ঢাকা, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, মঙ্গলবার, ২৪ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৫ রজব ১৪৪৪ হিঃ

মত-মতান্তর

পুলিশের গোপন তথ্য মেশিন ও অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি

যুক্তরাজ্য থেকে ডাঃ আলী জাহান

(৩ মাস আগে) ১৬ অক্টোবর ২০২২, রবিবার, ৯:১৭ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ১০:২৭ পূর্বাহ্ন

mzamin

. মহিলাদের চেহারায় আতঙ্কের ছাপ। জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন। তারা সংখ্যায় ১০ জন। সাথে ছোট একটা বাচ্চাও আছে। কায়দা করে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ছবি তোলা হয়েছে। ছবিতে একজন মহিলা পুলিশকে দেখা যাচ্ছে। পত্রিকায় যেসব ছবি প্রকাশ করা হয়েছে তা থেকে বুঝা যাচ্ছে না যে ছবিটি যেখান থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে সেখানেই তোলা হয়েছে না-কি থানায় তোলা হয়েছে। বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্ন ছবি এসেছে। সম্ভবত সাংবাদিকদের ডেকে এনে ছবি তোলা হয়েছে। থানায় বা গ্রেফতারের স্থানে সাংবাদিক ডেকে এনে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির ছবি তোলা কি বাংলাদেশের আইন সমর্থন করে?

ছবি- উঠান বৈঠক থেকে আটক মহিলা ও কোলের শিশু 

. জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা এই মহিলাদের একজনের  বয়স ৬০ বছর হলেও বাকি ৯ জনের বয়স ২০ থেকে ৩৫।

বিজ্ঞাপন
ছবিতে থাকা শিশুটির বয়স জানি না। ওর নামও জানি না। তবে মিডিয়ার কল্যাণে এ আতঙ্কগ্রস্থ ১০ জন মহিলার নাম আমরা জানি। বাংলাদেশের অনেক পত্রিকা সেই শিশুর ছবিও প্রকাশ করেছে।

. সাহিদা বেগম (৬০) মায়ের বয়সী হলেও সানোয়ারা খাতুন (৩৫), সুরাইয়া খাতুন (২০)দের কেউ কেউ তো আমাদের বোনের বা মেয়ের বয়সী হবেন। কারো কারো হয়তো সংসার আছে, স্বামী আছে, সন্তান আছে। কেউ কেউ হয়তো এখনও সংসারই শুরু করেননি। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের অপরাধের খাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছে। পুলিশের গোপন সূত্রের কল্যাণে তাদের জীবন ও পরিবারের মান-ইজ্জত এখন ছিন্নভিন্ন।

. ১১ অক্টোবরে প্রায় সবগুলো পত্রিকার খবর অনুসারে  মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলায় 'উঠান বৈঠক থেকে' বাংলাদেশে একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ১০ মহিলা কর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। গোপন বৈঠক হচ্ছে এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মুজিবনগর থানার পুলিশের একটি দল হযরত আলীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে এই মহিলাদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত মহিলাদের কপাল ভালো যে, আদালত তাদেরকে রিমান্ডে না পাঠিয়ে মেহেরপুর কারাগারে পাঠিয়েছেন।

. পুলিশের বুঝা উচিত যে, গোপন বৈঠক উঠানে দুপুরবেলা হয় না। গোপন বৈঠকের সময় শিশুকে নিয়ে মহিলাদের ওখানে থাকার কথা না। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে যা দেখা যাচ্ছে যে, তারা কিছু ধর্মীয় বই পুস্তক নিয়ে ওখানে আলোচনা করছিলেন। পুলিশ অবশ্য এই ইসলামিক বইগুলোকে জিহাদি বই হিসেবে চালিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে মজার কাণ্ড হচ্ছে যে দলের মহিলা কর্মীদের নাশকতার পরিকল্পনা করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে সেই দলের প্রধান প্রকাশ্যে সারা দেশে সভা-সমাবেশ এবং ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছেন। যে দলের প্রধান সারা দেশে প্রকাশ্যে সভা- সমাবেশ করছেন, সেই দলের ১০ জন মহিলাকর্মী কোন অজপাড়া গায়ে প্রকাশ্যে উঠানে বসে নাশকতার পরিকল্পনা করছেন! কেউ বিশ্বাস করবে? কিন্তু আদালত সম্ভবত কিছুটা বিশ্বাস করেছেন। সে কারণেই হয়তো এই মহিলাদের জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আদালতকে ধন্যবাদ যে 'গোপন সূত্রে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে' আটক করা এই মহিলাদের রিমান্ডে পাঠানো হয়নি। আদালত এক সময় নিশ্চয়ই পুলিশকে  তাদের 'গোপন সূত্রে পাওয়া তথ্য' নিয়ে' প্রশ্ন করবেন।

. ১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহে বাংলাদেশের বৃহত্তম জনপ্রিয় একটি দলের (বিএনপি) মহাসমাবেশকে পণ্ড করার জন্য সড়ক পথ এবং নৌ পথে কারবালার মতো অবস্থা করা হয়েছিল। ময়মনসিংহমুখী  দূরপাল্লার সব যানবাহন বন্ধ করে দেয়া হয়। গাড়ির মালিকেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে এই কারবালা ঘটায়। গাড়ির মালিকেরা কেন এই কারবালা ঘটালেন? ড্রাইভার সমিতি, মালিক সমিতিকে ফোন করেও কোনো সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি। এক পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন 'গাড়ি চলাচল করছে না,  রাস্তা বা গাড়িতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি  করা হয়েছে এমন বিষয়ে সম্পর্কে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।' এমন অবিশ্বাস্য মন্তব্য আমাদের বিশ্বাস করতে হবে? যে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ মেহেরপুরে উঠান থেকে ১০ মহিলাকে গ্রেফতার করেছে সেই গোপন তথ্য মেশিন বুঝি ময়মনসিংহের সারা জেলার গাড়ি বন্ধের ব্যাপারে কিছুই জানে না?

.  এই গোপন তথ্য মেশিন অবশ্য গত কয়েক সপ্তাহে বেশ আরও কয়েকটি  প্রকাশ্য ঘটনা ও তথ্যকে গোপন করেছে।

. ইডেন কলেজের ভয়াবহ ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সবার হাতে এখন। দেহ ব্যবসার মতো অনৈতিক কাজ করানোর অভিযোগ থেকে শুরু করে প্রকাশ্যে মারামারির ভিডিও সবার কাছে প্রকাশ্য হলেও পুলিশের কাছে গোপন। আর সে কারণেই ইডেন কলেজের ভয়াবহ ঘটনার পর  আমরা কাউকে গ্রেফতার হতে দেখিনি। ইডেন কলেজে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি-না তা নির্ণয় করার দায়িত্ব কি অধ্যক্ষের না পুলিশের?

ছবি-ইডেন কলেজের এই যুদ্ধে কোনো গ্রেফতার নেই 


৯. গত দুই সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল এবং গণ অধিকার পরিষদের কর্মীদের যেভাবে প্রকাশ্য পুলিশের সামনে পেটানো হয়েছে তাও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সবার মোবাইলে চলে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস শেষ করে এই সন্ত্রাস  ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও পুলিশ আক্রমণকারীদের কাউকে এখনো গ্রেফতার করেনি। প্রকাশ্য আক্রমণের এই ঘটনাগুলো পুলিশের কাছে বিশেষ কারণে গোপন হয়ে গেছে। তাই কোনো গ্রেফতার নেই, মামলা নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে ঘটানো এই বর্বরতার নায়কদের বিষয়ে পুলিশের কাছে কোন তথ্য নেই?

 

১০. রাষ্ট্রীয় যে আইন আছে, আদালতের নির্দেশনা আছে সেখানে প্রকাশ্যে বলা হয়েছে ওয়ারেন্ট ছাড়া কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের বিচার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করা যাবে না।
১১. মেহেরপুরের ঘটনায়  পুলিশ কি আদালতের নির্দেশনা অবমাননা করেছেন? অবমাননা করলে আদালত এখন কী করবেন?

১২. সম্ভবত কিছুই ঘটবে না। এ নিয়ে কাউকে হইচই, মানববন্ধন করতে দেখা যাবে না। ময়মনসিংহ জেলায় সমাবেশের দিন যানবাহন চলাচলে বন্ধ করে দেয়া হলো কেন? ড্রাইভার বা মালিক সমিতিকে আদালতে একটু ডেকে এনে জিজ্ঞেস করা যায়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইডেনের ঘটনায় কেন হামলাকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি, পুলিশ কেন অপরাধ তদন্ত করেনি এমন প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না?

১৩. বর্তমানে এবং নিকট অতীতে এরকম ঘটনা অহরহ ঘটেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে। দু একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কেউ কিছু করছে না, কেউ কিছু বলছে না। মনে হচ্ছে অন্ধের দেশে কেউ আয়না বিক্রি করছে। তাই কেউ কিছু দেখছে না, কেউ কিছু শুনছে না। এই অন্ধত্ব ও বধিরতা কতদিন স্থায়ী হয় তা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।


ডা: আলী জাহান
কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট, যুক্তরাজ্য।
সাবেক পুলিশ সার্জন, যুক্তরাজ্য।
[email protected]

মত-মতান্তর থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status