দেশ বিদেশ
সেই সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের নির্দেশনায় চট্টগ্রামে ডাবল মার্ডার
জালাল রুমি, চট্টগ্রাম থেকে
৩ এপ্রিল ২০২৫, বৃহস্পতিবার
চট্টগ্রাম নগরে প্রাইভেটকারে ‘ব্রাশফায়ার’ করে দু’জনকে খুনের ঘটনায় ৭ জনের নাম উল্লেখপূর্বক ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলায় সমপ্রতি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্নাকেও আসামি করা হয়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সন্ত্রাসী সাজ্জাদকে গ্রেপ্তারে পুলিশকে সহযোগিতার অভিযোগে সন্ত্রাসী সাজ্জাদের স্ত্রী তামান্নার নির্দেশনায় এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের ৩ দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করতে পারেনি। ১লা এপ্রিল সন্ধ্যায় নিহত বখতিয়ার হোসেন মানিকের মা ফিরোজা বেগম বাদী হয়ে নগরীর বাকলিয়া থানায় মামলাটি করেছেন। মামলায় সাজ্জাদ, তার স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না ছাড়াও মোহাম্মদ হাছান, মোবারক হোসেন ইমন, খোরশেদ, রায়হান ও বোরহানকে আসামি করা হয়েছে। তা ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ছয়-সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, আসামি সাজ্জাদ এবং তার স্ত্রী তামান্নার পরিকল্পনা অনুযায়ী আসামিরা সারোয়ার হোসেন বাবলা ও অন্যদের হত্যা করার জন্য নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে প্রাইভেটকারটির পিছু নেন।
এজাহারে বলা হয়, সারোয়ার হোসেন বাবলার গাড়িচালক ছিলেন গুলিতে নিহত মানিক। আর সারোয়ারের ব্যক্তিগত কাজকর্ম করতেন নিহত আবদুল্লাহ। গত ২৯শে মার্চ রাতে প্রাইভেটকারে করে নতুন ব্রিজ এলাকায় আড্ডা দিচ্ছিলেন মানিক, সারোয়ার, আবদুল্লাহ, রবিন, হৃদয় ও ইমন। নতুন ব্রিজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় রাত ২টার দিকে রাজাখালী ব্রিজে পৌঁছামাত্র ছয়-সাতটি মোটরসাইকেল থেকে প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গুলিতে গাড়ির পেছনের গ্লাস ছিদ্র হয়ে যায়। তখন মানিক বহদ্দারহাটের দিকে না গিয়ে বাকলিয়া এক্সেস রোড দিয়ে চকবাজারের দিকে যান। রাত সোয়া ২টার দিকে চকবাজার থানার নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কে মানিক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গাড়ি থামানো হয়। গাড়ির পেছনে থাকা হাছান, ইমন, বোরহান, খোরশেদ, রায়হানসহ অজ্ঞাতপরিচয় ছয়-সাতজন তাদের হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করেন। গুলিতে মানিক ও আবদুল্লাহ জখম হন। গাড়িতে থাকা সারোয়ার এবং ইমন কৌশলে নেমে যান। এরপর গুলি ছুড়তে থাকা ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। মানিক ও আবদুল্লাহকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ব্যাপারে সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না বলেন, আমি ২ মাসের সন্তান সম্ভবা। আমার অপরাধ একজনকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছি। সবাই বলছে, আমার স্বামীকে ধরিয়ে দেয়ায় নাকি প্রতিশোধ নিয়েছি। আমার স্বামীকে তো সরোয়ার ধরিয়ে দেয়নি। ধরিয়ে দিয়েছে সূচী নামে এক মেয়ে। বালুমহালে বড় সাজ্জাদ ও সরোয়ার ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তাদের আধিপত্য নিয়ে এই ঝামেলার সৃষ্টি হয় বলে আমি জানতে পারি। বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, প্রাইভেটকারে ব্রাশফায়ার করে দুইজনকে খুনের ঘটনায় ৭ জনের নাম উল্লেখ করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে নিহত চালক মানিকের মা একটি মামলা করেছেন। তবে এপর্যন্ত ওই মামলার কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে কি-না জানতে চাইলে ওসি বলেন, ওইভাবে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে কয়েকটি বিষয় সামনে নিয়ে আমরা এগুচ্ছি। আশা করি, শিগগিরই আমরা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের চিহ্নিত করতে পারবো। এর আগে গত রোববার ভোরে নগরীর বাকলিয়া নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে চন্দনপুরা এলাকা পর্যন্ত একটি প্রাইভেটকার লক্ষ্য করে গুলি করতে করতে ধাওয়া করে একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। এতে বখতিয়ার হোসেন মানিক ও মো. আব্দুল্লাহ নামের দুইজন গাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। বখতিয়ার হোসেন মানিক ছিলেন ওই প্রাইভেটকারের চালক। আর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ছিলেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলার দেহরক্ষী। ঘটনার সময় সন্ত্রাসী সারোয়ার ওই গাড়িতেই ছিলেন ও গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কৌশলে বেঁচে যান। মূলত তাকে লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়। এই ঘটনায় প্রাইভেটকারে থাকা আরও দুইজন আহত হয়েছেন।
এদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রবিন নামের গুলিবিদ্ধ একজন জানিয়েছিলেন, সাজ্জাদের সঙ্গে সারোয়ারের আগে থেকে দ্বন্দ্ব ছিল। সমপ্রতি সাজ্জাদের গ্রেপ্তার এবং রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দু’জনের মধ্যে ঝামেলা বেড়েছে। তাই সাজ্জাদের লোকজন সারোয়ারকে খুন করতে এ হামলা চালাতে পারে।
নিহত আবদুল্লাহর মা রাশেদা বেগম জানিয়েছিলেন, মাস দু’য়েক আগে ছোট সাজ্জাদ রাউজানে তার ছেলের পায়ে গুলি করেছিল। তাই দুই মাস সে ঘর থেকে বের হতে পারেনি। ঈদের মার্কেট করার জন্য দুই মাস পর ওইদিন বের হয়েছিলেন আবদুল্লাহ।
নিহতদের সবাই নগরীর অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী সারোয়ার বাবলার কর্মী। সন্ত্রাসী বাবলা বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী বলে পরিচিত। আসলাম চৌধুরীর বালুমহাল থেকে ফেরার পথেই তারা প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়েছেন। আর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা রাউজান-রাঙ্গুনিয়াকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী খোরশেদ, হাসান ও রায়হানের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের কর্মী।
এদিকে আরেকটি সূত্র জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘বড়’
সাজ্জাদও জড়িত। সমপ্রতি বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছোট সাজ্জাদকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ওই গ্রেপ্তারে সারোয়ার বাবলা পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন বলে কথিত আছে। সেই ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে এই হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। এছাড়া নতুন ব্রিজ এলাকায় একটি বিরোধপূর্ণ জায়গার দখল নিয়ে নগর বিএনপি’র সাবেক এক শীর্ষ নেতার অনুসারী বলে পরিচয় দেয়া ছাত্রদলের এক সহ-সম্পাদক এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছে।