ঢাকা, ১৩ জুন ২০২৪, বৃহস্পতিবার, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

প্রথম পাতা

সড়কে জট, এম্বুলেন্সেই মৃত্যু

শুভ্র দেব, মরিয়ম চম্পা, ফাহিমা আক্তার সুমি, নাজমুল হুদা
১৮ মার্চ ২০২৩, শনিবার
mzamin

ছবি: জীবন আহমেদ

চাঁদপুরের খায়রুন্নেছা। ভুগছিলেন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে। ডেটলাইন ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৩। হঠাৎ অবস্থার অবনতি। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালে। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক পরামর্শ দেন ঢাকায় বড় হাসপাতালে ভর্তির। ওইদিনই স্বজনরা এম্বুলেন্সে রওয়ানা হন ঢাকার দিকে। ঠিকঠাকই চলছিল সব। কিন্তু কাঁচপুরে এসেই বাধে বিপত্তি। যানজটে আটকা পড়ে এম্বুলেন্স।

বিজ্ঞাপন
এক সময় জট কিছুটা কমে। ধীরে ধীরে এগুতে থাকেন তারা। নিউমার্কেট এলাকায় এসে ফের বড় ধরনের জট। এ জট খোলার আগে এম্বুলেন্সেই মারা যান খায়রুন্নেছা। সোহ্‌রাওয়ার্দী হাসপাতালে জীবিত পৌঁছা হয় না তার। যানজটের নগরী ঢাকা। সামান্য পথ যেতেও কখনো কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। অন্যসব গাড়ির মতো এসব জটে আটকা পড়ে মুমূর্ষু রোগী বহনকারী এম্বুলেন্সও। বেজেই চলে সাইরেন। যেন আর্তি জানাচ্ছে, আমাকে যেতে দাও!  কিন্তু কিসে কি! কোনো যাদু মন্ত্রতো নেই। খায়রুন্নেছার মতো কারও কারও মৃত্যু হয় এম্বুলেন্সেই। আবার হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরির কারণেও পরিস্থিতির অবনতি হয় বহু রোগীর। এমন পরিস্থিতি মেনে নিতে পারেন না স্বজনরা। যেমনটা হয়েছে খায়রুন্নেছার স্বজনদের বেলায়।

খায়রুন্নেছার এই করুণ  মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তার ছেলে মফিজুর রহমান। মানবজমিনকে তিনি বলেন, যেদিন মা মারা যান সেদিন বৃহস্পতিবার ছিল। তাই রাস্তায় অনেক যানজট ছিল। যানজট না থাকলে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসতে ৩ ঘণ্টাও লাগে না। কিন্তু সেদিন এম্বুলেন্সে করে আসতে ৫ ঘণ্টা লেগেছে। চাঁদপুর থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত আসতে আড়াই ঘণ্টা লেগেছে। সেখান থেকে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার হয়ে নিউমার্কেট দিয়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল যেতে আরও আড়াই ঘণ্টা লেগেছে। কিন্তু জ্যাম না থাকলে এই সড়কে ৪০ মিনিটও লাগার কথা না।  আক্ষেপ করে তিনি বলেন, হয়তো আর আধা ঘণ্টা আগে চিকিৎসা শুরু করলে মাকে বাঁচানো যেতো।

২০১৩ সালে যানজটে আটকা পড়ে এম্বুলেন্সেই কোমায় চলে যান মঞ্চ ও টিভি অভিনয়শিল্পী খালেদ খান। ঘটনাটি ওই বছরের ১৬ই ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টার। ওইদিন শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বজনরা তাকে নিয়ে মালিবাগ থেকে রওনা দেন বারডেম হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। তখন রাস্তায় ছিল তীব্র যানজট। গাড়িতে বসা অবস্থায় তার শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার রেসপিরেটরি অ্যাটাক হয়ে কোমায় চলে যান। এর ৪দিন পর তিনি মারা যান। তার মেয়ে রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ফারহিন খান জয়িতা মানবজমিনকে বলেন, সেদিন অনেক যানজট ছিল। প্রচণ্ড যানজটের কারণে গাড়িতেই তার খারাপ অবস্থা শুরু হয়। এটা দেখে আমার চাচা গাড়ি থেকে নেমে নিজেই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেছিলেন। তারপরও হাসপাতালে নিতে দেরি হয়েছিল। মালিবাগ থেকে বারডেমে যেতে দুই ঘণ্টা লেগেছিল। যানজটে পড়ার কারণে বাবা সময়মতো চিকিৎসা পাননি। তিনি কোমায় চলে যান। পরে আর তাকে আর বাঁচানো যায়নি। 

এম্বুলেন্স-চালকরা বলছেন, ঢাকার যানজট পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন যানজটে দাঁড়িয়ে থাকলে এম্বুলেন্স হিসেবে বাড়তি কোনো সুবিধা পাওয়া যায় না। অথচ একটা সময় ছিল এম্বুলেন্সের সাইরেন যে রাস্তা থেকে আসতো ট্রাফিক সদস্যরা ওই রাস্তার সিগন্যাল ছেড়ে দিতেন। যানজটে পড়ে যেসব ব্যক্তি মারা যান তাদের স্বজনদেরও আক্ষেপ করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। যানজটে আটকা পড়ে এম্বুলেন্সে মৃত্যুর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, এম্বুলেন্স-চালক এবং স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে কিছু পরিসংখ্যান সামনে আসে। ২০২২ সালে ঢাকার যানজটে আটকা পড়ে এম্বুলেন্সে ৩৩ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেভ দ্য রোড’র মহাসচিব শান্তা ফারজানা। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনদের দেয়া তথ্য ও সেভ দ্য রোডের গবেষণা সেলের পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে আসে। এতে দেখা যায়, প্রতিদিন কমপক্ষে ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানজট থাকায় এম্বুলেন্সে হাসপাতালগামী মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এর প্রতিকার হিসেবে প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্রিয় দায়িত্ব পালন। সেভ দ্য রোড সূত্র জানায়, ২০২২ সালের বছরজুড়ে মৃত্যুবরণকারী রোগীদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসার সময় ১১ জন, মিডফোর্ট হাসপাতালে আসার সময় ১০ জন, শেখ হাসিনা বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে আসার সময় ৩ জন এবং অন্যান্য হাসপাতালে আসার সময় ৯ জন রোগীর মৃত্যু হয়। দায়িত্ব পালনে অবহেলা, আইনের সংস্কৃতি না থাকা এবং সংকীর্ণ রাস্তার কারণে অহরহ এমন করুণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে বলে জানান সেভ দ্য রোড’র প্রতিষ্ঠাতা ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মোমিন মেহেদী। 

দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১৩ মাসে হাসপাতালটিতে মৃত অবস্থায় আনা হয় ১ হাজার ৫৭৩ জনকে। যার মধ্যে ২২ সালের জানুয়ারিতে ১১১, ফেব্রুয়ারিতে ১১২, মার্চে ১১৩, এপ্রিলে ১০২, মে মাসে ১২০, জুনে ১০৫, জুলাইতে ১২৪, আগস্টে ১৪৩,  সেপ্টেম্বরে ১২২, অক্টোবরে ১২৪, নভেম্বরে ১৪৭, ডিসেম্বরে ১১৩ এবং চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ১৩৭ জন। হাসপাতালটির সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৃত অবস্থায় আসা এসব ব্যক্তিরা যানজটের কারণে রাস্তায় মৃত্যুবরণ করেছেন কিনা এরকম কোনো তথ্য তাদের কাছে নাই। তবে একাধিক এম্বুলেন্স-চালক, রোগীর স্বজন, জরুরি বিভাগের কর্মরতদের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, ঢাকার বাইরে থেকে যেসব রোগী নিয়ে এম্বুলেন্স-চালকরা আসেন তারা ঢাকায় প্রবেশ করেই যানজটে পড়েন। কুমিল্লা থেকে ঢাকায় প্রবেশ করতে যে সময় লাগে তার চেয়ে বেশি সময় লাগে সেখান থেকে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পৌঁছাতে। ঢাকায় যেসব রোগীদের আনা হয় তাদের বেশির ভাগই গুরুতর অসুস্থ। কিন্তু যানজটে আটকা পড়ে বাড়তি সময় নষ্ট হওয়াতে অনেক রোগী রাস্তায়ই মারা যান। কারণ অনেক মুমূর্ষু রোগীকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য যেসব সুবিধা এম্বুলেন্সে থাকার দরকার তার ৯০ শতাংশই দেশের এম্বুলেন্সে নাই। অনেক সময় ঠিকমতো অক্সিজেন সাপোর্টটুকু দেয়াও সম্ভব হয় না। 

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ই মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালে মৃত অবস্থায় আসেন ১২০ জনের বেশি রোগী। এরমধ্যে কেউ কেউ যানজটের কারণে হাসপাতালে আসার পথেই মারা গেছেন। রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সিসিইউ এবং ইমার্জেন্সিতে দায়িত্ব পালন করেন এমন সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে গত ১০ই মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ’ব্রোটথ ডেথ’ (মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আসা) রোগীর সংখ্যা ২৭৭ জন। যেটা হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত রোগীর তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। হাসপাতালের বাইরে, গেটে, গাড়িতে, যানজটে এম্বুলেন্সে এসব রোগীর মৃত্যু হয়েছে। পরে ইসিজি করে তাদেরকে মৃত ঘোষণা করেন হাসপাতালের চিকিৎসক। হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২২ সালে মৃত রোগীর মোট সংখ্যা ৫ হাজার ৫শ ৪২ জন। বারডেম হাসপাতালের তথ্যমতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১৪ জন রোগী হাসপাতালে আসার আগেই মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানান, একজন ইমারর্জেন্সি রোগীর ক্ষেত্রে সময় কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোগী যদি আধা ঘণ্টা আগে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে তাহলে সেবা দেয়া সম্ভব হয়। আইসিইউ সার্পোট পেলে ওই রোগীর সুস্থ হয়ে উঠার সুযোগ থাকে বা বাঁচানো যায়। কোনো ক্ষেত্রে যদি রোগী মারা না যায় তারও হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শারীরিক জটিলতা বেড়ে যায়। চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়টি সে হারিয়ে ফেলে।  

চিকিৎসকরা যা বলছেন: বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ডা. রোনে সুজন ক্লোদ সরকার বলেন, একজন ইমারর্জেন্সি রোগীর ক্ষেত্রে সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই রোগী যদি আধা ঘণ্টা আগে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারতো তাহলে আমরা সেবা দিতে পারতাম। আইসিইউ সার্পোট পেলে ওই রোগী হয়তো সুস্থ হতে পারতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যদি রোগী মারা না যায় তারও কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শারীরিক জটিলতা বেড়ে যায়। সে যদি আরও আগে পৌঁছাতে পারতো তাহলে কিন্তু আমরা চিকিৎসা দিয়ে তাকে দ্রুত সুস্থ করে তুলতে পারি। জটিলতার কারণে কিন্তু তাদের অনেক অর্থ খরচ হয়। রাস্তায় সময় ক্ষেপণ হলে সব রোগীদের ক্ষেত্রেই সমস্যা হয়। অন্যান্য দেশে কিন্তু একটি সিস্টেমই চালু আছে। যখন একটা এম্বুলেন্সের সাইরেন শুনে তখন তারা ডানে-বামে সরে গিয়ে জায়গা দেয়। এটাতে তারা অভ্যস্ত। আলাদা করে তাদের আর চিন্তা করতে হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে সেটি ভিন্ন। অনেক সময় সাধারণ মানুষতো দূরের কথা সাইরেন বাজালে ট্রাফিকও ছাড়ছে না। সামনে থাকা গাড়িটাও একটুও নড়ার চেষ্টা করছে না। আমরা চিন্তা করি না যে এম্বুলেন্সে একটা খারাপ রোগী, বা মৃত্যু পথযাত্রী রোগীও থাকতে পারে। এসব জরুরিকাজে ব্যবহৃত গাড়িগুলোকে আগে ছেড়ে দেয়ার মানসিকতা আমাদের থাকতে হবে। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডা. মো. আলাউদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, ঢাকায় যানজট একটা বড় সমস্যা। যানজটে আটকা পড়ে অনেক রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। এতে করে রোগীরা চিকিৎসার গোল্ডেন আওয়ার মিস করেন। কারণ রোগী হার্টঅ্যাটাক, স্টোক বা হঠাৎ যেকোনো ধরনের অসুস্থবোধ করলে সময়মতো যদি তার চিকিৎসা শুরু করা যায় তবে তাকে বাঁচানো যায়। কিন্তু হাসপাতালে আনতে দেরি হলে তখন অনেক রোগী মারা যান। অনেক সময় যানজটের কারণে রোগীরা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না।  জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী কর্তকর্তা ডা. ওয়াহিদুর রহমান তুষার বলেন, সঠিক সময়ে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারলে এই ব্রোটথ ডেথ এর সংখ্যাটা আরও কমানো যেত। এক্ষেত্রে আমাদের সড়ক ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই।

অসহায় এম্বুলেন্স চালকরা: দুই বছর ধরে এম্বুলেন্স চালান আক্কাস আলী বিশ্বাস। দিনে ও রাতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগী বহন করেন তিনি। যানজটের কারণে হাসপাতালে যেতে দেরি হওয়ায় তার এম্বুলেন্সেও অনেক রোগী শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেছেন। এম্বুলেন্সে স্বজনের আহাজারিও দেখেছেন। তিনি বলেন, প্রায়ই আমরা যানজটে আটকা পড়ি। অনেক সময় সাইরেন বাজালেও গাড়ি ছাড়া হয় না। যদি সিগন্যালে পড়ে যাই সেখানে এম্বুলেন্সের সামনে ২-৩টা গাড়ি থাকলে ছেড়ে দেয়। কিন্তু যদি বেশি পিছনে থাকি তাহলে আর ছাড়ে না। সিগন্যাল ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত আর যেতে পারি না। এম্বুলেন্সে রোগী মারা গেলে নিজের কাছেই খারাপ লাগে। আমরা তো চেষ্টা করি সময়মতো হাসপাতালে দিয়ে আসতে। একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আক্কাস আলী বলেন, একদিন খুব অসুস্থ একটা রোগী বহন করছিলাম। সেদিন পুরো রাস্তা জ্যাম ছিল। সাইন্সল্যাব থেকে নিলক্ষেত মোড় পর্যন্ত যেতে এক ঘণ্টা লেগে গেছে। সেখান থেকে জ্যাম ছাড়ার পর ঢাকা মেডিকেল যেতে যেতে রোগী মারা গেছে। 

এম্বুলেন্স চালক মো. ওমর ফারুক বলেন, দশ বছর ধরে এম্বুলেন্স চালাই। রোগীদের এই সেবা দিতে গিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয়। রোগী যখন নিয়ে আসি তখন রাস্তায় প্রচণ্ড যানজটে পড়তে হয়। কখনও কখনও রোগীর অবস্থা বুঝে রং সাইড দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়। এই যানজটের কারণে অনেক রোগী মারা গেছে এম্বুলেন্সে। ঢাকার বাইরে থেকে শুরু করে ঢাকার মধ্যে সব রাস্তায়ই জ্যামে পড়তে হয়। যখন পদ্মা ব্রিজ ছিল না তখন ফেরিতে উঠতে না পেরে অনেক রোগী মারা গেছে। বিজয় সরণি সিগন্যাল, সাইন্সল্যাব মোড়, বাটা সিগন্যাল, শাহবাগ মোড়, সোনারগাঁও মোড়, ফার্মগেট, বনানী, টেকনিক্যাল মোড়, আসাদগেট এই জায়গাগুলোতে খুবই দুর্ভোগ। গ্রীন রোড থেকে উত্তরা যেতে মিনিমাম আমার তিনঘণ্টা লাগে। ঢাকা থেকে চিটাগাং নেয়ার পথে ফেব্রুয়ারি মাসে একজন রোগী রাস্তায় মারা যায়। ওইদিন ঢাকার রাস্তায় অনেক জ্যাম ছিল। রাস্তার জ্যামের কারণে যাত্রীর সেবা দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। চোখের সামনে রোগী মারা গেলে অনেক সময় নিজেকে অসহায় মনে হয়। অনেক সময় আমি যদি এম্বুলেন্স নিয়ে সিগন্যালের মুখে থাকি তবুও সাইরেন শুনে গাড়ি ছাড়ে না। অথচ একজন এমপি গেলেও গাড়ি ছেড়ে দেয়। অনেক সময় রোগী নিয়ে রাস্তায় চারঘণ্টাও বসে থাকতে হয়, যখন ভিআইপি যান। এম্বুলেন্সচালক ইব্রাহিম বলেন, অনেক সময় সাইরেন দিলেও পুলিশে ছাড়তে চায় না। তখন আমাদের আর কিছু করার থাকে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোগী নিয়ে বসে থাকতে হয়। এই যানজটে কত রোগী মারা গেছেন যা হিসাবের বাইরে। 

আক্ষেপের শেষ নেই স্বজনদের: ডেমরার বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী শুকুর আলী। গত ৩রা মার্চ জুমার নামাজ শেষে স্ট্রোক করেন। তাকে হাসাপাতালে নেয়ার জন্য এম্বুলেন্স আনা হয়। প্রথমে ডেমরা ও যাত্রাবাড়ীর স্থানীয় দুইটি হাসপাতালে তাকে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে অন্য হাসপাতালে নেয়ার জন্য চিকিৎসক পরামর্শ দেন। তখনও বেঁচে ছিলেন শুকুর আলী। এরপর রওনা দেন বারডেম হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। কিন্তু আটকা পড়েন যানজটে। যানজট ছাড়ার পর যখন তাকে নেয়া হয় বারডেম হাসপাতালে তখন চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শুকুর আলীর ছেলে কবির হোসেন বলেন, ওইদিন শুক্রবার হলেও যাত্রাবাড়ীর দিকে অনেক যানজট ছিল। সেখানে এক সিগন্যালেই ৩০ মিনিট সময় চলে যায়। এর আগে ডেমরা থেকে বের হতেও যানজটে পড়ি। যদি যানজটে না পড়তাম আর সময়মতো বাবাকে হাসপাতালে নিতে পারতাম তবে হয়তো বাবাকে বাঁচাতে পারতাম। ৬৬ বছর বয়সী হোসনে আরা রশিদ হঠাৎ অসুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বজনরা এম্বুলেন্স কল করেন। কিন্ত যানজটে আটকা পড়ে তাদের বাসায় এম্বুলেন্স আসতে দেরি করছিল। যানজট পেরিয়ে যখন এম্বুলেন্সটি আসে ততক্ষণে না ফেরার দেশে চলে যান হোসনে আরা রশিদ। তার ছেলে চৌধুরী মেহের-ই-খোদা বলেন, এমন শহরে বাস করি দুই মিনিটের রাস্তায় এম্বুলেন্সটি আসতে সময় লাগায় ২৫ মিনিট। পাঁচমিনিট আগে যদি মা’কে হাসপাতালে নিতে পারতাম হয়তো বাঁচানো যেত। 

কুমিল্লার বুড়িচং এলাকার শিক্ষার্থী হামীম। এক সপ্তাহ আগে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় যানজটে পড়ে তার মৃত্যু হয়। তার স্বজনরা জানান, ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার সময় বলছিল, তার কষ্ট হচ্ছে, গাড়িতে গরম লাগছে। এম্বুলেন্সের এসি ও অক্সিজেন বাড়িয়ে  দেয়ার জন্য। কিছুক্ষণ পর আবার বলছিল সে বাঁচবে না। কিন্তু আগারগাঁও  থেকে মেডিকেলে যাওয়ার সময় আসাদগেট থেকে শুরু করে একাধিক সিগন্যালে আটকা পড়ে ঘণ্টাখানেক লেগে যায়। যখন এম্বুলেন্স চালক তাকে নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের স্ট্রেচারে তুলেন ততক্ষণে হামীম দুনিয়া ছেড়ে চলে যান।

যানজট নিয়ে ট্রাফিক পুলিশের বক্তব্য: ট্রাফিকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জন্য যে পরিমাণ রাস্তা থাকা দরকার সে পরিমাণ রাস্তা ঢাকায় নেই। বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে জনবসতি গড়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে মিশ্র নগরায়ন হয়েছে। আবার যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য যে পরিমাণ পার্কিং ব্যবস্থা থাকা দরকার সেটি তাদের নেই। পার্কিং ব্যবস্থা ছাড়াই একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে যাচ্ছে।  যে রাস্তাগুলো সিটি করপোরেশন দেখবে তাদেরও কিন্তু সেই পরিমাণ পার্কিং ব্যবস্থাপনা নেই। মাকেটগুলোরও সেই পরিমাণ পার্কিং ব্যবস্থাপনা নেই। এসব ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নেয়া উচিত। মার্কেটের অনুমোদন দিতে হলে অবশ্যই তার নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ডিএমপি রমনা ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার জয়নুল আবেদীন মানবজমিনকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্সে যদি কোনো জরুরি মূমূর্ষু রোগী থাকে তাহলে আমরা বিকল্প সহজ রাস্তা দিয়ে তাকে হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ করে দেই। এম্বুলেন্সচালককে সবসময় বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়। রাস্তায় যানজটের কারণে মুমূর্ষু কোনো রোগী যেতে না পারলে তারা আমাদের ৯৯৯ সার্ভিসের সহযোগিতা নিতে পারে। তখন ওই এলাকায় যোগাযোগ করে আমরা দ্রুত তাকে একটি লেন খালি করে হাসপাতালে পাঠাতে পারি। সবসময় আমরা রোগী বহনকারী এম্বুলেন্সকে সহযোগিতা করি এবং অগ্রাধিকার দেই। আমাদের ট্রাফিকে যারা দায়িত্বে থাকেন তাদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এসকল বিষয়ে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, জনগণকে সচেতন হতে হবে। মানুষের মধ্যে আরও পরিবর্তন আনা উচিত। গাড়িচালকদের মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। এদিকে ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেমে পরিবর্তন আনা জরুরি। সিস্টেম পরিবর্তন ছাড়া সড়কে বিশৃঙ্খলা ও ভোগান্তি কমানো সম্ভব না। 

সাইরেন বাজালে মানুষ বিরক্ত হয়: ৪ঠা মার্চের ঘটনা। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অটোরিকশার ধাক্কায় দু’পা ভেঙে যায় কুমিল্লার শিক্ষার্থী মো. সেলিমের। এছাড়া তিনি বুকে গুরুতর আঘাত পান। প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর শেরে-বাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের (নিটোর) আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। একটি এম্বুলেন্সে করে যখন স্বজনরা তাকে নিয়ে রওয়ানা দেন তখন বাজে বেলা ১১টা। ওই হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেলে যেতে সর্বোচ্চ সময় লাগে আধাঘণ্টা। কিন্তু ওইদিন আড়াই ঘণ্টায়ও  এম্বুলেন্সচালক মেহেদী হাসান অসুস্থ সেলিমকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেননি। মেহেদী হাসান বলেন, চার স্থানে যানজটে আটকা পড়ি। বাকি সড়কও ধীর গতিতে গাড়ি চলছিল। এম্বুলেন্সে অক্সিজেন সংকটও ছিল। যানজটে পড়ে অক্সিজেনও শেষ হয়ে যায়। আমি সাইরেন বাজাচ্ছিলাম। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বরং সাইরেনের শব্দ শুনে আশেপাশের যানবাহনের চালক, যাত্রী, পথচারীরা বিরক্ত হচ্ছিল।  দুপুর দেড়টায় সময় সেলিম এম্বুলেন্সেই মারা যায়। এম্বুলেন্স চালক হাসান বলেন, ৮ মাস আগে যানজটে আটকা পড়ে আমার এম্বুলেন্সে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়। তার বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩২ বছর। মাগুরায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তিনি পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে অবস্থার অবনতি হলে বিকাল ৫টায় এম্বুলেন্স করে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালের উদ্দেশ্যে আগারগাঁও থেকে রওয়ানা দেই।  বাংলামোটর থেকে পল্টন পর্যন্ত যেতে প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট লেগে যায়। রোগীর অবস্থা দ্রুতই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। আহত পুলিশ সদস্য বারবার আমাকে বলছিলেন একটু তাড়াতাড়ি আমাকে নিয়ে যান। আমি রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানোর জন্য আর সিগন্যাল ছাড়ার জন্য সাইরেন বাজিয়েও কাজ হয়নি। বরং মানুষ আমাকে বকা দিচ্ছিল। অপারগ হয়ে সিগন্যালে দায়িত্বে থাকা পুলিশের সার্জেন্টকে ওই পুলিশের পরিচয় দিয়ে যেতে চাইলেও তিনি সুযোগ করে দেননি।

 

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

   

প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status