ঢাকা, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, মঙ্গলবার, ২৪ মাঘ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৫ রজব ১৪৪৪ হিঃ

শরীর ও মন

শরীরের যতো দুর্গন্ধ

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল হাই
২১ জানুয়ারি ২০২৩, শনিবার

প্রতিটি মানুষের শরীরে নিজস্ব একটা গন্ধ থাকে। তাই সন্তান না দেখেও মায়ের গন্ধ ঠিকই টের পায়। মূলত অনেকগুলো বিষয়কে নির্ভর করে মানুষের শরীরের নিজস্ব গন্ধ তৈরি হয়Ñ ত্বকে ঘামের পরিমাণ, বিপাক প্রক্রিয়া, শরীরের সচরাচর উপস্থিত থাকা ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাসসহ অণুজীব ইত্যাদি। কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে শরীরে অস্বাভাবিক গন্ধ বা দুর্গন্ধের সৃষ্টি হতে পারে। আসুন জেনে নেই দুর্গন্ধের কিছু কারণ:
নাভি মূল 
গবেষণায় দেখা গেছে, সত্তরেরও অধিক ব্যাকটেরিয়ার শুধুমাত্র নাভিমূলে বসবাস করে। ঠিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকলে অনেকেরই এ স্থান থেকে গন্ধ ছড়ায়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এ স্থানে ইনফেকশনের কারণে দুর্গন্ধ তৈরি হয়।
কান
কানে ওয়াক্স বা ময়লা জমা স্বাভাবিক। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ময়লা নিজে নিজেই দূরীভূত হয়ে যায়, তবে যখন এ জায়গা থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায় বা এ জায়গা ভেজা ভেজা মনে হয়, তখন বুঝতে হবে ইনফেকশন হয়ে গেছে, গন্ধ ও তখন বেড়ে যায়।
মুখ গহ্বর 
এটা শরীরের অন্যতম জীবাণুবহুল জায়গা। সেলিভা বা থুথু মুখের ব্যাকটেরিয়াগুলোকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করার কাজ করে। সকালে খালি মুখে একটু গন্ধ থাকবেই কারণ ঘুমের মধ্যে শরীরে থুথু বা সেলিভা কম তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপন
বেশিক্ষণ ক্ষুধার্ত থাকলে বা অনেকক্ষণ পানি পান না করলেও এরকম সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। সাধারণত মুখ-গহ্বরে খাবারের স্পর্শ বা খাবার চিবাতে শুরু করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবেই থুথু তৈরি হয়।
শ্বাস-প্রশ্বাসের গন্ধ
শারীরিক নানা বিপত্তিতেই শ্বাস-প্রশ্বাসে দুর্গন্ধ হতে পারে। এমনকি দাঁতের মাড়িতে প্রদাহ, অতিরিক্ত এসিডিটি ও সাইনাসে সংক্রমণের কারণেও এ সমস্যা হতে পারে
মল ও পায়ুগামী বায়ু
মল বা পায়খানায় সব সময়ই কিছু ব্যাকটেরিয়া ও গ্যাসজাতীয় বস্তুকণার মিশ্রণ থাকে যা দুর্গন্ধের জন্য যথেষ্ট। তবে ক্ষেত্রবিশেষে সেই গন্ধ তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যেমন অন্ত্রনালীতে জিয়ারডিয়াসিস সংক্রমণ। আবার অন্য বেশকিছু পেটের রোগের সঙ্গেও দুর্গন্ধের সম্পর্ক রয়েছে। পায়ুগামী বায়ু যখন নির্গত হয়, তখন সশব্দেই গন্ধ দূষণ হয়। মলের সঙ্গে যেহেতু সম্পর্কযুক্ত তাই এখানে দুর্গন্ধ থাকবেই। তবে কিছু কিছু নিঃশব্দ বায়ুপাত রয়েছে, যা সত্যি সত্যি পীড়াদায়ক ও ভয়ঙ্কর। বৃহদান্ত্রিক ভেতরের ব্যাকটেরিয়া যখন একটু সময় নিয়ে গাজন হয়, তখনই তীব্র গন্ধযুক্ত এ বায়ুপাতের সৃষ্টি হয়। একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৩ থেকে ২১ বার পায়ু পথ দিয়ে বায়ুপাত করেন। এটা স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়া। কারণ আমরা প্রতিদিন খাবারের সাথে বেশকিছু বাতাসও গিলে ফেলি। বায়ুপাতের অন্যতম কারণ এটাই। যাই হোক, কিছু কিছু খাবার যেমন শিম বা পেটের কিছু রোগে এ গন্ধ বিশ্রীরকম তীব্র হতে পারে।
ঘাম 
ব্যায়াম, তীব্র গরম বা মানসিক চাপেও শরীরে অত্যধিক ঘামের সৃষ্টি হতে পারে। ঘামের কিন্তু নিজস্ব কোনো দুর্গন্ধ নেই, ঘাম যখন ত্বকের অণুজীবের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক ধরনের এনজাইম তৈরি করে, তখনই ঘামের বস্তুকণাগুলো ভেঙে গিয়ে দুর্গন্ধের সৃষ্টি করে।
প্রস্রাব
প্রস্রাব মূলত পানি ও শরীর নিঃসৃত বর্জ্যরে সংমিশ্রণ। যে প্রস্রাবে পানির পরিমাণ বেশি, সেখানে গন্ধ কম। অ্যামোনিয়ার মতো কিছু গন্ধ যখনই প্রস্রাবে উপস্থিত থাকে, তখনই বুঝতে হবে পানি বেশি পরিমাণ খেতে হবে। কিছু কিছু খাবার ও ভিটামিন জাতীয় ওষুধ প্রস্রাবের গন্ধ পরিবর্তিত হতে পারে।
যৌনাঙ্গ 
পুরুষ ও নারী উভয়ের যৌনাঙ্গেই কিছু গন্ধ থাকতেই পারে। পুংলিঙ্গে যাদের খতনা করা নেই, তাদের আগার চামড়ায় মরা কোষ ও নিঃসৃত রস মিলে পনিরের মতো এক ধরনের বস্তুর সৃষ্টি হয়, যা দুর্গন্ধসম্পন্ন। পানি ও সাবান দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করলে এ সমস্যা থাকে না। আবার অণ্ডথলি ও উরুর মধ্যে ক্রমাগত ঘর্ষণের ফলে কুঁচকিতে অতিরিক্ত ঘামের সৃষ্টি হয়, যা দুর্গন্ধের অন্যতম কারণ। নারীদের যোনিতেও গন্ধ থাকে। কিছু গন্ধ প্রাকৃতিক। যৌনতা, মাসিক স্রাব ও ঘামের মতো কিছু ফ্যাক্টর সময়ে সময়ে গন্ধের পরিবর্তন ঘটায়। তবে যাদের দুর্গন্ধের সঙ্গে যোনিতে চুলকানি ও নিঃসরণের মতো সমস্যা থাকে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। ব্যাকটেরিয়াল ভ্যাজাইনোসিস, ক্যান্টিডিয়াসিস ও কিছু যৌন রোগে এখানে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হতে পারে।
পায়ের গন্ধ
যাদের পা অতিরিক্ত ঘামে, যারা একই জুতা প্রতিদিন ব্যবহার করেন, তাদের পায়ে গন্ধ থাকে। অনেকেরই পায়ের আঙুলের ফাঁকে সংক্রমণ হয়ে গন্ধ আরো তীব্র আকার ধারণ করে। নিয়মিত একটি এন্টিবায়োটিকযুক্ত সাবান দিয়ে ধৌতকরণ, প্রতিদিন পরিষ্কার মোজা পরিধান এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সারকথা হচ্ছে, মানুষের শরীরের নিজস্ব কিছু গন্ধ থাকবেই। কিছু গন্ধ মেনে নেয়াই উচিত। তীব্র দুর্গন্ধের ক্ষেত্রে ডিওডোরেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে এবং একইসঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো শরীরের যেকোনো গন্ধকেই পরিত্যাজ্য বা দূষণীয় বলে প্রচার করার চেষ্টা করে। এর পেছনে ব্যবসায়িক দূরভিসন্ধিই কাজ করে। একজন শ্রমিকের সারা দিনের পরিশ্রমের ফলে ঘামভেজা শরীর বা সারাদিন কাজের পর মায়ের শরীরের যে গন্ধ, সেটা অনেক পারফিউমের চেয়েও ভালো।
 

লেখক: (চর্ম, যৌন ও এলার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ) জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। চেম্বার: ১২, স্টেডিয়াম মার্কেট, সিলেট। ফোন-০১৭১২-২৯১৮৮৭

 

শরীর ও মন থেকে আরও পড়ুন

শরীর ও মন সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status