ঢাকা, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, মঙ্গলবার, ১০ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৩ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

শেষের পাতা

ডোপ টেস্ট কেলেঙ্কারি

আসামিদের নিয়ে হাসপাতালে বিচারক, অতঃপর...

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
৩১ মার্চ ২০২৪, রবিবার

সোমবার মাদক মামলায় ১৫ জনকে ৬ মাস থেকে ৩ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. হুমায়ুন কবীর এ রায়  দেন। এর আগে মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের স্বার্থে ডোপ টেস্টের নির্দেশ দেন বিচারক। ডোপ টেস্টের সেই রিপোর্ট পর্যালোচনায় প্রশ্ন তৈরি হলে আসামিদের নিয়ে জেলা হাসপাতালে ছুটে যান বিচারক। সেখানে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর আসামিদের ডোপ টেস্টের জন্য দেয়া ইউরিনের বদলে পানি পূর্ণ করে ল্যাবে জমা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন। পরে আদালতে ফিরে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন।  শুক্রবার বিচারক নিজের ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঘটনাটি তুলে ধরেন। বিচারক হুমায়ুন কবীর তার স্ট্যাটাসে জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনিয়ম আর ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কঠিন এক বাস্তবতার অবতারণা করেছেন। এমন ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাসুদ পারভেজ বলেন, বেশ কয়েকজন রোগী আদালত থেকে এসে জরুরি ডোপ টেস্টের জন্য তাড়াহুড়ো করেন।

বিজ্ঞাপন
তারা টেকনিশিয়ানদের হাতে কিছু টাকাও দেন। যেন তাদের রিপোর্ট জরুরি হয়। এখানে সরকারি ফি ৯০০ টাকা ছাড়াও বকশিস নেয়া হয়। যার প্রমাণ মিলেছে। এমন অপরাধের জন্য একজন টেকনিশিয়ানকে শোকজ করা হয়েছে, একজনকে সতর্ক ও অপর একজনকে জেলা হাসপাতাল থেকে বদলি করা হবে। 

ডা. মাসুদ পারভেজ বলেন- ডোপ টেস্টে অর্থ আদায়ের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আরও কী ব্যবস্থা নেয়া যায়- সে বিষয়ে পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে। মানবজমিন’র সঙ্গে আলাপে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় প্রত্যেককে ছয় মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ঘটনটি ফেসবুকে তুলে ধরার মাধ্যমে পদে পদে অসঙ্গতি আর আদালতের এজলাসে বসে সঠিক রায় কত কঠিন সেটি বোঝানোর চেষ্টা করেছি।   বিচারকের স্ট্যাটাস তুলে ধরা হলো- ২৫ মার্চ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৫টি মাদক মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল। মামলাগুলো ২০১৭-২০১৮-২০১৯ সালের। দীর্ঘদিন আসামিরা আদালত চত্বরে ঘোরাঘুরি করেছেন নিয়মিত হাজিরাও দিয়েছেন। অন্যদিকে মাদকের পরিমাণও বেশি না। সবকিছু বিবেচনা করে মনে করলাম আসামিদের প্রবেশন দেয়া যায় কিনা। আবার  ভাবলাম দেখি আসামিদের ডোপ টেস্টের রেজাল্ট কি আসে তারপরে সিদ্ধান্ত নেবো। এটা বিবেচনা করে ডোপ টেস্টের জন্য ২৫০ শয্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ  জেলা হাসপাতালে পাঠালাম।

 আসামিরা ডোপ টেস্টের রেজাল্ট নিয়ে হাজির হলো। দেখলাম মাত্র একজন আসামির রেজাল্ট পজিটিভ এসেছে বাকি সবগুলোর নেগেটিভ। চিন্তায় পড়ে গেলাম রেজাল্ট কি ঠিক এলো নাকি সত্যি সত্যিই আসামিরা মাদক ছেড়ে দিয়েছে। আমার জানামতে ছয় মাস আগেও যদি কেউ মাদক গ্রহণ করে তবুও ডোপ টেস্টে তার রেজাল্ট পজিটিভ আসবে। এমনিতেও আসামিরা আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন- তারা মাদকের সঙ্গে জড়িত না মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের ফাঁসানো হয়েছে। তখন মনে হচ্ছিল এতগুলো নিরপরাধ মানুষকে কীভাবে ফাঁসানো হলো। আরও অনেক চিন্তা মাথায় ঘুরছিল। এরপর ডোপ টেস্টের সব রিপোর্ট ভালোভাবে পর্যালোচনা করে দেখলাম। দেখতে পেলাম সবক’টা ইউরিন অর্থাৎ প্রসাব গ্রহণের মাধ্যমে টেস্ট করা হয়েছে। আমার কাছে একটু সন্দেহ হলো আমি বললাম ব্লাড টেস্টের মাধ্যমে রিপোর্ট নিয়ে আসেন। কিছুক্ষণ পর একজন আইনজীবী এসে বললেন স্যার প্রত্যেক টেস্টের জন্য ১১০০ টাকা খরচ হচ্ছে এরা গরিব মানুষ এত টাকা কোথায় পাবে। আবার আসামিদের ডাকলাম। 

 আমার ধারণা ছিল সরকারি হাসপাতাল ১০ টাকার টিকিট কেটে টেস্ট করা সম্ভব। তিনি লিখেছেন, আসামিরা পুনরায় এসে একটি ভয়ঙ্কর তথ্য দিলেন। তারা বললেন- স্যার ৯০০ টাকা রিপোর্টের জন্য আরও ২০০ টাকা বকশিশ (ঘুষ) নিয়েছে। এজলাস থেকে নেমে আসামিদের নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মহোদয়ের রুমে গেলাম এবং উনাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললাম। আমার কথা উনি মনোযোগ সহকারে শুনে ডোপ টেস্টের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে ডাকলেন। তত্ত্বাবধায়ক মহোদয় আমার অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই সংশ্লিষ্টরা অকপটে স্বীকার করে বলেন স্যার ৯০০ টাকা টেস্টের খরচ আর ২০০ টাকা  আমাদেরকে খুশি হয়ে দিয়েছে। শুনে খুব রাগ হচ্ছিল। এরপরেও চেপে রেখে মৃদু হেসে নিজেকে সংযত করে মনে মনে ভাবলাম মাত্র ২০০ টাকা! কত জন, কত ভাবে, কত কায়দায় হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করেও বহাল তবিয়তে ঘোরাফেরা করছে। সেখানে মাত্র ২০০ টাকা! এটা আমার মাথাব্যথা না। পরবর্তী ঘটনা ছিল আরও ভয়ঙ্কর। আমি তত্ত্বাবধায়ক মহোদয়কে বললাম ইউরিন বা প্রস্রাব টেস্টের মাধ্যমে  সঠিক ডোপ টেস্টের রেজাল্ট পাওয়া যায় কি? উনি আমাকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললেন অবশ্যই। ৯৮% সঠিক আসবে।  কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কোথায় যেন একটা ঘাপলা আছে। আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল। অবশ্য তাতে আমার আপত্তি নেই। সঠিক তথ্য বের করতেই হবে। এবার পেলাম সেই ভয়ঙ্কর তথ্য। ইউরিন বা প্রস্রাব দেয়ার বিপরীতে আসামিরা বাথরুমে ঢুকে পটে করে পানি নিয়ে ল্যাবে জমা দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে রেজাল্ট যা আসার তাই এসেছে।

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশ জীবিত আছে?

বীর মুক্তিযোদ্দা ফার
৮ এপ্রিল ২০২৪, সোমবার, ৯:৫৬ পূর্বাহ্ন

জজ সাহেবকে অভিনন্দন।

তাপশ
৩ এপ্রিল ২০২৪, বুধবার, ১:০১ অপরাহ্ন

Justice can be blind but he/she can see in the dark!

nonprofitvsunfit!
৩১ মার্চ ২০২৪, রবিবার, ১২:৪০ অপরাহ্ন

ধন্যবাদ বিচারক সাহেবকে। বিচার বিভাগে উনার মতো সৎ সাহসী মানুষ প্রত্যাশা রইল।

মহিউদ্দিনি
৩১ মার্চ ২০২৪, রবিবার, ১১:১৫ পূর্বাহ্ন

আমরা বাঙ্গালিদের মত এত বড় শঠ, প্রতারক পৃথিবীতে আর আছে কিনা সন্দেহ!!!

MD REZAUL KARIM
৩১ মার্চ ২০২৪, রবিবার, ১০:৩২ পূর্বাহ্ন

স্যালুট জজ সাহেব।

রাশিদ
৩১ মার্চ ২০২৪, রবিবার, ৯:৪৮ পূর্বাহ্ন

শেষের পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status