারতের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলছে না।

গত ১৭ জুলাই থেকে ২১ জুলাই ঢাকায় বিজিবি-বিএসএফ-এর মধ্যে পাঁচদিনের সীমান্ত সম্মেলন হয়। ওই সম্মেলনে যোগ দিতে ঢাকায় আসেন ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনি বিএসএফ-এর মহাপরিচাক পঙ্কজ কুমার সিং।

বিজ্ঞাপন
তিনি তখন বলেছিলেন, ‘‘সীমান্ত এলাকায় সব গুলির ঘটনাই রাতে ঘটে এবং যেসব হতাহতের ঘটনা ঘটে তারা সবাই অপরাধী।”

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা ফেলানী কি অপরাধী ছিলেন? ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ফেলানী মারা যায়। ফেলানীর লাশ অন্তত পাঁচ ঘণ্টা কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকে। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানীর লাশ দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছিল। তখন দাবি তোলা হয়েছিল- ফেলানী যেন সীমান্তে শেষ হত্যার ঘটনা হয়। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ২০১০ সালে মনমোহন সিং-এর সময় থেকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাক- শুন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সীমান্ত হত্যা কমছে না।

ভারত সফর শেষে ৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সফরসঙ্গীরা। আলোচিত এই সফরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা কমিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে- সীমান্তে হত্যা শূন্যে কমিয়ে আনতে দুই দেশ একত্রে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। সীমান্ত হত্যা কমিয়ে আনার বিষয়ে খবর স্বাভাবিকভাবেই আশাবাদী করে তোলে দেশবাসীকে। কিন্তু আশাহত হতেও বেশি সময় লাগল না। ৭ সেপ্টেম্বর দিনাজপুরের দাইনুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে মিনহাজ নামে ১৯ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আরও দুই বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন। নিহত মিনহাজ সদর উপজেলার ৯ নং আস্করপুর ইউনিয়নের ভিতরপাড়া এলাকার জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে। নিখোঁজ দুই ব্যক্তি হলেন-একই ইউনিয়নের খানপুর এলাকার লতিফুল ইসলামের ছেলে ২৮ বছর বয়সী এমদাদুল ও সালমানের ২০ বছর বয়সী ছেলে সাগর। তার মানে, এই সীমান্তে মিনহাজ হত্যার ঘটনা এমন সময়ে ঘটল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তখনও ভারতে অবস্থান করছিলেন। বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী যেখানে সীমান্তে হত্যা কমিয়ে আনার বিষয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন মাত্র একদিন আগে; সেখানে মিনহাজের মৃত্যু শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিপরীত চিত্রই প্রকাশ পায়।

বিজিবি-বিএসএফ-এর মধ্যে পাঁচদিনের সীমান্ত সম্মেলন হয় জুলাইয়ে, ওই বৈঠকের পর আগস্টে, অর্থাৎ গত মাসেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। ২৪ আগস্ট পঞ্চগড়ের অমরখানা সীমান্তে আবদুস সালাম নামে এক বাংলাদেশিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ৩১ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিংনগর সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে ভেদু নামে একজন নিহত হন।

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেব অনুযায়ী, জুলাই পর্যন্ত চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সীমান্তে বিএসএফ আট জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে। এর মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ছয় জনকে। এই সময়ে আহত হয়েছেন চার জন। সাত জনকে অপহরণ করা হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে সীমান্তে হত্যা করা হয় মোট ১৯ জন বাংলাদেশিকে। এর মধ্যে ১৬ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০২০ সালে হত্যা করা হয় ৪৯ জনকে। তাদের মধ্যে গুলিতে নিহত হয়েছিলেন ৪২ জন। ২০১৯ সালে মোট ৪৩ জনকে হত্যা করা হয়। গুলি করে হত্যা করা হয় ৩৭ জনকে। ২০১৮ সালে মোট হত্যা করা হয় ১৪ জনকে। সেই বছর গুলিতে প্রাণ গিয়েছিল আট জনের। এর আগে ২০১৭ সালে ২৪ জনকে হত্যা করা হয়। ২০১৭ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত পাঁচ বছর সাত মাসে সীমান্তে মোট ১৫৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এই সময়ে আহত হয়েছেন ১৩৭ জন, অপহৃত হয়েছেন ১১৯ জন। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ৯০ ভাগকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

মূলত আইনকে পাশ কাটিয়ে সীমান্তে হত্যাকা-কে উৎসাহিত করা হচ্ছে। যাদেরকে অপরাধী বলা হচ্ছে, আদালতে প্রমাণের আগে তাদের অপরাধী বলার সুযোগ নেই। অপরাধী বলে কাউকে হত্যা করাও চরম বে আইনি।
লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status