ঢাকা, ২০ জুলাই ২০২৪, শনিবার, ৫ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৩ মহরম ১৪৪৬ হিঃ

শেষের পাতা

মৌলভীবাজারের বন্যার্তরা সংকটে

ইমাদ উদ দীন, মৌলভীবাজার থেকে
২২ জুন ২০২৪, শনিবারmzamin

বন্যা আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে। গিলে খেয়েছে আমাদের ঘরবাড়ি, ক্ষেত কৃষি ও খামার। এখন আয়-উপার্জনও নেই। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। এই চরম দুর্ভোগের চলমান সময়ে খাওয়া-বাঁচা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা। সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগের ত্রাণ সহায়তাই একমাত্র ভরসা। কিন্তু গেল ৩-৪ দিনেও মেলেনি ত্রাণ সহায়তা। কোনো কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারি তরফে অল্প পরিমাণে ত্রাণ পৌঁছালেও জেলার ৭টি উপজেলায় অনেক আশ্রয়কেন্দ্র ও অন্যত্র থাকা বন্যার্ত মানুষজন এখনো পাননি কোনো ত্রাণ। 

এদিকে যারা সরকারি ত্রাণ হিসেবে চাল, শুকনো কিংবা রান্না করা খাবার পেয়েছেন তাও চাহিদার তুলনায় একেবারেই কম। আশ্রয়কেন্দ্রে ও সড়কের পাশে অথবা নিজ বাড়ির উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়া হতদরিদ্র বানভাসি লোকজন অর্ধহারে অনাহারে অনেকটাই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অসহায়।

বিজ্ঞাপন
বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যোগে অল্প পরিমাণ শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হলেও তা খুবই অপ্রতুল বলে জানাচ্ছেন বন্যাদুর্গতরা। জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার হাকালুকি হাওর তীরের গ্রামগুলোর বন্যাকবলিত অনেক মানুষই তাদের গবাদিপশু ও আসবাবপত্র আশ্রয়কেন্দ্রসহ অন্যত্র সরিয়ে নিলেও এখনো তারা নিজ বসতঘরে চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। অনেকেই আবার আশ্রয়কেন্দ্র বা অন্যত্র আশ্রয় না নিয়ে নিজের বসতভিটায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অবস্থান করছেন। 

তারা জানান, ত্রাণের আশায় প্রতিদিনই অপেক্ষায় থাকেন কিন্তু দিনশেষে তারা আশাহত হচ্ছেন। তারা অভিযোগ করে বলছেন এমন দুর্দিনে তারা এখনো সরকারি ত্রাণ সহায়তা পাননি। ব্যক্তি, বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ হলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল হওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়েছেন দুর্গতরা। জেলার ৭টি উপজেলার হাওর ও নদী তীরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তরাসহ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হাকালুকি হাওর তীরের ভূকশিমইল, জয়চণ্ডি, কাদিপুর, জায়ফরনগর, পশ্চিম জুড়ী, ভাটেরা ও বরমচাল, তালিমপুর ইউনিয়নের একাধিক গ্রামের বন্যাকবলিতরা দীর্ঘ অপেক্ষার পরও সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় চরম হতাশ। এ ছাড়াও জেলার অন্যান্য উপজেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে আলাপে তারাও এমনটিই জানান। 
বানভাসিরা জানান, চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। খুচরা বাজারে কোনো চালই কেজি প্রতি ৫০ থেকে ৬০ টাকার কম নেই। প্রতিদিনই ১০-১২ সদস্যের পরিবারে ৩-৪ কেজি চালের প্রয়োজন। এ ছাড়া অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস তো রয়েছেই। এই সময়ে ক্ষেত কৃষি না থাকায় নেই আয় রোজগারও। বন্যায় সর্বস্বান্ত কৃষক, মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ বন্যায় পড়েছেন মহাবিপাকে। খাদ্য ও বাসস্থান সংকটে ইতিমধ্যে যাদের গবাদিপশু আছে সেগুলোও তারা অনেকটা কমমূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছেন। বেঁচে থাকার সব উপকরণ হারিয়ে এখন তারা অসহায়। আশ্রয়কেন্দ্র থাকা বন্যার্তরা জানান, তারা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সমস্যায় ভুগছেন। তারা অভিযোগ করে বলেন, অপরিকল্পিতভাবে হাওর তীরের অধিকাংশ বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর নিচ তলায় শৌচাগার ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা থাকায় তা বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাদের চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে। অনুরূপ বাড়িতে, সড়কে বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নেয়া বন্যাকবলিত লোকজনও এই সমস্যায় ভুগছেন। 

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জেলা কার্যালয় ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জেলার নদী ও হাওর এলাকায় পানি কিছুটা কমলেও জেলার কোনো কোনো নদী এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বন্যাদুর্গতরা বলছেন, বানের পানি সহসা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং তা দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় রূপ নেয়ার আশঙ্কা তাদের। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলার ৭টি উপজেলায় বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ২ শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য সেবার জন্য ইউনিয়ন ভিত্তিক মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে শুকনো খাবার ২৫শ’ প্যাকেট, ১২শ’ প্যাকেট রান্না করা খাবার, ৬৫ হাজার পানি বিশুদ্ধ করণ ট্যাবলেট, ২৫শ’টি খাবার স্যালাইন সরবরাহ করা হয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেও ওই উপজেলায় এ রকম ত্রাণসমাগ্রীও বিতরণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় সদর উপজেলায় বানের পানিতে ডুবে ১ শিশু ও ১ কিশোর মারা গেছে। বড়লেখা উপজেলায় বানের পানিতে ডুবে ১ জন মেয়ে শিশু মারা গেছে। 

জানা যায়, বন্যার্ত সার্বিক সহায়তায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে কনট্রোলরুম খোলা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। জেলার অসহায় হতদরিদ্র বানভাসি মানুষ সরকারি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও রাজনৈতিক সংগঠন, বিভিন্ন সংস্থা, পেশাজীবী সংগঠনসহ দেশ ও প্রবাসের বিত্তবানদের কাছে অতীতের মতো তাদের চলমান এই কঠিন দুর্যোগে সার্বিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর আকুল আবেদন জানান। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ড. ঊর্মি বিনতে সালাম মানবজমিনকে জানান জেলার ৭টি উপজেলায় বন্যার্ত মানুষের কাছে চাল, শুকনো খাবার, স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ বরাদ্দকৃত সরকারি ত্রাণ সহায়তা ধাপে ধাপে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বন্যাকবলিত হাওর এলাকার দুর্গম গ্রামগুলোতে ত্রাণ পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হলেও আগামীকালের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছাবে। জেলা প্রশাসন থেকে বিষয়টি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে।

 

 

শেষের পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status