ঢাকা, ১৯ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

প্রথম পাতা

টাঙ্গাইলে বাসে ডাকাতি-ধর্ষণ

তরুণীর মুখে লোমহর্ষক বর্ণনা

টাঙ্গাইল, ঘাটাইল ও মধুপুর প্রতিনিধি
৫ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার

টাঙ্গাইলে যাত্রীবেশে বাসে উঠে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড় সারা দেশে। এ ঘটনায় জড়িতদের ধরতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে  আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ইতিমধ্যে জড়িত এক চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কাছ থেকে মিলেছে ডাকাতির স্বীকারোক্তি। তাকে নেয়া হয়েছে ৫ দিনের রিমান্ডে। বাসে থাকা যাত্রী ও ধর্ষণের শিকার নারীর জবানিতে মিলেছে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা।  বুধবার সকাল থেকে টাঙ্গাইলের আড়াইশ’ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পুলিশি নিরাপত্তায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ভুক্তভোগী নারী। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ডাকাতরা তিনটি স্থান থেকে বাসে উঠে এবং তাদের একজনের সঙ্গে সিটে বসা নিয়ে তার ও বাসের কন্ডাক্টরের তর্ক হয়। ওই নারী বলেন, ‘আমি কুষ্টিয়ার একটি জায়গা থেকে বাসে উঠি। সিরাজগঞ্জের হোটেলে রাত সাড়ে ১১টায় এসে পৌঁছাই।

বিজ্ঞাপন
খাওয়া-দাওয়া শেষে গাড়ি চলতে শুরু করে। তার পাঁচ মিনিট পরে তিনটা ছেলে বাসে উঠে। তাদের বয়স ২০ থেকে ২২ বছর হবে। এরপর তারা বললো, আমাদের আরও লোক আছে সামনে। সামনে গিয়ে বাসে আরও চারটা লোক উঠে। তার মধ্যে আরেকজন বলে, সামনে আমার আরও লোক আছে। সিরাজগঞ্জের মধ্যে আরও ছয়জন উঠে। তাদের সিট পেছনে দেয়া হয়।’  ভুক্তভোগী নিজেকে একজন পরিবহন শ্রমিকের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বলেন, আমার দুটো সিট। একটা ফাঁকা। 

কোনো নারী পেলে নেবে, নাহলে ফাঁকাই থাকবে। তখন একজন আমার সিটে বসতে গেলে কন্ডাক্টর উঠিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর কন্ডাক্টর এসে আমার ওই সিটে বসে। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে তর্ক হয়। কিছুক্ষণ পরে তিনজন ড্রাইভারের কাছে গিয়ে বলে যে, আমরা নামবো। তারপরেই ড্রাইভারের গলায় চাকু ধরে। তারপর ড্রাইভার ও হেলপারকে তুলে বাসের পেছনের দিকে নিয়ে আটকে রাখে। সঙ্গে সঙ্গে কন্ডাক্টরকেও তুলে নেয়। তারপর যাত্রীদের মধ্যে বেটা ছেলেদের সবাইকে বেঁধে ফেলে। মুখও বেঁধে ফেলে। পরে মেয়েদেরও বেঁধে ফেলতে শুরু করে। টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন সবই কেড়ে নেয়। কারও গহনাও নিয়ে নেয়। তখন আমার কাছে আসে। আমি বাদানুবাদ করায় তারা আমাকে ধর্ষণ করে।  এ বিষয়ে টাঙ্গাইল সদর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক খন্দকার সাদিকুর রহমান বলেন, ‘মেয়েটি হাসপাতালে রয়েছেন। এ ধরনের ক্ষেত্রে মেডিকেল বোর্ড করে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এরই মধ্যে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে।’  এদিকে টাঙ্গাইলের মধুপুরে বাস ডাকাতি ও ধর্ষণের মামলায় মূল হোতা রাজা মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। বৃহস্পতিবার ভোরে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার নিশ্চিত করেছেন। 

তিনি জানান, বুধবার রাতে টাঙ্গাইলের মধুপুর থানায় মামলা হয়েছে। পরে মেয়েটিকে উদ্ধার করে টাঙ্গাইল সদর হাসপাতালে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সুপার জানান, রাজা মিয়া কালিহাতী উপজেলার বল্লা গ্রামের হারুন অর রশিদের ছেলে। সে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো। টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা রুটে ঝটিকা বাসের চালক ছিল সে। পুলিশ সুপার জানান, মধুপুরে বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু হয়েছে। রাতে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। তিনি আরও জানান, অজ্ঞাত ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে।  কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা বাসটিতে নাটোরের বড়াই গ্রামের বাসিন্দা ফল ব্যবসায়ী যাত্রী হাবিবুর রহমান গাড়িতে উঠেন রাত ১০টায়। তিনি নাটোরের তরমুজ চত্বর থেকে বাসে উঠেন। তিনি আমড়া, কাঁঠাল ও তাল বিক্রি করার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। ঈগল পরিবহনে অনেকদিন ধরে নিয়মিত যাতায়াত করা এই যাত্রী বলেন, আমরা বাসে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আমাদের বাসটি সিরাজগঞ্জের কাছাকাছি “দিবারাত্রি হোটেলে” রাতের খাবারের জন্য বিরতি দেয়। 

বাসের অনেকেই ওই হোটেলে খাবার খান। আমিও ওই বাসের সুপারভাইজার রাব্বি ও সহযোগী দুলালের সঙ্গে বসে খাবার খাই। আগে যে চালক বাস চালাতেন, আজ সেই চালক ছিলেন না। কড্ডার মোড়ে আসার পর গেঞ্জি, শার্ট পরা ১০-১২ জন যাত্রী গাড়িতে ওঠেন। তাদের প্রত্যেকেরই পিঠে ব্যাগ ছিল। তারা বাসের খালি সিটগুলোতে বসে পড়েন। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর যাত্রীবেশে ওঠা এই ডাকাত দলের সদস্যরা ঘুমন্ত যাত্রীদের অস্ত্রের মুখে একে একে বেঁধে ফেলে। একই সঙ্গে প্রত্যেক যাত্রীর চোখ ও মুখ বেঁধে জিম্মি করে বাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তারা। এমনকি শিশুদেরও একই কায়দায় বেঁধে রাখে তারা। পরে সব যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল, টাকা, গহনা লুট করে নেয়। তারপর নারী যাত্রীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়।’ হাবিবুর রহমান নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘আমার পাশে বসা নারীকে চার দফায় ধর্ষণ করা হয়েছে বলে আমি অনুধাবন করতে পেরেছি। আমরা অসহায় ছিলাম। হাত, মুখ, চোখ বাঁধা ছিল। কিছুই করতে পারিনি। টানা তিন ঘণ্টা আমরা ওই বাসটিতে জিম্মি ছিলাম। 

বাসটি কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, আমরা কিছুই জানি না। দুর্ঘটনায় শিকার হওয়ার পর আমরা জানতে পারি, টাঙ্গাইলের মধুপুরের রক্তিপাড়া এলাকায় আছি।’ বাসের নারী যাত্রী কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার তারাগুনিয়া গ্রামের শিল্পী বেগম বলেন, ‘আমি আমার অসুস্থ মেয়েকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের সবাইকে হাত, মুখ, চোখ বাইন্দা ডাকাতরা সব লুট কইরা নিছে। আমার স্বামী পিয়ার আলিকে ছুরি দিয়ে আঘাত করছে। আমার কাছ থিকা ৩০ হাজার টাকা নিয়া গেছে।’ ওই বাসে থাকা অন্য নারী যাত্রীরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে তিনি জানান।  বাসের আরেক যাত্রী বেসরকারি চাকরিজীবী নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ জানান, আমি নাটোর থেকে বাড়ি যাচ্ছিলাম অসুস্থ মাকে দেখার জন্য। সঙ্গে ছিল বেতনের ২২ হাজার ৮০০ টাকা। এর মধ্যে ১০০ টাকা রেখে বাকি পুরো টাকাই ডাকাতেরা নিয়ে গেছে।

পাঠকের মতামত

Police will take right step to arrest them with in short time.But the lawyers will make business.

Md.Sohrab Hossain
৫ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ১:৪১ পূর্বাহ্ন

Oder live mara huk.

Baidya
৫ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ১:১৬ পূর্বাহ্ন

All passengers including children are severely traumatised by this incident and they all will have permanent scares in their memories for the rest of their lives. My request to all Authorities is that they must ensure that justice is done punish the criminals and all victims get proper and adequate helps to overcome their trauma.

Nazmul
৪ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ৬:৫৮ অপরাহ্ন

বিএনপি নেতাকর্মীরা যদি গুম,খুন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হতে পারেন, তাহলে এই ধর্ষকদের বাঁচিয়ে রেখে কি লাভ।

Shwapnohin
৪ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১২:১৪ অপরাহ্ন

মধ্য রাত ডাকাতদের একজন চালকের আসনে বসে গাড়ীর নিয়ন্ত্রণ নেয়। ডাকাতদলের বাকী সদস্যরা লুটপাট ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। ডাকাত দলের নেতা ২/৩ ঘন্টা গাড়িটির সঠিক নিয়ন্ত্রণ রাখলেও অবশেষে গতি হারিয়ে বালুতে আটকে যায়। ডাকাতরা যতই শক্তিশালী ও দক্ষ হোক না কেন তাদের তাাদের দাপট চিরস্থায়ী নয়। টাঙ্গাইলের ডাকাতদের কৌশল ও পরিনতির সাথে অন্য আরেকটি মধ্য রাতের ডাকাতির মিল চোখে ভেসে ওঠে।

ইয়াসীন খান
৪ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১১:৪৮ পূর্বাহ্ন

দায়ী ডাকাত দল চিহ্নিত করে ওদের ক্রস ফায়ার এর মাধ্যমে মেরে ফেলা হউক

Md Yeasin Ali
৪ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার, ১১:৪১ পূর্বাহ্ন

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

প্রথম পাতা থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status