ঢাকা, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, শুক্রবার, ৬ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

নির্বাচন

কার ভাগ্যে ছিঁড়বে শিকা?

শুভ কিবরিয়া
২০ মে ২০২৩, শনিবার
mzamin

গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে মূলগত অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। পুরো সমাজব্যবস্থায় অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতায় একটা নতুন শ্রেণি তৈরি হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক মনোজগতেও একটা প্যারাডাইস শিফট ঘটে গেছে। আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্যও বেড়েছে। সমাজের ভেতরে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত প্রবণতাও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ গোটা সমাজের অন্তরালে একটা সামরিকীকরণ প্রবণতার উদ্ভব হয়েছে। মত ও পথের বিবেচনায় মধ্যপন্থার বদলে একটা ‘র‌্যাডিকেল’ প্রবণতা সমাজের অন্তরে জেগে উঠেছে। নৈতিকতার জায়গা নিয়েছে শক্তিমানের ইচ্ছা। কাজেই ক্ষমতার পালাবাদল কিংবা নির্বাচনের পালাবদলে এখানে কেউই হারতে রাজি নন। এই পরাজয় না মানা পরাভব কীভাবে গণতন্ত্রকে সংহত করবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

নির্বাচন সব দেশেই একটা উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ আনে।

বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল বা জোটের জন্য নির্বাচন একটা আগাম চিন্তার কারণ ঘটায়। কেননা ক্ষমতায় আবার ফিরে না আসা মানে ক্ষমতার চেয়ার থেকে যেমন দূরে সরে যাওয়া তেমনি প্রতিপক্ষের হাতে নাকাল হবার সমূহ সম্ভাবনা। ক্ষমতার বাইরে যারা থাকে তাদের জন্য নির্বাচন একটা সুযোগও বটে। কেননা ওই পথ দিয়েই কেবল গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ক্ষমতার পাটাতন বদলে ফেলা যায়। দীর্ঘদিনের ক্ষমতা থেকে দূরে থাকার অবসান ঘটার সম্ভাবনা আর নতুন করে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার রাষ্ট্রিক সম্ভাবনা হাতে পাবার সমূহ সুযোগ ঘটে।
এটা সেসব দেশেই চলে যেখানে নির্বাচন কিভাবে হবে, কোন সরকারের অধীনে হবে, নির্বাচন কমিশন কিভাবে কাজ করবে তার একটা সুস্থির কাঠামো বিদ্যমান। বিদ্যমান সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও। তার সঙ্গে যেখানে রীতি ও প্রথাতে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবার সংস্কৃতিও চলমান। উদাহরণ হিসেবে আমরা ভারতের কথা বলতে পারি। সেখানে বিভিন্ন রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলগুলো প্রমাণ করে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা-ধর্মবাদী রাজনীতির প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও ওখানে একটা ন্যূনতম মানসম্পন্ন নির্বাচনী ব্যবস্থা বিরাজমান। জনগণ যাকে চাইবে, তাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনার কিংবা যাকে চাইবে না তাকে ভোট না দিয়ে বিদায় দেবার ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে ভারতের আগামী লোকসভার নির্বাচনে কে ক্ষমতায় থাকবে তা ঠিক করতে আমেরিকা, চীন, বৃটেন কিংবা জাতিসংঘের দিকে চোখ রাখতে হবে না তাদের। সেখানকার জনগণ সুনিশ্চিত যে তাদের নির্বাচনী কাঠামো, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সামরিক- বেসামরিক আমলাতন্ত্র নিজেদের সামর্থ্যেই, জনগণের ভোটে, ক্ষমতার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারবে।

কিন্তু দেশে আমরা এখনো সুনিশ্চিত নই এখানে নির্বাচনই হবে কী না? হলে কার অধীনে হবে, কীভাবে হবে? সেই নির্বাচনে সবাই অংশ নেবে কিনা? কিংবা নিলেও জনগণ ভোট দিতে পারবে কিনা? অথবা ভোট দিলে যেখানে ভোট দেবে ফলাফল সেদিকেই যাবে কিনা? অথবা বাংলাদেশের আগাম নির্বাচনে ভারত, আমেরিকা, চীন কোন দেশ প্রাধান্য বিস্তার করে, তাদের পছন্দমতো সরকারকেই ক্ষমতায় আনবে? 

এসব উৎকণ্ঠার কারণ কী? অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ জেনেছে ভোট নিয়ে আপাতত উৎকণ্ঠা ছাড়া নিশ্চিত কোনো সুস্থিরতার খবর নেই। এদেশের মানুষ বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় দেখেছে এখানে জনগণের ভোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলে কোনো ভূমিকা রাখে না; বরং অন্যকিছুই বড় ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দেয়? ফলে নির্বাচন নিয়ে একটা অনিশ্চয়তার ভাবনা সর্বত্রই বিরাজমান।
ভাবনাগুলো এরকম:

এক.
০১. বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে, না নির্বাচনকালীন নতুন কোনো সরকার হবে?
০২. নির্বাচনকালীন নতুন সরকার হলে সেই সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কিনা?
০৩. বিএনপিকে ছাড়াই নাকি বিএনপিকে সহ-ই একটি নির্বাচন হবে?
০৪. নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী হবে?
০৫. এবারের ভোটে কি মানুষ তার ইচ্ছেমতো ভোট দিতে পারবে? নাকি অতীতের মতোই ভোট হবে?
০৬. ভারতের ভূমিকা কী হবে? 
০৭. আমেরিকা প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা নেবে কি?
০৮. নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে কোনো স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা আসার সম্ভাবনা আছে কি? স্যাংশনের বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্বেগ আছে কি? নইলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কেনো বলেছেন যে, যে দেশ স্যাংশন দেবে তাদের কাছ থেকে তিনি কিছু ক্রয় করবেন না?
০৯. হঠাৎ কী হলো যে সরকার বড় বড় দেশের রাষ্ট্রদূতদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এত বড় পরিবর্তন আনলেন। তাহলে কি কোথায় কোনো সমস্যা দেখা দিচ্ছে? সরকার কি বড় দেশগুলোকে চাপে ফেলে নির্বাচনে নিজেদের ইচ্ছাকেই বাস্তবায়িত করতে যাচ্ছে? নাকি, বড় দেশগুলোর সঙ্গে নির্বাচনপূর্ব নেগোসিয়েশন মনমতো হচ্ছে না সরকারের?  

১০. সরকার যে উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে বড় বড় মেগাপ্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছে এবং করতে যাচ্ছে, সেগুলোর ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করতে আমেরিকা-ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো এবং ভারত, চীন, জাপান আবার বর্তমান সরকারকেই কি ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবে? তাদের বিনিয়োগের স্বার্থেই আবার তারা যেকোনো মূল্যেই এই সরকারকেই ক্ষমতায় চাইবে?
আপাতত এসব ভাবনা থাকলেও তার কোনো নিশ্চিত উত্তর কারও জানা নেই। তবে কিছু কিছু লক্ষণ খুব মন দিয়ে দেখার মতো।

দুই.
নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা যেমন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে আছে, নিজ দলের মধ্যেও তার কমতি নেই। সম্প্রতি গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একসময়ের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের পরিণতি তার বড় উদাহরণ। একসময় মনে হতো, গাজীপুরে জাহাঙ্গীর আলমের চাইতে শক্তিমান আর কেউ নাই। তার নেটওয়ার্কিং, টাকার ক্ষমতা, সাংগঠনিক ক্ষমতাকে মনে হতো কারও পক্ষেই আর ছোঁয়া সম্ভব নয়? সেই জাহাঙ্গীর আলমের রাজনৈতিক ভাগ্য এখন দুর্দিনের দিকেই পথ চলতে শুরু করেছে। দল থেকে চিরস্থায়ী বহিষ্কার হয়েছেন। দুদক তার পেছনে ছুটছে। শোনা যাচ্ছে পারিবারিক জীবনেও তিনি বিপত্তির মুখোমুখি। এসব কিছুই তার রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর সঙ্গেই জড়িত বলে অনুমান করা যায়। 

বরিশাল সিটি করপোরেশনের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী সাবেক মেয়রের ভাগ্যেও বিপত্তি নেমে এসেছে। তার পরিবারের মধ্য থেকেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী আবির্ভূত হয়েছেন। যে বরিশালে তিনিই ছিলেন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী, তার ইচ্ছেই ছিল সব, সেখানে এখন তিনি নিষ্প্রভ। তার ডান হাত-বাম হাত নামে পরিচিত নেতারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। তিনি নিজেও আর কোনো বড় ভূমিকা রাখার ক্ষমতা দেখাতে পারছেন না। প্রশাসনও তাকে আর তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। 

আরেকটা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে সরকারি দলে। বিভিন্ন নির্বাচনী আসনে হেভিওয়েট নেতাদের ছোট-বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হাজির হচ্ছেন সগর্বে। নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় এতদিন যে নেতারা ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের সামনেই বড় আওয়াজ তুলে হাজির হচ্ছেন সম্ভাব্য সব এমপি ক্যান্ডিডেট। ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইলের নানা হেভিওয়েট নেতাদের আসনে এরকম সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীদের উপস্থিতি প্রায় নাকাল করছে তাদের। সরকারি দলেই এই প্রবণতা বিদ্যমান। কেননা, সরকারি দলের নেতাদের একটা বড় অংশ মনে করেন তাদের নেত্রী এবারো নির্বাচনে তাদের দলকেই ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনবেন। বিএনপি কোনো ফ্যাক্টর নয়। সুতরাং আওয়ামী লীগের নমিনেশন পেলেই কেল্লা ফতে। আর কিছু লাগবে না। যেকোনো মডেলেই নির্বাচন হোক না কেন, সরকারি দলের প্রতীক পেলেই এমপি বনে যাবেন তারা। সুতরাং দলের মধ্যে লড়াইটাই আসল। তাই এবার আর কোনো ছাড় নয়। যেকোনো ভাবেই হোক না এমপি নির্বাচনে সরকারি দলের প্রতীকটা তার চাই-ই চাই। 

বিএনপি অবশ্য এখনো দোটানায়। তাদের নেতারা তাদের সামনে নির্বাচন নিয়ে কোনো পরিষ্কার ভবিষ্যত এখনো দেখাতে পারেন নাই। তারা আমেরিকা আর পশ্চিমা দেশগুলোর ইচ্ছের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। আর নির্ভরশীল প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের অধীন নিয়তির ওপর। কোনো অলৌকিক শক্তিবলে একদিন তাদের মতে সব অনাচারের বিরুদ্ধে জেগে উঠবে জনতা, পতন ঘটবে শক্তিমান শাসকের, প্রতিষ্ঠা পাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড-আপাতত এই দৈবশক্তির ওপরেও তাদের ভরসা। তাই ভেতরে ভেতরে তারাও নির্বাচনী আসন নিয়ে নিজেদের কন্টাক্ট-কানেকশন বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। অপেক্ষা করছেন দুর্দিনের অবসানে সুদিনের। জাতীয় পার্টির অবস্থা অবশ্য ভিন্ন। তারা জানে দলের মধ্যে সরকারপন্থি আর সরকারবিরোধী দুই লবিই শেষাবধি চেষ্টাটা চালিয়ে যাবে ভবিষ্যত ক্ষমতাসীনদের নৈকট্য পেতে। ইসলামী দলগুলোর একটা বড় অংশও জাতীয় পার্টির ফর্মুলাতেই চলবে, চলছে। বৃষ্টি যেদিকে, সেদিকেই তারা ছাতা ধরবে।

তিন.
এই ‘যদি’, ‘কিন্তু’ নিয়েই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ তার পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের দিকে। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে মূলগত অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। পুরো সমাজ ব্যবস্থায় অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতায় একটা নতুন শ্রেণি তৈরি হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক মনোজগতেও একটা প্যারাডাইস শিফট ঘটে গেছে। আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্যও বেড়েছে। সমাজের ভেতরে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত প্রবণতাও বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ গোটা সমাজের অন্তরালে একটা সামরিকীকরণ প্রবণতার উদ্ভব হয়েছে। মত ও পথের বিবেচনায় মধ্যপন্থার বদলে একটা ‘র‌্যাডিকেল’ প্রবণতা সমাজের অন্তরে জেগে উঠেছে। নৈতিকতার জায়গা নিয়েছে শক্তিমানের ইচ্ছা। কাজেই ক্ষমতার পালাবাদল কিংবা নির্বাচনের পালাবদলে এখানে কেউই হারতে রাজি নন। এই পরাজয় না মানা পরাভব কীভাবে গণতন্ত্রকে সংহত করবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। উন্নয়নকে বিশেষ করে অবকাঠামোগত উন্নয়নকে টেকসই চেহারা দিতে যে রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক সুস্থিরতা প্রয়োজন, দেশের সমাজ-মানসে যে পরমতসহিষ্ণুতা দরকার সেটা আগামী নির্বাচন দিতে পারবে কিনা সেটাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। তাই নির্বাচনে কার ভাগ্যে শিকা ছিঁড়বে এবং সেই ভাগ্য কে নির্ধারণ করবে সেটাই এখন ভাবনার বিষয়। 

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক।

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status