ঢাকা, ৩ এপ্রিল ২০২৫, বৃহস্পতিবার, ২০ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৩ শাওয়াল ১৪৪৬ হিঃ

দেশ বিদেশ

শোলাকিয়ায় রেকর্ড ৭ লাখ মুসল্লির নামাজ আদায়

স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে
৩ এপ্রিল ২০২৫, বৃহস্পতিবারmzamin

মিষ্টি রোদ আর বসন্ত বাতাসের মেলবন্ধনে মনোরম ও স্নিগ্ধ এক সকাল দেখে শোলাকিয়া। প্রকৃতির এই নিবিড় আতিথেয়তা নিয়ে শোলাকিয়া অভিমুখে ঢল নামে মুসল্লিদের। জামাত শুরু হওয়ার দেড়ঘণ্টা আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় প্রায় ৭ একর আয়তনের শোলাকিয়া ময়দান। তখনো শোলাকিয়ার পথে পথে মুসল্লিদের স্রোত। ঈদগাহ্‌ ময়দানে জায়গা না পেয়ে তারা ছড়িয়ে পড়েন পাশের সড়ক, পুকুরপাড়, নরসুন্দা নদীর তীর, শোলাকিয়া সেতু, আশপাশের এলাকা ও সড়ক এবং বাসাবাড়ির ছাদ ও উঠানে। সকাল ১০টায় যখন এবারের ১৯৮তম জামাত শুরু হয়, তখনও চলছিল ঈদগাহমুখী মুসল্লিদের ঢল। মহান রবের রহমত কামনা যেন ব্যাকুল করে তোলে মুসল্লিদের। শোলাকিয়া ময়দানে এত বিপুলসংখ্যক মুসল্লির সমাগম ছিল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। লাখো কণ্ঠের আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ঈদগাহ এলাকা। 

প্রতিবারের মতো এবারও শোলাকিয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাতে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ ছুটে আসেন। দেশের সর্ববৃহৎ এ জামাতে অংশগ্রহণ করতে সকাল থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত শোলাকিয়া ঈদগাহের উদ্দেশ্যে। ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে আসা দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লির ভিড়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় শোলাকিয়া ময়দান। সকাল ১০টায় রেকর্ড সাত লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে জামাত শুরু হওয়ার আগে রেওয়াজ অনুযায়ী ১৫, ৫ ও ১ মিনিট আগে শর্টগানের ফাঁকা গুলির আওয়াজ করে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেয়া হয়। ফ্যাসিবাদী জমানায় শোলাকিয়া ঈদগাহ্‌ ময়দানে ইমাম হিসেবে ইসলাহুল মুসলিহীন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ দায়িত্ব পালন করলেও এবার মুতাওয়াল্লি নিযুক্ত স্থায়ী ইমাম শহরের বড়বাজার জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহকে পুনর্বহাল করা হয়। এছাড়া বিকল্প ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান হয়বতনগর এ ইউ কামিল মাদ্রাসার তাফসির বিভাগের প্রভাষক যোবায়ের ইব্‌নে আব্দুল হাই। জামাত শুরুর আগে গ্র্যান্ড ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ এবং বিকল্প ইমাম যোবায়ের ইব্‌নে আব্দুল হাই বয়ান করেন। জামাতে ইমামতি করেন গ্র্যান্ড ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ। জামাত শেষে ইমাম তার বয়ানে শোলাকিয়া ময়দানের প্রয়াত মুসল্লিদের ও ফিলিস্তিনে নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য দোয়া ও দেশের শান্তি, উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। এছাড়া প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মুসলমান, আরাকানের মুসলমান, চেচনিয়ার মুসলমান, মধ্য আফ্রিকার মুসলমান এবং ফিলিস্তিনের গাজার মুসলমানদের দুরবস্থার পরিত্রাণ কামনা করে তিনি বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। মোনাজাতে ইমাম মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের জন্য আল্লাহ্‌র সাহায্য কামনা করেন। লাখ লাখ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অটুট থাকা এবং পাপ থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করেন তিনি। এ সময় লাখো মুসল্লির উচ্চকিত হাত আর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আমীন, আমীন ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো ঈদগাহ এলাকা।

১৮২৮ সালে অনুষ্ঠিত ঈদের প্রথম বড় জামাতের হিসাব অনুযায়ী শোলাকিয়া ময়দানে এবার ছিল ১৯৮তম ঈদ জামাত। জামাতকে কেন্দ্র করে এবার নেয়া হয় পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠে স্থাপন করা হয় ৬টি ওয়াচ টাওয়ার। ৬৬টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হয় ঈদগাহ ময়দান, আশেপাশের এলাকা এবং অলিগলিসহ মাঠ সংলগ্ন চারপাশ। পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় এবারো যুক্ত ছিল ড্রোন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শোলাকিয়ার ঈদজামাতকে ঘিরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী টহল কার্যক্রম পরিচালনা করে। পাঁচ প্লাটুন বিজিবি, শতাধিক র‌্যাব এবং পুলিশের ১১০০ সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেড় হাজারের মতো সদস্য দিয়ে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হয় শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানকে। প্রবেশপথে স্থাপিত আর্চওয়ে দিয়ে মুসল্লিদের ঢুকতে হয় ঈদগাহ ময়দানে। এর আগে আরও অন্তত কয়েক দফা মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে মুসল্লিদের দেহ তল্লাশি করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের শুধু জায়নামাজ ও মোবাইল ফোন নিয়ে ঈদগাহে ঢুকতে দেয়া হয়।

মাঠের সুনাম ও জনশ্রুতির কারণে ঈদের বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সারা দেশের বিভিন্ন জেলা তথা ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, জামালপুর, খাগড়াছড়ি, শেরপুর, যশোর, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ অধিকাংশ জেলা থেকে শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের সমাগম ঘটে। এদের অনেকে ওঠেন হোটেলে, কেউবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। আবার অনেকেই কোথাও জায়গা না পেয়ে রাত কাটান জেলা সদরের বিভিন্ন মসজিদে। এছাড়া জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপানায় ঈদের আগের দিন আসা মুসল্লিদের রাত্রিযাপনের জন্য শহরের আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, কুমুদিনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বাগে জান্নাত নূরানী মাদ্রাসায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়। ঈদের দিন শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে চলাচল করেছে ২টি স্পেশাল ট্রেন। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে আসে এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌনে ৬টায় ছেড়ে আসে।

ঈদ জামাত শুরুর আগে ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মিজাবে রহমত এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী বিপিএম-সেবা মুসল্লিদের স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। জামাতে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক মো. রমজান আলী, জেলা খেলাফত মজলিসের সভাপতি শায়খুল হাদিস মাওলানা আব্দুল আহাদ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন।

দেশ বিদেশ থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

দেশ বিদেশ সর্বাধিক পঠিত

   
Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status