ঢাকা, ১৯ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

প্রথম পাতা

ঢাকায় চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মিজানুর রহমান
৭ আগস্ট ২০২২, রবিবার

চীনের স্টেট কাউন্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র ঢাকা সফর নিয়ে অন্তহীন কৌতূহল। আছে রাখঢাকও। সফরটি  স্বপ্রণোদিত। ওই সফরের জন্য প্রস্তুত ছিল না ঢাকা। এশিয়ার আরও ৪টি দেশ সফরের অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ওই প্রতিনিধি বাংলাদেশে এসেছেন। ওয়াং ই এমন এক সময় ঢাকার মাটিতে পা রাখেন যখন হোস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন দেশের বাইরে। মোমেন অবশ্য ঢাকা ছেড়ে যাওয়া আগে তার অবস্থান স্পষ্ট করে গেছেন। মন্ত্রী মোমেনের দাবি ছিল ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস সেগুনবাগিচার সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সফরের অনেক কিছু ঠিক করে ফেলেছে। তার এমন বক্তব্যে খুশি হয়নি চীনা দূতাবাস। তারা বিরক্তি প্রকাশ করেছে সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপে।


সেই প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ডেমেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করেন দু’দিন আগে।

বিজ্ঞাপন
এ নিয়ে গণমাধ্যমে ব্রিফ করেন তিনি। অবশেষে শিডিউল পরিবর্তন করে শনিবার বিকালে স্পেশাল ফ্লাইটযোগে ১১ সদস্যের প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অতিথির আগমনের কারণে মন্ত্রী মোমেনও তাড়াহুড়া করে রাতেই দেশে ফিরেছেন। 

ভোরে তারা প্রাতঃরাশ বৈঠকে বসছেন
মূলত সেই ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ে হবে আনুষ্ঠানিক আলোচনা। আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন উভয় দেশের দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরাও। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সমাপনীতে গোটা পাঁচেক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে জানিয়ে সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, পূর্ব-নির্ধারিত মঙ্গোলিয়া সফরের কারণে দুপুরের আগেই ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিদায়ের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হবে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ। কর্মকর্তাদের ধারণা, ঢাকার প্রস্তুতির ঘাটতি সত্ত্বেও বেইজিংয়ের একান্ত আগ্রহে অনুষ্ঠিত ওই সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের কোনো বিশেষ বার্তা নিয়ে এসেছেন তার সরকারের প্রভাবশালী প্রতিনিধি ওয়াং ই। কিন্তু কি সেই বার্তা তা এখনো আঁচ করা যায়নি দাবি করে এক কর্মকর্তা বলেন, দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের পাশাপাশি চীনের দিক থেকে ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত সহযোগিতার আকর্ষণীয় প্রস্তাব থাকছে- এটা অনুমেয়। নিশ্চিতভাবে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সেটি স্পষ্ট হবে। মার্কিন সরকার প্রস্তাবিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি এবং ইন্দো প্যাসিফিক ইকোনমিক ফোরামে বাংলাদেশের যোগদান না করার অনুরোধ রয়েছে চীনের। বেইজিং প্রকাশ্যে এ নিয়ে ঢাকাকে নিরুৎসাহিত করছে।

সফরকালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি আলোচনার টেবিলে তুলতে পারেন এমন ধারণা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট আইপিএস এবং কোয়াডে বাংলাদেশ যোগদান করলে ঢাকার সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের অবনতি হবে এমন হুমকি আগেই দিয়েছে বেইজিং। তখন ঢাকা বলেছিল কোনো সামরিক জোটে নয় বরং ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি বা আইপিএস এর অর্থনৈতিক ফ্রন্টে থাকবে বাংলাদেশ। গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতীক্ষিত সেই অর্থনৈতিক কর্মসূচি আইপিইএফ ঘোষণা করেন। আইপিইএফ-এ ঢাকা যোগ দিচ্ছে কি-না তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওই জোটে যাতে বাংলাদেশ যোগদান না করে বরং চীনের প্রেসিডেন্ট ঘোষিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ (গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ-জিএসআই) এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের (গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ-জিডিআই) সঙ্গে যেন বাংলাদেশ সম্পৃক্ত হয় সেই তদবির চালাচ্ছে বেইজিং। জিএসআই বিশ্বে চীনের ভাবমূর্তির পাশাপাশি প্রভাব বাড়ানোর উদ্যোগ এবং জিডিআই জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি’র পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচ্য। সর্বশেষ চীনের পার্লামেন্ট ন্যাশনাল পিপল্‌স কংগ্রেসের চেয়ারম্যান লি ঝ্যাংশু স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সঙ্গে আলোচনায় জিএসআই এবং জিডিআইয়ের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। 

গত ১৯ শে জুলাই ভিডিও কনফারেন্সে অনুষ্ঠিত ওই আলোচনায় লি ঝ্যাংশু বলেন, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন বিশ্বের সব দেশের অভিন্ন উদ্বেগের বিষয়। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সারা বিশ্বের জনগণের স্বার্থে চীন জিডিআই এবং জিএসআইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। যৌথভাবে বৈশ্বিক শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ এসব উদ্যোগে সমর্থন ও সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে- এটাই প্রত্যাশা করে চীন। ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরে জিডিআই ও জিএসআইয়ের মত প্রসঙ্গগুলো আসতে পারে এটা ধরে নিয়েই প্রস্তুতি এগিয়েছে। তবে বাংলাদেশ কোভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন সংকট মোকাবিলার মতো বিষয়গুলোতে জোর দিতে চায়। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে জিডিআই, জিএসআইয়ের মতো বিষয়গুলো এলেও বিভিন্ন পরাশক্তির মাঝে যে বিষয়গুলোতে বৈরিতা চলছে, তাতে যুক্ত হওয়ার তেমন আগ্রহ ঢাকার নেই বলে স্পষ্ট করেন জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা। তিনি এ-ও বলেন, চীন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে আগ্রহী। এখন ঢাকা সফরের সময় এ নিয়ে ওয়াং ই কি বার্তা দিয়ে যান- সেদিকে নজর রাখছে বাংলাদেশ। বেইজিংয়ে ভাষা বুঝে নিজের অবস্থান তুলে ধরবে বাংলাদেশ। 

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন গণমাধ্যমকে বলেন, চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি বেশ এগিয়েছে, বাংলাদেশ প্রসঙ্গটি আলোচনায় তুলবে। ঢাকা মনে করে প্রত্যাবাসনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে রাখাইনে সহায়ক পরিবেশ ফেরানো দরকার। রাখাইনে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য মিয়ানমারের ওপর চাপ দিতে চীনকে অনুরোধ জানানো হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জোর দেয়া ছাড়াও বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করবে ঢাকা। ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্ক মুক্ত সুবিধার পরিধি বাড়ানো এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া হবে। সেই সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় যে সব প্রকল্পের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর জোর দেয়া হবে। 

চীনে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। বাংলাদেশ চীনে শতভাগ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা চাইবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি করে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের পণ্য। তার বিপরীতে আমদানি করে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের পণ্য। বাণিজ্যের ওই বৈষম্য দূর করতে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধার পরিধি বাড়ানোর অনুরোধ জানাবে। এছাড়া এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ১৪০ কোটি ডলার। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি চীনকে দেয়া হয়েছে। আনোয়ারার পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হবে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় ২৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ওই প্রকল্পগুলোতে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার দেয়ার কথা বেইজিংয়ের। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে এসব সিদ্ধান্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা হবে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত চীনের প্রকল্পগুলোর মধ্যে আটটি প্রকল্পের ঋণচুক্তি সই হয়েছে। ওই আটটি প্রকল্পের ব্যয় ৭৮০ কোটি ডলার হলেও এ পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ৩৩০ কোটি ডলার।

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

প্রথম পাতা থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status