ঢাকা, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

স্কুল কলেজের নাম পরিবর্তনঃ তুঘলকি কাণ্ড

শরীফ আস্-সাবের

(৪ মাস আগে) ২০ মে ২০২২, শুক্রবার, ২:২৭ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১:১৩ অপরাহ্ন

সম্প্রতি সকল সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজকে সংক্ষিপ্ত নাম পরিহার করে পূর্ণ নাম ব্যবহার করার জন্য এক নির্দেশনা জারী করেছে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। অধিদপ্তর মনে করে, বিভিন্ন দাপ্তরিক ও অন্যান্য কাজে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করে আসছে যা যথাযথ নয়। নির্দেশনা অনুসারে,  যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহার করে আসছিলো, তাদেরকে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ নাম ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। ঐ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্যাড, মূল ফটক ও অন্যান্য স্থানে পূর্ণ নাম ব্যবহার নিশ্চিত করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রতিবেদন পাঠনোর জন্য অধিদপ্তরের আঞ্চলিক উপপরিচালক ও পরিচালকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এইসব পরিবর্তন চুডান্তকরনের পর পূর্ণ নামাঙ্কিত মূল ফটকের ছবি তুলে অধিদপ্তরে পাঠানোর জন্যও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত নাম পরিবর্তন করার পর ব্যানবেইস ও শিক্ষা বোর্ডগুলোতে আবেদন করে এই পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। তবে, নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোন কারণ কিংবা যুক্তির উল্লেখ  করা হয়নি। এই সকল নির্দেশনা জারী করার আগে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর শিক্ষা মন্ত্রী এবং মন্ত্রনালয়ের অনুমোদন নিয়েছে কিনা তা অবশ্য নিশ্চিত করা যায়নি।

ইতোমধ্যেই, নির্দেশনা অনুসারে সংক্ষিপ্ত নামধারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি তাদের নাম পরিবর্তন করে পূর্ণাঙ্গ নাম ব্যবহার শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক, শুভানুধ্যায়ী এবং এলাকাবাসীদের অজ্ঞাতসারে তাঁদের প্রিয় প্রতিষ্ঠানের  নামের এই আকস্মিক পরিবর্তনে সকলেই স্তম্ভিত হয়েছেন। কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিবাদ করছেন।

বিজ্ঞাপন
কেউ মিউ মিউ করে জানিয়েছেন সমর্থন। আর কেউ ভাবছেন, ‘হু কেয়ার্স?’

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষও কাউকে কোন পরিস্কার ধারনা প্রদান করছেন না। তারা আদিষ্ট হয়েই এই কাজটি করেছেন, তাতে কোন সন্দেহ নাই। এর অন্যথায়, তাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন ভাতা বন্ধ হয়ে যেতে পারতো বলে তারা মনে করেন। এমতাবস্থায়, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনেকটা বাধ্য হয়ে রাতারাতিভাবেই নাম পরিবর্তনসহ প্রতিষ্ঠানর  লোগো, প্যাড ও নামফলক প্রতিস্থাপন করেছে।

প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, কেন এই হঠাৎ সিদ্ধান্ত? সিদ্ধান্ত গ্রহনের আগে এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোন কমিটি গঠন কিংবা শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞসহ বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কি কোনরূপ মতামত আহবান করা হয়েছিল? এর তরিৎ বাস্তবায়নের পিছনে কি কোন ব্যাখ্যা রয়েছে? এই পরিবর্তনের সামাজিক এবং আইনগত ভিত্তি কি? এবং কেন এই অনমনীয় বাধ্যবাধকতা?

আমাদের দেশে সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে মসজিদ মন্দিরের হাত ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রথম আবির্ভাব। তারপর, দেশের বহু সমাজসেবী এবং দানশীল ব্যক্তির উদ্যোগে এবং সহায়তায় বিভিন্ন সময়ে দেশ জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক স্কুল, কলেজ মাদ্রাসা। এছাড়াও প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার পিছনে রয়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকবাসীদের যথাসাধ্য আর্থিক ও বৈষয়িক সহায়তাসহ শ্রম, উৎসাহ, আবেগ, ত্যাগ ও তীতিক্ষা। বিদ্যালয়ের নাম, লগো, মূলমন্ত্র ইত্যাদিও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে প্রচুর গবেষণা ও আলাপ আলোচনার পর নির্ধারিত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোতে মূল প্রতিষ্ঠাতার ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রতিফলনও ঘটেছে। একটি নিবিড় এবং দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়ার পর রীতি ও পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত নাম, ঠিকানা, ধরন ইত্যাদি উল্লেখ করে অনুমোদন/নিবন্ধনের জন্য সরকার বরাবর আবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা কিংবা উদ্যাক্তারা যদি কোন নামের এব্রিভিয়েশন ব্যবহার করে থাকেন এবং তা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে বছরের পর বছর (কোন কোন ক্ষেত্রে শতাধিক বছর) ব্যবহৃত হয়, তা বিনা কারণে  পরিবর্তন করার কোন যুক্তি বা এখতিয়ার অধিদপ্তরের আছে কি?

উদাহরণস্বরূপ, আমি নরসিংদীর তিনটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের কথা বলতে চাই - স্যার কেজি গুপ্ত উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রাহ্মন্দী কে.কে.এম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সাটিরপাড়া কেকে ইন্সটিটিশন। আমি মোটামুটিভাবে নিশ্চিত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল প্রতিষ্ঠাতারা বিদ্যালয়ের নামে সংক্ষেপিত আদ্যাক্ষরগুলি জুড়ে দিয়েছিলেন। এই সব নামের পরিবর্তন হবে তাঁদের স্মৃতি ও আত্মার প্রতি অবমাননার সামিল। এ ছাড়াও, যদি কোন বিদ্যালয় পূর্ণ নামেও প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, প্রচলিত সংক্ষেপিত নাম বাতিল করার প্রয়োজন তো নেই। পৃথিবী জুড়ে এর নজীর রয়েছে। নিউইর্য়ক এয়ারপোর্টের মূল নাম জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি এয়ারপোর্ট  হলেও তা জেএফকে নামেই পরিচিত। এমনকি ঐ বিমানবন্দরের বেশ ক’টি সাইনে শুধুই জেএফকে লেখা আছে। অষ্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের জেএনইউ কিংবা আমেরিকার এমআইটি বা ইউসিএলএ নিয়ে তো কোন মাথাব্যথা ওখানকার শিক্ষা বিভাগের নেই। বুয়েটিয়ানরাও কি চাইবেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংক্ষেপিত নামটি বিলীন হয়ে যাক?

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের গর্বের ধন, আমাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের প্রতিভূ। আর, এই সব প্রতিষ্ঠানের নামগুলো আমাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক যা দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ কালের অমোঘ সাক্ষী। এই সব নাম কি পরিদপ্তরের একটি আদেশেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে? দেশের সরকার, রাজনীতিবিদ ও বিজ্ঞজনদের কি এ বিষয়ে কিছুই করার নেই?

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উচিত ছিল এই বিষয়টি বাস্তবায়নের আগে এর উদ্দেশ্য এবং প্রকৃতি সম্পর্কে স্থানীয় সাংসদ ও অন্যান্য নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সামাজিক  সংগঠন এবং এলাকবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে পরামর্শ করা। জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুভূতির মূল্যায়ন না করে এ ধরনের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহন ও চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক ও অসমীচীন বলে প্রতীয়মান হয়।

যাই হউক, আমি মনে করি, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর বিষয়টির বিশালত্ব ও গুরুত্ব সঠিকভাবে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। কোন ধরনের গবেষণা কিংবা বিস্তারিত আলোচনা ও পরামর্শ ছাড়াই  তারা নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। এ বিষয়ে কোন ধর্তব্য ব্যখ্যাও তারা জনসাধারন্যে উপস্থাপন করে নি। অধিদপ্তর পূর্বাপর না ভেবে দেশের মানুষকে প্রকারান্তরে ছাত্রজ্ঞান করেই যেন এই সিদ্ধান্তটি গ্রহন এবং বাস্তবায়ন করেছে। দেখে শুনে মনে হয়, এ যেন নিছক এক তুঘলকি কাণ্ড!

শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কারো মতামতের তোয়াক্কা না করে অধিদপ্তরের এই জাতীয় অতি উৎসাহের কারণ এবং অহেতুক অর্থ ও সময় খরচের বিষয়টি জরুরী ভিত্তিতে তলিয়ে দেখা দরকার।

সব শেষে, শেক্সপিয়র সাহেবের একটি বিখ্যাত উক্তি তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেছিলেন, ‘নামে কি আসে যায়?’ আর, কথায় আছে, ‘জন্ম হউক যথাতথা, কর্ম হউক ভালো’। নাম নিয়ে বাড়াবাড়ি এবং এ নিয়ে সময় ও অর্থের অপচয় না করে মাউশি পরিদপ্তরের উচিত তার মূল দায়িত্ব, শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত ও গুণগত উৎকর্ষ সাধনে মনোনিবেশ করা।

(লেখকঃ ড. শরীফ আস্-সাবের, শিক্ষক, কলামিস্ট, কবি)

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

মত-মতান্তর থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status