ঢাকা, ১৫ জুলাই ২০২৪, সোমবার, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ মহরম ১৪৪৬ হিঃ

শেষের পাতা

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র কমিটি বিলুপ্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

জালাল রুমি, চট্টগ্রাম থেকে
১৫ জুন ২০২৪, শনিবারmzamin

চট্টগ্রাম মহানগর ও উত্তর জেলা বিএনপি’র কমিটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে বলে কয়েকদিন ধরে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। এরমধ্যে সেই গুঞ্জনের কিছুটা সত্যি হয়েছে। মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত  ঘোষণা করা হয়েছে। মধ্যরাতে এক প্রেস রিলিজের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই কমিটি বিলুপ্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন  এখানকার নেতাকর্মীরা। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টায় কেন্দ্রীয় বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে  চট্টগ্রাম মহানগরসহ মোট ৪টি ইউনিটের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে নগর বিএনপি’র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ইদ্রিস আলী মানবজমিনকে বলেন, এখানে কাউকে বাদ দেয়া হয়নি। দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কেন্দ্র আমাদের এই আংশিক কমিটি বিলুপ্ত করেছেন। ইনশাআল্লাহ্‌ শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।

গত ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর অনেকটা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে চট্টগ্রামের  বিএনপি’র নেতাকর্মীরা। গা-ঢাকা দেন অধিকাংশ সিনিয়র নেতা। এরমধ্যে গত রমজানে বড় পরিসরে ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে নির্বাচনের পর প্রকাশ্যে আসে তারা।

বিজ্ঞাপন
নির্বাচন-পূর্ব আন্দোলন সংগ্রামে কোনো হদিস না থাকা নেতাদেরও প্রায় সবাই ছিলেন সেই প্রোগ্রামে। এছাড়া গত মাসে কয়েকটি প্রোগ্রাম করে নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার চেষ্টা করে আহ্বায়ক শাহাদাত ও সদস্য সচিব বক্করের নেতৃত্বাধীন কমিটি।
এদিকে হঠাৎ কমিটি বিলুপ্তি নিয়ে চলছে নানা গুঞ্জন। একপক্ষ বলছে,  এই কমিটিকে বাদ দেয়া গত নির্বাচনের আগেই দরকার ছিল। আরেক পক্ষ বলছে, এটি দলের পুনর্গঠনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে একটি অংশের দাবি, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র রাজনীতিতে এই মুহূর্তে শাহাদাত- বক্করের বিকল্প নেই।

বিষয়টি নিয়ে মহানগর কৃষকদলের আহ্বায়ক কমিটির ১ নম্বর সদস্য আজম খান বলেন, কমিটি গঠন বা বিলুপ্তি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক অংশ। কমিটি গঠনের তৎপরতায় তৃণমূল উজ্জীবিত হয়। আর তৃণমূলের  নেতাকর্মীরা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর যোগ্য নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ আছে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
মহানগর বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ এরশাদ উল্লাহ বলেন, কমিটি বিলুপ্তি ও নতুন কমিটি গঠন দলের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। আমাদের নেতা তারেক রহমান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আশা করি অতি শিগগিরই আমরা একটা ডাইনামিক নেতৃত্ব পাবো।

২০০৯ সালের ২০শে ডিসেম্বর  মহানগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক হওয়ার মাধ্যমে সবার নজরে আসেন ডা. শাহাদাত। সেই কমিটির সভাপতি ছিলেন স্থায়ী কমিটির বর্তমান সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ২০১৬ সালের ৬ই আগস্ট  শাহাদাতকে সভাপতি ও নগর যুবদলের সাবেক সভাপতি আবুল হাশেম বক্করকে সদস্য সচিব করা হয়। এদের দু’জনই  বর্ষীয়ান বিএনপি নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমানের অনুসারী বলে পরিচিত। যদিও নেতৃত্বে আসার পর থেকে শাহাদাত হোসেন গ্রুপিং রাজনীতিতে থেকে সরে আসেন। এক সময় বেশ কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত থাকা চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র নেতাকর্মীদের একই ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কর্মী-বান্ধব বলে পরিচিত ডা. শাহাদাত তৃণমূলে বেশ জনপ্রিয়। নেতাকর্মীদের বিপদ-আপদে এগিয়ে আসার কারণে দলের ভেতরে শক্তিশালী অবস্থানও রয়েছে তার। আর সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্করের আছে নিজস্ব একটি শক্তিশালী বলয়। যদিও গত ২৮শে অক্টোবরের পর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত কোনো মিছিল-মিটিংয়ে দেখা যায়নি তাকে। আহ্বায়ক ডা. শাহাদাতকেও প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি তখন।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক মহানগর বিএনপি’র এক যুগ্ম আহ্বায়ক মানবজমিনকে বলেন, ‘দলে শাহাদাত বক্কর ভাইয়ের ভূমিকা আছে ঠিক। তবে দীর্ঘদিন স্টিয়ারিংয়ে থেকেও তারা নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেননি। থানা -ওয়ার্ড কমিটি দিতে পারেননি। বিশেষ করে গত নির্বাচন পূর্ববর্তী আন্দোলন-সংগ্রামে উনাদেরকে প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। মহানগর যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সঙ্গে উনাদের সমন্বয় নেই। যেটার কারণে চট্টগ্রামে শক্তিশালী আন্দোলন হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে  আমাদের নেতা তারেক রহমান এই কমিটির উপর বিরক্ত ছিল। এই ধরেন, এই রমজানে ছোটখাটো শাখার ইফতারেও তিনি জুমে জয়েন করেছিলেন। কিন্তু চট্টগ্রাম মহানগরের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ শাখার ইফতারে তিনি থাকেননি।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে  আহ্বায়ক কমিটির আরেকজন সদস্য বলেন, ‘সমন্বয়হীনতার জন্য তো শাহাদাত -বক্কর ভাই দায়ী নয়। এটার জন্য দায়ী কেন্দ্রের কয়েকজন ক্ষমতালোভী নেতা। এই ধরেন, মীর হেলাল সাহেব। তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নাম বেচে ইদানীং এখানে গ্রুপিং করছেন। মহানগর ছাত্রদলের সেক্রেটারি, যুবদলের সভাপতি-সেক্রেটারি, স্বেচ্ছাসেবকদলের সেক্রেটারি উনিই সিস্টেমে দিয়েছেন। তাদেরকে তিনি (মীর হেলাল) নগর কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করতে দেননি। আর ছাত্রদলের সভাপতি ও স্বেচ্ছাসেবকদলের সভাপতিও অন্য একজন সিনিয়র নেতার অনুসারী।  যে কারণে তারা আন্দোলনে  মূল সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে ওইভাবে ভূমিকা রাখতে পারেননি।’

তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম নগরে বিএনপি’র রাজনীতিতে  শাহাদাত ভাইয়ের বিকল্প কেউ আছেন বলে মনে হয় না। বিশেষ করে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য যে আর্থিক ব্যাপার আছে, সেগুলোতে এই মুহূর্তে  তিনি ছাড়া অন্য কেউ ভূমিকা রাখতে পারবেন না। সবাই তাকিয়ে থাকেন শাহাদাত ভাইয়ের দিকে। এই ধরেন- একটা ব্যানার লাগবে, সেটার টাকাও শাহাদাত  ভাইকে দিতে হয়। এই হলো আমাদের অবস্থা।’

মহানগর বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলাম বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান ভেবে-চিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে এটা বলে রাখি, দলের এই দুঃসময়ে শাহাদাত ভাইকে আমাদের খুব প্রয়োজন। আর কমিটি বিলুপ্ত হওয়া মানে উনাদেরকে বাদ দিয়ে দেয়া না।

এদিকে বিএনপি’র সঙ্গে সমন্বয়হীনতার বিষয়ে জানতে চাইলে নগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল আলম বলেন, এই অভিযোগটা সত্য নয়। বিএনপি আমাদের অভিভাবক সংগঠন। উনাদের সঙ্গে সমন্বয় করেই আমরা কাজ করি। গত সরকার পতনের আন্দোলনেও ভ্যানগার্ড হিসেবে আমরা সামনের সারিতে ছিলাম।

মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেন দীপ্তি বলেন, ‘কমিটি বিলুপ্তি একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। দল পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে আমাদের নেতা তারেক রহমান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এখানে কাউকে ফেলে দেয়া বা কাউকে পেছন থেকে গ্রেস দিয়ে  তোলার বিষয় নেই। দলের খারাপ সময়ে যারা মাঠে আছেন, তাদেরকে নিয়েই আশা করি নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে।’

এদিকে দলের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যে মহানগর বিএনপি’র নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সদস্য সচিব আবুল হাশেম বক্কর, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক  শিল্পপতি এরশাদ উল্লাহ, সাইফুল আলম, সাবেক ছাত্রনেতা নাজিমুর রহমান ও নগর যুবদলের আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেন দীপ্তি- এই ৫ জনের মধ্য থেকেই নতুন সভাপতি- সেক্রেটারি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সদ্য  বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেনকে কেন্দ্রীয় কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হবে।

শেষের পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status