ঢাকা, ১২ জুন ২০২৪, বুধবার, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৫ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

প্রথম পাতা

ইতালিতে ওয়ার্ক পারমিট

ভাগ্য পরিবর্তনের যুদ্ধে অনিশ্চিত অপেক্ষা

শুভ্র দেব
৮ মে ২০২৪, বুধবার
mzamin

রায়হান উদ্দিনের চোখে-মুখে হতাশার ছাপ। কখনো মনমরা হয়ে তাকিয়ে থাকেন গুলশানের নাফি টাওয়ারের দিকে। কখনো আশেপাশের লোকজনের সঙ্গে  গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন। ৩৬ বছর বয়সী এই যুবকের প্রতিটি দিন কাটে হতাশায়। কী হচ্ছে, কী হবে এমন চিন্তা তার সবসময়। আবার চাকরিতে যোগ দিবেন নাকি অপেক্ষা করবেন কাক্সিক্ষত সেই যাত্রার। পরিবারের কাছ থেকে বারবার সময় নিয়েছেন। এখন আর তাদেরকে কিছু বলার বা সময় নেয়ার মতো অবস্থা নাই। বন্ধুবান্ধবরাও এখন হাসাহাসি শুরু করেছেন। সবমিলিয়ে কঠিন এক সময় পার করছেন রায়হান।

বিজ্ঞাপন
তবুও সবকিছু ছাড়িয়ে নিজের মনের ভেতরে বোনা স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার সব চেষ্টাই করছেন। যদি একবার ইতালির ভিসা হয়ে যায় তবে হয়তো স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি অনেকের কটু কথার জবাব দিতে পারবেন। 

রায়হান মানবজমিনকে বলেন, উত্তরায় অনেক বছর ধরে। পেশাদার হেড শেফ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ছোটবড় অনেক রেস্টুরেন্টে চাকরি করেছি। বড় অংকের বেতনও পেতাম। কয়েকজন শুভাকাংক্ষী পরামর্শ দেয় ইউরোপে গেলে কয়েক লাখ টাকা বেতন পাবো। প্রথম অবস্থায় তাদের কথার গুরুত্ব দেইনি। কিছুদিন যাবার পর মনে হলো একবার ইউরোপ ঘুরে এসে দেখি। তাই পরিচিত এক ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ইতালির ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করি। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে আবেদন করার পর কয়েক মাসের ভেতরে আমার পারমিট বের হয়ে যায়। তারপর আনুষঙ্গিক কাজ ও কাগজপত্র যোগাড় করে ওই বছরের আগস্ট মাসে ভিসার আবেদন করে পাসপোর্ট জমা দেই। আমাকে বলা হয়েছিল পাসপোর্ট জমা দেয়ার মাসখানেকের ভেতরে ভিসা হয়ে যাবে। তাই আমি সেই হিসাব মাথায় রেখে যেখানে চাকরি করতাম সেখান থেকে ইস্তফা দেই। তারপর প্রায় ১০ মাস হতে চললো। এখন পর্যন্ত কোনো খবর পাচ্ছি না। এতদিন ধরে চাকরিহারা হয়ে ঘুরছি। আর কতোদিন অপেক্ষা করতে হবে সেটাও জানি না। ভাগ্য পরিবর্তনের যুদ্ধে নেমে এক অনিশ্চিত অপেক্ষায় দিন-রাত কাটাচ্ছি। 

রায়হানের মতো শ’ শ’ মানুষের অবস্থা একইরকম। যারা তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ইতালি যেতে চান। অনেকে তাদের পূর্বের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন পরিবারের খরচ চালাতে অর্থনৈতিকভাবেও বিপর্যস্ত। তারা কেউই ভাবেননি পাসপোর্ট ফিরে পেতে এত সময় লাগবে। এরকম অবস্থায় তারা অন্য কোনো দেশেও চেষ্টা করতে পারছেন না। তাই একটু ভালো খবর শোনার অপেক্ষায় তারা ইতালি দূতাবাসের থার্ডপার্টি ভিএফএস গ্লোবালের গুলশানের অফিসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। অনেকেই এই ভিসা সেন্টারের নিয়ম অনুযায়ী দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভেতরে প্রবেশ করে কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। কিন্তু প্রতিদিনই তাদেরকে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো তারিখ বা আশা দেয়া হয় না। 

হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার শাহজাহান ইসলাম জনি। শায়েস্তাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে লেখাপড়া করেন। বাবা কৃষি কাজ করেন। ঘরে মা ছাড়াও এক ভাই ও বোন আছে। জনি পরিবারের বড় সন্তান। তার উপর দায়িত্বটাও বেশি। তাই লেখাপড়া ছেড়ে মামার মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন গত বছর থেকে। তার বাবার সঙ্গে কথা বলে মামা সবকিছুর ব্যবস্থা করেছেন। ইতালি প্রবাসী মামা ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থা করেছেন। তারপর থেকে তিনি লেখাপড়ায় মনযোগ দিতে পারছেন না। গতকাল গুলশানে ভিসা সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে জনি বলেন, ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার পর সেপ্টেম্বর মাসে ভিসার আবেদন করে অ্যাপয়মেন্ট নিয়ে জমা দিয়েছি। তারপর থেকে ভিসার অপেক্ষা করছি। শুনেছিলাম ২১ দিনের ভেতরে ভিসা হোক আর না হোক পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হয়। কিন্তু এত মাস হয়ে গেলেও ভিসা হবে কিনা সেই খবরও পাচ্ছি না। ভিসা সেন্টারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করলে তারা বলেন, পর্যায়ক্রমে সবার কাছে মেসেজ যাবে। তবে কবে সেই মেসেজ যাবে সেটি বলা হচ্ছে না। তাই খবর নেয়ার জন্য ঢাকায় আসতে হয়। এটা আমার জন্য ভোগান্তি। আমি ও আমার পরিবার এ নিয়ে খুব হতাশায় আছি। বড় পরিবার আমাদের। অর্থনৈতিক সচ্ছলতাও নাই। অনেক কষ্ট করে বাবা ইতালির টাকার বন্দোবস্ত করেছেন।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের রাসেল স্ত্রীর ইতালি প্রবাসী ভাইয়ের মাধ্যমে ১৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থা করেছেন। যদিও কথা ছিল তাকে স্পন্সর ভিসা দেয়া হবে। ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার পর সকল কাগজপত্রসহ ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভিসার আবেদন করে এখনো অপেক্ষা করছেন। রাসেলের ভাই কাতার প্রবাসী রাশেদ বলেন, আমার ভাই ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবসা করতেন। ব্যবসা ভালো না যাওয়াতে সিদ্ধান্ত নেন ইউরোপে চলে যাবেন। ভাবীর বড়ভাই ইতালি থাকেন। তিনি বলেছিলেন ১৭ লাখ টাকা লাগবে তবে স্পন্সর ভিসার ব্যবস্থা করা যাবে। আমরা সেই আশাতেই তাকে ১২ লাখ টাকা দিয়েছি। কিন্তু যখন কাগজ হাতে পেলাম তখন দেখলাম এটা কৃষি কাজের ভিসার পারমিট। পরে সেটা দিয়েই ভিসার আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু মাসের পর মাস যাচ্ছে ভিসা হচ্ছে না। ভাই ইতালির আশায় ব্যবসাও বন্ধ করে দিয়ে এখন বেকার সময় কাটাচ্ছেন। আমিও অনেকদিন হলো দেশে চলে এসেছি। সবমিলিয়ে আমাদের পরিবারের সদস্যরা অপ্রত্যাশিত চাপে আছি। চিন্তায় আছি যদি পারমিটের মেয়াদ চলে যায়।  
বিক্রমপুরের কসমেটিক ব্যবসায়ী দীপ্ত মণ্ডল। বাবা-মাকে নিয়েই তার সংসার। চাচার সঙ্গে কসমেটিকের দোকানে ব্যবসা করেন। একসময় তিনি কাতারে ছিলেন। সেখানে ভালো বেতনে চাকরি করতেন। করোনা মহামারির সময় দেশে ফিরে আসেন। তারপর থেকে ব্যবসা করছেন। বোনের স্বামীর পরিচিত মতিঝিল এলাকার একটি ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ইতালির ওয়ার্ক পারমিটের চুক্তি করেন। ১২ লাখ টাকা দিয়ে করা এই চুক্তির কিছুদিনের মাথায় তার নামে ওয়ার্কম পারমিট বের হয়। তারপর আগস্ট মাসে ভিসার আবেদন করে জমা দেন। আগস্ট থেকে-মে দীর্ঘ এই সময় তিনি ভিসার অপেক্ষা করছেন। প্রায় ১০ মাসে অসংখ্যবার তিনি বিক্রমপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন ভিসার খবর নেয়ার জন্য। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ইতালির আশায় অন্য কোনো দেশেও যেতে পারছি না, কোনো ব্যবসা বাণিজ্য ভালোভাবে করতে পারছি না। দোকান থেকে যে ইনকাম আসে সেটি দিয়ে পরিবারের ব্যয় মিটছে না। তাই ইতালি দূতাবাসের প্রতি অনুরোধ যত দ্রুত সম্ভব আমাদের পাসপোর্ট যেন ফেরত দেয়া হয়।

ইতালির পারমিটের জন্য ১২ লাখ টাকা চুক্তি করে ৮ লাখ টাকা সাবেক এক সহকর্মীকে দিয়েছেন মোবাইল সেট কোম্পানি ভিভোর মার্কেটিং ম্যানেজার বরিশালের বাসিন্দা জুয়েল। বাকি টাকা ভিসা হওয়ার পরে দিবেন। সেই সহকর্মী ইতালির একজনের মাধ্যমে পারমিট বের করেছে গত বছরের আগস্ট মাসে। জুয়েল বলেন, ওই মাসে আমি নিয়ম মেনেই ভিসার আবেদন করেছি। ইতালি থেকেও বলে দিয়েছিল সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে ভিসা হয়ে যাবে। ১০ মাস পরেও জানতে পারছি না কবে ভিসা বা পাসপোর্ট ফেরত পাবো। আরেক ভুক্তভোগী রাজবাড়ীর চঞ্চল শিকদার। একটি কলেজে অনার্স চতুর্থ বর্ষে লেখাপড়া করছেন। জীবিকার সন্ধানে তিনিও ইতালি যেতে চান। তাই ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে এক মিডিয়ার মাধ্যমে ওয়ার্ক পারমিট বের করে ভিসার আবেদন করেছেন সেপ্টেম্বর মাসে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত রাজবাড়ী থেকে গুলশানে একাধিকবার এসে হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেন, অনেক অপেক্ষা করেছি। আর কতো অপেক্ষা করবো? আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে পাসপোর্ট তুলে নিবো। মুন্সীগঞ্জ সদরের বাসিন্দা ইমরান বলেন, আমি এবং আমার ভাই ইরাকে থাকতাম। একসময় মনে হলো ইউরোপের কোনো দেশে গেলে হয়তো ইনকাম আরও ভালো হবে। সেজন্য গ্রামের এক চাচা পারমিটের ব্যবস্থা করে দেন। ইরাকে আমার ভালো চাকরি ছিল। ভালো বেতন পেতাম। ইতালির জন্য দেশে চলে আসি। আসার সময় ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে এনেছিলাম। কিন্তু এখন ইরাকের ভিসার মেয়াদও চলে গেছে। এদিকেও কোনো খবর নাই। সবমিলিয়ে খুব হতাশার মধ্যে আছি। কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। ভৈরবের বাসিন্দা হানিফ বলেন, আমি আমার ভাইয়ের ভিসার খবর নিতে এসেছি। বড়ভাই ব্যবসা করতেন। ইতালির পারমিট পাওয়ার পর ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষায় আছেন কবে ভিসা হবে। কিন্তু ৮ থেকে ৯ মাস অপেক্ষা করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। 

ইতালি দূতাবাসের সামনে গত মাসে বিক্ষোভ করেন দেশটিতে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিরা। ভিসা দিতে সময় ক্ষেপণ করায় তারা তাদের পাসপোর্ট ফেরত পাওয়ার জন্য বিক্ষোভ করেন। ওই বিক্ষোভে শত শত ভুক্তভোগী প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে অবস্থান করেন। তাদের অনেকের অভিযোগ ছিল স্পন্সর নিয়ে ভিএফএস গ্লোবালের মাধ্যমে ভিসার আবেদন করে পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন তারা। কিন্তু বছর পার হওয়ার পরও তারা ভিসা বা পাসপোর্ট কিছুই ফেরত পাচ্ছেন না। এদের মধ্যে অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের প্রবাসী ছিলেন। তাদের পাসপোর্টে ওইসব দেশের ভিসা ছিল। কিন্তু পাসপোর্ট পেতে দেরি হওয়াতে তাদের ওই ভিসার মেয়াদও চলে গেছে। তাদের অভিযোগ, ভিসার জন্য পাসপোর্ট ও কাগজপত্র জমা দেয়ার ক্ষেত্রে ভিএফএস থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় না। এ ছাড়া কিছু সময়ের জন্য সুনির্দিষ্ট সময়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিংয়ের স্লট খুলে দেয়া হয়। অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিংয়ের জন্য আগে থেকে যারা ভিএফএসকে অর্থ দিয়ে রেখেছেন, তারাই সে সময়টি জানেন এবং সে সময়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পান। এসব অ্যাপয়েন্টমেন্টের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায়, যার কাছ থেকে যত পারে, তত টাকা আদায় করা হচ্ছে। এ ছাড়া ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দূতাবাস মাসের পর মাস পাসপোর্ট আটকে রাখছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। সূত্রগুলো বলছে, ইতালি দূতাবাস থার্ডপার্টি ভিএফএস গ্লোবাল নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইতালি যেতে ইচ্চুক বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে ভিসা প্রসেস করে। সাম্প্রতিক সময়ে পারমিটধারীদের ভিসা জট লাগায় দূতাবাস ভিএফএস গ্লোবালকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা সাক্ষাৎসূচি পদ্ধতি পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে। যাদের কাছে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে, তারা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন। ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবাইকে ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে ভিসা সাক্ষাৎসূচি বুকিংয়ের জন্য কোনো ধরনের অর্থ খরচ না করতেও পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

পাঠকের মতামত

শেফ রায়হান সাহেব এতো আগেই চাকরি ছেড়ে বড়ই ভুল করেছেন। সব নিশ্চিত হবার পর এটা করা উচিৎ ছিল। ইতালি এখন আর মধু মাখা নয়। হোয়াইট কলার জব ছাড়া বড়ই কস্টের জীবন। আমার তিনবার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

এস ইউ জামান
৮ মে ২০২৪, বুধবার, ৬:০৭ অপরাহ্ন

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

   

প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status