ঢাকা, ১২ জুলাই ২০২৪, শুক্রবার, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৫ মহরম ১৪৪৬ হিঃ

প্রথম পাতা

আগামী বছর বিদ্যুতে লোকসান দাঁড়াবে ১৮ হাজার কোটি টাকা: সিপিডি

অর্থনৈতিক রিপোর্টার
২৪ জুন ২০২৪, সোমবারmzamin

দেশে এখন বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ 
চাহিদার চেয়ে এখন বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ৪৬.৪ শতাংশ বেশি। এই সক্ষমতা দেশের অর্থনীতির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ উৎপাদন না করলেও দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে দিতে হয় ক্যাপাসিটি চার্জ। এই চার্জের নামে এখন হাজার হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে সরকারের তহবিল থেকে। 

রোববার রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক ইন সেন্টারে প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ‘পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি সেক্টরে চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তাব’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এতে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য এ কে আজাদ। বক্তব্য রাখেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. ম তামিম, বাংলাদেশ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউটের রেক্টর মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম প্রমুখ। 
বক্তারা বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুতের জন্য বাড়তি খরচ (ক্যাপাসিটি চার্জ) বহন করছে সরকার।

বিজ্ঞাপন
তারা বলেন, টেকসই জ্বালানি নিশ্চিতে ব্যর্থ হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেট। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিনির্ভরতার কারণেই জ্বালানি খাতে বরাদ্দ কমেছে।

সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশে এখন বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ব্যবহার করা না গেলেও কেন উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে?  তিনি বলেন, সরকার এখন যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করেছে তা ২০৩০ সালেও প্রয়োজন হবে না। আজ থেকে ৬ বছরে চাহিদা দাঁড়াতে পারে ১৯ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। ২৫ শতাংশ রিজার্ভ ধরলে তখন ২৩ হাজার ২৫২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সক্ষমতা হলেই হয়। আবার সক্ষমতা বাড়লেও দেশে লোডশেডিং হচ্ছে। গরমে গড়ে ১১শ’ মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে। বাজেটে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত নিয়ে স্পষ্ট কিছুই নেই। সরকার এই খাত নিয়ে কী করবে তা নিয়েও সবাই অন্ধকারে। সরকারের ভুলনীতির কারণে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অব্যাহত লোকসান ২০২৫ সাল নাগাদ ১৯৬ শতাংশ বেড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াবে। 

অনুষ্ঠানে হামিম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. আজাদ এমপি বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাসের কথা বলে দাম বাড়ানো হলো, কিন্তু লোডশেডিং কমেনি। ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। ডিজেল দিয়ে, সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস এনে কারখানা চালাতে হচ্ছে। এতে খরচ বেড়ে গেছে। অনেক কারখানা বন্ধ হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকায় বিনিয়োগ আসছে না জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ২৫ শতাংশ ক্যাপিটল মেশিনারিজ আমদানি কমেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ২২ শতাংশ। বাজেটের অধিকাংশ ব্যয় অনুন্নয়ন খাতে। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক এই সভাপতি বলেন, ইউএনও, ডিসিদের জন্য হাজার কোটি টাকা খরচ করে দামি গাড়ি কেনা হচ্ছে যেখানে ভারতের মন্ত্রীরা নিজেদের দেশের গাড়িতে চড়েন। পাশের দেশ ভারতের বিনিয়োগ নীতির কথা তুলে ধরে এ. কে. আজাদ বলেন, তাদের জমি, বিদ্যুৎ, জ্বালানিতে ভর্তুকি দেয়া হয়, ৫ বছরের জন্য কর্মীদের বেতন দেয় সরকার। বিনিয়োগ তো ওই দেশেই হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না হলে কর্মসংস্থান বাড়ানো যাবে না। 

অনুষ্ঠানে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলেও দেশে সুবিধা মিলছে না ডলারের দাম বেশি হওয়ায়। এর প্রভাব বিদ্যুৎ খাতেও পড়ছে।
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, সবার আগে একটি আধুনিক জ্বালানি নীতিমালা প্রয়োজন। তা না করে জোড়াতালি দিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য একের পর এক মাস্টার প্ল্যান ফেল করছে। বিদ্যুৎ খাতের বিশেষ বিধান বাতিল করতে হবে। টেন্ডার ছাড়া প্রকল্প নেয়ায় প্রতিযোগিতামূলক দাম পাওয়া যাচ্ছে না। এখনো ১২ থেকে ১৩ টাকায় সৌর বিদ্যুতের চুক্তি হচ্ছে। অথচ দর প্রক্রিয়ায় গেলে এটি ৮ থেকে ৯ টাকায় করা সম্ভব। 

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের নামে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি সমন্বয় করা হয়েছে। তিনি বলেন, সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিদ্যুৎ কিনছে। আবার কমিশনকে পাশ কাটিয়ে গণশুনানি ছাড়াই নির্বাহী আদেশে বিদ্যুৎ জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছে। কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা, বিদেশ ভ্রমণ, ঘুষের টাকা, কমিশন সবই জনগণের টাকা থেকে মেটানো হচ্ছে। এরপরও জনগণকে কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না। ফলে এই বাজেট এলেই কী, আর গেলেই কী। বরং বাজেটে যত বেশি বরাদ্দ বাড়বে তত বেশি লুট হবে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা নিয়েছে সেটা উচ্চাভিলাসী। ওই সময় ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত রিজার্ভ ধরেও সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ হলেই যথেষ্ট। সক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুতের কারণে জ্বালানি সংকট এবং বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকার পরও লোডশেডিং হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। এর ফলে পিডিবি’র লোকসান বাড়ছে। সেই সঙ্গে ভোক্তার বিদ্যুতের দামও বাড়ছে। 

সরকার বিদ্যুৎ খাত নিয়ে গোঁজামিলের আশ্রয় নিয়েছে উল্লেখ করে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার একদিকে বিদ্যুতে ভর্তুকি দিচ্ছে। অন্যদিকে ডিপিডিসি বলছে, বছরে তাদের ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লাভ হচ্ছে। তিনি বলেন, আইএমএফ-এর শর্ত শুনে সরকার বিদ্যুতের ভর্তুকি কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা এ টেকসই সমাধান হবে না এবং এ খাতের সমস্যা সমাধান হবে না। বাজেটে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ট্যাক্স হলিডে পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছরে উন্নীত করা, ছোট আকারের সৌরভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে শতভাগ শুল্ক মওকুফ এবং সৌর বিদ্যুৎ-সম্পর্কিত উপকরণে ক্রমবর্ধমান করের হার কমানোর সুপারিশ করেন তিনি।

পাঠকের মতামত

বিদ্যুৎ বিল অচিরেই ১০০০ টা/ ইউনিট করা হলে, অবাক হব না !

parvez
২৪ জুন ২০২৪, সোমবার, ৮:৫৮ পূর্বাহ্ন

Welldone CPD !!! Nation sees still CPD is brave enough to publish their true statistics.

NP
২৪ জুন ২০২৪, সোমবার, ৭:৪০ পূর্বাহ্ন

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status