ঢাকা, ১৯ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

আমাদের সংস্কৃতির উপর পদ্মা সেতুর ভবিষ্যত প্রভাব

গাজী মিজানুর রহমান

(২ সপ্তাহ আগে) ১ আগস্ট ২০২২, সোমবার, ১:৫৬ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৪:৩৭ অপরাহ্ন

পদ্মা বাংলাদেশের অঘোষিত জাতীয় নদী। পদ্মা আমাদের গানে, কবিতায়, উপন্যাসে, সিনেমায় বিশিষ্ট স্থান দখল  করে আছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পদ্মার বুকে তার ব্যক্তিগত বোটে ভেসে ভেসে গ্রামবাংলার প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে জানার সুযোগ পেয়েছিলেন। শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসর কবিজীবনের তিন গুরুত্বপূর্ণ স্থান। কলকাতা থেকে ট্রেনে চেপে কুষ্টিয়া তারপর নৌকাযোগে গড়াই -পদ্মা। তারপর ইছামতী, বড়াল ও গোহালা। রবীন্দ্রনাথের সে সময়কার রচিত কবিতা, গান ও অন্যান্য সাহিত্য-কীর্তি তার কবিজীবনে অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। বিশেষ করে ‘সোনার তরী’ কাব্য রচনার নেপথ্যে পদ্মার ভূমিকা অপরিসীম। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের– “পদ্মার ঢেউরে– মোর শূন্য হৃদয়-পদ্ম নিয়ে যা রে’- এই গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। পদ্মাকে নিয়ে গাওয়া আব্বাস উদ্দিন ও আব্দুল আলীমের গান আমাদের ভীষণভাবে নাড়া দেয়।

বিজ্ঞাপন
এসব গানের মধ্যে কোনো-কোনোটিতে দেহকে একটা নৌকার সাথে তুলনা করে উদ্দাম পদ্মাকে দেখা হয়েছে জীবনের নানা প্রতিকূল অবস্থার প্রতীক হিসেবে।

পদ্মা সেখানে এক সর্বনাশা নদী, যার কূল-কিনারা নেই। মানিক বন্দোপাধ্যায় পদ্মা-পাড়ের মানুষের জীবন নিয়ে উপন্যাস লিখে আমাদের সাহিত্য-ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। ‘গরীবের মধ্যে গরীব আর ছোটলোকের মধ্যে ছোটলোকের’ জীবন কাহিনীর মধ্যে পদ্মা বারংবার উপন্যাসের আরেক চরিত্র হয়ে উঠেছে। পদ্মাকে নিয়ে রচিত সাহিত্যের এ তালিকা অনায়াসে আরও দীর্ঘায়িত করা যাবে। এখন পদ্মার শরীরে যে সেতুর মেখলা তৈরি হলো, তার পরিপ্রেক্ষিতে পদ্মা হয়তো শিল্পী, লেখক, গায়কদের নিকট এক নতুন ব্যক্তিত্ব নিয়ে  উপস্থিত হবে। এটা  প্রত্যক্ষ করতে এখন আমাদের অপেক্ষা করার পালা।

কোনো  স্থাপনা যেদিন সব মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়, সেদিন থেকে তার নতুন জীবন শুরু হয়। ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্তের সাথে মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও কল্পনা এসে ভর করে। স্থাপনা তখন একপ্রকার জীবন্ত ব্যক্তিত্বে পরিণত হতে থাকে। ২৫ জুন থেকে পদ্মা সেতুর জীবনে সে নবযাত্রা শুরু হয়েছে। সর্বসাধারণের সাথে এখন তার পরিচয় ঘটবে। পদ্মা সেতু মানুষের মনের মধ্যে ঢুকে নানা আঙ্গিকে ছাপ ফেলতে থাকবে। এমনটা হয়েছে বিশ্বের নানা স্থানে গড়ে ওঠা নানা সেতু নিয়ে। ঠিক সেভাবে পদ্মা ব্রিজ নিয়ে কেউ কেউ ভবিষ্যতে উপন্যাস লিখবেন, কবিতা রচনা করবেন, ছবি আঁকবেন, কিংবা গান লিখবেন বা গাইবেন। আবার কেউ কেউ হয়তো সিনেমাও বানাবেন। এতে শিল্প-সংস্কৃতির ভুবন সমৃদ্ধ হবে। আবার এসবের কিছুই না-ও হতে পারে। বঙ্গবন্ধু সেতু উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনলেও সাহিত্যে তার উপস্থিতি সেরকম হয়নি। বর্তমানে পদ্মা সেতু নিয়ে যে সব কবিতা ও গান লেখা হচ্ছে, তাদের মধ্যে মহৎ সৃষ্টি হিসেবে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে পারঙ্গম হয়েছে এমন কটা উদাহরণ আছে? লেখক, গায়ক, শিল্পী ও নির্মাতারা যাই লিখুক, আর নির্মাণ করুক না কেন, মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হতে গেলে তার মধ্যে উপস্থিত হতে হবে চারপাশের বাস্তব জীবন। অন্যথায়  শিল্প-সাহিত্য বড় মাপের আকৃতি ধারণ করতে পারে না।

জীবনের প্রতিফলন, অর্থাৎ মানুষের আশা-নিরাশা, দুঃখ-সুখ, পাওয়া-না-পাওয়ার চিত্রায়ন ছাড়া সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সেতুকে আনলেও সেতুর অস্তিত্ব অনুভূত হয় না। এ প্রসঙ্গে আমরা টি এস এলিয়টের বিখ্যাত কবিতা “দ্যা ওয়েস্ট ল্যান্ডের” কথা বলতে পারি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে যুদ্ধ এবং মহামারিতে বিধ্বস্ত ইউরোপের মারাত্মক প্রভাব পড়েছিল লন্ডনের উপর। লন্ডন ব্রিজের উপরে ধাবমান জন্স্রোতের মধ্যে এলিয়ট তাই আবিষ্কার করেন হতাশা, নিঃসঙ্গতা আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন আত্মমগ্নতা। অন্যদিকে খুব কাছের এক প্রিয়জন কর্তৃক প্রতারিত এবং হতাশাগ্রস্ত হয়ে ফ্রান্সের পন্ট নাফ ব্রিজে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল এক যুবতী। সেখানে তিনি বেঁচে থাকার প্রেরণা হিসেবে নতুন একজনকে পেয়ে যান এবং জীবনের কাছে ফিরে আসেন। গল্পটা ‘ফোর নাইটস অফ এ ড্রিমার’ ছবির। আবার বিপরীতটাও ঘটেছে  ‘ওয়াটারলু ব্রিজ (১৯৪০)’ সিনেমার গল্পে। এ ব্রিজের উপরে এসে ভাগ্যের হাতের ক্রীড়নক এক রমণী আত্মহত্যার পথে পা বাড়ায়। ব্রিজ আসলে একটা  উপলক্ষ্য মাত্র। জীবনের বাস্তবতা না ফুটলে সে এক জড় স্থাপনা ছাড়া কিছুই না।

দেশে দেশে ব্রিজ নিয়ে নানা ধরণের  মাতামাতি  হয়েছে। ফরাসি দেশ থেকে প্রেম-প্রত্যাশী যুবক-যুবতীর মধ্যে একটা উন্মাদনা শুরু হয়। তারা বিশেষ কোনো ব্রিজে গিয়ে ব্রিজের রেলিংয়ের সাথে তালা সেঁটে দেয় এবং চাবিটা নদীতে ফেলে দেয়। তার আগে তারা তালায় নিজেদের নাম স্বাক্ষর করে রাখে।  তাদের বিশ্বাস, এতে ভালোবাসা মজবুত হয়। ফল  হয়  এই যে, টন টন তালার ভারে ব্রিজের রেলিং কাঁপতে থাকে, এবং একসময় প্রচুর অর্থ ব্যয় করে কর্তৃপক্ষ যারা তাদেরকে তালাগুলি সরাতে হয়। তবে  পদ্মা সেতু নিয়ে এমন আজগুবি কান্ড হওয়ার সম্ভাবনা কম। এশিয়াতে এ সংস্কৃতি নেই। কিন্তু তবুও আমাদের অনুকরণপ্রিয়তার উপরে বিশ্বাস রাখা যায় না। তবে আশার কথা এই যে, পায়ে হেঁটে সেতু পার হওয়ার কোনো ব্যাবস্থা নেই ব’লে পাগলামি করার সুযোগ নেই। ব্রিজ নিয়ে মানুষের পাগলামির  আর একটা উদাহরণ দেয়া যায়। ১৮৮৩ সালে  ব্রুকলিন ব্রিজ চালু হওয়ার পর ‘সেলিং দ্যা ব্রুকলিন ব্রিজ‘ নামে আমেরিকায় একটা শব্দগুচ্ছ উৎপত্তি হয়েছে। জর্জ সি পার্কার নামের এক প্রতারক বেছে বেছে নিরীহ হাবাগোবা টাইপের লোকেদের কাছে ব্রুকলিন ব্রিজ বিক্রয় করার চেষ্টা করে একাধিকবার সফল হন। কেউ কেউ নিজের বোকামি বুঝতে পেরে চুপিচুপি কেটে পড়লেও এক ব্যক্তি যখন ব্রিজের দখল নিতে যায়, তখন পুলিশ ঘটনা জানতে পেরে পার্কারকে আটক করে। অবশেষে তার ঠাঁই হয় জেলখানায়। কয়েদী হিসেবে ১৯৩৬ সালে জেলখানাতে তার মৃত্যু হয়। আমেরিকাবাসীর জন্য জন্ম হয় বোকা বানিয়ে লোক-ঠকানোর ফ্রেজ ‘সেলিং দ্যা ব্রুকলিন ব্রিজ‘। পদ্মা সেতু নিয়ে এমন কিছু না হলেও বলা যায় যে, এইসেতু নিয়ে মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে ভালো-মন্দ কিছু মিথের জন্ম হবেই। কি সেগুলি তা সময় বলে দেবে।

(গাজী মিজানুর রহমান : লেখক এবং প্রবন্ধকার  )

 

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status