ঢাকা, ৪ এপ্রিল ২০২৫, শুক্রবার, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৪ শাওয়াল ১৪৪৬ হিঃ

অনলাইন

প্রাগে রবীন্দ্র দর্শন

বরেন চক্রবর্তী

(২ দিন আগে) ১ এপ্রিল ২০২৫, মঙ্গলবার, ২:২২ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৪:৩০ অপরাহ্ন

mzamin

১৯২৬ সালে দ্বিতীয়বার প্রাগ ভ্রমণের সময় তোলা ছবি। ছবির বাঁ পাশে অধ্যাপক মরিস উইন্টারনিৎস, ডান পাশে ভিনসেন্স লেসনি এবং পেছনে ইন্ডিয়ার প্রভাবশালী সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘মডার্ন রিভিউ’র প্রকাশক ও সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়।

প্রাগ শহরকে বলা হয় ‘The City of K’( সিটি অফ কে)। একটা শহরের নাম কী করে ‘ক’-শিরোনামের শহর হয়ে গেল তার পেছনের কারণ অতি স্পষ্ট। শিল্প-সাহিত্য জগতের দুই কিংবদন্তির জন্ম এই দেশে এবং এরা দু’জনই কাজ করেছেন এই প্রাগ শহরে। এর একজন চেকোস্ল্লোভাকিয়ার গ্রেট কথাশিল্পী বিশ্বসাহিত্যে¨ অনন্য এবং ভিন্ন্‌ ধারার লেখক Franz Kafka (ফ্রানৎস কাফ্‌কা, ১৮৮৩-১৯২৪) আরেকজন হলেন এই দেশটির আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী Frantisek Kupka (ফ্রান্টিসেক  কুফ্‌কা, ১৮৭১-১৯৫৭)। এ দু’জনেরই মূল নামের আদ্যাক্ষর ‘K’, তাই মানুষের কাছে প্রাগ হয়ে গেছে ‘দ্য সিটি অফ কে’। কুফ্‌কা ছিলেন রঙের খেলার জাদুকর এবং চেক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান শিল্পী। চেকোস্লোভাকিয়ার যে সব শিল্পী বহির্বিশ্বে সর্বাধিক পরিচিত তাঁদের মধ্যে কুফ্‌কা অন্যতম। আর ফ্রানৎস কাফ্‌কা কতো বড় লেখক ছিলেন? এককথায় বলা যায় কাফ্‌কা বিংশ শতাব্দীর সাহিত্য জগতের এক বিস্ময়। ফ্রানৎস কাফ্‌কা কখনো নোবেল পুরস্কার পান নি কিন্তু অন্তত এক ডজন নোবেল লরিয়েট সাহিত্যিক তার লেখা কর্তৃক সরাসরি প্রভাবিত। বিংশ শতাব্দীর দুই কিংবদন্তি লেখক Gabriel García Marquez  (গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, ১৯২৭-২০১৪, Kjvw¤^qv ) এবং Jorge Luis Borges (হোর্হে লুইস বোর্হেস, ১৮৯৯-১৯৮৬, আর্জেন্টিনা)  দু’জনই ছিলেন কাফ্‌কার লেখার স্টাইলের অনুসারী। সাহিত্যের অনেক ক্ষেত্রজ্ঞ মনীষীদের মতে Cervantes (সার্ভেন্টিস, ১৫৪৭-১৬১৬) এর পরে মার্কেস আর বোর্হেস এই দুইজন হলেন স্প্যানিশ ভাষার সেরা লেখক। মার্কেজ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ১৯৮২ সালে কিন্তু  হোর্হে  লুইস বোর্হেসকে কেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়নি তা তাবৎ পৃথিবীর রহস্য এবং এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর সুইডেনের  নোবেল পুরস্কার কমিটি আজো দিতে পারে নি। কাফ্‌কা কতো বড় লেখক ছিলেন তা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের জবানবন্দিতেই বুঝা যায়। মার্কেজ নিজে বলেছেন- কাফ্‌কার বই পড়ে প্রথম বুঝেছি ভিন্নভাবেও লেখা যায়। কাফ্‌কা সেই উচ্চতার ভাষাশিল্পী যার বশ্যতা মার্কেজ কিংবা বোর্হেসরাও নির্দ্বিধায় মেনে নেয়। রাশিয়া গদ্য সাহিত্যের গুরু কিন্তু তারপরও যে লেখক বিংশ শতাব্দীতে অন্যান্য লেখকদের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন তিনি হলেন- ফ্রানৎস কাফ্‌কা। কাফ্‌কা এমন একজন  লেখক যাকে  সমীহ করে পৃথিবীর তাবৎ লেখক। অনেক ক্রিটিকদের ধারণা দু’জন কিংবদন্তি লেখক বিংশ শতাব্দীর বেশির ভাগ লেখককে প্রভাবিত করেছেন, এ দু’জনের একজন করেছেন পদ্যে আর একজন করেছেন গদ্যে। পদ্যে করেছেন ফরাসি গ্রেট Charles  Baudelaire (চার্লস বোদলেয়ার, ১৮২১-১৮৬৭) আর গদ্যে ফ্রানৎস কাফ্‌কা। কাফ্‌কা আর বোদলেয়ারের জীবনের একটি জায়গায় খুব মিল। দু’জনই  ছিলেন ¯^ívqyi মানুষ। বোদলেয়ার বেঁচেছিলেন ৪৬ বছর আর কাফ্‌কা মাত্র ৪০ বছর। কাফ্‌কা নিজে নোবেল পুরস্কার পাননি কিন্তু তাঁকে অনুসরণ করে লিখে কিংবা তাঁর দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হয়ে লেখা লেখি করে এ পুরস্কার পেয়েছেন অনেকে। কাফ্‌কা কর্তৃক সরাসরি প্রভাবিত যে সব বিখ্যাত লেখকরা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন আলজেরিয়ায় জন্ম নেয়া গ্রেট লেখক Albert Camus (আলবেয়ার কামু, ১৯১৩-১৯৬০) আর দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেয়া লেখক John Maxwell Coetzee (জন ম্যাক্সওয়েল কোয়েটজি, জন্ম ১৯৪০)। প্রথমজন নোবেল পুরস্কার পান ১৯৬৪ সালে আর দ্বিতীয়জন ২০০৩ সালে। কাফ্‌কার লেখার অনুসারী অন্তত এক ডজন লেখক ইতিমধ্যে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেছেন। নোবেল পুরস্কার না পেলে কী হবে ফ্রানৎস কাফ্‌কা কিন্তু শুধু চেকোস্লোভাকিয়াতেই নয়, বিশ্ব নিরিখেই কিংবদন্তি।১৯৮১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী জার্মান লেখক Elias Canetti (ইলিয়েস ক্যানেট্টি, ১৯০৫-১৯৯৪), সারা বিশ্বে পরিচিতই কাফ্‌কা স্পোশালিস্ট হিসেবে। আমার মেয়ে অনি বোঝে না, যে লোকটা কোনোদিন নোবেল পুরস্কারই পায়নি তাঁকে নিয়ে আমার এতো উচ্ছ্বাসই বা কেন, আর পরপর দু’দিন আমরা তাঁর বাড়িতে যাচ্ছিই বা কেন? কাফ্‌কা নোবেল পুরস্কার পায়নি এ কথাটা ঠিক, কারণ তিনি মারা গেছেন ১৯২৪ সালে আর নোবেল পুরস্কার প্রথম দেয়া শুরু হয় ১৯০১ সালে। অর্থাৎ এ পুরস্কার শুরু হওয়ার পরও দীর্ঘ তেইশ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন কিন্তু নোবেল তিনি পান নি। অনির এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন।  নোবেল পুরস্কার বড় মজার জিনিস, অনেক সময়েই খুঁটির জোর না থাকলে তা ধরা দেয় না।  মহাত্মা গান্ধী শান্তিতে নোবেল পায় নি, তা কী ভাবা যায়! সত্যেন্দ্রনাথ বোস (১৮৯৪-১৯৭৪)’র তত্ত্বের উপর গবেষণা করে এ পর্যন্ত সাত বিজ্ঞানী ইতিমধ্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেছেন কিন্তু তিনি নিজে নোবেল পুরস্কার পান নি। ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান (১৮৮৮-১৯৭৫) মোট ২৭ বার (সাহিত্যে ১৬ বার+শান্তিতে ১১ বার) নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েও পুরস্কারটি তাঁর অধরাই রয়ে গেছে। তবে কাফ্‌কা কেন নোবেল পুরস্কার পান নি তার একটা যুক্তি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। কারণ এই লেখকের মাস্টারপিস উপন্যাসগুলো প্রকাশ হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর। কাফ্‌কার মৃত্যু হয় ১৯২৪ সালে কিন্তু তাঁর লেখা বিখ্যাত উপন্যাস  ‘The Trial’ (দ্য ট্রায়াল,১৯২৫), ‘The Castle’ (দ্য ক্যাসেল, ১৯২৬) আর ‘The Man Who Disappeared’ (দ্য ম্যান হু ডিজঅ্যাপিয়ার্ড, ১৯২৭) ছাপা হয় তাঁর মৃত্যুর পর, তাই তাঁর নাম কখনো হয়তো নোবেল পুরস্কার কমিটির বিবেচনাতে আসেনি। তবে আমরা যারা সাধারণ পাঠক তারা কাফ্‌কাকে মনে রেখেছি তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘The Metamorphosis’ (দ্য মেটামরফোসিস, ১৯১৫) রচনাটির জন্য। এই  রচনাটিকে ঠিক গল্প না বলে নভেলা বলাই বোধ হয় শ্রেয় (গল্পের চেয়ে বড় কিন্তু উপন্যাসের চেয়ে ছোট রচনা), যে রচনার মূল চরিত্রই একটি আরশোলা। ফ্রানৎস কাফ্‌কার লেখা থেকে বিশ্ব সাহিত্যে ‘Kafkaesque’ (কাফ্‌কায়েস্ক) নামে একটি শব্দ উদ্ভাবিত হয়েছে। রূপক আর আধ্যাত্মিকতা নির্ভর  লেখাগুলো এই গোত্রীয়।  কাফ্‌কা যে স্টাইলে লিখতেন সেই ঘরানা অনুসরণ করে যে লেখা হয়, তা ‘কাফ্‌কায়েস্ক’ গোত্রীয় রচনা। এটি একটি আধুনিক সাহিত্য ঘরানা, যা রচিত হয় বাস্তবতা আর কল্পনার মিশেলে। অতিপ্রাকৃত পরিস্থিতি, বিচ্ছিন্নতা, অস্তিত্বমূলক উদ্বেগ, অপরাধবোধ আর অযৌক্তিকতা এর মতো বিষয়-আশয় উঠে আসে এসব সাহিত্য সৃষ্টিতে। ‘কাফ্‌কায়েস্ক’ রীতি শুধু সাহিত্যে নয়, টিভি সিরিয়াল আর সিনেমাতেও বার বার এসেছে । কাফ্‌কা বেঁচেছিলেন মাত্র ৪০ বছর কিন্তু তিনি এখনো বিশ্ব সাহিত্যে প্রভুত্ব করেন অনায়াসে। তবে সিসৃক্ষু মানুষের কাছে বয়স কোনো অন্তরায় না। উপমহাদেশের সর্বকালের সেরা নারী শিল্পী অমৃতা শেরগিল বেঁচেছিলেন মাত্র ২৮ বছর, ফরাসি মাস্টার আমাদিও মদিগ্লিয়ানি ৩৫ বছর, ডাচ্‌ গ্রেট ভ্যান গঘ ৩৭ বছর আর রাশান গদ্য সাহিত্যের রাজা নিকোলাই গোগোল বেঁচেছিলেন মাত্র ৪২ বছর! কিন্তু বয়স কী তাঁদের সর্জনসামর্থ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে? পারে নি।  

দ্বিতীয়বারের মতো কাফ্‌কার বাড়ি থেকে যখন আমরা বের হই তখন বেলা বাজে সাড়ে বারোটার মতো। সেদিন আবহাওয়া ভালো ছিল না। সকাল থেকেই ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির টপটপানি ছিল তবে কখনো একেবারে ঝেঁপে আসে নি। আজ দুপুরে লাঞ্চ খেতে হবে চেক স্টাইল  রেস্তোরাঁয়, যা আমাদের লোকাল গাইড মামুর আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে। মামুর আগেই বলেছিল যে রেস্তোরাঁয় আমরা দুপুরের খাবার খাবো সেটি আমাদের ডিপ্লোমেট হোটেল থেকে খুব কাছে। সঠিক অর্থে মামুর আসলে আমাদের গাইড কিংবা হোস্ট কোনোটাই না। মামুরের পুরো নাম ডা. ফাইজুল হোসেন ভূঁইয়া এবং ওর ডাক নাম মামুর। ও আমার শ্যালক তুল্য কারণ মামুর আমার একমাত্র শ্যালক ডা. দেবাশীষের বাল্যবন্ধু। সুতরাং আমার বৌ চন্দনা তার ভাই পেয়ে আর সুদি অনি ওদের পূর্ব পরিচিত মামা পেয়ে মহানন্দে গত দু’দিন কাটিয়ে দিয়েছে এই প্রাগ শহরে। কিন্তু আমি তো শুধু প্রাগকে নিছক দেখতে আসিনি, আমি এখানে এসেছি চেক শিল্প সাহিত্য সম্পর্কে জানতে আর চেকোস্লোভাকিয়ার গ্রেট পেইন্টারদের কাজ চাক্ষুষ দেখতে। গাড়িতে উঠেই চন্দনা বললো সকাল থেকে প্রাগ ক্যাসেল, চার্লস ব্রিজ আর ওল্ড টাউনে ঘোরাঘুরি করে ও ক্লান্ত, তাই ও লাঞ্চের আগে একবার হোটেলে যেয়ে ফ্রেস হতে চায়। কাফ্‌কার বাড়ি এলাকা থেকে মামুরের গাড়ি চললো আমাদের হোটেলের দিকে। গাড়িতে বসেই দেখছি রাস্তার মোড়ে এ দেশের মানুষ শুধুমাত্র ‘K’ অক্ষরটি দিয়ে ভাস্কর্য বানিয়ে রেখেছে। একজন লেখককে যে একটা দেশের মানুষ দেবতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে তা আমি প্রাগে এসে দ্বিতীয়বার দেখলাম। প্রথম দেখেছিলাম ডাবলিন শহরে।  লেখাপড়ার জন্যে একসময় আমাকে আয়ারল্যান্ডের এই শহরটিতে যেতে হয়েছিল এবং আমার প্রথম বিদেশি ফেলোশিপও ওই শহর থেকেই। সেখানে দেখেছি wek^weL¨vZ উপন্যাস ‘Ulysses’ (ইউলিসিস, ১৯২২)’র লেখক James Joyce (জেমস জয়েস, ১৮৮২-১৯৪১) কে কী করে একটা দেশের মানুষ দেবতা জ্ঞান করে প্রায় পূজা করে। আমার একটা ট্রাভেলগে এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত লিখেছিও। ডাবলিন শহরে একটা শো-রুমও খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে হাতে ছড়ি,  চোখে চশমা আর পকেটে হাত ঢোকানো জয়েসের অন্তত একটা মিনেয়েচার ভাস্কর্য নেই।  আইরিশদের বসতবাড়ির ড্রয়িং রুমে জয়েস থাকবেই। ঠিক যেন সে রকম দৃশ্যই দেখলাম কাফ্‌কাকে নিয়ে প্রাগ শহরে। গাড়ি মোড় নিতেই আবার সেই চার্লস ব্রিজ। গত দুদিন এই শহরে থেকে মনে হয়েছে এই ব্রিজটি বোধ হয় কখনো স্থির থাকে না। ছটফটে কিশোরের মতো এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়ায়। তা না হলে এই শহরের যে দিকেই আপনি যান না কেন, কাছ কিংবা দূর থেকে এই ব্রিজ এক পলকের জন্যে হলেও আপনার দৃষ্টির আয়ত্বের ভিতর আসবেই। হোটেলে আমরা বেশিক্ষণ দেরি করিনি কারণ তখনো আমার দুটো পেইন্টিং মিউজিয়াম দেখা বাকি এবং এরমধ্যে একটি হলো ‘মুচা মিউজিয়াম’। কিংবদন্তি চেক শিল্পী Alfons Mucha (আলফোনস মুচা, ১৮৬০-১৯৩৯)’র আঁকা ছবি নিয়ে গড়ে উঠেছে এই পেইন্টিং গ্যালারি। ‘The Slav Epic’ (স্লাভ এপিক) এঁকে তিনি wek^weL¨vZ| হোটেল থেকে যখন গাড়িতে উঠতে যাবো ঠিক ওই সময় মামুর বললো ‘দাদা, আপনাদের এই হোটেল থেকে ‘Thakurova’ (ঠাকুরোভা) কিন্তু খুব কাছে’। প্রথমে আমি ‘ঠাকুরোভা’ বিষয়টা কী, তা বুঝতে যথার্থই ব্যর্থ হই। ওকে আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম ‘ঠাকুরোভা’ জিনিসটা কী? গাড়িতে বসে যখন আমি শুনলাম যে ‘ঠাকুরোভা’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে অ্যাভিনিউ এবং এর কাছাকাছি অবস্থানে পার্কের মাঝে রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য আছে, তখন আমি রীতিমতো থ। বলে কী! গত দু’দিন আমরা তবে প্রাগে কী খুঁজলাম? এইমাত্র মামুর যদি কথাটা আমাকে না বলতো অথবা ও যদি আদৌ বিষয়টা আমার কানে না তুলতো, তবে তো আমার প্রাগে আসাটা অর্ধেক ব্যর্থ হয়ে যেত। তবে এইটুকু বুঝলাম রবীন্দ্রনাথের কথাটা বলতে মামুর ঢের দেরি করে ফেলেছে। রেস্তরাঁ থেকে বের হতে হতে বেজে যাবে দু’টা-আড়াইটা। এরপর মিউজিয়াম দেখে রবীন্দ্র দর্শন করতে প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবে। ওইদিনই ছিল আমাদের প্রাগ সফরের শেষ দিন। আজ মধ্য রাতেই আমরা বাসে করে রওনা হবো ভিয়েনার পথে। সন্ধ্যার পর হোটেল থেকে চেক আউট করে চলে যাবো মামুরের বাড়িতে, সেখানে ডিনার করে বাস স্টেশন। কিন্তু বিষয় যখন রবীন্দ্রনাথ তখন তো যে করেই হোক দেখে যেতেই হবে।

গাড়িতে বসেও আমার যতো চিত্ত চাঞ্চল্য রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে। রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য আমার হোটেলের এত কাছে আর আমি তা নাদেখেই চলে যাবো, তা কী করে হয়? আর দূরে হলেই বা যাবো না কেন? যেতে তো হবেই। প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য খুঁজে বের করেছি, স্ট্র্যাটফোর্ড অন অ্যাভনে শেক্সপিয়রের বাড়িতে যেয়ে তাঁর বাগানে রবীন্দ্রনাথের বাস্ট দেখে এসেছি, আর একদিন পথ ভুলে ঘন্টা দুয়েক লন্ডনের রাস্তায়  ঘোরাঘুরি করে চন্দনার পা ব্যথা ধরিয়ে শেষপর্যন্ত গর্ডন স্কয়ার পার্কে রবীন্দ্র ভাস্কর্য দর্শন করেছি। তাই প্রাগে গুরুদেবের দেখা পাবো না, তাতো হবার নয়। যতোদূর স্মৃতি যায় আমার মনে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দু’বার এই শহরে এসেছেন। তিনি যে প্রাগে এসেছিলেন সে বিষয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে যখন আমি রবীন্দ্র চিত্রকলা নিয়ে Ôˆewk^K প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্র চিত্রকলা’ বিষয়ক বইটি লিখছিলাম। কিন্তু সে বিষয়-আশয়গুলো ছিল শিল্পকলা সম্পর্কিত। রবীন্দ্রনাথের সাথে বিখ্যাত চেকোস্লোভাকিয়ান পেইন্টার Jaroslav Hnevkovsky (জেরোস্লাভ নেভকোভস্কি, ১৮৮৪-১৯৫৫)’র সখ্য ছিল। নেভকোভস্কিকে বলা হয় ‘Slavic Gauguin’ (møvwfK গগ্যাঁ)। অর্থাৎ জেরোস্ল্লাভ নেভকোভস্কি হলেন স্লাভদেশের Paul Gauguin (পল গগ্যাঁ, ১৮৪৮-১৯০৩)।১ ফরাসি গ্রেট পল গগ্যাঁ হলেন সিমবোলিস্ট ও প্রিমিটিভিজম ঘরানার প্রবাদ পুরুষ।  নেভকোভস্কিকে বলা হয় স্লাভ গগ্যাঁ, এ থেকে সহজেই অনুমেয় যে কোনো উচ্চতার শিল্পী ছিলেন এই স্লাভ শিল্পীটি। (যারা স্লাভ ভাষায় কথা বলে তারাই স্লাভ। স্লাভিক দেশগুলো হলো চেক রিপাবলিক, রাশিয়া, ইউক্রেন, স্লোভাকিয়া,  স্লোভেনিয়া, পোল্যান্ড, বেলারুশ আর সার্বিয়া)। রবীন্দ্রনাথের সাথে এই চেক শিল্পীর পরিচয় হয় ১৯২১ সালে। পরিচয়ের প্রথম পর্বেই এই চেক শিল্পীর পেইন্টিং রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। এবং রবীন্দ্রনাথ সাথে সাথে নেভকোভস্কিকে তাঁর শান্তিনিকেতনে এসে সেখানকার চিত্রকলার ছাত্রদের শিক্ষক হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। এবং রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে জেরোস্লাভ নেভকোভস্কি ১৯২২ সালে ভারতে আসেন এবং ১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্ডিয়াতেই থেকে গেছেন। ওটা ছিল নেভকোভস্কির দ্বিতীয়বারের মতো ইন্ডিয়া আসা। এর আগেও ১৯০৯ সালে আরেক সুখ্যাত  চেক পেইন্টার Otakar Nejedly (ওটাকার নেজেডলি, ১৮৮৩-১৯৫৭)কে সাথে নিয়ে জেরোস্ল্লাভ নেভকোভস্কি ইন্ডিয়া ও শ্রীলঙ্কা ঘুরে গেছেন।১ (জেরোস্লাভ নেভকোভস্কির নামের চেক উচ্চারণ হলো য়ারোস্লাভ হ্নেভকবস্ক আর ওটাকার নেজেডলি’র নামের চেক উচ্চারণ হলো অতাকার নেইয়েড্‌লী)। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা নিয়ে বই লেখার নিমিত্তে রবীন্দ্রনাথের সাথে চেকোস্লোভাকিয়ার শিল্পীদের  যোগাযোগ বিষয়ক এই ঘটনাগুলো আমি জানতাম। কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু আমি আর জানতাম না। এই শহরে পা রাখার সাথে সাথেই যদি জানতাম যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে এই শহরে ‘ঠাকুরোভা’ শিরোনামে একটা অ্যাভিনিউ আছে এবং তাঁর ভাস্কর্য আছে পার্কে, তবে গত দু’দিনে নিশ্চয়ই আমি বার কয় অবশ্যই যেতাম সেখানে। বিষয়টা জানলাম কিন্তু বড় দেরি করে জানলাম।

আমি দেখছিলাম মুচা মিউজিয়াম কিন্তু আমার মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছিল রবীন্দ্রনাথ, কখন ‘ঠাকুরোভা’ চত্বরে যেয়ে গুরুদেবের ভাস্কর্যের সামনে প্রণত হবো সেই ঈপ্সায়। ওইদিনের আবহাওয়া ভ্রামণিকদের জন্য খুব একটা অনুকূল ছিলো না। সকাল দুপুর সব সময়ই কিছু না কিছু বারিপাত ছিলোই। সাধারণত ইউরোপের সূর্য দেরিতে ডুবে। প্রাগেও গত দুদিন ওরকমটাই প্রত্যক্ষ করেছি। বিকেল তখন পাঁচটা ছুঁই ছুঁই। আমি আর অনি মিউজিয়াম থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে এলাম। সুদি আর চন্দনা মিউজিয়ামের ভিতর ঢুকেনি। মামুর ওদের দু’জনকে নিয়ে কফিশপে ঢুকেছিল। কিন্তু বাইরে বের হয়েই দেখলাম চোখের সামনে বিপত্তি। বৃষ্টিটা তখন আর আগের মতন টিপটিপে ঝিরঝিরে নেই, তখন ছিলো অবিরল বর্ষণ। ওই বৃষ্টি যেন তখন আমার শিরে করাঘাত। এতকাছে এসে রবীন্দ্রনাথকে না দেখে প্রাগ ছাড়লে অন্তর্বেদনায় পস্তাতে হবে দীর্ঘদিন। আমার ওই মুষড়ে পড়া হাবভাব দেখে মামুর বলে উঠলো- দাদা, প্রাগের বৃষ্টি বেশিক্ষণ থাকে না। দেখবেন হঠাৎ যেমন এসেছে আবার হঠাৎই চলে যাবে। ইউরোপের বৃষ্টি সম্পর্কে আমারও প্রাকধারণা আছে, এখানে বৃষ্টি বার বার আসে কিন্তু তা ক্ষণস্থায়ী। কাষ্ঠবৎ দাঁড়িয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। সাথে গাড়ি তো ঠিকই আছে কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে ঠাকুরোভা পার্ক  দেখবো কী করে? আমার তখন নখ কামড়ানো অপেক্ষা, কখন বৃষ্টিটা থামবে। একসময় বৃষ্টিটা থামলো ঠিকই কিন্তু থামতে সময়টা একটু বেশিই নিলো। সময়টা তখন সন্ধ্যে ছ’টার আশপাশে।

আমাদের নিয়ে মামুরের গাড়ি ছুটলো ‘ঠাকুরোভা’ স্কয়ারের দিকে। ইউরোপে পনের মিনিটের রাস্তা পনের মিনিটেই পেরোনো যায়, কারণ রাস্তায় ঢাকা শহরের ত্রিভূজ প্রেমের জটলার মতো ট্রাফিক জ্যাম নাই। সময় মতো পৌঁছেও তেমন লাভ হলো না, কারণ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় সূর্য দেব আজ যেন একটু আগেই ডুবলো। তারপরও এসেছি তো, ওতেই শান্তি। মুখে গদগদ ভাব নিয়ে গাড়ি থেকে নেমেই দেখি সামনেই ঠাকুরোভা স্কয়ারের প্রবেশ পথ আর মাথার উপর স্পষ্ট করে লেখা

‘THAKUROVA’

DEJVICE- PRAHA 6

প্রাগ শহরকে যে এদেশের মানুষরা ’প্রাহা’ বলে তা দু’দিন আগে এয়ারপোর্টে নেমেই বুঝে গেছি। কোথাও ‘প্রাগ’ শব্দটা লেখা নেই, সব জায়গাতেই লেখা ‘প্রাহা’। কিন্তু ‘ঠাকুরোভা’ আর ‘প্রাহা’ শব্দ দু’টির মাঝে ‘ডেজভিস’ নামে আরো একটি শব্দ আছে। মামুর বললো ডেজভিস (চেক ভাষায় উচ্চারণ ‘ডেইভিছ্যে’) এই এলাকার নাম, প্রাগ ৬ ডিস্ট্রিক্টের নামই ডেজভিস। এটি প্রাগ শহরের একটি পশ এলাকা, আর এই ঠাকুরোভা অ্যাভিনিউর আশপাশেই আছে চেক টেকনিক্যাল ইউনির্ভাসিটি, ইউনির্ভাসিটি অফ কেমিস্ট্রি অ্যান্ড  টেকনোলজি আর চেক ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ টেকনোলজি। ঠাকুরোভা এলাকাটি ইউনিভার্সিটি এরিয়া ছাড়াও ডিপ্লোমেটিক জোন হিসেবে পরিচিত। আমি যখন আধো আলো আধো আঁধারে ঠাকুরোভার চারপাশ দেখছি তখন অনি এসে বললো- বাবা, তাড়াতাড়ি ছবি তোলো। অন্ধকার আরো বেশি হলে কিন্তু ছবি ভালো আসবে না। ছবি ভালো না হলে ভ্রমণ কাহিনী লিখবা কী করে? কথাটা একেবারে সত্যি। ইউরোপের সূর্য আজ একটু তড়িঘড়ি করেই অস্তমিত হয়েছে। ঠাকুরোভার মূল গেটে সুদি আর অনিকে দাঁড় করিয়ে আমি অনেক গুলো ছবি তুললাম।

ঠাকুরোভাতে দাঁড়িয়েই আমার বার বার মনে হচ্ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব বেশিদিন চেকোস্ল্লোভাকিয়া নামের দেশটিতে থাকেন নি।২,৩ (রবীন্দ্রনাথ যে দু’বার এই দেশটি ভ্রমণ করেছিলেন তখন এই দেশটির নাম চেকোস্লোভাকিয়াই ছিলো। ১৯৯২ সালের ৩১ wW‡m¤^i চেকোস্ল্লোভাকিয়া নামের দেশটি ‘ভেলভেট ডিভোর্স’য়ের মাধ্যমে চেক রিপাবলিক আর স্লোভাকিয়া নামের দু’টি দেশে বিভক্ত হয়ে যায় এবং সেখানে কমিউনিস্ট শাসনের ইতি ঘটে। শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সেপারেশনকেই বলা হয় ভেলভেট ভিভোর্স)। ওইদিন ঠাকুরোভায় দাঁড়িয়ে প্রাগ শহরের চারপাশ আমি আবার যেন নতুন করে দেখার যেন চেষ্টা করি। সত্যিই সুন্দর শহর এই প্রাগ নগরী। অনেক বোদ্ধাদের মতে প্রাগ নাকি প্যারিস থেকেও উজ্জীবিত উদবেলিত শহর। এই শহরের ভিতর দিয়ে ৩১ কিলোমিটার পথে বয়ে গেছে ভালতাভা নদী, আর এপার ওপারের যোগসূত্র হিসেবে ভালতাভার উপর দিয়ে চলে গেছে ১৬টি মোহনীয় ব্রিজ। wek^weL¨vZ চার্লস ব্রিজ তার একটা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে কিংবদন্তি চেক দার্শনিক ও গাণিতিক  Bernard Bolzano (বার্নার্ড বোলজানো, ১৭৮১-১৮৪৮) বলে গেছেন, প্রাগ হলো একশ তিন M¤^y‡Ri ম্যাজিক্যাল শহর।৪ সত্যি রাতের বেলা ক্যাথিড্রাল, ক্যাসেল, চার্চ আর ঐতিহাসিক ইমারত ভবনগুলোর শিখরে চাঁদের আলো cÖwZwew¤^Z হয়ে সেগুলো মুক্তোর মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই ভবনগুলো শত শত বছরের পুরনো, তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিশ্চয়ই রাতের প্রাগ শহরের এই বর্ণবিভা কাছ থেকে দেখেছেন।  

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রচিত ‘রবীন্দ্রজীবনী’ আর প্রশান্তকুমার পালের ‘রবিজীবনী’ থেকে জানা যায় রবীন্দ্রনাথ খুব কম সময়ের জন্য দুবার এই দেশটিতে এসেছিলেন।২,৩ কিন্তু এই দুই জীবনীকারের বিবরণীতে রবীন্দ্রনাথের চেকোস্ল্লোভাকিয়া ভ্রমণের বিষয় আশয় তেমন বিশদে লেখা নেই। রবীন্দ্রনাথ চেকোস্লোভাকিয়া সফর করেছিলেন দুবার ১৯২১ আর ১৯২৬ সালে। প্রথম সফরে তিনি এই দেশটিতে ছিলেন মাত্র চারদিন।২ ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রাগ এসেছিলেন ১৭ জুন আর এই শহর থেকে তিনি ২১ জুন স্টুটগার্ড হয়ে প্যারিস পোঁছান। ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ বার্লিন থেকে প্রাগ এসেছিলেন ৯ অক্টোবর এবং সেখান থেকে তিনি ভিয়েনা পৌঁছান ১৬ অক্টোবর। অর্থাৎ এই দুই সফর মিলে তিনি এই দেশে ছিলেন মাত্র ১২ দিন। রবীন্দ্রনাথ দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি সময় ছিলেন ইংল্যান্ডে আর দ্বিতীয় স্থানে আছে আমেরিকা। ভাবতে অবাক লাগে যে দেশটিতে তিনি ছিলেন মাত্র ১২ দিন কিন্তু সে দেশের মানুষ কেন তাঁকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করে! একেবারে খোদ রাজধানীর ব্যস্ত এলাকায় তাঁর নামে অ্যাভিনিউ, পার্কে শোভা পায় তাঁর মূর্তি। কিন্তু কেন? ইতিহাসবেত্তারা বলেন চেকোস্ল্লোভাকিয়ার শিল্প কিংবা সাহিত্যের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনুরাগ ছিল তা কোনোভাবেই স্পষ্ট করে প্রমাণ হয় না, কিন্তু এই দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সব সময়ই সংবেদী ছিলেন। চেকোস্লোভাকিয়া দেশটির ¯^vaxbZvi স্থপতি এবং প্রথম প্রেসিডেন্ট Tomas  Masaryk (টমাস ম্যাসেরিক, ১৮৫০-১৯৩৭) এর সাথে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। ফ্রান্সের কাপ্‌ মার্‌ত্যাঁয় অবস্থানের সময় তাঁদের দু’জনের প্রথম পরিচয় ঘটে। ৩ম্যাসেরিক ১৯১৮ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত চেকোস্ল্লোভাকিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এবং ১৯২১ ও ১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন এই দেশটি সফরে আসেন তখন এই টমাস ম্যাসেরিকই ক্ষমতায় ছিলেন। চেকোস্লোভাকিয়ার প্রেসিডেন্ট টমাস ম্যাসেরিকের সাথে গুরুদেবের হৃদ্যতা কতোটা গভীর ছিল তার প্রমাণ মেলে প্রাগ থেকে পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে। ১৯২৬ সালের ১৫ অক্টোবর প্রতিমা দেবীকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- কল্যাণীয়াসু বৌমা, এখানকার পালা শেষ হলো। আজ যাব ভিয়েনায় কাল হবে বক্তৃতা-তার পরে যাব বুডাপেস্টে, সেখানে হবে বক্তৃতা। তার পরে যাব এখানকার প্রেসিডেন্ট ম্যাসেরিকের বাড়িতে- না গেলে সবাই দুঃখিত হবে। ৫সুতরাং এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান যে শুধু শিল্প সাহিত্যই নয়, এর বাইরেও ভূরাজনীতি বিষয়ে চেকোস্লোভাকিয়ার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটা সংবেগের সম্পর্ক ছিল। চেকোস্লোভাকিয়া নামের এই দেশটিতে যখনই কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে তখনই রবীন্দ্রনাথ তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৩৭-৩৮ ছিল চেকদের জন্য দুঃসময়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে গুরুত্বপূর্ণ চেক লেখক ও নাট্যকারদের  মধ্যে অন্যতম ছিলেন Karel Capek (ক্যারেল ক্যাপেক, ১৮৯০-১৯৩৮)। ক্যাপেকের সাথে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। চেকোস্ল্লোভাকিয়া যখন আক্রান্ত হতে যাচ্ছে তখন  ক্যারেল ক্যাপেক শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের কাছে তাঁর দেশের নির্মম নিয়তির কথা বিস্তারিত জানিয়ে টেলিগ্রাম করেছিলেন। ক্যাপেকের ওই টেলিগ্রামের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে আবেগঘন তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন এবং সেই বার্তায় তিনি চেকদের উদ্দেশ করে লিখেছিলেন- ‘Friends in Czechoslovakia. In the terrible storm of hated violence raging over humanity, accept the goodwill of an old idealist who clings to his faith in the common destiny of the East and West and all people on the Earth.’6 ১৯৩৮ সালের ৩০ †m‡Þ¤^i ‘মিউনিখ এগ্রিমেন্ট’র মাধ্যমে হিটলারের জার্মান নাৎসিরা চেকোস্লোভাকিয়ার সুডেটেন্ড নামের একটি বিশাল অংশ দখল করে নেয়। এই সংবাদ পেয়ে রবীন্দ্রনাথ যারপরনাই ব্যথিত হন। রবীন্দ্রনাথ তখন দুঃখভারাক্রান্ত মনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট  Edvard Benes (এডভার্ড বেনেস, ১৮৮৪-১৯৪৮) এর কাছে টেলিগ্রাম করেন। ওই বার্তায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘I can only offer profound sorrow and indignation on behalf of India and of myself at the conspiracy of betrayal that has suddenly fling your country into a tragic depth of isolation’. মিউনিখ চুক্তির কারণে প্রাগ যখন বিপর্যস্ত তখন রবীন্দ্রনাথ আকাশবাণী থেকে সরাসরি বক্তৃতায় চেকোস্লোভাকিয়ার পক্ষ Aej¤^b করে বাণী দিয়েছিলেন।৭ ওই বছরই রবীন্দ্রনাথ চেক জাতিকে উদ্দেশ্য করে ‘প্রায়শ্চিত্ত’ কবিতাটি লিখেন।

‘উপর আকাশে সাজানো তড়িৎ-আলো....

নিম্নে নিবিড় অতিবর্বর কালো

ভূমিগর্ভের রাতে...

ক্ষুধাতুর আর ভূরিভোজীদের

নিদারুণ সংঘাতে

ব্যাপ্ত হয়েছে পাপের দুর্দহন

সভ্যনামিক পাতালে যেথায়

জমেছে লুটের ধন।

দুঃসহ তাপে গর্জি উঠিল

ভূমিকম্পের রোল,

জয়তোরণের ভিত্তিভূমিতে

লাগিল ভীষণ দোল।

কবিতাটি লিখেই রবীন্দ্রনাথ ওই কবিতার ভাবার্থ অনুবাদ করে সাথে সাথে চেকোস্ল্লোভাকিয়ায় পাঠিয়ে দেন।

‘Those crushed and trodden lives of the meek and the weak

which are sacrificed as food offerings for the mighties.

Those human flesh-eaters, snatching and scrambling,

tearing the gut,

scattering everywhere pieces of flesh bitten by sharp teeth,

Stained the lap of the mother earth with the muddy blood.

From the thrust of that fierce destruction

one day, peace will emerge in the end with a great power.

We will not fear,

overcoming the distress, victory for us at the end. (‘Prayaschitta’ 9)8

চেকদের জন্য শুধু শোকগাথা আর কবিতা লিখেই তিনি ক্ষান্তি দেন নি, রবীন্দ্রনাথ মিউনিখ ক্রাইসিসের উপরে ওয়ার্ল্ড প্রেসে জার্মানদের চেকোস্লোভাকিয়া দখলের প্রতিবাদে খোলা চিঠিও লিখেছিলেন। ওইসব চিঠি আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছাপাও হয়েছে কিন্তু সে চিঠি চেকোস্ল্লোভাকিয়ায় ছাপা হয়নি। সে সব চিঠি চেকোস্লোভাকিয়ায় ছাপা হয়ে ছিল ১৯৪৫ সালে, যখন আর রবীন্দ্রনাথ নিজে বেঁচে ছিলেন না।৯ রবীন্দ্রনাথকে বলা হয় গ্লোবট্রটার অর্থাৎ wek^åvgwYK| যেসব দেশে তিনি গেছেন সে সব দেশ সম্পর্কে তিনি লিখেছেনও ভূরিভূরি। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, জাপান কিংবা আর্জেন্টিনা নিয়ে তাঁর লেখা আছে বিস্তর কিন্তু চেকোস্লোভাকিয়াকে নিয়ে  লেখালেখিতে তার তেমন কোনো উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে না। কিন্তু তারপরও চেকরা তাকে মনে রেখেছে সবসময় কিন্তু কেন? শুধু সাহিত্যের জন্যে নয়, বারবার বিপদের সময় রবীন্দ্রনাথকে তারা বন্ধু হিসেবে পাশে পেয়েছে সে জন্য। তাই প্রবাদপ্রতিম এই মানুষটিকে তাদের মাঝে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রাগ শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে তারা বানিয়ে রেখেছে ‘Thakurova’ অর্থাৎ ঠাকুর চত্বর। এই এভিনিউতে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো চেকরা যে আমাদের রবীন্দ্রনাথকে মনে রেখেছে তা অকারণে নয়। শুধু বারোদিন রবীন্দ্রনাথ এই দেশটাতে থেকে গেছেন বলে চেকরা তাদের খোদ রাজধানী শহরের ভিতর সুন্দর এক  অভিজাত এলাকায় একটা পার্কের নামকরণ করে রেখেছে  তা কিন্তু নয়, এর পেছনে আছে একটি মানবিক ইতিহাস, তাই চেকরা রবীন্দ্রনাথকে ভুলে নি।  

আমরা সবাই তখন ঠাকুরোভা স্ট্রিটে মাথার উপর গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি নিয়েই এদিক ওদিক হাঁটছিলাম। ঠাকুরোভা স্ট্রিটের পাশেই পার্কের ঠিক মধ্যিখানে রবীন্দ্র ভাস্কর্য। এই পার্কটি একেবারে প্রাগের টেকনিক্যাল ইউনির্ভাসিটির দুয়ারে। দু’পাশে সারি সারি বনবীথিকা আর মাঝখানে বেদিতে ব্রোঞ্জ নির্মিত গুরুদেবের বাস্ট। ছ’ ফুট উঁচু বেদিতে রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি। আমরা যখন ওই ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে দাঁড়ালাম তখন সূর্যের আলো একেবারেই ছিল না। তারপরও অনি বার বার ওর আই ফোনের ক্যামেরার ফ্ল্যাস ব্যবহার করে ফটোসেশন করার চেষ্টা করলো কিন্তু ভালো ছবি একটাও এলো না। মামুরও বার কয় আমাদের ফ্যামিলি সহ রবীন্দ্র ভাস্কর্যের ছবি নেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। ভালো ছবি যে আসবে না তা বোঝাই যাচ্ছিল কারণ পার্কের ওই এলাকাটা অত আলোকোজ্জ্বল ছিল না আর মূল ভাস্কর্যটি ছিল বেশ উঁচুতে। তাই নিরাশ হতেই হলো। তবে ওই বেদিতে যে সব কথাগুলো লেখা ছিলো তা পড়তে আমাদের কষ্ট হলো না। মূর্তির ঠিক নিচে বেদির সামনের দিকে লেখা আছে-

Rabindranath

THAKUR

বিদেশে সাধারণত রবীন্দ্রনাথকে ‘Thakur’ (ঠাকুর) হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় না, ইউরোপ আমেরিকা সহ সব জায়গাতেই দেখেছি ইংরেজিতে তারা লেখে ‘Tagore’ (টেগোর)। ভিনদেশি ভিনভাষী মানুষের কাছে ‘ঠাকুর’ হয়ে গেছে ‘টেগোর’। কিন্তু প্রাগে এই নিয়মের ব্যত্যয় দেখলাম। একেবারে সোজাসুজি তারা লিখেছে বিশুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে। বেদির চারপাশে চেক ভাষায় লেখা আছে বেশ ক’টি বাক্য, যেগুলোর অর্থ আমরা বুঝলামই না। মামুর আমাদের ওই চেক বাক্যগুলো বাংলায় তর্জমা করে বুঝিয়ে দিলো। সে সময় বুঝেছিলাম ঠিকই কিন্তু ক’বছর পর যখন তা লিখতে বসেছি তখন ওই শব্দগুলোর বাংলা অর্থ আর স্মৃতিতে এলো না। বেদিতে উৎকীর্ণ লেখাগুলোর ছবি তুলে রেখেছিলাম, অস্পষ্ট ওই ছবিগুলো আমাদের সংগ্রহে ছিল ঠিকই, তাই ওগুলো বাংলা করার জন্য আবার সেগুলো পাঠাতে হয়েছে মামুরের কাছে।  রবীন্দ্রনাথের নামের বাঁ পাশে লেখা

6.5.1861

BENGALSKY UMELEC

FILOSOF A TEORETIK

7.8.1941

‘৬.৫.১৮৬১

বেঙ্গালস্কি উম্যালেছ

ফিলোজফ আ তেওরেতিক

৭.৮.১৯৪১’

ঠিক এই কথাগুলোর বাঁ পাশেই লেখা

VEDINI NENI

NICIM JINYM NEZ

STALYM SPALOVANIM

OMYLU ABY VYNIKLO

SVETLO PRAVDY

‘বেদিনী নেনী

নিচিম ইনীম নেশ্‌

অমিলু আবি ভিনিক্লো’

বেদিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামের ডান পাশে লেখা

NOSITEL

NOBELOVY CENY

ZA LITERATURU

‘নছিতেল নোবেলভী ছেনী

যা লিতেরাতুরি’

বেদির পেছনে উৎকীর্ণ করা আছে’

KDYZ ZAMKNES

DVERE PRED VSEM

OMYLY, ZUSTANE

ZA NIMI I PRAVDA

‘গিড্ডিস জামক্‌নেশ্‌

ডিভারজে প্রেড্‌ শেম্‌

অমিলী, জুস্তানে

জা নিমি ই প্রাভডা’

রবীন্দ্র ভাস্কর্যের বেদির চারপাশ ঘিরে চেক ভাষায় যে সব বাক্য গুলো উৎকীর্ণ করা ছিল সেগুলো ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম-মৃত্যু-পরিচয় আর নোবেল প্রাপ্তি বিষয়ক তথ্য। সাথে ছিল রবীন্দ্রনাথের লেখার দু’টি উদ্ধৃতি। চেকদের ভালোবাসা আর একাগ্রতার  কমতি ছিল না কোনোখানে কিন্তু তারপরও ভুলতো একটা হয়েই গেল। এই বেদিতে লেখা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৯৬১ সালের মে মাসের ৬ তারিখ কিন্তু তাতো নয়। রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিলো তো ১৯৬১ সালের মে মাসের ৭ তারিখ। চেকরা ভুল করে কবিকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে একদিন আগে।

ঠাকুরোভা পার্কে গুরুদেবের যে ভাস্কর্যের ঠিক সামনে আমরা তখন দাঁড়িয়ে আছি সেটি সেখানে স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিল চেক সরকার এবং এ বিষয়ে তাদের আলোচনা হয় প্রাগের ভারতীয় দূতাবাসের সাথে। তারপর ইন্ডিয়ান G¤^vwm প্রাগের ডেইভিছ্যে জেলা কর্তৃপক্ষের কাছে এই ভাস্কর্যটি উপহার হিসেবে হস্তান্তর করে। ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন ভারতীয় ভাস্কর গৌতম পাল।১০ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাস্কর্যটি এ স্থানে স্থাপন করার বিষয়টিও তাৎপর্যময়। এর পেছনের সত্যটি হলো রবীন্দ্র প্রাগ সফরের সময় wek^we`¨vj‡qi এই জায়গাটিতেই বক্তৃতা করেছিলেন এবং সে বিষয়টি নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যই চেক কর্তৃপক্ষ গুরুদেবের আবক্ষ মূর্তিটি এই এলাকায় স্থাপন করেছে।১১ আমরা যখন ঠাকুরোভা পার্ক এলাকা থেকে বের হই তখন সন্ধ্যা সাতটা পেরিয়ে গেছে। যাবার বেলায় গুরুদেবকে প্রণাম করে বিদায় নেয়ার পালা। সে সময় অনি বললো- বাবা রবীন্দ্রনাথের তো পা’ই দেখা যায় না। প্রণাম করবো কী করে? আবক্ষ মূর্তিতে পা আসবে কোত্থেকে! আর রবীন্দ্রনাথের চরণ যুগল আমাদের দু’চোখে দেখতে হবে কেন? গুরুদেবের সবকিছু তো বাঙালির পাঁজরের মধ্যিখানে।  আমরা চারজন এক সারিতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথকে হাতজোড় করে প্রণাম জানিয়ে গাড়ির দিকে হাঁটি। আমাদের হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা রেখে গেলাম রবীন্দ্রনাথের অদৃশ্য চরণতলে।

‘কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া

তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া....’

শুধু আমরা না, দেশ-বিদেশের সবাই এই ভাস্কর্যের সামনে এসে দাঁড়ায় এই দেবতাতুল্য মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াসে। আমাদের এই পার্কে আসার কিছুদিন আগেই ভারতের রাষ্ট্রপতি  রামনাথ কোবিন্দ আর তাঁর স্ত্রী সবিতা কোবিন্দ রবীন্দ্রনাথের এই ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম আর শ্রদ্ধা জানিয়ে গেছেন। প্রাগের wek^wekÖæZ চার্লস ইউনির্ভাসিটি ক্যাম্পাসের যে স্থানে দাঁড়িয়ে একদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বক্তৃতা করেছিলেন ঠিক ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে ভাষণ দেয়ার সময় রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বলেছিলেন- ‘As I speak here, I feel proud to be at such a great seat of knowledge. It delights me that Rabindranath Tagore, our national poet and one of the greatest sons of India, once came to this very campus and delivered a thought-provoking speech, captivating many’|12 যে পথে রবীন্দ্রনাথ হেঁটেছেন, যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ভাষণ দিয়েছেন আর যে গৃহে তিনি থেকেছেন তা মানুষের জন্য হয়ে গেছে পুণ্য ভূমি।

ঠাকুরোভা পার্ক থেকে মামুরের বাড়িতে যেতে সময় লাগলো মাত্র মিনিট পনের। মামুরের বৌ জেঙ্কা আমাদের জন্য ডিনার সাজিয়ে বসেই ছিলো। জেঙ্কার পুরো নাম জেঙ্কা ভূঁইয়ানোভা লুডভিকোভা। বিয়ে যে নিয়তি নির্ধারিত তা মামুর আর জেঙ্কার সংসার দেখলেই বোঝা যায়, যাকে বলে প্রজাপতি নির্বন্ধ। আর তা-ই যদি না হবে তবে একটা বাংলাদেশি ছেলে কেন প্রাগে মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তার হতে এসে, হয়ে গেল পুরাদস্তুর চেক। দুই ছেলে অ্যাডাম আর ডেভিডকে নিয়ে মহাসুখে ওরা আছে এই শহরে।  আমার সব সময়ই তাই মনে হয় আধুনিক সময়ে মানুষ হয়তো জন্মকে প্রায় সবটুকুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কিন্তু বিয়ে আর মৃত্যু হয়তো এখনো নিয়তি নিয়ন্ত্রিত। মামুরের বাড়িতে ডিনারে আমরা কী কী খাবো সে সব আমরা ঢাকা থেকেই জেনে এসেছি। কারণ আমাদের মামুর সেনাকর্মকর্তা না হলেও তাদের চেয়ে দু কদম বেশি ফর্মাল। প্রাগে থাকা কালীন আমরা কোথায় কোথায় যাবো (ওই ফর্দে ঠাকুরোভার নাম ছিলো না), কী কী দেখবো এমনকি ওর বাড়িতে ডিনারে ও কী কী আমাদের খাওয়াবে তার একটা j¤^v-PIov ফিরিস্তি সে তার বোনের কাছে মেসেজ করে পাঠিয়ে দিয়েছে। ডিনার টেবিলে সাজানোই ছিল কিন্তু মামুর বললো- দাদা আপনাদের ভিয়েনা বাস তো পৌনে একটার সময়, রেস্ট করেন আর গান শোনেন। জেঙ্কার নামটা আমার উচ্চারণ করতে অসুবিধা হচ্ছিল, তাই সে নিজে ইংরেজিতে ওর নামটা ক্যাপিটাল লেটারে আমার ডায়েরিতে লিখে দিলো। যে ডায়েরিতে জেঙ্কা ওর নামটা লিখেছিল ওটা এখনো আমার সংগ্রহে আছে। শুধু নাম না, ও লিখে জানালো ও পেশায় একজন হেমাটোলজিস্ট (রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ)। জেঙ্কা একের পর এক মিউজিক আর চেক গান বাজিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনোটাই আমাকে তেমন আকর্ষণ করে না। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে হলেও মুখে তো আর বলা যাবে না যে, ওই সুর আমার পছন্দ না। যে গানের বাণী আমি বুঝি না, তা আমার ভালো লাগবে কেন? মিউজিকের দিক দিয়ে আমি চরম সেকেলে। রবীন্দ্র-নজরুল-দ্বিজেন্দ্র-গৌরীপ্রসন্ন ঘরানার গান ছাড়া আর অন্য কোনো গানই আমার কান দুটো ধারণ করতে চায় না। অবশ্য শুধু আমি না, এমন রুচির মানুষ পৃথিবীতে আরও অনেক আছেন। এর মধ্যে ¯^qs রবীন্দ্রনাথও আছেন। ১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনা অবস্থানের সময় ল্যাটিন আমেরিকার বিখ্যাত লেখিকা এবং ‘সুর’ সম্পাদক Victoria Ocampo (ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, ১৮৯০-১৯৭৯) রবীন্দ্রনাথকে তিন বিশ্ব সেরা  সংগীতজ্ঞ Claude Debussy (ক্লদ দেবুসি, ফরাসি, ১৮৬২-১৯১৮), Joseph Maurice Ravel  (†Rv‡md মরিস রাভেল, ফরাসি, ১৮৭৫-১৯৩৭) এবং Alexander Porfiryevich Borodin (আলেকজান্ডার পরফিরেভিচ বোরোডিন, রাশিয়া, ১৮৩৩-১৮৮৭)- এই তিনজনের সুর আর গান শোনানোর ব্যবস্থা করেছিলেন কিন্তু সেই সুর রবীন্দ্রনাথের কাছে তেমন ভালো লাগেনি। ফরাসি দুই সংগীতকারের চেয়ে তাঁর কাছে রুশ বোরোডিনের সৃষ্টিকে কম দুর্বোধ্য এবং কম জটিল বলে মনে হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছেন- ‘আমার এই কথা মনে হয় যে, য়ুরোপের গান এবং আমাদের গানের মহল যেন ভিন্ন; ঠিক এক দরজা দিয়া হৃদয়ের একই মহলে যেন তাহারা প্রবেশ করে না’।১৩  তাই প্রায়শ এক ভাষায় রচিত গান অন্য  ভাষাভাষীদের মধ্যে তেমন কোনো শিহরন কিংবা ভাবোচ্ছ্বাসের উন্মেষ না-ও করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ এবং ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছে। ওকাম্পো নিজেই বলেছেন ‘আমাদের পশ্চিমি সংগীত ওঁর কাছে যতটা জড়ানো আর বিন্যাস-বিহীন লেগেছিল, প্রথমবার ওঁর মুখে বাংলা গান শুনে আমারও মনে হয়েছিল ঠিক ততটাই অসহ্য একঘেয়ে। এর থেকে বোঝা যায় যে যতটা ভাবা যায় সংগীতের ভাষা ঠিক ততটা সার্বজনীন নয়’। বিদেশি গান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বেশ কড়া সমালোচনাও আছে। ১৯৪১ সালের ২৩ এপ্রিল রবীন্দ্রনাথ রানী চন্দকে বলেছিলেন ‘এমন অনেক দেশের গান আছে, শুনলে মনে হয় শেয়াল-কুকুরের ঝগড়া। এখানে ভাষার তফাত, রূপের তফাত অনেকখানি দূরত্ব সৃষ্টি করে আছে।’১৪ জেঙ্কা যখন আমাদের আনন্দ দেয়ার জন্য একের পর এক চেক গান আর সুর বাজিয়ে যাচ্ছে তখন আমি এমন একটা ভাব করলাম যেন চেক সুরের আমি নতুন অনুরাগী। এর মধ্যে জেঙ্কা হঠাৎ করেই বললো- এখন যে মিউজিকটা বাজছে সেই সুরকারের সাথে তোমাদের রবীন্দ্রনাথের সখ্য ছিল। ওই কথা শুনেই আমি যেন নড়েচড়ে বসলাম। নাম কী তাঁর? তিনি হলেন চেকোস্ল্লোভাকিয়ার কিংবদন্তি সুরকার ও মিউজিক ডিরেক্টর Leos Janacek (লিওস য়ানাচেক, ১৮৫৪-১৯২৮)। ১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন প্রাগে আসেন সেবার তিনি উঠেছিলেন শহরের ‘হোটেল প্যাসেজ’য়ে।ওই সফরের সময় ১৯ জুন সকালে রবীন্দ্রনাথ কনসার্ট হলে তাঁর রচনা থেকে পাঠ করেন। বিশাল হলে প্রচুর ভিড় হয়। ওই অনুষ্ঠান সম্পর্কে ওই দেশটির জনপ্রিয় ‘Servant Magazine’ তাদের ১১ আগস্ট সংখ্যায় লেখে ‘The largest audience that the poet met throughout his tour was to be seen here.The auditorium of the hall was very large and Rabindranath lectured from a ‘dias’ erected for him alone in the centre of the hall’15 ওই কনসার্ট হলে রবীন্দ্রনাথের আবৃত্তি শুনে য়ানাচেক আপ্লুত হয়ে পড়েন এবং ওই কবিতার শব্দচয়ন আর মেলোডি সম্পর্কে তিনি ‘Lidové Noviny’ পত্রিকার ২৬ জুন সংখ্যায় লিখেন ‘কবি রবীন্দ্রনাথ নিঃশব্দে সভাকক্ষে প্রবেশ করলেন। মনে হলো এক শুভ্র, দিব্য শিখা যেন উপস্থিত বহু সহস্র্র শ্রোতৃমণ্ডলীর মাথার উপরে জ্বলে উঠল।.... তাঁর কবিতা পাঠের প্রথম শব্দেই মনে হলো যেন আমি এক আনন্দসূত্রে গ্রথিত হয়েছি (অশোককুমার মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদ)।১৬,১৭ য়ানাচেক আরো লিখেছিলেন- তিনি সুরের ডানা মেলে দিয়ে প্রত্যেকটি শব্দ উচ্চারণ করছিলেন যেমন আমরা আমাদের গানের ক্ষেত্রে করে থাকি। য়ানাচেক রবীন্দ্রনাথে এতই বুঁদ হয়ে ছিলেন যে, তিনি কবির লেখা ’পরশপাথর’ এর ইংরেজি অনুবাদ ‘The Wandering Madman’ Aej¤^‡b ১৯২২ সালে ঐক্যতানিক কোরাস রচনা করেন যার চেক শিরোনাম- ‘Potulný silenec’| ‘দ্য ওয়ান্ডারিং ম্যাডম্যান’ লিওস য়ানাচেকের জীবনের একটি সেরা কাজ হিসেবে বিবেচিত। দেশে বিদেশে মাসের পর মাস এটি পরিবেশিত হয়েছে।১৬

             ‘খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ পাথর

    মাথায় বৃহৎ জটা                  ধুলায় কাদায় কটা,

              মলিন ছায়ার মতো ক্ষীণ কলেবর।

ওষ্ঠে অধরেতে চাপি                   অন্তরের দ্বার ঝাঁপি

            রাত্রিদিন তীব্র জ্বালা জ্বেলে রাখে চোখে।’

‘A wandering madman was seeking the touchstone,

with matted locks

tawny and dust-laden, and body worn to a shadow, his lips

tight-pressed, like the shut-up doors of his heart, his burning

eyes like the lamp of a glow-worm seeking its mate.’

লিওস য়ানাচেক কতোবড় মাপের সুরকার ছিলেন সে সম্পর্কে আমার অত তখন জানার দরকার ছিল না, আমি শুধু জেনেছি মানুষটি রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন, অর্থাৎ গোত্র বিচারে আমরা এক। শুধু য়ানাচেকই না বিখ্যাত চেক সুরকার JB Foerster (জেবি ফরেস্টার, ১৮৫৯-১৯৫১) ও রবীন্দ্রনাথের কবিতার ছন্দের অনুরাগী হয়ে  উঠেছিলেন এবং তিনি ‘Milostne pisne’ (Love Songs) শিরোনামে গীতিনাট্য নির্মাণ করেছিলেন।৯ য়ানাচেকের সুর শুনতে শুনতেই আমি এগিয়ে যাই মামুর-জেঙ্কার ড্রয়িংরুমের বুক শেলফের দিকে। ওখানে ইংরেজি, চেক আর বাংলা ভাষার নানাবিধ বই ছিল। চেক ভাষা আমি বুঝি না। হঠাৎ করেই জেঙ্কা আমাকে বললো এখানে যে সব বই আছে সেগুলোর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বেশ ক’টি বই আছে যেগুলো অনুবাদ করেছে চেকোস্লোভাকিয়ার লেখকরা। চেক ভাষা আমি বুঝবো কী করে? জেঙ্কা আমাকে একের পর এক রবীন্দ্রনাথের বই দেখায় কিন্তু ওগুলোর কোনো কিছুই আমার কাছে বোধ্য হয় না। আর তা হবেই বা কী করে? যে বিষয় আমার মস্তিষ্কের সন্নিকর্ষ থেকে অনেক দূরে তা চোখে দেখে বোঝার চেষ্টা করা পন্ডশ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ আমি জানি ‘The eye cannot see what the mind does not know. অর্থাৎ মন যা জানে না, চোখ তা দেখে না। ঠিক সে অবস্থাটাই তখন আমার হলো। ওখানে দাঁড়িয়েই আমি জানলাম Vincenc Lesny (ভিনসেন্স লেসনি, ১৮৮২-১৯৫৩) এবং Moriz Winternitz (মরিস উইন্টারনিৎস, ১৮৬৩-১৯৩৭) নামের দু’জন অধ্যাপক রবীন্দ্র সাহিত্যকে চেকোস্লোভাকিয়ায় জনপ্রিয় করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। যদিও এ দু’জন ছাড়া ওই দেশটির আরও অনেকে রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে কাজ করেছেন। আমি আগে অধ্যাপক লেসনি আর অধ্যাপক উইন্টারনিৎসের বিষয়ে তেমন কিছুই জানতাম না। প্রাগ থেকে ফিরে জেনেছি। কোনো এক অজানা কারণে উপমহাদেশের সাহিত্যের প্রতি চেকদের অনুরাগ ছিল আরও অনেক আগে থেকে। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকেই উপমহাদেশের ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে চেকরা উৎসাহী ছিল। চেক পুনর্জাগরণের প্রবাদ পুরুষ ও ভাষাতত্ত্ববিদ Josef Dobrovsky (জোসেফ ডোব্রোভস্কি, ১৭৫৩-১৮২৯) এবং Josef Jungmann  (জোসেফ জুংম্যান, ১৭৭৩-১৮৪৭) চেক লেখকদের সংস্কৃত ভাষা শিখতে পরামর্শ দিতেন এবং তাঁরা নিজেরা এই ভাষা জানতেন। তাঁদেরই পরম্পরায় ভিনসেন্স লেসনি আর মরিস উইন্টারনিৎস চেকোস্লোভাকিয়ার বিভিন্ন wek^we`¨vj‡q রবীন্দ্রসাহিত্যকে পরিচয় করিয়ে দেন। অধ্যাপক লেসনি ছিলেন প্রাগের চেক wek^we`¨vj‡qi সংস্কৃত ভাষা এবং প্রাচ্যবিদ্যার অধ্যাপক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২১ সালে চেকোস্ল্লোভাকিয়া আসার আগেই ১৯১৪ সালে অধ্যাপক ভিনসেন্স লেসনি রবীন্দ্রনাথের বেশ ক’টি কবিতা চেক ভাষায় অনুবাদ করে  ‘Rabindranath Thakur : Ukazky poesie a prosy’ (উকেজি পোয়েজি অ্যা প্রোজি, ১৯১৪) শিরোনামে তা প্রকাশ করেন। প্রফেসর লেসনি প্রথম ইউরোপিয়ান ইন্ডোলজিস্ট (ভারততত্ত্ববিদ) যিনি সরাসরি বাংলা ভাষা থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা চেক ভাষায় অনুবাদ করেন। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশের লেখকরা যারা রবীন্দ্রসাহিত্য তাদের ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন তারা প্রায় সবাই ইংরেজি অনুবাদ থেকে সেটি করেছেন। ১৯৩৭ সালে লেসনি ‘Rabindranath Thakur: Personality and Work’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: পার্সোনালিটি অ্যান্ড ওয়ার্কস) শিরোনামে বই লিখেন। বইটি লেখা হয় চেক ভাষায় এবং লেসনির ওই বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে। লন্ডনের জর্জ অ্যালেন অ্যান্ড আনউইন লিমিটেড থেকে প্রকাশিত বইটি অনুবাদ করেছিলেন গাই ম্যাককীভার ফিলিপস।১৯,২০ অস্ট্রিয়ার অধিবাসী মরিস উইন্টারনিৎস ছিলেন জার্মানদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্টেট ইউনির্ভাসিটির এবং ভিনসেন্স লেসনি ছিলেন চার্লস ইউনির্ভাসিটির অধ্যাপক। রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথমবারের মতো ভিয়েনা থেকে প্রাগে এসেছিলেন সেদিন সকালে এই দুই প্রফেসরই প্রাগ স্টেশনে কবিকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন।৩ ২০ জুন রাতে অধ্যাপক উইন্টারনিৎস রবীন্দ্রনাথকে নৈশভোজে আপ্যায়িত করেন। ওই ডিনারে রবীন্দ্রনাথ দুই অধ্যাপককেই wek^fviZx‡Z অতিথি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানান। তাঁরা দু’জনই wek^fviZx‡Z অধ্যাপনা করে গেছেন। প্রফেসর উইন্টারনিৎস শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন ১৯২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এবং সেখানে শিক্ষকতা করেন ১৯২৪ সালের †m‡Þ¤^i মাস পর্যন্ত। অধ্যাপক লেসনি শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা করতে দু’বার ভারত এসেছিলেন। অধ্যাপক লেসনি wek^fviZx‡Z জার্মান ভাষা শিখাতেন। ২১ভিনসেন্স লেসনির সাথে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত অটুট ছিল।২১ দ্বিতীয়বার ১৯২৬ সালের ৯ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ যখন বার্লিন হয়ে প্রাগ আসেন সে সময়ও ভিনসেন্স লেসনি আর মরিস উইন্টারনিৎসের তত্ত্বাবধানে কবির লেকচার সহ সব কিছু ব্যবস্থা করা হয়। দ্বিতীয় সফরের সময় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে বিখ্যাত অস্ট্রিয়ান সুরকার Alexander von Zemlinsky (আলেকজান্ডার ভন জেমলিনস্কি, ১৮৭১-১৯৪২) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গান চেক ভাষায় গেয়ে শুনিয়েছিলেন। সে সময়  জেমলিনস্কি প্রাগের জার্মান থিয়েটারের মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।২,২২ প্রাগে রবীন্দ্রনাথের প্রতিটি অনুষ্ঠানে উপচেপড়া ভিড় ছিল। রবীন্দ্রনাথের মুখে কবিতা আবৃত্তি শোনার জন্য চেকরা কত উৎসাহী ছিল তার প্রমাণ মেলে ইন্ডিয়ার প্রভাবশালী সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘মডার্ন রিভিউ’র প্রকাশক ও সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় (১৮৬৫-১৯৪৩) এর বয়ানে। ওই সময় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় লীগ অব্‌ নেশনসের আমন্ত্রণে জেনেভা আসেন ও মধ্যয়ুরোপ ভ্রমণকালে কবির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।২৩ ইউরোপে একজন কাথিক এবং আবৃত্তিকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কতটা সফল ছিলেন তা অধিগমন করা যায় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে। তিনি লিখেছেন- ‘His recitations were such that even though the poems recited were in a language not understood by the vast majority of the audience, he had to repeat them several times at their earnest request.’24 এই পৃথিবীতে যত বিরক্তিকর বিষয় আছে তার মধ্যে সবচেয়ে পীড়াদায়ক বিষয়টি হলো, যে ভাষা আপনি বোঝেন না সে ভাষায় দেয়া বক্তৃতা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখমুখ বুজে শুনে যাওয়া। যে মানুষটি আপনার মুখের ভাষা বোঝে না তার সাথে কথা বলতে আপনার কেমন লাগবে? কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ভাষার ওই সীমাবদ্ধতা নিজ গুণে কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। এটি একটি বিশাল কৃতিত্ব। প্রাগে তিনি কবিতা আবৃত্তি করেছেন বাংলা ভাষায় যে ভাষা চেকোস্লোভাকিয়ার সিংহভাগ মানুষ বোঝে না, কিন্তু তারপরও চেকরা একই কবিতা বার বার তাঁকে আবৃত্তি করে শোনাতে অনুরোধ করেছে। চিন্তা করা যায় কতটা MMbPz¤^x হতে পারে একজন মানুষের বাগবৈদদ্ধ্য!

জেঙ্কার সংগ্রহে যে ক’টি রবীন্দ্র সাহিত্যের অনুবাদ গ্রন্থ ছিল তার একটি বই আমি অনেকক্ষণ ধরেই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। বিষয়টা জেঙ্কার নজর এড়ায়নি। আমারও মনে মৃদু ইচ্ছা ছিল চেক ভাষায় অনূদিত অন্তত একটা বই দেশে নিয়ে যেতে। জেঙ্কা হয়তো আমার মনোগত ইচ্ছাটা বুঝতে পারল। ও নিজেই বললো, যদি আমি চাই তবে আমার হাতের বইটা আমাকে সে প্রেজেন্ট করতে পারে। ওই বইয়ের প্রচ্ছদে তিনটি অক্ষর লেখা আছে ইংরেজি ভাষায় কিন্তু বই এর ভিতরে সবটাই চেক ভাষায় অনূদিত। ওই শব্দ তিনটি থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামটা বুঝতে কষ্ট হয় না। অন্য শব্দটা আমার কাছে অজানিত। প্রচ্ছদে লেখা ছিল- ‘Zahradnik’| জেঙ্কা নিজেই বললো ওই শব্দটার উচ্চারণ হলো (জাহারাডনিক) অর্থাৎ যে বাগান করে। আমার আর বুঝতে কষ্ট হলো না যে এটা রবীন্দ্রনাথের ‘মালিনী’র চেক ভাষান্তরের গ্রন্থ। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ নিজেই ১৯১৩ সালে এটির ইংরেজি অনুবাদ করে নাম রেখেছিলেন ‘The Gardener’ (দ্য গার্ডেনার)। ওই বইটি জেঙ্কা আমাকে উপহার হিসেবে দিয়ে দিল এবং বললো এই বইটি অনুবাদ করেছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রাপ্ত প্রখ্যাত চেক লেখক Dusan Zbavitel (ডুসান জবাভিটেল, ১৯২৫-২০১২)। জেঙ্কার দেয়া গিফটের বইটি আমি এখনো আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে সযতনে সংরক্ষণ করে চলছি। এবং প্রাগ থেকে দেশে ফিরে ওই লেখক সম্পর্কে আরো অনেক কিছু জেনেছি। ডুসান জবাভিটেল হলেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতত্ত্ববিদ। তিনি রবীন্দ্রনাথের বেশ ক’টি বই চেক ভাষায় অনুবাদ করেছেন। তিনি ছিলেন অধ্যাপক ভিনসেন্স লেসনির সরাসরি শিষ্য। কিন্তু পরিচিতিতে ছাড়িয়ে গেছেন তাঁর গুরুকেও। অধ্যাপক জবাভিটেল দু’শটিরও বেশি বই লিখেছেন বা অনুবাদ করেছেন। তিনি প্রাগের চার্লস wek^we`¨vj‡qi কলা অনুষদে ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বাংলা ভাষা পড়াতেন। চেকোস্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ছাড়াও তিনি ভারত থেকে ‘পদ্মভূষণ’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপর গবেষণার জন্য ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি লাভ করেন। জবাভিটেল নিজেই বলেছেন তাঁর কাছে বাংলা ভাষাকে চেক ভাষায় অনুবাদের কাজটি ছিলো সহজ বিষয়। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ‘In translating his poetry, one great advantage has been that the structure of the Czech language and the Bengali language is very similar. We have very similar sounds and also the structure of the verbs is very similar. So it is not so difficult to translate it.’25 অর্থাৎ ডুসান জবাভিটেলের কথা অনুযায়ী চেক ভাষার সাথে বাংলা ভাষার কাঠামোগত মিল আছে এবং এই দুই ভাষার উচ্চারণেও অনুরূপতা আছে এবং এ কারণেই তাঁর জন্য চেক ভাষায় রবীন্দ্র সাহিত্য অনুবাদ সহজ হয়েছে। তবে অধ্যাপক জবাভিটেলের এই অভিমতের সাথে আমি সহমত নই। যে ক’দিন আমি প্রাগ শহরে ছিলাম চেক ভাষার উচ্চারণকে আমার কাছে ঈষৎ বিদঘুটে ঠেকেছে।

রাত সাড়ে এগারোটার দিকে মামুরের নজরবন্দিত্ব থেকে ছাড়া পেলাম। মামুরের অতি আতিথ্যে গত তিনদিন বিদেশ ভ্রমণ করলাম, না নজরবন্দি থেকে গেলাম তা আক্ষরিক অর্থেই বলা কঠিন। সে এক মুহূর্তের জন্যেও আমাদের ছেড়ে যায় নি এবং কোনো কিছুই আমাদের ইচ্ছায় চলেনি। কোথায় কোথায় যেতে হবে, কোথায় খেতে হবে, কী কী দেখতে হবে, সবকিছু চলেছে মামুরের ইচ্ছায়। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্যটি হলো- প্রাগ (প্রাহা) এয়ারপোর্টে আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে এসেই মামুর বললো তার দিদির প্রাগ সফরের জন্য সে আগে থেকেই একটা হোমওয়ার্ক করে রেখেছে। মামুরের ওই কথা শুনে মনে হলো আমি যেন রাষ্টীয় অতিথি হয়ে চেক প্রজাতন্ত্রে এসেছি।

রবীন্দ্রনাথ প্রাগে দু’ সফরে থেকেছিলেন অল্প সময় কিন্তু অত্যন্ত ব্যস্ত সময় তিনি পার করেছিলেন এই দেশটিতে। তাঁর প্রাগের ব্যস্ততার দেখা মেলে ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে লেখা চিঠিতে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- কল্যাণীয়াসু- তোর রাখী পেলুম।  কিন্তু বিষম ঘোরে বেড়াচ্চি-কোনো বন্ধন কোথাও ধরে রাখ্‌চে না। অথচ এ’কে মুক্তি বলে না-মন নিষ্কৃতি চাচ্চে তবু গোলেমালে ছুটি কিছুতেই মেলে না। আদর অভ্যর্থনার বিরাম নেই-সংসারে তার মূল্য যথেষ্ট আছে, কিন্তু তার চেয়ে মূল্যবান, শান্তিতে স্থির প্রতিষ্ঠা।২৬ রবীন্দ্রনাথের মতো আমরাও অতি ব্যস্ত সময় কাটিয়ে গেলাম এই প্রাগ শহরে। মামুরের দিক থেকে আদর-অভ্যর্থনার কোনো বিরাম সত্যি ছিল না।

গাড়িতে উঠেই মনে হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬ সালে দ্বিতীয়বার যখন প্রাগ এসেছিলেন সে সময় রবীন্দ্রনাথ রচিত দু’টি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল চেকোস্লোভাকিয়ার ন্যাশনাল থিয়েটারে এবং একটি প্রাগের জার্মান থিয়েটারে।২৫ নিজের লেখা নাটক চেকোস্লোভাকিয়ার মঞ্চে মঞ্চস্থ হওয়ার কথা তিনি পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে চিঠি লিখেও জানিয়েছেন। ১৯২৬ সালের ১২ অক্টোবর তিনি প্রাগ থেকে লিখেছিলেন- কল্যাণীয়াসু বৌমা, প্রাগে এসে বক্তৃতাগুলো চুকিয়ে দিয়েছি। আজ চেক্‌দের থিয়েটারে পোস্ট অফিস অভিনয় হবে, সেখানে গোটাকয়েক বাঙলা কবিতা আবৃত্তি করতে অনুরোধ করেছে। বুধবারে জর্ম্মান থিয়েটারে ঐ নাটকটাই অভিনয় করবে, সেখানে চুপ করে বসে শোনা ছাড়া আমার আর কোনো কর্ত্তব্য নেই।২৭

চেক ন্যাশনাল থিয়েটারের আশপাশে আমরা গতকালও যেয়ে ঘোরাঘুরি করে এসেছি। ভালতাভা নদীর একপাশে ক্যাসেল আরেক পাশে ন্যাশনাল থিয়েটার আর প্রাগের বিস্ময় ডান্সিং হাউজ (যে ভবনের দিকে চাইলেই মনে হয় ইমারতটি যেন সব সময় নর্তকীর মতো নাচছে)। এই স্থাপনাগুলোর মাঝে সংযোগ গড়ে দিয়েছে চার্লস ব্রিজ। গাড়িতে করে মাঝপথে এসে মনে হলো, যে থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথ নিজে বসে নাটক দেখেছেন এবং যেখানে তাঁর রচিত নাটক হয়েছে সেই ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের ছবি তোলা হয়নি। আমাদের বাসে ওঠার সময় তখনও ঢের বাকি, তাই মামুরকে বললাম আমাদেরকে কিছুক্ষণের জন্য ন্যাশনাল থিয়েটার চত্বরে নিয়ে যেতে। ওখানে পৌঁছাতে লাগলো মাত্র মিনিট পাঁচেক। কিন্তু মধ্য রাতে ওই থিয়েটার ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ফটোসেশন করা বেশ কঠিন ছিলো। কারণ দেখে মনে হচ্ছিল কে যেন এই বিশাল থিয়েটার ভবনের উপর হলুদ আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। অনি বার বার চেষ্টা করছিল ওর দাদাকে থিয়েটার ভবনের সামনে দাঁড় করিয়ে ভালো মত কিছু ছবি তুলতে। কিন্তু বার বারই ও মনমত  ছবি তুলতে ব্যর্থ হয়ে বিরক্ত হচ্ছিল। ও এক সময় বললো- বাবা, এই থিয়েটার বিল্ডিংটার ভিতর এতো ঝলকানো আলো যে ছবি জ্বলে যায়। সত্যি চোখ ধাঁধানো হলুদ আলোতে মোড়া ছিল ওই থিয়েটার ভবন, চারপাশে আলোর বন্যা। অতি আলোর জন্য অনিকে নিরাশ হতে দেখে আমি তখন বললাম- মা, আর দেরি করা যাবে না। যা তুলেছ তাতেই চলবে। আর তা ছাড়া যে ভবনে একবার রবীন্দ্রনাথ ঢুকেছেন ওই ভবনের আলো আর কোনো কালেই কমবে না। ওই আলো হলো রবি আলো, যা সুপ্রভ সমুজ্জ্বল থাকবে নিরন্তর। 

তথ্যসূত্র

১.    Czech Painter of India Jaroslav Hnevkovsky.The Embassy of the Czech Republic in New Delhi.https://mzv.gov.cz/newdelhi/en/pr/hnevkovsky.html#

২.     প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রজীবনী, তৃতীয় খণ্ড,১৯১৮-১৯৩৪, পাতা-৮৫-৮৬ ও ২৮৭

৩.    প্রশান্তকুমার পাল। রবিজীবনী, অষ্টম খণ্ড, ১৯২০-১৯২৩, পাতা ১২৩-১২৪।

৪.     Shaju Peter. Finding Tagore in Prague.The Tribune. https://www.tribuneindia.com/news/archive/spectrum/finding-tagore-in-prague-807691/

৫.     প্রতিমা দেবীকে লেখা চিঠি। ১৫ অক্টোবর, ১৯২৬। চিঠি: ৩১, রবীন্দ্রসমগ্র, খণ্ড-২২, পাতা-২২৭, পাঠক সমাবেশ, বাংলাদেশ ২০২০।

৬.    Tagore, Janacek and yoga: Czech-Indian connections over two centuries.https://english.radio.cz/tagore-janacek-and-yoga-czech-indian-connections-over-two-centuries-8802307

৭.     শাকুর মজিদ। প্রাগের ঠাকুরোভা লবণপুরের মোজার্ট। অবসর প্রকাশনা সংস্থা, প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৫, পাতা-৬৬।

৮.    Kalyan Kundu. Rabindranath Tagore and World Peace.Asiatic, Vol. 4, No. 1, June 2010: Page: 77-86.

৯.    David Vaughan.Rabindranath Tagore: an Indian poet who inspired a Czech generation.10/15/2011.https://english.radio.cz/rabindranath-tagore-indian-poet-who-inspired-a-czech-generation-8559768

১০.    Rabindranath Tagore statue in Dejvice city district,prague.

            https://www.flickr.com/photos/127086976@N03/16923440225

১১.   Anirban Saha.Finding Tagore in Germany & Czech Republic. https://www.anirbansaha.com/tagore-germany/

১২.   President Kovind pays tribute to Rabindranath Tagore in Prague.Business Standard.https://www.business-standard.com/article/news-ani/president-kovind-pays-tribute-to-rabindranath-tagore-in-prague-118090900357_1.html

১৩.  জীবনস্মৃতি, ১৯৬২,পৃ-১০৫।

১৪.   রানী চন্দ। আলাপচারি রবীন্দ্রনাথ।  বৈশাখ, ১৩৯০, প্রকাশক-শ্রীজগদিন্দ্র ভৌমিক, wek^fviZx|

১৫.   Servant Magazine,August 11, 1921.

১৬.  Joseph Loewenbach. Leos Janacek and Rabindranath Tagore.,n: Rabindranath Tagore - A Centenary Volume - 1861-1961, pp 159-162 (Radhakrishnan ed.), Publisher: Delhi: Sahitya Academy.

১৭.   Leos Janacek,          Rabindranath Tagore,in: Lidové Noviny, Wednesday 22-6-1921, Publisher: Lidové Noviny.

১৮.   Blanka Knotkova-Capkova.Tagore in Czech Literary Translation: Interpretation and Gender Analysis.Gitanjali & Beyond 2016;1(1):119.DOI:10.14297/gnb.1.1.119-133

১৯.  সমীর সেনগুপ্ত। রবীন্দ্রসূত্রে বিদেশিরা। সাহিত্য সংসদ, ২০১৪, পাতা-৮৭৮।

২০.   Rabindranath Tagore : his personality and work / by V. Lesný ; translated by Guy McKeever Phillips ; with a forward by C.F.Andrews.London : George Allen & Unwin 1939

২১.   সুমিতা চক্রবর্তী. চেক গবেষক ভি.লেসনি লিখিত রবীন্দ্রজীবনী: এক বিদেশি অনুরাগীর রবীন্দ্র-শ্রদ্ধার্ঘ।            file:///C:/Users/USER/Desktop/Prague%20Rabindranath/_Parabaas.Com.+Special+Rabindranath+Tagore+section&oq

২২.   Norman Lebrecht. Alexander von Zemlinsky: Lyric Symphony (Accentus).15 February 2019.https://myscena.org/norman-lebrecht/alexander-von-zemlinsky-lyric-symphony-accentus/#prettyPhoto.

২৩.  সম্পাদকের চিঠি। প্রবাসী, আষাঢ় ও শ্রাবণ, ১৩৩৪।

২৪.   Ramananda Chatterjee, ‘Rabindranath Tagore’, in ‘Tagore Birthday Number’, Visva-Bharati Quarterly Vol. VII, Parts I & II, May-Oct. 1941, 1-30.

২৫.   Translation of “Rabindranath Tagore” into Czech, https://glosbe.com/en/cs/Rabindranath%20Tagore

২৬.  প্রাগ থেকে ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীকে লেখা চিঠি, ৯ অক্টোবর, ১৯২৬। চিঠি : ২৭৪। রবীন্দ্রসমগ্র, খণ্ড-২২, পাতা-৮৭৯, পাঠক সমাবেশ, বাংলাদেশ ২০২০। 

২৭.   প্রতিমা দেবীকে লেখা চিঠি। ১২ অক্টোবর, ১৯২৬। চিঠি: ৩০, রবীন্দ্রসমগ্র, খণ্ড-২২, পাতা-২২৬, পাঠক সমাবেশ, বাংলাদেশ ২০২০।

 

 

 

অনলাইন থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

অনলাইন সর্বাধিক পঠিত

   
Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: news@emanabzamin.com
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status