ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, শুক্রবার, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১২ শাবান ১৪৪৫ হিঃ

শরীর ও মন

লিভার সিরোসিসের আধুনিক চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে

ডা. এম এ হক
১২ জানুয়ারি ২০২৩, বৃহস্পতিবার
mzamin

আমাদের পেটের উপরের অংশের ডানদিকে লিভারের অবস্থান যা দেহের বিপাক ক্রিয়াসহ শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খাদ্যের অতিরিক্ত গ্লুকোজ লিভারে গ্লাইকোজেন হিসেবে সঞ্চিত থাকে, যা পরবর্তীতে আমাদের শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয়। লিভার শরীরের অতি প্রয়োজনীয় অ্যালবুমিন এবং অন্যান্য প্রোটিনের মূল জোগানদাতা। রক্ত তরল রাখার বেশ কিছু উপাদান লিভার থেকে তৈরি হয়। আমাদের শরীরের অনেক দূষিত উপাদান, বর্জ্য, ওষুধের বিপাকজনিত বর্জ্য বের করে দিতেও লিভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাজেই লিভার সিরোসিস হলে লিভারের সব কাজ ব্যাহত হয়। লিভার সিরোসিস নানা ধরনের উপসর্গ নিয়ে উপস্থিতি জানান দিতে পারে। ক্লান্তি,  দুর্বলতা, অরুচি, ওজন হ্রাস এসবই প্রাথমিক লক্ষণ। কখনো জন্ডিস এত মৃদু হয় যে, রুটিন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হঠাৎ লিভার ফাংশন টেস্ট করলে লিভার সিরোসিস ধরা পড়ে।

লিভার সিরোসিস:

লিভার সিরোসিস একটি মারাত্মক রোগ হলেও এটি নিরাময়যোগ্য। লিভারের নানারকম রোগের মধ্যে এটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ের একটি রোগ বলে গণ্য করা হয়।

বিজ্ঞাপন
লিভার সিরোসিস লিভারের দীর্ঘস্থায়ী রোগের ফল যা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত থেকে সৃষ্টি হতে পারে এবং মারাত্মক পর্যায়ের সিরোসিসে লিভারের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে মৃত্যুও হতে পারে। লিভার সিরোসিসের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লিভারের সুস্থ-সবল টিসু বা কোষগুলো আক্রান্ত হয়ে ক্ষয়যুক্ত টিসু বা নডিউলে রূপান্তরিত হয়। ফলে, লিভার তার কাজ যেমন: বিপাক ক্রিয়া, খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের ব্যবস্থাপনা, রক্ত জমাট বাঁধার উপকরণ তৈরি, ওষুধ ও রাসায়নিকের শোষণ ইত্যাদি সঠিক ভাবে করতে পারে না। লিভার সিরোসিস হলে লিভার সূক্ষ্ম সুতার জালের মতো ফাইব্রোসিসের বিস্তার ঘটে। লিভারে ছোট ছোট দানা বাঁধে, আস্তে আস্তে সেটির বিস্তার ঘটতে থাকে। এক পর্যায়ে সম্পূর্ণ লিভারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন লিভার আর নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে না, ফলে লিভার সংকুচিত হয়ে পড়ে।

লিভার সিরোসিসের কারণ:
সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাসের আক্রমণে লিভারের কার্যক্রম সংকুচিত হয়। এ ছাড়াও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, অতিরিক্ত মদপান, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ইচ্ছামত ওষুধ সেবন, অস্বাস্থ্যকর খাবার-পানীয়, খোলা শরবত, কেমিক্যালযুক্ত ফল, অনিরাপদ যৌন মিলন, একই সুচ-সিরিঞ্জ ব্যবহার, সেলুনের কাঁচি, রেজার ইত্যাদি জীবাণুমুক্ত না করে ব্যবহারের মাধ্যমে হেপাটাইটিস হয়ে লিভার সিরোসিস রোগ হতে পারে। লিভার সিরোসিস আর লিভারের ক্যান্সার এক রোগ নয়। তবে লিভার সিরোসিস থেকে লিভারের ক্যান্সার হতে পারে।

লিভার সিরোসিসের লক্ষণ:
লিভার সিরোসিসের শুরুর দিকে তেমন উপসর্গ থাকে না। অনেক সময় পেটের আলট্রাসাউন্ড কিংবা পেটে অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে এই রোগটি ধরা পড়ে। রক্ত পরীক্ষা, বায়োপসি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমেও রোগটি শনাক্ত হতে পারে। তবে, কিছু লক্ষণ দেখা গেলে লিভার সিরোসিসের বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। যেমন: শারীরিক দুর্বলতা, খাবারে অরুচি, পেটে অস্বস্তি, ওজন কমে যাওয়া, অবসাদ ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। লিভার সিরোসিস হলে পেটে বা পায়ে পানি আসতে পারে, চোখ ও প্রস্রাব হলুদ হতে পারে। অনেকে জ্ঞান হারিয়ে কোমায়ও চলে যেতে পারেন।

চিকিৎসা:
সাধারণত লিভার সিরোসিস হলে বিশেষজ্ঞগণ লিভার ট্রান্সপ্লাটের পরামর্শ দেন। তবে, নির্ভরযোগ্য বিকল্প চিকিৎসা থাকলে কেন লিভার ট্রান্সপ্লাটের মতো জটিল এবং ব্যয়বহুল অপারেশনের ঝুঁকি নিব? বিকল্প চিকিৎসাসেবা অর্থাৎ হোমিওপ্যাথিতে লিভার সিরোসিস ভালো হয় একথা সকলেই জানেন। এজন্য প্রয়োজন লিভার সিরোসিস চিকিৎসায় অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। চিকিৎসক রোগীকে বিনা অপারেশনে এবং কম খরচে ঝুঁকিমুক্তভাবে সুস্থ করে তুলবেন- এটাই সকলের কাম্য। চিকিৎসা শুরু করলে যদি রোগীর কষ্ট কমতে থাকে, হজমক্রিয়া ঠিকমতো চলতে থাকে এবং শরীরের শক্তি স্বাভাবিক হতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে চিকিৎসা সঠিক হচ্ছে। এ ছাড়াও প্রয়োজন মনে করলে লিভারের স্ক্যান অথবা এম.আর.আই করেও চিকিৎসার অগ্রগতি দেখে নিতে পারেন। লিভার বা যকৃত যেহেতু অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সেহেতু চিকিৎসক নির্বাচনের সময় অবশ্য গুরুত্ব দিতে হবে। লিভার সিরোসিস চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথির সফলতা এবং ঝামেলামুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতিতে আকৃষ্ট হয়ে ক্রমেই এই চিকিৎসার প্রতি  রোগীদের আস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

লিভার সিরোসিসের চিকিৎসায় রোগীর ‘মায়াজমের’ দিকে খেয়াল রেখে আমি প্রধানত: থুজা, মেডোরিনাম, সিফিলিনাম, টিউবারকুলিনাম, কার্সিনোসিন, সোরিনাম, সালফার, ক্যালকেরিয়া-কার্ব, ক্যালকেরিয়া-ফস, ক্যালকেরিয়া-ফ্লোর, মার্কসল, ন্যাট্রাম-মিউর, ন্যাট্রাম-সালফ, বার্বরিস, লাইকোপডিয়াম ইত্যাদি ওষুধ ব্যবহার করি। এ ছাড়াও চিকিৎসার পাশাপাশি লাইফস্টাইল ও খাদ্য-খাবার সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান করি যা অসুস্থ লিভারের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য সহায়ক হয়। অতএব, লিভার সিরোসিসের আধুনিক চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই হচ্ছে।

লেখক: পিএইচ.ডি (স্বাস্থ্য), এম. ফিল (স্বাস্থ্য), ডিএইচএমএস। জটিল ও দুরারোগ্য রোগীর অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও গবেষক। 
চেম্বার: ড. হক হোমিও ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড রিসার্র্স সেন্টার, বিটিআই সেন্ট্রা গ্রান্ড, গ্রাউন্ড ফ্লোর (জি-৪), ১৪৪ গ্রীন রোড, পান্থপথ, ঢাকা। মোবাইল: ০১৭১২-৪৫০ ৩১০

 

শরীর ও মন থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2023
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status