ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, সোমবার, ১১ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৯ সফর ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

দ্রব্যমূল্য

রাষ্ট্র অপারগ হয়ে ওঠেছে

ইফতেখার আহমেদ খান

(১ মাস আগে) ২২ আগস্ট ২০২২, সোমবার, ৮:৪৫ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১০:২৯ অপরাহ্ন

সামসময়িক বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় উর্ধ্বগতি ও প্রশাসন কর্তৃক এর নিয়ন্ত্রণহীনতা পুরো রাষ্ট্রর পরিচলনে অপারগতা বয়ে এনেছে। একটি রাষ্ট্র যদি তার উদ্দেশ্যাবলী নাগরিকগণের কাছে সুস্পষ্ট করতে না পারে তবে বলা যায়, সেই রাষ্ট্র অপারগ হয়ে ওঠেছে। সাম্প্রতিক দ্রব্যমূল্যের চিত্রটি নাগরিকগণের কাছে রাষ্ট্রের উদ্ভবের উদ্দেশ্যকে অস্পষ্ট করে দিয়েছে। একটি রাষ্ট্রের অপারগ হয়ে যাওয়ার পেছনে অনেক উপাদান ক্রিয়াশীল থাকে। রাষ্ট্রচিন্তাবিদগণ এই সকল উপাদানসমূহকে নানা আঙ্গিকে বিন্যাস করেছেন। এরকম একটি উপাদান হলো বন্টন সংকট।

সার্বভৌম সত্ত্বা হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় অর্ধশত বৎসর পার হয়ে গেল। সময়ের হিসাবে এর বয়স নেহায়েত কম নয়। এতোটা সময় পার হওয়ার পরও স্থিতি কিন্তু এলো না? সাধারণ নাগরিকের সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন এটা নয়, এটা নির্দিধায় শোষণ ও বঞ্চনা।

বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশের অনুচ্ছেদ ১৪ তে কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তির কথা এভাবে বলা হয়েছে- রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে মেহনতী মানুষকে- কৃষক ও শ্রমিককে এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হতে মুক্তি দান করা। সাথে সাথে অনুচ্ছেদ ১৫ এর ‘ক’ ধারায় বলা হয়েছে- রাষ্ট্র অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করবে। অর্থাৎ জনগণের বেঁচে থাকার সামগ্রিক শর্ত নির্মাণে রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে বাধ্য।

বিজ্ঞাপন
ধারাসমূহ খেয়াল করলে দেখা যায়, কৃষক-শ্রমিক এবং অনগ্রসর জনগণের কথা বলা হয়েছে। এখন যদি আমরা মিলিয়ে দেখি দ্রব্যমূল্যের এই উর্ধ্বগতিতে কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? নিঃসন্দেহে শ্রমিক-কৃষক এবং রাষ্ট্রের অনগ্রসর অংশ। তার মানে রাষ্ট্র ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় তার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র এই ব্যর্থতা স্বীকার না করে বরং দেশের মানুষ ‘বেহেশতে’ আছে বলে স্বগোক্তি করে।

রাষ্ট্রের সুখ বলে একটি প্রত্যয় সমষ্ঠির মাঝে প্রতিষ্ঠার দাবি রাখে। রাষ্ট্রের সুখ সঙ্গায়িত করলে সঙ্গাটি ব্যাপক কলেবর লাভ করবে। সংকীর্ণভাবে এটা বলা যায়, সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মতো মৌলিক প্রয়োজন ন্যূনতম মাত্রায়ও যদি পূরণ হয় তবে বলা যায় রাষ্ট্রে সুখ আছে। উল্লেখ জরুরি এই সামান্য সুখটুকু নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রের সমুদয় উদ্দেশ্যসমূহ কোন পর্যায়ে অস্তিত্বশীল তা অনুধাবন করা যায়।

রাষ্ট্রের উপাদানসমূহের মধ্যে অন্যতমটি হলো এর সরকার। সরকারের থাকে তিনটি বিভাগ; আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এই তিনটি বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং সমন্বয়হীনতার তীব্রতা যতগুলো পরিণাম বয়ে আনে সেসবের মধ্যে অন্যতমটি হলো রাষ্ট্রের পরিচলন ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে দেয়া। এই ভঙ্গুরতাই এই সময়ের দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণ। সংবাদ মাধ্যমগুলো ঘণ্টায় ঘণ্টায় প্রতিবদেন প্রকাশ করছে, কারণ উদঘাটন করছে, সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছে। ক্রেতা-বিক্রেতা, খুচরা-পাইকারি-মজুতদারি সকল পর্যায়ের সাথে আলোচনা করা হচ্ছে। প্রতিটি পর্যায়-ই যার যার অবস্থান থেকে নিজের অবস্থান পরিষ্কার রেখে বয়ান দিচ্ছে। সকল পর্যায়ের সাথে অনুসন্ধান চালিয়েও কোনো কূলকিনারা করা যাচ্ছে না। বিষযটি এমন- একদল  ছেলেপেলেকে একটি মাঠে ছেড়ে দেওয়া হলো, ছেলেগুলো সেখানে খেলছে, কোলাহল করছে এবং একসময় বড়দের মধ্য হতে কারো ইশারায় বিশৃঙ্খলা করে ফেলেছে। বিশৃঙ্খলা কে করেছে তার অনুসন্ধান শুরু হলো। সারাদিন অনুসন্ধান করেও সঠিক চিত্র পাওয়া গেল না, কারণ বড়দের মধ্য হতে যিনি ইশারা করেছেন, অনুসন্ধানী দল তার কাছে পৌঁছতেই পারেনি। ঠিক তেমনি, দ্রব্যমূল্য পরিবীক্ষণে সরকারের নির্দিষ্ট দপ্তর রয়েছে। সেই দপ্তর উদ্দিষ্ট ঘটনার কারণ বের করবে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক কার্য বিন্যাসে। এটি আমাদের দেশের বাস্তবতায় অনেকটাই অসম্ভব, কেননা আমাদের প্রশাসনযন্ত্রের সুগঠিত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেনি। প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠলেও বাংলাদেশের শাসন এখনও প্রাতিষ্ঠানিক হয়নি। এখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতার অসম বণ্টন এক নিয়ত বাস্তবতা।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম ভাগ পায় না। দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত নাগরিক রাষ্ট্রীয় সম্পদের চুলচেরা ভাগ পায়। অপরদিকে, যে জনতার দুর্বার শ্রমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার পূর্ণ হয় সেই জনতা সেই কোষাগার থেকে কোনোরুপ বিনিময় পায় না। তাছাড়া আয়ের সীমাহীন বৈষম্য, ধনী-গরীবের আকাশচুম্বি ব্যবধান, সুযোগের ব্যাপক তারতম্য, দুর্নীতির উল্ফন ধারাবাহিকতা, নির্মম দলীয়করণ ও শাসনতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় একটি বড় মাপের বন্টন সংকটের উদ্ভব ঘটিয়েছে। আর এসব উপাদানসমূহের সগৌরব উপস্থিতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মৌলনীতিসমূহকে চ্যালেঞ্জ করে যায় প্রতিনিয়ত।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সামরিকশাসন দীর্ঘদিন বলবৎ থাকায় নাগরিকবৃন্দ নিয়মতান্দ্রিক শাসন ও অনিয়মতান্ত্রিক শাসন সম্পর্কে ধারণার অধিকারী হয় না। স্বাধীনতা অব্যবহিতকাল ১৯৭৫ সাল থেকেই বাংলাদেশে অনিয়মতান্ত্রিক শাসন জারি হয় এবং এর ভয়ঙ্কর প্রভব বলয় তৈরি হয়, যার কারণে ১৯৯০ পরবর্তী সময় হতে এ পর্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও শাসনতান্ত্রিক বিন্যাসটি জনমুখি করা সম্ভব হয়নি। বাস্তবিকভাবে, উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতায় প্রশাসনিক জটিলতাসহ আরও নানা কারণে সরকার যথেষ্ঠ মাত্রায় জনগণের কাছে পৌঁছতে পারে না। অর্থাৎ সরকার ও জনগণের মাঝে কার্যকর ও অর্থবহ সংযোগ প্রতিষ্ঠা পায় না। সরকারের সকল উন্নয়ন উদ্যোগ, নীতি এবং এসব বাস্তবায়নে জন-উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়। এই অবস্থাকেই বলা হয়, জনগণের মাঝে সরকারের অনুপ্রবেশ নেই। জনগণের সাথে সরকারের অনুপ্রবেশ নেই বিধায় জন-অভিপ্রায় সরকার সঠিকভাবে অনুধাবন করতে সক্ষম হয় না।

উদাহরণ হিসাবে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কথা বলা যায়। জনগণের ইচ্ছা হলো দ্রব্যমূল্য নাগালের মধ্যে কিংবা ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকুক, কিন্তু সরকার তা অনুধাবন করতে পারছে না। বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির চর্চায় নেতৃত্বশ্রেণির রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতা ও ভোগ ন্যায্য সমাজের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে না। দূর্বৃত্তায়িত নেতৃত্বের প্রতি সাধারণ জনগণ আগ্রহী হয় না। ফলে প্রতিবাদ জানানোর মতো যথেষ্ঠ তথ্য প্রাপ্তি ঘটলেও জন-অংশগ্রহণের ভিত্তিতে শাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। সাম্প্রতিক দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি তীব্রভাবে প্রশাসনিক জবাবদিহির আওতায় ফেলা যায়।

জনগণের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও দাবি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। দলভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা আধুনিক রাজনীতির একটি পোক্ত শর্ত। বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির চর্চা ও অনুশীলন এবং প্রবাহে সত্যিকার অর্থে সাধারণ জনগণের অভিপ্রায় অর্ন্তভুক্ত হয় না। যেমন, বাংলাদেশের সরকার দলভিত্তিক সরকার, দল গঠিত হয় জনগণের সমবায়ে। সেই সূত্রে জনগণ দ্বারা গঠিত যে দল সেটি কিন্তু সরকারের নিকট দাবি তুলছে না দ্রব্যমূল্যকে সীমার মধ্যে রাখার জন্য কিংবা দ্রব্যমূল্যের এই আকাশচুম্বি বৃদ্ধিতে জনভোগান্তির চিত্রটি যথাযথভাবে সরকারের কাছে তুলে ধরছে না অথচ রাজনৈতিক দল মানে সমাজের বৃহত্তর অংশের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা। রাজনৈতিক দল তার প্রাতিষ্ঠানিক কর্মের কথা ভুলে গিয়ে সরকারের তল্পিবাহক হয়ে পূর্বতন জ্বী-হুজুর সংস্কৃতির আবির্ভাব ঘটিয়েছে অথচ এই দেশের স্বাধীনতা অর্জনের যে মূলসনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা তা রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই কাঠামো লাভ করেছিল, যার দুর্বার প্রবাহে পাকিস্তানি মসনদের ভিত নড়ে গিয়েছিল। সেই একই রাজনৈতিক দল তার গৌরবোজ্জ্বল অতীতের কথা ভুলে কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল।

বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতির বৈশিষ্ট্যে পারস্পরিক বিরুদ্ধচারণ ঐতিহাসিক বাস্তবতায় অর্জিত দর্শন বিপরীত দর্শনে পতিত হয়। একটা অংশ ব্যাপকভাবে জনজীবনে উৎসজাত, চেতনাজাত ঐতিহাসিক জাতীয় ঐক্যের স্ফুরণ ঘটায়, আরেকটা অংশ একইতালে কৃত্রিম জাতীয়তাবাদ নির্মাণ করে তার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়- যার মোকাবেলা করতে করতেই সরকারের সময় বয়ে যায়, জনগণের মৌলিক চাহিদার প্রয়োজন মেটানোর অতি আবশ্যক দিকটি উপেক্ষিত থেকে যায়। যেমন উপেক্ষিত হয়ে আছে দ্রব্যমূল্যের সাম্প্রতিক উর্ধ্বগতির অসহনীয় দিকটি। 


লেখক: উন্নয়নকর্মী, কথাশিল্পী 
[email protected]

 

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status