ঢাকা, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

যে সেতু বদলে দেবে আমাদের জীবন

মোহাম্মাদ রুহুল আমিন
১৮ জুন ২০২২, শনিবার

প দ্মা সেতু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব লেখালেখি হচ্ছে। প্রতিনিয়ত প্রতিমুহূর্তে সেতুর নানান বিষয় নিয়ে নিউজ হচ্ছে। পদ্মা সেতু নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে, হচ্ছে, হয়তো সামনে আরও হবে। সেতুর নির্মাণ ব্যয়, লোন, নির্মাণকাল ইত্যাদি বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে। এই সেতু হলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন ঘটবে সেই আলোচনাও রয়েছে। পদ্মা পার হতে কতো সময় লাগবে সেই সংবাদও গণমাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রকাশ হয়েছে। পদ্মা সেতু দেখতে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকেই পদ্মা সেতুর সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন। পদ্মা সেতুর টোল নির্ধারণের পর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। ইতিপূর্বের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সরকার নতুন করে কোনো টোল, কর, ফিস, সেস বা যেকোনো শুল্ক/ফি ইত্যাদি আরোপের পর সাধারণের মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

বিজ্ঞাপন
২. অগণিত মানুষ যারা নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত ফেরি, লঞ্চ, স্পিডবোট, ট্রলারযোগে এই পদ্মা পার হয়ে বাড়ি ফেরেন কিংবা বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যান, তারা খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পারবেন কতো কষ্ট, কতো ভোগান্তি, কতো ঝুঁকি আর কতো সময় অপচয় করে পদ্মা পার হতে হয়। সকালের বাসে যারা ঢাকা যেতেন তাদের অনেককেই দেখেছি সতর্কতা হিসেবে সঙ্গে খাবারদাবার নিতে, কারণ ঠিক কতোক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছাবেন সেটা বলা মুশকিল। মোটা দাগে পদ্মা পাড়ি দিয়ে বাসযাত্রা ছিল এরকম- বাস এসে পদ্মার পাড়ে কাছাকাছি কোথাও থামবে, এরপরে বাস থেকে নেমে দীর্ঘ পথ হেঁটে লঞ্চে উঠতে হবে, ফের লঞ্চ থেকে নেমে দীর্ঘ পথ হেঁটে আবার বাসে উঠতে হবে। এ সময় যদি কেউ ভুল করে পথ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে বাস মিস। অনেক সময় বাস থেকে নেমে রিকশায় করে লঞ্চঘাট পর্যন্ত যেতে হয়েছে, কারণ নদীতে পানি কম বা বেশির কারণে লঞ্চঘাটের স্থান পরিবর্তন হতে হয়েছে। যদি সঙ্গে বাচ্চা-কাচ্চা থাকে আর লঞ্চে পদ্মা পার হতে হয়, তাহলে কোলে বা এক হাতে বাচ্চা, অন্য হাতে ব্যাগ নিয়ে সাবধানে হাঁটতে হবে। এ অবস্থায় ব্যাগ সামলাবেন নাকি বাচ্চা? সে এক যুদ্ধ! এ ধরনের যাত্রায় ইচ্ছে থাকলেও সঙ্গে  একাধিক লাগেজ নেয়ার সুযোগ থাকে না। দুই হাতে আর কয়টাই বা লাগেজ নেয়া যায়। লঞ্চে ওঠা-নামার ঠেলাঠেলিতে নদীতে যাত্রীদের পড়ে যেতে দেখেছি। ভিড় ঠেলে লঞ্চে উঠে লাগেজ রাখার জায়গা খুঁজতে হয়, লাগেজ শুধু রাখলেই হবে না তাতে চোখও রাখতে হবে। কারণ কেউ একজন লাগেজ নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিতে পারে। লাগেজ রাখলেন, এবার বাচ্চা-কাচ্চা আর পরিবারের সদস্যরা কই দাঁড়াবে সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। এরপর আবার একটা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে লঞ্চ থেকে নামতে হবে, নামতে গিয়ে আপনি লাগেজ, বাচ্চা নাকি একটা বাঁশ ধরে নামবেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে নিতে পেছন থেকে যাত্রীদের চাপ আসবে, ‘ভাই দ্রুত করেন।’ এর মধ্যে পেছনে তাকালে দেখা যাবে, বাচ্চার মা’কে কোথাও দেখা যাচ্ছে না, ধাক্কাধাক্কিতে হয়তো অন্যদিকে চলে গেছে। ফেরি পারাপারে যেতে চাইলে ঘাটে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ফেরি পাবেন তার নিশ্চয়তা নেই। ফেরি পেতে কতোক্ষণ লাগবে তারও কোনো সঠিক হিসাব জানা নেই।  এই দীর্ঘ অপেক্ষা বা দীর্ঘ যাত্রায় শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে খুবই কম, বিশেষ করে নারী যাত্রীদের। এই হিসাব স্বাভাবিক সময়ের জন্য। রোজা কিংবা কোরবানি ঈদের ছুটিতে এই যাত্রার হিসাব আরও ভোগান্তির। এতসব ভোগান্তির সঙ্গে বাড়তি যোগ হতো আতঙ্ক। আতঙ্কের নাম ‘অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চে পারাপার’। একবার এক লঞ্চ চালককে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলাম, এত মানুষ নিচ্ছেন কেন লঞ্চ তো ডুবে যাবে! উত্তরে তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, বেশি ভয় পেলে যেনো ব্যক্তিগত লঞ্চে যাতায়াত করি।  রাতে জরুরি প্রয়োজনে পদ্মা পার হতে ফেরি পাওয়া না গেলে স্পিডবোট বা ট্রলারই ভরসা। শীতকালে সেই যাত্রায় ঝুঁঁকি কম হলেও বর্ষাকালে অনেকটা মৃত্যুঝুঁকিকে আলিঙ্গন করার সামিল। স্পিডবোট বা ট্রলার মাঝ নদীতে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাও স্বাভাবিক ও নিয়মিত ছিল। রাতে বাড়তি ভাড়ার এ যাত্রায় পথ চলতে স্পিডবোটের আলো বলতে চালকের হাতে থাকা টর্চ লাইট। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে লঞ্চ ডুবুডুবু অবস্থায় কতোবার যে সৃষ্টিকর্তার দয়ায় পদ্মা পার হয়েছি তার হিসাব নেই। প্রবল বাতাসে লঞ্চ একবার এপাশে আরেকবার ওপাশে কাত হয়ে যাচ্ছে আর সবাই সমস্বরে ভয়ে চিৎকার করে উঠছে। আমি সবসময় লঞ্চের দোতলায় বা ছাদে বসতাম, যেনো লঞ্চ ডুবতে বসলে অন্তত: ঝাঁপ দিয়ে পানিতে পড়তে পারি। আর ঝড় তুফানের মাসে লঞ্চে কেন ফেরিতেও পারাপার হতে ভয় লাগতো। শীতে ঘন কুয়াশায় ডুবোচরে ফেরি বা লঞ্চ আটকে গেলে, সেখান থেকে মুক্তি পেতে কতো সময় খরচ হয়ে যেতো সেই হিসাব না হয় বাদই দিলাম। এ ছাড়াও ঘন কুয়াশার কারণে ফেরি বা লঞ্চ চলাচল যখন বন্ধ হয়ে যেতো, তখন দুই পাড়ের সারি সারি গাড়িকে সূর্যি মামার জন্য অপেক্ষা করতে হতো।  প্রায়শই মনে হতো যারা লঞ্চে যাত্রী পারাপার করেন তাদের ধারণা যতক্ষণ না লঞ্চ ডুবে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত যাত্রী নেয়া যাবে। ডুবে গেলেই ধরে নিতে হবে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া হয়েছিল। অতিরিক্ত যাত্রী নেয়ার প্রবণতা কখনোই কমতে দেখিনি। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে লঞ্চ বা ট্রলার ডুবির ঘটনায় প্রিয়জনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এরকম কতো শত আতঙ্ক এবং তিক্ত ও কষ্টের অভিজ্ঞতা এই পদ্মা পারাপারে। সংকটাপন্ন রোগী বহনকারী এম্বুলেন্সকে এ ঘাটে এসে ফেরির জন্য ছোটাছুটি করতে দেখেছি। একবার আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছোট ভাইয়ের লাশ নিয়ে পদ্মার পাড়ে ফেরির জন্য ৩-৪ ঘণ্টা বসেছিলাম।  টোল, নির্মাণ ব্যয়, প্রবৃদ্ধি, জিডিপি, সেতুর অর্থনৈতিক গুরুত্ব ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে এবং হবে। এই আলোচনার বাইরেও পদ্মা পারাপারের সীমাহীন ভোগান্তি, কষ্ট, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির স্বপ্ন পূরণের আনন্দও আছে। কারও কারও কাছে পদ্মা সেতু মানে কষ্ট আর ভোগান্তি থেকে মুক্তির স্বপ্ন পূরণ, প্রিয়জনের স্বস্তির যাত্রার লালিত স্বপ্নপূরণ। ৩. পদ্মা সেতু নিয়ে গুজবও বেশ ডালাপালা ছড়িয়েছে, সেই গুজব আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ‘মানুষের কল্লা কেটে পদ্মা ব্রিজের পিলারের গোড়ায় দিতে হবে’- গুজবটি বেশ ভুগিয়েছেও। একবার এক স্কুলে গিয়ে জানা গেলো, মায়েরা বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। কারণ হিসেবে এক শিক্ষক জানালেন, ছেলেধরা যদি তার বাচ্চাকে নিয়ে যায়- এই ভয়ে মায়েরা ঝুঁকি নিচ্ছেন না। গুজব বোধহয় শেষ হয়নি। গুজব এখনো আছে। গুজব আছে টোল আদায় নিয়ে, গুজব আছে টোলের টাকা কই যাবে সেটা নিয়েও। গুজব ছিল, আছে, হয়তো সামনে থাকতেও পারে। গুজব মাড়িয়ে, সব ছাপিয়ে পদ্মা সেতু আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকুক এবং যার দৃঢ়তায় ও আন্তরিকতায় কোটি মানুষের ভোগান্তি লাঘব হলো তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। 

(বি দ্র: উপরের বর্ণনা পদ্মা পার হয়ে ঢাকা আসা যাওয়ার আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা) লেখক: সচিব (ভারপ্রাপ্ত), বাংলাদেশ চা বোর্ড।

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status