বাংলারজমিন
ঈদে বেড়ানো
চায়ের দেশের মনকাড়া জীববৈচিত্র্য
ইমাদ উদ দীন, মৌলভীবাজার থেকে
৩০ মার্চ ২০২৫, রবিবার
দু’চোখ জুড়ে কেবল দৃষ্টি নন্দন নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নানা জীববৈচিত্র্যের সমারোহ। পাহাড়ি টিলা, নদী হাওর আর চায়ের দেশ। বলা চলে সবুজের স্বর্গরাজ্য খ্যাতি এ জেলার। প্রবাসী ও পর্যটন অধ্যুষিত মৌলভীবাজারের প্রকৃতির অপরূপ রূপ মাধুর্যের কী নেই ওখানে। চোখের প্রতিটি পলকেই প্রশান্তির পরশ। এখানকার উজাড় করা ভূপ্রকৃতির অপরূপ লীলা নিকেতন এ যেন এক ব্যতিক্রমী মায়াবী দৃশ্য। ৯২টি চা বাগান, লেবু, আনারস, আগর-আতর ও রাবার বাগান, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড ও হামহাম জলপ্রপাত আর কতো কি। আর দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি ও তার জীববৈচিত্র্য। এ জেলার সৌন্দর্যবর্ধনের অন্যতম প্রাকৃতিক উপকরণ। সবুজ বন জীববৈচিত্র্য আর অনন্য প্রকৃতি। মনোমুগ্ধতার এক অন্যরকম আবেশ।
মনকাড়া চায়ের রাজ্য: বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির ফোঁটায় সজীব সতেজ দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি। আর শুষ্ক মৌসুমে আধমরা চা গাছগুলো থাকে নির্জীব। বৃষ্টি এলেই পত্রপল্লবে জীবনচক্র ফিরে। তখন কী যে অপরূপ প্রাণবন্ত প্রাণচঞ্চলতা। পাহাড়ি টিলার পরতে পরতে যেন সবুজের ঢেউ খেলা। আঁকাবাঁকা মেঠো পথে সকাল থেকেই চা কন্যারা কাজে ব্যস্ত। তাদের রপ্তকরা নিজস্ব কায়দা কৌশলে চা-পাতা চয়ন ব্যতিক্রমী শৈল্পিকতা। নানা হাড়খাটুনি কঠিন পরিশ্রমী এ মানুষগুলোর জীবন যুদ্ধের গল্প একটু ভিন্ন রকম। তাদের মানবেতর জীবনযাপনের মাঝেও আছে সমৃদ্ধ নিজস্ব সংস্কৃতি। তাদের মনোমুগ্ধকর চা নৃত্য বা কাঠি নৃত্য সমৃদ্ধ করেছে সংস্কৃতিকে। দেশে ১৬৭ চা বাগানের মধ্যে মৌলভীবাজার জেলার ৭টি উপজেলায় রয়েছে ৯২টি।
জলপ্রপাত: মাধবকুণ্ড আর হামহাম জলপ্রপাত আকৃষ্ট করে প্রকৃতিপ্রেমীদের। দেশের অন্যতম জলপ্রপাত দু’টির অবস্থান যেমন জেলার দু’টি উপজেলায়। তেমনি ব্যতিক্রমী গুণে মুগ্ধ করছে পর্যটকদের। মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত জেলার বড়লেখা উপজেলার কঠিন পাথরের পাহাড় পাথারিয়া পাহাড়ের উপর বহমান গঙ্গামারা ছড়া মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত হয়ে নিচে পড়ে, ১৬২ ফুট উপর থেকে পড়ে তা মাধবছড়া দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপর থেকে পানি নিচে পড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট কণ্ড। আর ডান পাশে সৃষ্টি হয়েছে পাথরের গুহা। ওই দৃশ্যগুলোই মাধবকুণ্ডের আর্কষণ। এডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে হামহাম জলপ্রপাতের গুরুত্ব অন্যরকম। গহীন অরণ্যের ১৩৫/১৪৭ ফুট উচ্চতার এই অনিন্দ্য সুন্দর এই জলপ্রপাতটি জেলা কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি কুরমা বনবিটে অনেকটা গোপনীয়তায় তার রূপ মাধুর্য জানান দিচ্ছে।
হাকালুকি হাওর: দেশের সবচেয়ে বড় ও এশিয়ার অন্যতম হাওর হাকালুকি। মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ৫টি উপজেলার ১৮,১১৫ হেক্টর আয়তনের অর্ধশতাধিক বিলের এই বিশাল হাওর বিপন্ন ও বিলুপ্ত প্রজাতির জলজ জীববৈচিত্র্যের নিবাস। মিঠাপানির মাছ, দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির অন্যতম আধার হাওরটি বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে মনকাড়া রূপ সৌন্দর্যে আপন করে কাছে টানে প্রকৃতিপ্রেমীদের।
বৃষ্টিবন লাউছড়া: গহীন বনে বন্যপ্রাণীর হাঁকডাক আর অবাধ বিচরণ। জীববৈচিত্র্যের সমারোহের এমন নজরকাড়া অপরূপ প্রকৃতির আধার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার জাতীয় উদ্যান। বৃষ্টি বন বা রেইন ফরেস্ট ‘লাউয়াছড়া’। দেশের অন্যতম ও জেলার একমাত্র এই জাতীয় উদ্যানটি দেশি-বিদেশি প্রকৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছে। উদ্যানের প্রবেশ পথে সারিবদ্ধ গাছ আর আঁকাবাঁকা রেলপথ আকৃষ্ট করে যে কাউকে। কি নেই ওখানে। সবুজ গাছগাছালি, বনজজঙ্গল আর লতাগুল্মের মধ্যেই নানা জাতের বন্যপ্রাণীর আপন নিবাস। সূর্যোদয় কিংবা গোধূলীলগ্নে ওখানকার বাসিন্দারা জানান দেয় এটাই তাদের আপন ভুবন। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশে অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনের একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা। বাংলাদেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে লাউয়াছড়া অন্যতম। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে সুন্দরবনের পরেই লাউয়াছড়া বনের অবস্থান। বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণী, ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছগাছালি আর লতাগুল্ম। নানা জাতের পাখি আর সবুজ প্রকৃতিতে ভরপুর ‘ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট’ হিসেবে খ্যাত লাউয়াছড়া। এ জেলার চা বাগান, অর্ধশতাধিক রাবার ও আগর বাগান, কমলা, লেবু ও আনারস বাগান, হাওর, মাধকণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, মাধপুর লেক, আলী আমজদের নবাববাড়ি, খাসিয়াপুঞ্জি ও পান চাষ, বাইক্কাবিলসহ নানা আর্কষণীয় দর্শনীয় স্থান দেখার পরও পর্যটকরা ছুটেন লাউছড়ায়। জানা যায় ১৯২৫ খিষ্টাব্দে বৃটিশ সরকারের উদ্যোগে ওখানে লাগানো হয় নানা জাতের গাছগাছালি। বনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পশ্চিম ভানুগাছ বনের ১,২৫০ হেক্টর এলাকাকে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ খিস্টাব্দে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়। জানা যায় বিশ্বখ্যাত ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইট্টিডেজ’ ছবির একটি অংশের শুটিং হয়েছিল লাউয়াছড়ায়। এ ছাড়াও মাধবপুর লেকসহ জেলা জুড়ে রয়েছে অর্ধশতাধিক ছোট বড় দৃৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পট। এবার ঈদে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করছেন এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। রয়েছে তাদের সে রকম প্রস্তুতি। পাঁচতারকা মানের দুসাই রিসোর্ট ও গ্র্যান্ড সুলতানসহ শতাধিক হোটেলমোটেল ও রিসোর্ট পর্যটক বরণে প্রস্তুত। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্র জানায়, পর্যটক বরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা এজেলায় আগত পর্যটকদের নির্বিঘ্ন সেবা দিতে প্রস্তুত।