ঢাকা, ১৮ মে ২০২৪, শনিবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ জিলক্বদ ১৪৪৫ হিঃ

শেষের পাতা

বেইলি রোড ট্র্যাজেডি

‘আগুন লাগা বিল্ডিং ছাড়া সবই স্বাভাবিক’

স্টাফ রিপোর্টার
২০ এপ্রিল ২০২৪, শনিবার
mzamin

আগুন লাগার পর কয়েকদিন একটু থমথমে ছিল পরিস্থিতি। এখন সবই স্বাভাবিক। যে বিল্ডিংয়ে আগুন লেগে এত মানুষ মারা গেল, এর সঙ্গেই লাগানো বিল্ডিংয়ের রেস্টুরেন্টে মানুষ দিব্যি খাচ্ছে। শুধুমাত্র আগুনে পোড়া কোজি কটেজটাই পড়ে আছে।’ গতকাল বেইলি রোডের গ্রিন কোজি   কটেজের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন পাশের ভবনের নিরাপত্তাকর্মী মো. নাসিরুদ্দিন। পুড়ে যাওয়া কোজি কটেজ ভবন দেখিয়ে তিনি বলেন, যখন এই ভবনে আগুন লাগে তখন আমি এখানেই ছিলাম। আমাদের ভবনে আগুন যেন না লাগে এই জন্য পানির পাইপ দিয়ে বারবার ভবনটি ভিজিয়ে রাখছিলাম। আমাদের ম্যানেজারই প্রথম বিদ্যুৎ অফিসে ফোন দিয়ে কারেন্ট বন্ধ করতে বলেন। এরপর ফুটপাথের নিচের গ্যাসের লাইনও বন্ধ করে দিই আমরা। আগুন যখন কম ছিল তখন আমাদের মই ব্যবহার করে কয়েকজনকে নিচেও নামিয়েছিলাম। কিন্তু আগুন বেড়ে যাওয়ায় পরে আর তা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ঈদের আগে পর্যন্ত এই এলাকায় একটা গুমট ভাব ছিল। কিন্তু এখন আর সে ভাব নেই। আগুন লাগা ভবন ছাড়া সবই স্বাভাবিক।  এর আগে ২৯শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের নিচতলায় চা-কফির দোকান চুমুক রেস্তরাঁয় আগুন লাগে। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পরে পুরো ভবনে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে আসলেও রাতভর একের পর এক লাশ আসতে থাকে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। 

রাত ৯টায় আগুন লাগলেও পরদিন সকাল পর্যন্ত ৪৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়। যাদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী ও শিশু। এই ঘটনায় দোষীদের শাস্তি দিতে মামলা হয় রমনা থানায়। এ ছাড়াও  রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ  (রাজউক) ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এসব বিষয়ে খোঁজ নিতে গতকাল বেইলি রোড এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আগুনে পোড়া গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের সামনে বেরিকেড দেয়া রয়েছে, যেন কেউ ভবনটিতে প্রবেশ করতে না পারে। আর ভবনটির নিরাপত্তার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন পুলিশ সদস্যরা। রাস্তায় নো পার্কিং এর বোর্ড লাগানো। তবে ওই নো পার্কি এর সামনেই গাড়ি পার্ক করে আশেপাশের ভবনের রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে যাচ্ছে মানুষ। সরজমিন দেখা গেছে, আগুন লাগা গ্রিন কোজি কটেজের সঙ্গেই লাগোয়া গোল্ড প্লেস নামক চৌদ্দতলা ভবন। ভবন দুটির মাঝে কয়েক ফিটের দূরত্ব। ওই ভবনটির নিচতলা থেকে ৬ষ্ঠ তলা পর্যন্ত রয়েছে কেএফসি, পিজ্জাহাট, সিকরেট রেসিপি, থার্টি-৩ রেস্টুরেন্ট, বেকার স্টরি, পিটা অ্যান্ড বার্গার ক্যাফে, দোসা এক্সপ্রেস, মোভিনপিকসহ একাধিক খাবারের দোকান। গ্রিন কোজি কটেজে আগুনে পুড়ে ৪৬ জন মারা গেলেও গোল্ড প্লেস ভবনের এই রেস্টুরেন্টগুলোতে মানুষের বিচরণ থেমে নেই। আগের মতোই মানুষ সেখানে খাবার খেতে যাচ্ছেন। খাবার খেয়ে কেউ আবার পোড়া ভবনের ছবি তুলে দিব্যি চলে যাচ্ছেন গন্তব্যে। কোজি কটেজের ঠিক সামনেই নাভানা বেইলি স্টার ভবন। সেখানে বুমার্স ক্যাফে নামে খাবার দোকানসহ শাড়ি-কাপড়, কসমেটিকের একাধিক দোকান।

 সেখানেও মানুষ সাভাবিকভাবেই চলাফেরা করছেন। এ ছাড়া কোজি কটেজের পাশের সুইস নামে খাবারের দোকান, ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টারের ডমিনো’স পিজ্জা, সাব-জিরো, বেইলি ডেলি, রাস্তার উল্টোপাশের ক্যাফে জেলাটেরিয়া, বার্গার এক্সপ্রেস, সেটিয়েট, ওয়াসিস ক্যাফে অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, আল খাব্বাস, ওয়ান ফুড অ্যান্ড পেস্ট্রি, হট কেক, সুলতান’স ডাইন সবই আগের মতো চিরচেনা রূপে ফিরে এসেছে।  এদিকে বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া রমনা থানার মামলা বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। অপরদিকে গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গঠন করা পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গত সপ্তাহে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- ভবনের নিচতলার ‘চুমুক’ নামের চা-কফির দোকানের ইলেকট্রিক চুলায় বৈদ্যুতিক গোলযোগ (শর্ট সার্কিট) থেকে আগুনের সূত্রপাত। সেখানে গ্যাস সিলিন্ডারের লাইনের ছিদ্র থেকে বের হওয়া গ্যাসের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ভবনে জরুরি বহির্গমন সিঁড়ি না থাকায় মানুষ চেষ্টা করেও বের হতে পারেনি। 

ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি বলেছে, বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য রাজউক ভবনের নকশা অনুমোদন করলেও এতে রেস্তরাঁ ব্যবসা করার অনুমতি ছিল না। কিন্তু ভবনের বেজমেন্ট (গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান) ছাড়া সব কটি তলায় ছিল রেস্তরাঁ। এতে ভবনটিতে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, সে অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। ভবনের অগ্নিনিরাপত্তার পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়নি। পুরো ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে (তলা), সিঁড়িতে একের পর এক গ্যাস সিলিন্ডার রাখা হয়েছিল। এমনকি বিভিন্ন রেস্তরাঁর ক্যাশ কাউন্টারের পাশেও রাখা ছিল গ্যাস সিলিন্ডার। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ভবনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসেরও ব্যবস্থা ছিল না। যে কারণে আগুন লাগার পর আটকা পড়ে অনেকের মৃত্যু হয়। আর এ ঘটনায় গত ২৭শে মার্চ পৃথক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি। 

তারা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, কোনো ভবন ব্যবহার করার আগে রাজউকের কাছ থেকে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট নেয়া বাধ্যতামূলক। এর কারণ, রাজউকের অনুমোদন নিয়ে নির্মাণের পরও ব্যবহারবিধি সঠিকভাবে না মানলে একটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আগুনে পুড়ে যাওয়া আটতলা গ্রিন কোজি কটেজ ভবনের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বা ব্যবহার সনদ কোনোটাই ছিল না। ব্যবহার সনদ ছাড়াই ১১ বছর ধরে ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছিল। এ ছাড়া ব্যবহার সনদ না থাকা সত্ত্বেও ওই ভবনের পাঁচটি রেস্তরাঁকে ব্যবসা করার অনুমতি (ট্রেড লাইসেন্স) দিয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ভবনের একটি রেস্তরাঁকে অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত সনদ দিয়েছিল। এ ধরনের অনুমতি দেয়ার আগে রাজউক অনুমোদিত নকশা ও ব্যবহার সনদ বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পুরো ঘটনার জন্য ভবন মালিক ও রেস্তরাঁ মালিকদের দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে বলে সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

শেষের পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status