ঢাকা, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, মঙ্গলবার, ২৪ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৫ রজব ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ’

শাকিল আহম্মেদ
৪ নভেম্বর ২০২২, শুক্রবারmzamin

ড. কামাল হোসেন

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে ড. কামাল  হোসেনের সংশ্লিষ্টতার কথা লিখতে গিয়ে এই নিবন্ধটি তিনটি পর্যায় অতিক্রম করবে। প্রথমত, সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিস, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশের ৫০তম সংবিধান দিবস উপলক্ষে ড. কামাল হোসেনের একটি পাবলিক লেকচারের আমন্ত্রণ বিষয় এখানে উল্লেখ করা হবে। দ্বিতীয়ত, ড. কামালের বাংলাদেশের রাজনীতি ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয়-সূচনার কথা বলা হবে। তৃতীয়ত, ১৯৭২ সালে খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে ড. কামালের অবদান ও সংবিধানের সর্বজনীনতা এখানে তুলে  দেয়া হবে। তবে এই নিবন্ধে সংবিধান বিষয়ক আলোচনা বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

এক
গত ১১ই অক্টোবর মতিঝিলের অফিস কক্ষে ঢুকেই দেখি ড. কামাল  হোসেন টেবিলের ওপারে হুইলচেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়ছেন। এখন তিনি মূলত হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। ওয়াশরুমে গেলে একজনের সহযোগিতা লাগে। পঁচাশি বছরে তার দ্বিতীয় শৈশব চলছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিস, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেনকে ৩রা নভেম্বর একটি পাবলিক  লেকচারের জন্য আমন্ত্রণ করতে এসেছি।

গত প্রায় ছত্রিশ বছর ধরে ব্যক্তিগত সচিব শাহজাহান সাহেব যখন আমার উপস্থিতি স্মরণ করিয়ে  দেয়ার জন্য ড. কামাল  হোসেনকে ডাকলেন তখনো তিনি পত্রিকা পাঠে মগ্ন। তারপর তার চিরচেনা গুরুগম্ভীর চোখগুলো দিয়ে আমার দিকে আস্তে করে তাকালেন।

বিজ্ঞাপন
ঠোঁটে চিকন হাসি। অশীতিপরের মুখম-লে স্কুলের ফার্স্ট বয়ের মতো নিপাট ভদ্রতার ছায়া। আর পুরো শরীরে পরিচিত সেই অতিরিক্ত ওজনের ভার।
প্রায় বাইশ বছর পর সরাসরি  দেখা। বয়সে আমি তার অনেক ছোট হলেও আপনি করেই ডাকেন। তুমি ডাকটা তার স্বভাবজাত নয়। আর তুই স্বভাববিরুদ্ধ। 

আমার এখানে আসার দরকার ছিল না। কেননা  টেলিফোনেই সংবিধানের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে একটি পাবলিক লেকচারের জন্য ড. কামাল হোসেন জাহাঙ্গীরনগরে আসার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হুইলচেয়ারে আসবেন। আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, বক্তৃতামঞ্চে যাতে করে হুইলচেয়ারে যাওয়া যায়। আমারই ভদ্রতায় বাঁধলো।  টেলিফোনে দাওয়াত দেয়াটা অসৌজন্যমূলক ও অপর্যাপ্ত মনে হলো। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সরাসরি এসে আমন্ত্রণ জানানো আমাদের সবার জন্য সম্মানজনক।

 

দুই
ড. কামাল হোসেন ছোট  ছোট কথায় অনেক গল্প করতে পারেন। সেগুলো অনুগল্পের মতো শুনায়। গল্পগুলো বিস্তৃত না কিন্তু গভীর হয়। তিনি আমাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বলুন তো ১৯৭২ সালে আমার উচ্চতা কতো ছিল? আমি উত্তর দিয়েছিলাম এখন আপনার যা উচ্চতা বাহাত্তর সালে একই উচ্চতা ছিল। তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, না, বাহাত্তরে আমি লম্বায় আট ফুট ছিলাম। আমি বিস্মিত হয়ে উচ্চস্বরে জিজ্ঞাসা করলাম সেটা কীভাবে সম্ভব? মানুষ কি আট ফুট লম্বা হতে পারে! তিনি তখন রহস্য উন্মোচন করলেন। তিনি বললেন, সদ্য বিজয় অর্জনকারী বাংলাদেশের মন্ত্রী হিসেবে আমি যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে যেতাম তখন পৃথিবীর বিভিন্ন  দেশের মানুষ আমাকে সম্মান জানাতো। তারা জিজ্ঞাসা করতো কীভাবে আমরা পাকিস্তানকে পরাজিত করলাম? তখন বাঙালি হিসেবে নিজেকে অনেক বড় মনে হতো। গর্বে আমার মনে হতো আমি লম্বায় আট ফুট উঁচু।

আমি ড. কামালকে জিজ্ঞাসা করলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে? তিনি যেন তার ক্যারিশমাটিক নেতার কথা শুনতে পেয়ে বাস্তবতায় ফিরে এলেন। বঙ্গবন্ধু যেন ড. কামালের জীবনে স্বপ্নপুরুষ। তিনি আবার শুরু করলেন। তিনি তখন  হোসেন শহীদ  সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে কাজ করেন। সোহরাওয়ার্দীর অফিসে বঙ্গবন্ধু আসেন। মাঝে মাঝে সারাদিনই থাকেন। ড. কামাল রাজনীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেন। আর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ নিয়ে তার স্বপ্নের কথা বলেন। তরুণ আইনজীবী ড. কামালকে নিয়ে  সোহরাওয়ার্দী উচ্চ ধারণা  পোষণ করতেন। সেগুলো তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলতেন। পরবর্তীতে ড. কামাল পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সহযোগী হলেন।
বঙ্গবন্ধু তার চারপাশে কিছু  মেধাবী মানুষকে এক করতে পেরেছিলেন। তাদের মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ ও ড. কামাল হোসেন অন্যতম। এই ধরনের মানুষ এখন শুধু বিরল নয়, বিলুপ্ত প্রায়।

তিন.
ড. কামাল হোসেন কখনোই শিক্ষানবিশ ছিলেন না।  শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়েই তিনি  পেশাজীবীদের মতো কাজ শুরু করে দিতেন। শিক্ষা গ্রহণের পরের দিন  থেকেই তিনি প্রস্তুত। চিতা বাঘের ক্ষিপ্রতা নিয়ে কাজ করেন।
১৯৭২ সালের ১১ই এপ্রিল ড. কামাল হোসেন খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তখন তার বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ। একটি দেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্য যে কমিটি হয়েছে তার সভাপতিত্ব করছেন একজন পঁয়ত্রিশ বছরের যুবক! সারাবিশ্বে এটা বিরল ঘটনা। চৌত্রিশ সদস্যবিশিষ্ট খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটি ড. কামালের সভাপতিত্বে নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজ সম্পন্ন করেন। বিস্ময়করভাবে মাত্র আট মাসের মধ্যে এই কমিটি গণপরিষদের পরামর্শ নিয়ে একটি পরিপূর্ণ সংবিধান চূড়ান্ত করে। যা ৪ঠা নভেম্বর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ গণপরিষদে গৃহীত হয়।

উপসংহার: বাহাত্তরের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের চেতনা আছে কিন্তু আবেগ নাই। এখানে ব্যক্তি নাই কিন্তু সমষ্টি আছে। মূল সংবিধানে খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটির সদস্যদের নাম নাই। এমনকি বঙ্গবন্ধুর নামও নাই। সেটা জরুরি নয়।  কেননা বাহাত্তরের সংবিধানে ব্যক্তির তুলনায় সরকার বড়। সরকারের তুলনায় রাষ্ট্র বড়। আর রাষ্ট্রের তুলনায় জনগণ বড়।
সংবিধানের চিন্তক, লেখক ও রক্ষক বাংলাদেশের জনগণ। তাই সংবিধান শুরু হয়েছে অসাধারণ তিনটি শব্দ দিয়ে। ‘আমরা, বাংলাদেশের জনগণ’।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status