ঢাকা, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, মঙ্গলবার, ৩ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ

সামাজিক হতে হতে অসামাজিকের পথে

মাহবুব নাহিদ
৯ মার্চ ২০২৪, শনিবার
mzamin

এই যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জয়জয়কার, এর মাঝে আমরা নিজেদের জ্ঞান বুদ্ধি স্বকীয়তা অনেক কিছুই অকাতরে বিলিয়ে যাচ্ছি, আমরা পরিণত এক আজব প্রাণীতে। এর থেকে বের হবার কি কোনো উপায় নেই? চারিদিকে ঘন আঁধারের ঘনঘটা, আলোর দেখা কি কোথাও নেই? হয়তো আলোর দেখা আছে, অনেক অনেক জ্বলার পরে হয়তো আগ্নেয়গিরিও একদিন শান্ত হবে। তেমনি মানুষ সত্যিকারের সামাজিক হবে, ফেসবুক, ইউটিউবের সামাজিক নামের ফাঁদে বড্ড অসামাজিক নয়। মানুষ আবার শিকড়ে ফিরে যাবে, চিঠি লিখতে বসে যাবে, মনের কথাগুলো সাদা কাগজের উপরে লিখে হয়তো আকাশের ভেলায় উড়িয়ে দেবে, কাঁচা বইয়ের ঘ্রাণ খুঁজতে চলে যাবে নীলক্ষেত কিংবা বাংলাবাজার, বসে পড়বে সবুজ ঘাসের নিচে, কথা বলবে নদীর সঙ্গে, মিশে যাবে পাখিদের কলকাকলীতে কিংবা সবুজের অবগাহনে


পৃথিবীর বয়স যত বাড়ছে, আমাদের পৃথিবী ধীরে ধীরে হয়ে যাচ্ছে ছোট। আমাদের ভাবনার জগৎ হয়ে যাচ্ছে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর। আমরা এখন চাইলেই অনেক কিছু ভাবি না, মোদ্দা কথা আমরা ভাবতে চাই না। আমাদের হাতে চিন্তা করার মতো পর্যাপ্ত সময় নেই। সময় থাকলেও সময় কাজে না লাগানোর নেশা আমাদের বন্দি করে ফেলেছে। জগৎটা ছোট হতে হতে আমরা বন্দি হয়ে চার দেয়ালের ভেতর। আমরা এখন চোখ মেলিয়া কিছুই দেখি না, নাক ভরিয়া সবুজের ভেতর নিঃশ্বাস নেই না, নদীর কাছে বলি না মনের কথা।

বিজ্ঞাপন
প্রযুক্তির সঙ্গে একটা আমৃত্যু বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেছি আমরা। আরও সহজ করে বললে মোবাইল নামক ছোট যন্ত্রটা আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। একদম স্পষ্ট করে বললে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নামক এক শুঁয়াপোকা আমাদের মাথার ভেতরে কিলবিল করে বেড়াচ্ছে।  মোবাইল ফোন নিশ্চয়ই আমাদের সময় কেড়ে নেয়ার জন্য তৈরি হয়নি। এই যন্ত্রটা তৈরি হওয়ার উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। মানুষে মানুষে যে শারীরিক দূরত্ব সেটা মুহূর্তের মধ্যেই কমিয়ে ফেলা সম্ভব না। কিন্তু মানসিকভাবে দূরত্ব কমানো যায়। মন থেকে যদি ভাবা যায় যে আমার কাছের মানুষ যিনি, তিনি আমার কাছেই আছেন, খুব কাছে যেন! ভাবলে ভাবা যায়, কিন্তু সেই ভাবনার সহজ করেছিল দূরালাপনি বা টেলিফোন নামক যন্ত্র। কিন্তু সেই টেলিফোন বা টেলিগ্রাম থেকে আরও দূরে এগিয়ে গেছে মোবাইল নামক ক্ষুদে যন্ত্রটি। প্রিয়জনের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পরম আনন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে একটা কল পাওয়ার অপেক্ষায়, ম্লান হয়ে গেছে সেই চিঠিকালের দিনগুলোর আবেগ। ওই যে আমাদের সময় খুবই কম! এখন তো ক্ষুদে বার্তাগুলোও আমরা সিগন্যাল বা কোড ওয়ার্ডে দিচ্ছি, শব্দগুলোকে অনেক ছোট বানিয়ে ফেলছি।  

কোনো একটা জিনিস শুধুমাত্র খারাপ কাজ করার জন্যই তৈরি হয় না। এই ধরলাম মোবাইলের কথাই বলি কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা বলি! এর কি কোনো ভালো দিক নেই? অবশ্যই আছে। আপনার কাছেই সমাধান আছে। আপনি ঠিক না বেঠিক পথ বেছে নিয়েছেন সেটা আপনার উপরে।  প্রথমে আসা যাক মোবাইলের প্রসঙ্গে, মোবাইল আপনাকে অনেক সুবিধা দেবে। যেমন ধরেন, মোবাইলের ক্যামেরা। এই ক্যামেরা আপনার জন্য স্মৃতি রোমন্থন করার এক বিরাট উপসর্গ হতে পারে, আবার আপনার পৌঁছে দিতে পারে বোকার স্বর্গেও। এমনটা যদি হয়, আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, আপনার সামনে বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি এসে পড়লো। ঠিক তখন আপনার আশপাশে পরিচিত কেউ নাই। কাউকে যে একটা বলবেন যে ভাই একটা ছবি তুলে দেন, তাও সম্ভব না। তখন কিন্তু আপনি নিজেই নিজের মোবাইল নামক যন্ত্রে অবস্থান করা ক্যামেরাটা দিয়ে একটা স্মৃতি রেখে দিতে পারলেন, বছরের পর বছর সেই স্মৃতি আপনার কাছে রেখে দেয়া সম্ভব। আবার ওই ছবিটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিয়ে আপনি জানিয়ে দিতে পারেন আপনার কাছে পিঠের মানুষগুলোকেও।  আবার এমনটা হলো যে, আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, একজন মানুষ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পড়লো।  আপনার তখন কি করা উচিত? নিশ্চয়ই মানুষটাকে সাহায্য করা উচিত। কিন্তু আপনি আপনার বোধ বুদ্ধি সবকিছু বিসর্জন দিয়ে চলে গেলেন সাংবাদিক বনে। আপনি চিন্তা করলেন মোবাইল দিয়ে কিছু ভিডিও করে রাখি নাহয় একটু লাইভে চলে যাই। বেশ ভালো একটা ভিউ ব্যবসা হয়ে যাবে। এই ভিউ ব্যবসার চক্করে পড়ে অনেকেই হারিয়ে ফেলছে নীতি-নৈতিকতা সবকিছুই।  আমাদের বর্তমান সময়ে এক আজব অসুখে পেয়েছে সেটা হচ্ছে ট্রল। কে কী করছে সেটা বড় বিষয় নয়, আমাদের ট্রল করতে হবে। ট্রল না করলে অনেকের রাতের ঘুম হয় না, পেটের খাবার হজম হয় না। 

ট্রল অবশ্য সমালোচনার একটা ঘৃণিত পর্যায়। সমাজ অবশ্যই সমালোচনা পছন্দ করবে বা সমর্থন করবে। কারণ প্রত্যেকটা কাজের প্রতিটি মানুষের সমালোচনা প্রয়োজন। তার সঠিকভাবে কাজ করার জন্যই সমালোচনা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা যেটা করি সেটা হয়ে যায় অপমান বা অবমাননা। একটা মানুষকে এত বাজেভাবে আঘাত করি যা গ্রহণ করার ক্ষমতাও থাকে না অনেকের। এমনকি কারও ভুলের জন্য তার পরিবার নিয়েও কথা বলতে দ্বিধাবোধ করি না। কেউ বিয়ে করলো, কারও সংসার ভাঙলো এটা নিতান্তই তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার হবে। কিন্তু আমরা সেটাকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকতে দেই না। আমরা সেটাকে নিয়ে এমনভাবে ঘাটতে শুরু করি যা অত্যন্ত জঘন্য। ট্রল করা আমাদের নেশায় পরিণত হয়েছে। ট্রল করতে আমরা সীমা ছাড়িয়ে যাই অনেক দূরে।  এসব বিষয় চিন্তা করলে দেখা যায় দেশের অধিকাংশ মানুষের মানসিকতাতেই এসব বিষ লেগে গেছে। এটা সহজে দূর করা সম্ভব নয়।  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন অসামাজিক পর্যায়ে চলে গেছে। এর পেছনে একটা বিশাল চক্র কাজ করেছে বলে মনে হয়। এমনভাবে সবকিছু সাজানো হয়েছে যে আপনি চাইলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বাইরে যেতে পারবেন না। আপনার ব্যবসা, চাকরি, পড়াশোনা সবকিছুই ওর মধ্যে এখন। আপনি না চাইলেও আপনাকে যেতে হবে, চাইলেও ছাড়তে পারবেন না। মোবাইল নামক যন্ত্রটা এখন অনেক কিছুর ওষুধ হয়ে গেছে। আমরা আমাদের বাচ্চাদের বলি, এইটুকু সময় পড়াশোনা করো তাহলে মোবাইল চালাতে দেবো। খাও তাহলে মোবাইল চালাতে দেবো। আমাদের প্রজন্মকে আমরা ঘরবন্দি করতে চেয়েছি, সবুজ মাঠের বদলে আবদ্ধ করেছে কংক্রিটের বাগানে, বেঁধে ফেলেছি ছোট একটা যন্ত্রে! এখন আমাদের প্রজন্ম মোবাইল ছাড়া কিছু বোঝে না, সেটা বলে বেঁচে যাওয়ার উপায় নাই। নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছি। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের অনেক কাজ থাকে, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, কাজে ঢুকে অকাজের মধ্যে জড়িয়ে গিয়ে ভুলেই যাই যেকোনো কাজে ঢুকেছিলাম! এই বুদ্ধি করেই আসলে আমাদের আটকে রাখছে। সবাই এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দিকেই ঝুঁকেছে। পত্রিকা এখন কাগজ পড়তে চায় না, পারলে অনলাইন পোর্টালে গিয়ে পড়ে, আরও সহজ হয়ে ফেসবুকে একটা ছবি দেখতে যেখানে টাইটেল থাকবে, প্রয়োজন হলে ভেতরে যাবে, নাহয় যাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আবার আমাদের মাঝে ঢুকিয়েছে পপুলারিটি নামক এক ভূত যার প্রধান কাজ হচ্ছে ভাইরাল হওয়া!  বেশিবার দেখা হয়েছে বা শেয়ার হয়েছে মানেই এখন হয়েছে সেরা যাচাইয়ের নিয়ম। ইউটিউব এখন হয়ে গেছে মাপকাঠির বড় একটা মাধ্যম। ভিউজ হয়ে গেছে সবকিছুর মূল চাবিকাঠি। একটা অখাদ্যকে কীভাবে ভিউজের মাধ্যমে জনপ্রিয় বানানো যায় সেটা বর্তমান সময় আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। বর্তমান সময়ে যে সমস্ত গান, সিনেমা, নাটক জনপ্রিয় হয়েছে (সো কল্ড ভিউজের মাধ্যমে) তার অনেক কিছুই সুস্থ দৃষ্টিতে দেখলে অখাদ্য মনে হবে। কিন্তু সেই অখাদ্যকে সেরা বানানো হচ্ছে। আর তথাকথিত ভিউজ বা রেভেনিউয়ের কারণে ক্রিয়েটররাও নিজেদের শুধরে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তারা তো মনে করেই নিচ্ছে যে তারা ভালো কাজ করছে। অনেকে তো আবার নেগেটিভভাবে জনপ্রিয়তা আদায় করতে চায় বা করে।

 ভিউজ যেহেতু বড় ব্যাপার সেহেতু সেটা যেকোনো পর্যায়ে হলেই হয়। মোট কথা, ভাইরাল হতে হবে আরকি। এই বিষয়টা শুধু ভিডিও মেকিংয়ের ক্ষেত্রেই সঠিক নয়। এটা বইয়ের ক্ষেত্রেও সত্যি। একজন কাছের মানুষ একটা কথা বলেছেন যে, একটা ভালো বই বর্তমান সময়ে বেস্টসেলার হতে পারে না। বর্তমানে ভালো পাঠক একদম নেই বললেই চলে। মানুষ বই কিনতে যায় না, যায় সেলফি কিনতে।  বইয়ের বিষয়টাও এখন তেমন হয়ে গেছে, বই এখন আর কাগজে মানুষ পড়তে চায় না। ই-বুক কিংবা অডিও বুকের দিকে ঝুঁকছে মানুষ। যুগের চাহিদা দেখে লেখক প্রকাশকও এসব বের করতে বাধ্য হচ্ছে।  এই যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জয়জয়কার, এর মাঝে আমরা নিজেদের জ্ঞান বুদ্ধি স্বকীয়তা অনেক কিছুই অকাতরে বিলিয়ে যাচ্ছি, আমরা পরিণত এক আজব প্রাণীতে। এর থেকে বের হবার কি কোনো উপায় নেই? চারিদিকে ঘন আঁধারের ঘনঘটা, আলোর দেখা কি কোথাও নেই? হয়তো আলোর দেখা আছে, অনেক অনেক জ্বলার পরে হয়তো আগ্নেয়গিরিও একদিন শান্ত হবে। তেমনি মানুষ সত্যিকারের সামাজিক হবে, ফেসবুক, ইউটিউবের সামাজিক নামের ফাঁদে বড্ড অসামাজিক নয়। মানুষ আবার শিকড়ে ফিরে যাবে, চিঠি লিখতে বসে যাবে, মনের কথাগুলো সাদা কাগজের উপরে লিখে হয়তো আকাশের ভেলায় উড়িয়ে দেবে, কাঁচা বইয়ের ঘ্রাণ খুঁজতে চলে যাবে নীলক্ষেত কিংবা বাংলাবাজার, বসে পড়বে সবুজ ঘাসের নিচে, কথা বলবে নদীর সঙ্গে, মিশে যাবে পাখিদের কলকাকলীতে কিংবা সবুজের অবগাহনে। 

লেখক, কথাসাহিত্যিক

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status