ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৩ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

প্রথম পাতা

পানিতে ভাসছে লাশ, ২২ জনের মৃত্যু

সিলেটে আর্তনাদ

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে
২২ জুন ২০২২, বুধবার

জৈন্তাপুরের ছাতাইর খাঁ হাওরের দুর্গম আমিরাবাদ গ্রাম। পানিবন্দি মেয়েকে স্বামীর বাড়িতে দেখতে গিয়েছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব নাজমুন্নেছা। সঙ্গে চৌদ্দ বছরের ছেলে আব্দুর রহমান। শুক্রবার বিকালে মেয়েকে দেখে ফিরছিলেন মোহালীপাড়া বাড়িতে। হাওরের পাশ দিয়ে রাস্তার উপর তখন প্রবল ঢল। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিলো। ঢলের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করলেন নাজমুন্নেছা। ছেলে আব্দুর রহমানসহ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল প্রলয়ঙ্করী ঢল। বিদ্যুৎ ছিল না এলাকায়। নেটওয়ার্কও নেই।

বিজ্ঞাপন
কেউ জানে না সে খবর। গতকাল সকালে হাওরে ভাসতে দেখা যায় দুটি লাশ। একটি নাজমুন্নেছার।  অন্যটি ছেলে আব্দুর রহমানের। শুধু নাজমুন্নেছা ও তার ছেলে আব্দুর রহমান নয়; এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে গত পাঁচ দিন। একেকটি গল্প হৃদয়বিদারক। বেদনাদায়ক। আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে বন্যাদুর্গত এলাকা। গত চার দিনে কেউ এসব খবরের সন্ধান করতে পারেনি। কী ঘটেছিলো কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, সিলেট সদর ও জৈন্তাপুরে- সেসব ঘটনা অজানাই ছিল।

 পানি কমতে শুরু করেছে। আর বানের স্রোতে তলিয়ে যাওয়া হতভাগা মানুষের লাশ ভাসছে। কারও লাশ হাওরে, আবার কারও লাশ খালের পানিতে। হাজার হাজার গবাদি পশুও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে প্রলয়ঙ্করী বন্যা। গতকাল থেকে খবর আসছে। ভয়ঙ্কর সেসব ঘটনাও মানুষের মধ্যে জানাজানি হচ্ছে। জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল আহমদ জানিয়েছেন- ‘কে কার খবর নিবে। সবার তো নাফসি নাফসি। কেয়ামতের মতো ঘটনা ঘটে গেছে। মা ও ছেলে ভেসে গিয়েছিলেন গত শুক্রবার বিকালে। আর আমরা জানলাম গতকাল সকালে। জানি না এ ধরনের ঘটনা আরও আছে কিনা, জানি না। খবর নেয়া হচ্ছে।’ কোম্পানীগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা বিল্লাল আহমদ জানিয়েছেন- ‘চোখের সামনে মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যেতে দেখেছি। শত শত গবাদি পশুও ভেসে গেছে। স্রোত এতটাই প্রবল ছিল; কাছাকাছি যা পেয়েছে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। শুধু যে নদী দিয়ে স্রোত গেছে তা নয়, মানুষের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটের উপর দিয়েও প্রবল বেগে স্রোত গেছে।’ সিলেটের ছাত্রলীগ নেতা আবুল কাশেম। বসবাস করতেন মদিনা মার্কেটে। গত শুক্রবার ঢলের পর সবাই পানিবন্দি। কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাড়িতে দাদি ছুরেতুন্নেছা ও চাচাতো বোন আটকা পড়েছে। খবর পেয়ে শনিবার কাশেম ছুটে যান বাড়িতে।

 গিয়ে দাদি ও বোনকে উদ্ধার করে নৌকায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে আল ইমদাদ একাডেমির সামনে আসা মাত্র তীব্র স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাদের নৌকা। পরে দাদি ছুরেতুন্নেছা ও আবুল কাশেমের মরদেহ পাওয়া যায়। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সেলিম আহমদ জানিয়েছেন- লাশ দুটি উদ্ধার করে দাফন করা হয়েছে। জগন্নাথপুরের হাওর এলাকা। গত সোমবার সেখানে মিললো কাফনবন্দি একটি লাশ। স্থানীয়রা সেই লাশ উদ্ধার করে দাফন করেছেন। হাওরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন- সবখানেই পানি। লাশ দাফনের জায়গায় নেই। এ কারণে হয়তো কেউ ভাসিয়ে দিয়েছিলো। পরে এলাকার লোকজন লাশ উদ্ধার করে দাফন করেছেন। গত শুক্রবার দুপুরে বিশ্বনাথের দশঘর ইউনিয়নের বাইশঘর গ্রামের মতছিন আলীর স্ত্রী লিমা বেগম ও তার বোন সীমা বেগমকে নৌকা করে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছিলেন। পথিমধ্যে তীব্র স্রোতের মধ্যে নৌকা ডুবে যায়। স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে যায় লিমা ও সীমাকে। বিকালে পার্শ্ববর্তী খালে তাদের মরদেহ পাওয়া যায়। সিলেটে গত বৃহস্পতিবার রাত, শুক্রবার, শনিবার ও রোববার ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছে উজানের ঢল। ডুবে যায় মানুষের ঘরবাড়ি। 

গত বৃহস্পতিবার রাতেই পানিবন্দি মানুষ। শুক্রবার থেকে শুরু হয় বাঁচার সংগ্রাম। নিরাপদে পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকেই হয়েছেন নিখোঁজ। চার দিনেও তার খবর মেলেনি। অবশেষে সোম ও মঙ্গলবার থেকে লাশ ভাসতে দেখা গেছে। এতে করে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। এমন ঘটনা বিগত ১০০ বছরেও ঘটেনি সিলেটে। এমন মানবিক বিপর্যয় হয়নি কখনো। কানাইঘাটের ঠাকুরের মাটি হাওরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন স্থানীয় এক বাসিন্দা। ফেরার পথে ঢল তাকে ভাসিয়ে নেয়। গতকাল মিলেছে লাশ। কানাইঘাটের ওসি তাজুল ইসলাম লাশ উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন। সিলেট সদরে ঢলের তোড়ে দু’জন ভেসে গেছে। আব্দুল হাদি নামে এক ছাত্র পানিতে ভেসে যাওয়ার পর তার লাশ পাওয়া গেছে। ইউএনও নুসরাত আজমেরী হক জানিয়েছেন- একজনের লাশ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজন মারা গেছে। গতকাল বিকাল পর্যন্ত সিলেটে বন্যায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায়ই সংখ্যা বেশি। সিলেটে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া- সুনামগঞ্জে ৫ জনের ও মৌলভীবাজারে দুইজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। 

তবে- সুনামগঞ্জের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। এখনো বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নিখোঁজদের খোঁজ নেয়া হচ্ছে। অনেককে পাওয়া যাচ্ছে, আবার অনেককে পাওয়াও যাচ্ছে না। সিলেট সদরের স্বাস্থ্য বিভাগ সিলেটের পরিচালক ডা. হিমাংশু দাশ রায় গতকাল মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ‘বন্যায় ভেসে গিয়ে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অন্তত ২০-২২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এখনো সব এলাকার খবর আসেনি।’ বন্যায় বিশ্বনাথ উপজেলায় পানিতে ডুবে ৬ জনের মৃত্যু এবং ১ শিশুকন্যা নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গত শুক্রবার বিকালে রামপাশা ইউনিয়নের আমতৈল জমশেরপুর গ্রামের জামাল উদ্দিনের স্ত্রী তার এক বছরের শিশুকন্যাকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নৌকায় করে বাড়িতে ফেরার পথে রামপাশা বাজারের পশ্চিমের হাওরে নৌকা ডুবে যায়। এ সময় ওই শিশুকন্যা পানির স্রোতে মায়ের হাত থেকে চলে যায়। এখনো নিখোঁজ রয়েছে। নিহতদের মধ্যে গত শুক্রবার দুপুরে উপজেলার খাজাঞ্চী ইউনিয়নের বাওনপুর গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা শামীম আহমদ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে শ্বশুরবাড়িতে ফেরার পথে পানিতে ডুবে গিয়ে নিখোঁজ হন। 

এরপর গত রোববার দুপুরে স্থানীয় মরা সুরমা নদীর তীরবর্তী মিরেরগাঁও গ্রাম থেকে শামীম আহমদের লাশ ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। একইদিন বিকালে খাজাঞ্চী ইউনিয়নের চন্দ্রগ্রাম গ্রামের অমর চন্দ্র দাসের পুত্র অনিক দাস ওরফে মোহন দাস বাড়ি থেকে সিলেট শহরে যাওয়ার পথে বাড়ির পার্শ্ববর্তী গ্রামের মসজিদের সামনে স্রোতে পানিতে নিখোঁজ হন। গত রোববার বিকালে তার লাশ পাওয়া যায়। পানিতে ডুবে মারা যান উপজেলার সিংরাওলী গ্রামের ইয়াসিন আলীর পুত্র আলতাবুর রহমান, লামাকাজী ইউনিয়নের দিঘলী দত্তপুর গ্রামের সিএনজিচালক অজিত রায় নিজ বসতঘরেই পানিতে ডুবে মারা যান। গতকাল দুপুরে জৈন্তাপুরের ছাতাইর খাঁ হাওরে মা ও ছেলের লাশ উদ্ধারের পর ওসি গোলাম দস্তগীর আহমদ জানিয়েছেন- মা ও ছেলে একসঙ্গে ঢল সাঁতরে ফিরছিলেন। এরপর ঢল তাদের ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কেউ তাদের খোঁজ করেনি, কিংবা কেউ জানতো না। 

লাশ উদ্ধারের পর তাদের মরদেহ শনাক্ত করা হয়। তিনি জানান- লাশ দুটি হাসপাতাল থেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে- কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটের নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন- দুটি উপজেলার অন্তত ২০টি বাড়ি  ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া হাজারো গবাদি পশু ও মানুষের ব্যবহারের আসবাবপত্র তারা ভেসে যেতে দেখেছেন।  

পাঠকের মতামত

Please advise how would we help these people direct...

Hassan Imam
২১ জুন ২০২২, মঙ্গলবার, ১১:১৩ অপরাহ্ন

সিলেটে শোকের মাতম চলছে, চলবে। প্রিয়জন হারা এই মানুষদের সাথে তাদের প্রতিবেশিদের মধ্যে শোক। কারণ এই শোকে স্তব্দ পুরো দেশ। কিন্তু পদ্মাসেতুর জমকালো উতবোধনী অনুষ্ঠানে আমরা আনন্দ ফুর্তি করব আর ২ দিন বাদে। আর এই সর্বনাশ বিষয়ে কেহ কোন কথা বলবনা। আসলে বন্যার কারণ কি? এটি বৃষ্টির পানি? না কিছুই বলবনা। কারণ বোবার শত্রু নাই বলেনা। আমরা তাই বলবনা। আমর মাতোয়ারা হব পদ্মা সেতুতে। আমরা পদ্মা সেতু নিয়ে গান, নাটক, কবিতা মাস্তি, আড্ডা, ফুর্তি সবই করব। কিন্তু সর্বহারা নিয়ে ভাবনা। আর নিঃস্ব মানুষেরা বিচারের ভারটা তুলে দেবেন তাঁরই কাছে। যিনি সবার উপরে বসে আছেন আর লাটাই হাতে সুতাতে নিয়ন্ত্রণ করছে সব। তিনি তাদের এবং আমাদের শেষ ভরসা। প্রভু তুমিই দেখ, তুমিই দেখ!!

কাজী এনাম
২১ জুন ২০২২, মঙ্গলবার, ১০:০৬ অপরাহ্ন

Foreign media already reported death of more than 40 people due to flood. The same is true when Covid did not come to Bangladesh until a certain date. The whims of the her majesty prevails despite the sufferings of the sylhet.

Shobuj Chowdhury
২১ জুন ২০২২, মঙ্গলবার, ১২:৪০ অপরাহ্ন

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

প্রথম পাতা থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status