ঢাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

চলে গেলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ব্যাটালিয়ন কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আইনউদ্দিন, বীর প্রতীক

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ বায়েজিদ সরোয়ার, এনডিসি (অবসরপ্রাপ্ত)

(১ মাস আগে) ১৬ আগস্ট ২০২২, মঙ্গলবার, ৫:৪৫ অপরাহ্ন

আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন একাত্তর রনাঙ্গনের আর একজন যুদ্ধ-দেবতা। মুক্তিযুদ্ধের অসমসাহসী বীর, ৯ ইষ্ট বেংগলের প্রতিষ্ঠাতা- অধিনায়ক (ব্যাটালিয়ন কমান্ডার), কুমিল্লা শহর মুক্তকরনের গৌরবধারী, ১৯ পদাতিক ডিভিশনের প্রথম জিওসি, সেনাবাহিনীতে সেনা আইনের লিজেন্ড, বিএ-২০১ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আইনউদ্দিন, বীর প্রতীক, পিএসসি, গত ২ আগষ্ট, ২০২২, ঢাকা সিএমএইচ এ মৃত্যুবরন করেন। তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৭ বছর।

মোহাম্মদ আইনউদ্দিন ১৯৪৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ার চর থানার লক্ষিপুরে জন্ম গ্রহন করেন।অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র আইনউদ্দিন, ১৯৬৬ সালের৮ মে, পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমী (পিএমএ) হতে, প্রথম ওয়ার ফোর্সের সাথে কমিশন লাভ করেন। তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে বাঙালি- প্রধান ইউনিট ৪ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে (বেবি টাইগার্স) যোগদান করেন।

একজন আইনউদ্দিনের যুদ্ধ-যাত্রা
মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ আজও আমরা গড়তে পারিনি। সীমাহীন লোভ অনেকের মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছে। আর তাই, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জীবনের সমস্ত লোভের উর্দ্ধে উঠে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা আইনউদ্দিন এর মতো মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ-যাত্রার পাঠ হয়তো এখনো প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে এটি রূপকথা মনে হতে পারে।

মার্চ ১৯৭১। সে ছিল আমাদের অদ্ভুত সময়। বাঙালির মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে সমগ্র বাঙালী জাতি তখন জেগে উঠেছে। এক সময় স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরোধে নেমে পড়লো সামরিক বাহিনীর সামরিক সদস্যবৃন্দ, ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ বাহিনীরপ্রশিক্ষিত সদস্যবৃন্দ।

বিজ্ঞাপন
জাতির প্রয়োজনে হাজার হাজার ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, জনতা অস্ত্র হাতে তুলে নিলো। প্রাথমিক প্রতিরোধে ঝলছে উঠলো বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব। বিশেষত সেনা কর্মকর্তাগণ রনাঙ্গনে হয়ে উঠলেন এক একজন যুদ্ধ-দেবতা। আবার এই জনযুদ্ধে গনযোদ্ধা ও জনগনের সাথে একাকার হয়ে তারাও হয়ে উঠেছিলেন এক ধরনের গনযোদ্ধা। আইনউদ্দিন তাদেরই একজন।

১৯৭১ সালের ৪ ইষ্ট বেঙ্গল  এর অবস্থান ছিল কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসে। সেই ইউনিটের অধিনায়ক ছিলেন লেঃ কর্ণেল খিজির হায়াৎ খান (অবাঙালি), উপ অধিনায়ক ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ (পরে ব্রিগেডিয়ার/মেজর জেনারেল, বীর উত্তম)। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তখন গনহত্যা চালানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করছে। এরই অংশ হিসেবে ৪ ইষ্ট বেঙ্গলকে বিভিন্ন ক্ষুদ্রাংশে বিভক্ত করে সেনানিবাসের বাইরে পাঠিয়ে ইউনিটকে দূর্বল করার চক্রান্ত করা হয। ২৫মার্চ তারিখে সম্পূর্ণ ব্যাটালিয়ন সেনানিবাস থেকে ব্রাহ্মনবাড়িয়া শহরে এসে পৌছায়।

ইউনিটের কোয়াটার মাষ্টার হিসেবে দায়িত্বরত ক্যাপটেন আইনউদ্দিন চট্টগ্রামে নতুন গঠনরত ৯ম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বদলী করা হয়েছিল বলে তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে থেকে যান।পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় আইনউদ্দিন তার স্ত্রী (নাজমা আক্তার চৌধুরী মিলি) ও দুই শিশু কন্যাসহ (তমা ও তিনা) ময়নামতি সেনানিবাসের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পাকিস্তান বাহিনীর বাধার মুখে  তিনি তা করতে পারেননি। ২৫ মার্চ কুমিল্লায় পাকিস্তানী বাহিনীর পরিচালিত গনহত্যার পর পরিবার পরিজনকে নিয়ে তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। তার তরুনী স্ত্রী বললেন “তুমি বেঁচে থাকলে আমাদের জীবনের স্বার্থকতা আছে, তুমি মরে গেলে আমাদের বেচে থাকার কোন অর্থ নাই”। তরুণী জীবন সঙ্গিনীর এই কথায় অভিভূত হলেন। ততক্ষণে আইনউদ্দিন জীবনের চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ করলে নিশ্চিত মৃত্যুদন্ড। জীবনের কোন কিছু পরোয়া না করে জাতির প্রয়োজনে মৃত্যুকেই বেছে নিলেন। কারন বাংলা মা তাকে ডাকছে....।

পরিবারকে আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়ে, তিনি ২৭ মার্চ সকালেখুব সাধারন পোষাক পরে বাজারেরথলি হাতে নিয়ে বাই সাইকেলে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে পড়েন। পাহারারতপাকিস্তানী সৈনিকরা তাকে চিনতে পারেনি। এরপর কিছুক্ষন সাইকেলে, পরবর্তীতে স্থানীয় একজন তরুনের মটর সাইকেলে চড়ে বিকেলে ব্রাহ্মনবাড়িয়া শহরে অবস্থানরত ৪ ইষ্ট বেংগলে যোগ দেন। উল্লেখ্য, ২৭ মার্চ সকালে ৪ ইষ্ট বেংগল মেজর সাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে এবং দুপুরে মেজর খালেদ মোশাররফ শমসের নগর থেকে এসে অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহন করে।

পরবর্তীকালে জানা যায়, ক্যাপটেন আইনউদ্দিন তাঁর বাসা থেকে বের হওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট পরে পাকিস্তানী সৈন্যরা তাঁর খোঁজ করতে যায়। তাকে বাসায় না পেয়ে সৈন্যরা তার স্ত্রী এবং মেয়েদের গ্রেফতার করে। তাছাড়া পাকিস্তানী সৈন্যরা তার পরিবারের সদস্যদের সামনে তাদের বাসভবনটি বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়। উল্লেখ্য ঐ দিনই (২৭ মার্চ) সেনানিবাসের বাঙালি অফিসার, সৈনিকদের পরিবার পরিজন গ্রেফ্তার করে ইসপাহানি পাবলিক স্কুলে বন্দী করে রাখা হয়।এই সময় সেনানিবাসে অবস্থানরত বিভিন্ন ইউনিটের ২৪ জন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও প্রায় ৩০০ বাঙালি সৈনিককে পরবর্তী দুই-তিন দিনের মধ্যে বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয়। অলৌকিকভাবে বা নিতান্ত ভাগ্যের জোরে সেই হত্যাকান্ডের স্থান থেকে লেঃ ইমাম-উজ-জামান (পরে মেজর জেনারেল, বীর বিক্রম) আহত অবস্থায় পলায়ন করেন এবং পরে ৪ ইস্ট বেঙ্গলের সঙ্গে যোগ দেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে স্বপক্ষ ত্যাগের পর ৪ ইষ্ট বেঙ্গল ব্রাহ্মনবাড়িয়ার চর্তুদিকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ব্রাহ্মনবাড়িয়াকে মুক্তাঞ্চল ঘোষনা করা হয়। জনতা ও সৈনিকদের সে এক অকল্পনীয় ঐক্য। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমসিএ লুৎফুল হাই সাচ্চুর নেতৃত্বে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বেসামরিক প্রশাসন ৪ ইষ্ট বেঙ্গলকে অসাধারন সাহায্য ও সমর্থন প্রদান করে।  ক্যাপটেন আইনউদ্দিনকে ৪ ইষ্ট বেঙ্গল এর একটি কোম্পানী, ইপিআর, পুলিশ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত বাহিনীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২৯ মার্চ ব্রাহ্মনবাড়িয়ার উপর পাকিস্তান বাহিনী ব্যাপক বিমান আক্রমন শুরু করে। অধিনায়ক খালেদ মোশাররফ তার সদরদপ্তর তোলিয়াপাড়া স্থানান্তর করেন এবং ক্যাপটেন আইনউদ্দিনকে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব দেয়া হয়। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার সাধারন মানুষের স্বাধীনতা স্পৃহা, সমর্থন ও আত্মত্যাগ দেখে আইনউদ্দিন মুগ্ধ হন। তিনি বুঝতে পারেন এই সাধারন মানুষেরাই মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি। ১৪ এপ্রিল ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় ব্যাপক আক্রমন শুরু হলে আইনউদ্দিন তার বাহিনী নিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনায় শহর ছেড়ে রনকৌশলগত পূনবিন্যাস (প্রত্যাহার) করে আখাউড়া অঞ্চলে প্রতিরক্ষা অবস্থান গ্রহন করেন।

১৮ এপ্রিল তারিখে পাকিস্তানি বাহিনী (১২ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স) গঙ্গাসাগর-দরুইন এলাকায় আক্রমন করলে ৪ ইষ্ট বেঙ্গলের সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে সহযোদ্ধাদের জীবন রক্ষা করেছিলেন। বীর শ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা যে সাহস, শোর্য্য ও পরাক্রম প্রদর্শন করেছেন তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অবিস্মরনীয় হয়ে থাকবে। পরবর্তীকালে, বীর শ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফার স্মৃতিচারনকালে চোখের পানি ধরে রাখতে পারতেন না আখাউড়া অঞ্চলের কমান্ডার আইনউদ্দিন।

এভাবেই প্রাথমিক প্রতিরোধের পর ক্যাপটেন আইনউদ্দিনতাঁর বাহিনীসহ ভারতে চলেযান ও ত্রিপুরার মনতলিতে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করেন।মে মাসে সেক্টর গঠন হলে ২নং সেক্টরের গঙ্গাসাগর-আখাউড়া-কসবা সাব সেক্টরের(কসবা সাব সেক্টর) কমান্ডার হিসেবে কাজ করেন। তিনি তার অঞ্চলে দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় শত্রুদের বিরুদ্ধে এমবুশ, রেইড ইত্যাদি অভিযান পরিচালনা করে পাকিস্তানীদের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি সাধন করেন।

ঢাকা ও ফরিদপুরে যত মিশনে গেরিলা যোদ্ধাদের পাঠানো হতো, তাদের অনেককে মেলাঘর (২নং সেক্টর হেড কোয়ার্টার) থেকে কমান্ডার আইনউদ্দিনের মনতলী ক্যাম্পে পাঠানো হতো। তিনি মনতলী থেকে ঢাকা পর্যন্ত একটা সেইফ প্যাসেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ও কমিউনিকেশন নেটওয়ার্কের মতো ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কওতৈরি করে। কখনো কখনো বিদেশী সাংবাদিকদের রনাঙ্গন ঘুরে দেখানোর দায়িত্বও ছিল।

কিংবদন্তিময় সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনকে অতিরিক্ত কয়েকটি দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কারন তিনি আইনউদ্দিনের সামর্থ্য ও যোগ্যতা সম্পর্কে জানতেন। পিএমএ’তে খালেদ ক্যাডেট আইনউদ্দিনের অস্ত্র প্রশিক্ষক ছিলেন। সাক্ষাৎ দ্রোনাচার্য। খালেদ বাঙালি ক্যাডেটদের খুব উৎসাহ দিতেন। উল্লেখ্য, পিএমএ’তে প্রশিক্ষনরত অবস্থায় ক্যাডেট আইনউদ্দিনের বাঙালির মর্যাদা রক্ষার দৃঢ় মনোভাব, সাহস ও স্পষ্টবাদিতা নিয়েতাঁর বইতে লিখেছেন, ১ম ওয়ারকোর্সের আর এক গর্ব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন (আমার স্মৃতি কথা)।

মেজর আইনউদ্দিনের যুদ্ধকালীন বহুমুখী কর্মকান্ডের কথা লিখেছেন, ক্র্যাক প্লাটুনের ডেয়ার ডেভিল মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম, বীর প্রতীক। “মেজর আইনউদ্দিন ও তার সৈন্যরা শুধু যুদ্ধই করেনি, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য আরও লোক যাতে আসতে পারে, সে পথ খোলা রাখার দায়িত্ব ছিল তাদের ওপর। একই সাথে তিনি সামরিক অসামরিক লোকদের সামলাতে পারতেন” (ব্রেভ অব হার্ট, হাবিবুল আলম বীর প্রতীক)।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বহুবিধ দায়িত্ব পালনের বিষয়ে মেজর জেনারেল আইনউদ্দিন এক সাক্ষাৎকারে বলেন “পূর্বাঞ্চল থেকে, বাংলাদেশের পূর্ব দিক থেকে যে কোন রুট ঢাকা বা অন্য কোন দিক যেতে হলে আমার এরেঞ্জমেন্টে এ যেতে হতো। এটা আমার জন্য ঢাকার সাথে নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা অতিরিক্ত দায়িত্ব ছিল। নাইন বেঙ্গল ফর্ম করার পর আমাকে নাইন বেঙ্গলের দায়িত্ব দেয়া হল। তখন আমি তিনটা সাব সেক্টর দেখছিলাম। তারপরেও অতিরিক্ত দায়িত্ব বজায় রাখা আমার জন্য খুব দুরুহ ব্যাপার ছিল। আমি ঘুমাতে পারিনি, আমার ঘুমের সময় ছিল না, খাবার সময় ছিল না। (মুক্তিযুদ্ধে কসবা)।

১০ অক্টোবর ১৯৭১ সালে, ক্যাপটেন আইনউদ্দিনের অধিনায়কত্বে (ব্যাটালিয়ন কমান্ডার)নতুন পদাতিক ব্যাটালিয়ন ৯ ইষ্ট বেঙ্গল গড়ে ওঠে। প্রধমদিকে ইউনিটে মাত্র ২জন অফিসার ছিল। অধিনায়ক ও লেঃ এম হারুন-অর-রশীদ (পরে লেঃ জেনারেল, সেনা প্রধান, বীর প্রতীক)। নব গঠিত ইউনিট প্রতিষ্ঠার সাংগঠনিক দক্ষতা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতার বিষয়ে পরবর্তিতে লেঃ জেনারেল হারুন লেখেন- “এখন বিষয়টি কল্পনা করে বিস্মিত হই যে, কীভাবে আমরা ২জন অফিসার একটি ব্যাটালিয়নকে মাঠে সংগঠিত করা, প্রশিক্ষন দেয়া এবং সুসজ্জিত করার মতো জটিল কাজটি করতে পেরেছিলাম”। (বিজয়ের পথে)

প্রিয়তম স্ত্রী কন্যা শত্রুর হাতে বন্দি। অথচ কমান্ডার আইনউদ্দিনের সহযোদ্ধারা কখনো তাকে হত্যোদম বা ভেঙে পড়তে দেখেনি। একই স্পিরিটে যুদ্ধ করছিলেন ২ নং সেক্টরের আর এক যুদ্ধ-দেবতা, দুর্ধ্ষ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ক্যাপটেন এইচ এম আব্দুল গাফফার (পরে ৪ ইষ্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক, লেঃ কর্ণেল, মন্ত্রি, বীর উত্তম)। ক্যাপটেন গাফফারের নব পরিনীতা স্ত্রীও কুমিল্লা সেনানিবাসে বন্দি ছিলেন। ১৯৭১ এ, আমাদের এইমুক্তিযোদ্ধারা কি এক একজন অতি মানব হয়ে উঠেছিলেন?

একবার কমান্ডার আইনউদ্দিনের ‘ছেলেরা’ দুর্ভেদ্য কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরেও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করে। রমনী মোহন শীল ছিলেন পাকিস্তানের কুমিল্লা বিগ্রেডে কর্মরত বারবার (নাপিত) কন্ট্রাক্টর। রমনী মোহন শীল ইস্পাহানী স্কুলে বন্দী শিবিরের গার্ডদেরও চুল কাটতেন ও দাড়ি  শেভ করতেন। তার সাহস বুদ্ধি ও কৌশলে একদিন বেগম আইনউদ্দিনের একটি চিরকুট (আমরা ভালো আছি) পৌঁছে গেল আইনউদ্দিনের মনতলী ক্যাম্পে। ছোট্ট চিঠি। অথচ এটি আইনউদ্দিনকে যুদ্ধ করার অপার শক্তি দিয়েছিল।এভাবেই শত্রুদের অনেক তথ্য মুক্তি বাহিনীর কাছে পৌছে যেত। পাকিস্তানি দূর্গে পরিচালিত এইআশ্চর্য গোয়েন্দা কাহিনীর কথা আমিবাবু রমনী মোহন শীলের কাছ থেকেই শুনবো ১৯৯৪ সালে। তখন তিনি বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমির বারবার কন্ট্র্যাক্টর। প্রকৃতপক্ষে রমনী মোহন ছিলেন কুমিল্লা সেনানিবাসের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড ও অপরাধের নীরব স্বাক্ষী। সে এক অন্য ইতিহাস।

১৯৭১ এর অনেক বছর পর জেনারেল আইনউদ্দিন একবার পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে আইনউদ্দিনের কোর্সমেটগণ রনাঙ্গনে তাঁর বীরত্ব সম্পর্কে জানতেন। ততোদিনে তারা সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদগুলোতে অধিষ্ঠিত। সফরকালে একজন বন্ধু উর্দুতে বলেছিলেন “ইয়ার...আইনউদ্দিন তুমি তো আমাদের ১২ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের বারোটা বাজিয়েছিলে।” আইনউদ্দিনের কাছে এটি ছিলবীরত্বের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

কসবা দখলে রাখা মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানী বাহিনীর মর্যাদার লড়াই এ পরিনত হয়েছিল। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের আদেশে, প্রতিষ্ঠার মাত্র ১২ দিনের মাথায়(২২ অক্টোবর) ৯ ইষ্ট বেঙ্গল কসবা আক্রমন করে ও শত্রু মুক্ত করে। অধিনায়ক বা ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হিসেবে এটি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও এটি ছিল সফল অভিযান আক্রমন। তথাপি এর সঙ্গে অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। খালেদ মোশাররফ আক্রমনের অগ্রগতি স্বচক্ষে দেখার জন্য যুদ্ধ এলাকায় যান। কসবার বিপরিতে পাহাড়ের শীর্ষে অবস্থিত ভারতীয় বিএসএফ পোষ্টে (কমলাসাগর বিওপি) বসে তিনি যুদ্ধের দৃশ্য পর্যবেক্ষন করছিলেন। এই সময় শত্রুর আর্টিলারী গোলার আঘাতে সেক্টর কমান্ডার গুরুতরভাবে আহত হন। তখনও শেলিং ও মেশিন গানের গুলি চলছিল। এই অবস্থার ভেতর ঘটনাস্থল থেকে ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন ও অত্যন্ত সাহসী সহযোদ্ধা অফিসার লেঃ শাহরিয়ার হুদা,লেঃ কর্ণেল খালেদ মোশাররফকে কাঁধে করে বাইরে নিয়ে যান। খালেদকে নিয়ে আইনউদ্দিন নিজে গাড়ি চালিয়ে নিকটবর্তি হাসপাতালের দিকে ছোটেন....।

কসবার পর ৯ ইষ্ট বেঙ্গলের সবচেয়ে আলোচিত যুদ্ধ ছিল চন্দ্রপুর-লাতুমুড়া আক্রমন। এই যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১১ পাঞ্জাবের একটি কোম্পানীও অংশগ্রহন করেছিল। তরুন ও অত্যন্ত সাহসী কোম্পানী কমান্ডার লেঃ হারুন অর রশীদ অসাধারন নেতৃত্ব দিলেও এই যুদ্ধে ব্যাটালিয়নের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। যুদ্ধে শতাধিক সৈনিকের হতাহতের বিষয়টি অধিনায়ক আইনউদ্দিনকে প্রায় সারা জীবন তাড়া করেছে। এই যুদ্ধে যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে-ব্যাটালিয়ান কমান্ডার হিসেবে এই বিষয়টি তিনি ভারতীয় ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার তুলিকে জানিয়েছিলেন। ব্রিগেডিয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, আক্রমনের আগে শত্রু এলাকায় ব্যাপক আর্টিলারী ফায়ার করা হবে যেন আক্রমনের সময় খুব সুবিধা হয়। চন্দ্রপুর যুদ্ধে শতাধিক সৈনিকের মৃত্যু তিনি কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। এর ১৮ বছর পর ব্রিগেডিয়ার আইনউদ্দিন ভারত সফরকালে,মুক্তিযুদ্ধে অসাধারন ভূমিকা পালনকারী লেঃ জেনারেল সাগাত সিং (মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্বাঞ্চলে ৪ নং কোর কমান্ডার) এর সঙ্গে জয়পুরে তার বাসভবনে (মেঘনা) দেখা করেন। দুজন ফিরে যান একাত্তরের রনাঙ্গনে।  চন্দ্রপুর যুদ্ধ প্রসঙ্গ উঠলে এই প্রবীন জেনারেল দুঃখ প্রকাশ করেন।

১৯৭১ এর নভেম্বর মাসে আইনউদ্দিন মেজর পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত হন। ৬ ডিসেম্বর, ৯ ইষ্ট বেঙ্গল (কে ফোর্স এর অংশ হিসেবে) আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে কুমিল্লা শহরের দিকে অগ্রসর হয়। শত্রুর কয়েকটি বাধাঁ উড়িয়ে ৯ ইস্ট বেঙ্গল ১৯৭১ এর ৮ ডিসেম্বর তারিখেকুমিল্লা শহর মুক্ত করে। এই অভিযানে ভারতের ১/১১ গুর্খা রেজিমেন্টও অংশ নিয়েছিল। মেজর আইনউদ্দিন শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ে অবদান রাখেন। কিন্তু কুমিল্লা সেনানিবাসের পতন না হওয়ায় অপারেশন অব্যাহত রাখতে হয়।

১৩ ডিসেম্বর তারিখে বিকেল বেলায় পাকিস্তানী কতৃপক্ষ দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধে তাদের কাছে বন্দী থাকা বাঙালি অফিসার/সৈনিকদের স্ত্রী সন্তানদের মুক্ত করে দেয়। মেজর আইনউদ্দিনের স্ত্রী ও কন্যাদেরও ঐদিন মুক্ত করে দেয়া হয়।

পাকিস্তানী কমান্ডারগন ১৭ ডিসেম্বর আত্মসমর্পনের সিদ্ধান্ত নেয়। কোটবাড়িস্থ ইপিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টারে আত্মসমর্পনের জন্য অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার আতিকসহ আরো কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা ভারতের মেজর জেনারেল গনজালভেসের নিকট আত্মসমর্পন করে। মেজর আইনউদ্দিন আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন।

মেজর আইনউদ্দিনের নেতৃত্বে ৯ ইষ্ট বেংগল বিহারীদের নিরস্ত্র করার জন্য পরিচালিত মিরপুর মুক্তকরন অভিযানেও (১৯৭২ এর ফেব্রুয়ারী) অংশগ্রহন করে।স্বাধীনতা যুদ্ধে অসাধারন অবদান ও বীরত্ব প্রদর্শন এবং বীরত্ব সূচক অবদানের জন্য তিনি “বীর প্রতীক” খেতাবে ভূষিত হন। অনেক পরে, ঢাকার গুলশান- ২ এর ৫১ নম্বর সড়কটি এই মুক্তিযোদ্ধার সম্মানে নামকরণ (বীর প্রতীক আইনউদ্দিন সড়ক) করা হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে মেজর আইনউদ্দিন নতুন দেশের নতুন সেনাবাহিনী পূর্ণগঠনে আত্মনিয়োগ করেন। শুরু হয় সেনা বাহিনী পুনঃগঠনের “নতুন যুদ্ধ”। এরপর লেঃ কর্ণেল, কর্ণেল, ব্রিগেডিয়ার ও মেজর জেনারেল পদ লাভ করেন। তিনি ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে চাকুরী করেন।

জেনারেল আইনউদ্দিন দেশে বিদেশে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষন গ্রহন করেন। তিনি সেনাবাহিনী/প্রেষনে গুরুত্বপূর্ণ পদ যেমন: ইষ্ট বেংগল রেজিমেন্ট সেন্টারের রেকর্ড অফিসার, প্রশাসনিক স্কুলের কমান্ড্যান্ট, বিএনসিসি পরিচালক, বিগ্রেড কমান্ডার, সেনাসদরে ডিপিএ,ডিডিজি-বিডিআর, রাজশাহী উন্নয়ন কতৃপক্ষের চেয়ারম্যান,লজিস্টিকএরিয়া কমান্ডার এবং ১৯ পদাতিক ডিভিশনের প্রথম জিওসি হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

জেনারেল আইনউদ্দিন মিলিটারি ল বা সেনা আইনে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। এ বিষয়ে মৃত্যুর পর তার এক প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা সহকর্মী ফেইসবুকে এভাবে স্মৃতি চারন করেন “আমাদের কাছে তিনি ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির মতো জ্ঞানী। আইন এর ডিপো। তার পিতা মাতার দেয়া নাম বৃথা হয়নি। আমরা তাকে বলতাম চলন্ত আইনের বই। সামরিক (সেনা) আইনের বই এর নাম এমবিএমএল (ম্যানুয়াল অব বাংলাদেশ মিলিটারী ল)। তার নাম ছিল “মোবাইল এমবিএমএল।”

বিপদগ্রস্ত সহকর্মীদের প্রয়োজনে আইনের সহায়তার জন্য তিনি‘ফ্রেন্ড অব একিউজড’ বা আত্মপক্ষ সমর্থনকারী অফিসার হিসেবে ঝাপিয়ে পড়তেন। এক্ষেত্রে  নিজের ক্যারিয়ার, ভবিষ্যত, নিরাপত্তা কোন কিছুই ভাবতেন না। ১৯৮০ এর দশকে গঠিত অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি ফিল্ড জেনারেল কোর্ট মার্শাল (এফজিসিএম) চলাকালেও তিনি অভিযুক্ত অফিসারদের পক্ষে ডিফেনডিং অফিসার এর দায়িত্ব পালনে ঝুঁকি নিয়েছিলেন। সেনা আইনের ক্ষেত্রেআইনউদ্দিন ছিলেন কিংবদন্তি।ইষ্ট বেংগল রেজিমেন্টাল সেন্টারের ‘সিনিয়র রেকর্ড অফিসার’ হিসেবে তিনি একটি অসাধারন কাজ করেছিলেন। “তিনি ইবিআরসির হাজার হাজার সৈনিকদের নাড়ির নক্ষত্র সমস্ত নথিপত্র শুন্য থেকেবানিয়েছিলেন।”

অত্যন্ত নিরহংকার, পরোপকারী, সৈনিক-বৎসল ও অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত, কিন্তু স্পষ্টবাদী মেজর জেনারেল আইনউদ্দিন ছিলেন তিন কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। বেগম নাজমা আক্তার চৌধুরী ২০১৮ সালে মৃত্যুবরন করেন। অবসর জীবনে তিনি সিটি ইউনিভার্সিটির খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কয়েক বছর নিয়োজিত ছিলেন।

দি লাস্ট পোষ্ট...
২০২২ সালের ২ আগষ্ট বিকেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় বনানী সামরিক কবরস্থানে জেনারেল আইনউদ্দিন এর দাফনের আয়োজন করা হয়। জানাজা নামাজের পরে মোহাম্মদ আইনউদ্দিনের মরদেহ বনানী সামরিক কবরস্থানে আনা হলো। নৌবাহিনী সদর দপ্তরের দক্ষিনে ও সামরিক কবরস্থানের উত্তর দিকের পার্কিং এরিয়ায় জাতীয় পতাকায় ঢাকা আইনউদ্দিনের কফিন একটি গান ক্যারেজে রাখা হয়।

বিকেলে ৫.৪০ এ শুরু হয় সেনাবাহিনীর উদ্যোগে রাষ্ট্রিয় (সম্মাননায়) মর্যাদায় দাফনের আনুষ্ঠানিকতা। এর আয়োজনে রয়েছে ২৫ ইষ্ট বেংগল (মৃত্যুজ্ঞয়ী পঁচিশ) এর একদল চৌকশ সেনাদল। উল্লেখ্য এটিই আমার মাতৃ-ইউনিট। সামরিক ঐতিহ্য অনুযায়ী সেরিমনিয়াল পোষাক পরা৪ জন সেনা কর্মকর্তা পল বেয়ারার হিসেবে ধীর গতিতে মার্চ করে গান ক্যারেজটিনিয়ে এগিয়েযায়....।

পল বেয়ারারদের পেছনে ফিনারাল প্রসেশনে মরহুমের পরিবার, আত্বীয়স্বজন, সেনা কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য, মুক্তি যোদ্ধাগনের সঙ্গে আমিও ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই।
একটি বিশেষ কারণে মেজর জেনারেল আইন উদ্দিনের কাছে আমার ও রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের ১৪তম ব্যাচের সেনাকর্মকর্তাদের ঋণ ও কৃতজ্ঞতা আছে। তৎকালিন কর্ণেল আইনউদ্দিন কলেজ পরিদর্শনে এসে (১৯৮২) সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য আমাদের দারুনভাবে অনুপ্রাণিত, ওউদ্বুদ্ধ করেছিলেন।রাওয়া ক্লাবে, কোরো অফিসে, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে, কখনো দীর্ঘ ইন্টারভিউতে মুক্তিযুদ্ধ ও তার সামরিক জীবন নিয়ে অনেক বার কথা হয়েছে। একবার বলেছিলেন এসব নিয়ে তিনি লিখবেন...।

মসজিদের কাছে এসে পল বেয়ারারগন কফিনকাঁধে নিলেন এবং নির্ধারিত কবরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন।২০১৮ সালে এই বনানী কবরস্থানেইসমাহিত হয়েছেনবেগম নাজমা আক্তার চৌধুরী। সেই কবরেই আজ জেনারেলকে সমাহিত করা হচ্ছে।

কবরের কাছে এসে দাফনের বারাষ্ট্রীয় সম্মাননার চুড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়া। মরহুমের জীবন বৃত্তান্ত পাঠের পর পালন করা হয় এক মিনিট নীরবতা। এই সময় সামরিক বাহিনীর সদস্যগন স্যালুট করেন। মরদেহ কবরে নামানো ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর ২৫ ইস্ট বেঙ্গলের চৌকস সেনাদল কর্তৃক ভলি ফায়ার (গান স্যালুট) প্রদান করা হয়।

সেনাবাহিনী প্রধানের পক্ষে প্রধান শোক জ্ঞাপনকারী অফিসার মেজর জেনারেল মুহম্মদ যুবায়ের সালেহীন কবরে পুষ্পস্তবকপ্রদান করলেন। সেনাবাহিনী সম্মান গার্ড এবার মরনোত্তর সালাম (আর্মস ডাউন) প্রদান করলো। বিউগলের করুন সুরে এভাবেই শেষ বিদায় (লাস্ট পোষ্ট) জানানো হলো মুক্তিযুদ্ধের বীর ও অন্যতম ব্যাটালিয়ান কমান্ডার জেনারেল আইনউদ্দিনকে। তখন সন্ধ্যা ৬.১৫।

এরপর ধর্মীয় শিক্ষক কতৃক মরহুমের আত্মার মাগফিরাত এর জন্য মোনাজাত করা হল। সবশেষে,মেজর জেনারেল যুবায়ের সালেহীন মরহুমের পুত্র মোহাম্মদফখরুউদ্দিনকে জাতীয় পতাকা প্রদান করলেন।

এখন সন্ধা। শেষ হলো রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের আনুষ্ঠানিকতা। অপরুপ বৃক্ষ লতা ফুলে ঘেরা কবরে চিরতরে ঘুমিয়ে আছেন মুক্তিযোদ্ধা আইনউদ্দিন। কবরটির নিকটবর্তি চারপাশে ছেয়ে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ সুরভিত সাদা জেসমিন ফুলে। এই ফুলকে খুব ভালবাসতেন মোহাম্মদ আইনউদ্দিন। ১৯৪৫ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারী কুলিয়ার চরের লক্ষীপুরে জীবনের যেযাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা শেষ হলো বনানীতে এসে।

১৯৭১ এ দেশের স্বাধীনতার জন্যস্ত্রী-সন্তান, চাকুরি সব কিছু ছেড়ে এসেছিলেন ২৬ বছরের যুবক আইনউদ্দিন। এই অকুতোভয় বীর যোদ্ধা আমাদের স্মৃতিতেচিরঅম্লান হয়ে রইবেন। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বই ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। ভবিষ্যতপ্রজন্ম আইনউদ্দিন এর মতো বীরদেরই খুঁজে নেবে অবলীলায়। স্যালুট টু ইউ জেনারেল...।


লেখক: গবেষক।
[email protected]

পাঠকের মতামত

মহান মুক্তিযুদ্ধা জেনারেল আইনুদ্দিনের সহযোদ্ধা হিসেবে ৭১ এর ৮ই ডিসেম্বর ভোরে কুমিল্লা শহরকে শত্রুমুক্ত করার সৃতি আজও চোখের সামনে ভাসছে। তাঁর অসাধারণ নেত্রীত্যের গুণাবলী চির অম্লান হয়ে থাকুক।

মাহবুবুল ইসলাম
২১ আগস্ট ২০২২, রবিবার, ৩:৪৫ পূর্বাহ্ন

I salute our freedom fighter. May almighty rest in peace.

Shahab
১৯ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন

Salute Comrade (Innalillahi wa inna ilaihi rageun)

Mirza Golam Quddus K
১৮ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১০:১৩ অপরাহ্ন

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status