ঢাকা, ১৩ জুলাই ২০২৪, শনিবার, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ মহরম ১৪৪৬ হিঃ

নির্বাচিত কলাম

সাম্প্রতিক

ডামি বাজেট নিয়ে আলাপের আগে যে কথাগুলো জরুরি

দিদারুল ভূঁইয়া
১৩ জুন ২০২৪, বৃহস্পতিবারmzamin

প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বাজেট নিয়ে অনেক আলোচনা, সমালোচনা, চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে; পক্ষে-বিপক্ষে তর্ক, বাহাস এমনকি পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে মারামারিও হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, কয়েকটা মৌলিক আলোচনা, মৌলিক কথা কেমন করে যেন বারবার বাদ পড়ে গেছে। কী সেগুলো? কেন বাদ পড়ে যাচ্ছে? 

গত নির্বাচনে নিজ দলের প্রার্থীদের একাংশকে সরকার প্রধান নিজে ‘ডামি’ বলেছিলেন। সে সূত্রে জনগণ নির্বাচনটাকে ডামি নির্বাচন বলেছে। সরকারকে বলেছে ডামি সরকার। কাজেই এই বাজেটও ডামি বাজেট, জনগণের বাজেট না। বাজেট নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বাজেট নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। এটা এদেশের একটা সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স। বাজেট নিয়ে এমনকি কোনো আদালতেও প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় না। সাধারণ জনগণ, এনালিস্ট, রাজনৈতিক কর্মী কোনো ছাড়; এমনকি প্রেসিডেন্টও বাজেট নিয়ে কোনো জবাবদিহিতা চাইতে পারেন না, আরেকবার ভেবে দেখার অনুরোধও জানাতে পারেন না। 

অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন পলিটিক্যাল স্টেটম্যান্ট? রাজনৈতিক কারণে বাড়িয়ে বলছি? আসুন ব্যাখ্যা করি।

বিজ্ঞাপন
 
বাংলাদেশে অর্থবিলে, মানে বাজেটে সাংবিধানিকভাবে ‘ইনডেমনিটি’ (দায়মুক্তি) দেয়া আছে। ইনডেমনিটি শব্দটা আমাদের সবার মননে ঘৃণার সঙ্গে সমুজ্জ্বল। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরে ইনডেমনিটি আইন করে খুনিদের রক্ষা করা হয়েছে। কাজেই বাঙালিমাত্রই ইনডেমনিটি বুঝে। সকলের শব্দটাকে ঘৃণা করারই কথা। 
সকল অর্থবিলে বা বাজেটে আগের থেকেই সাংবিধানিকভাবে ইনডেমনিটি দেয়া আছে। তবু আওয়ামী লীগ সরকার বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে আলাদা করে ইনডেমনিটি করেছেন। 
ইনডেমনিটি আইন থাকলে কোনো বিষয়ে কোনো অপরাধ, বেআইনি বা অনৈতিক কাজ, অপচয়, দুর্নীতি, লুটপাট, পাচার- যাই হোক না কেন; সেসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যায় না, আদালতে মামলা করা যায় না।
তারমানে বাজেট সকল স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে।

বাংলাদেশের প্রতিটা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বছর অডিট করতে হয়। অডিটে কোনো ভুল, অন্যায়, অনৈতিক কিছু পেলে রাষ্ট্র সে প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে। অনেক হাঙ্গামা করে। রাষ্ট্র যেহেতু একটা সবেচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান, এরও অডিট করতে হয়। এটা করেন রাষ্ট্র নিজে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (বাংলাদেশ) নামক একটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। শুনে মনে হচ্ছে না কতো ভালো একটা ব্যবস্থা? অপচয়, দুর্নীতি, লুটপাটবিরোধী একটা দারুণ সিস্টেম? মুশকিল হলো আর দশটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মতো এই প্রতিষ্ঠানেরও নিয়োগ দেন আদতে প্রধানমন্ত্রী। মানে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে প্রেসিডেন্ট। তারমানে সরকারের অপচয়, চুরি, দুর্নীতি ধরার জন্য যে প্রতিষ্ঠান, সে প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ দেন সরকার প্রধান নিজে (আরেকটা প্যারাডক্স)। তাহলে কার ঘাড়ে দুইটা মাথা? যাকে সরকারই নিয়োগ দেন, সেই কিনা সরকারের চুরি ধরবে? ফলাফল প্রতিষ্ঠানগুলো একদম উলটা কাজটা করে বা করতে বাধ্য হয়। 

গত ৫৪ বছরের বাজেটের কোনো বিশ্বাসযোগ্য অডিট আমরা পেয়েছি? তারা যে খাতে যত খরচ করেছেন বলে দেখিয়েছেন; আসলেই তা করেছেন? কতো টাকা অপচয়, লুটপাট, পাচার হয়েছে গত ৫৪ বছরে; অডিটে তা এসেছে ঠিক? তাহলে এবারের বাজেটে আসলেই তারা কোন খাতে কী খরচ করবেন, কতো লুটপাট আর পাচার হবে; এটা জানার কী উপায় আছে? নাই। 

কিংবা ধরেন শিক্ষা খাতে যতটুকুই বরাদ্দ, তাও কি সাধারণের শিক্ষায় ব্যবহার করা হবে? সরকারি স্কুল-কলেজ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ব্যয় হবে? নাকি ক্ষমতাসীনদের নবাবজাদাদের বিশেষায়িত স্কুল বা সরকারি বিভিন্ন সংস্থার শিক্ষার জন্যই সিংহভাগ চলে যাবে? স্বাস্থ্য বাজেট কি গ্রামের ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যন্ত পৌঁছাবে ঠিকঠাক? বিশ্বাসযোগ্য অডিট না থাকলে আমি, আপনি, আমরা কেমন করে নিশ্চিত হবো? 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা আলাপ হলো পাচারমুখী যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এদেশে আছে, সেটার সুফল সাধারণের পক্ষে আসার কোনো সুযোগ আছে? 
সরকারি হিসেবে এদেশ থেকে ১০ বছরে অন্তত ৬ লক্ষ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা অন্তত ৩ গুণ। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে সরকারের জবাব রেডি আছে-  পাচার সব দেশেই হয়, কম আর বেশি। কথা সত্য, যুক্তি ভালো। কিন্তু একটা কিন্তু আছে। কম আর বেশি। কী করে অন্যান্য দেশগুলো পাচার নিয়ন্ত্রণে রাখে আর কেন আমাদের দেশে পাচারের একেবারের খুল্লমখুল্লা রমরমা ব্যবস্থা? 

আলাপটা খুব দূরে না নিয়েও এতোটুকু বলা যায়, একটা জবাবদিহিতার রাষ্ট্রে অপচয়, দুর্নীতি, পাচার খুব বাড়তে পারে না, সম্ভব না। উদাহরণ দেই, আমাদের সরকারও স্বীকার করেন, বেশির ভাগ পাচার হয় আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভারইনভয়েসিং’র মাধ্যমে। মানে আমদানির সময় ২ টাকার জিনিস এনে বলে ২০০ টাকার এনেছি। এভাবে বলে ১৯৮ টাকা বিদেশে পাচার করে। রপ্তানির সময় উল্টাটা। ২০০ টাকার জিনিস পাঠিয়ে বলে ২ টাকার পাঠিয়েছি। আর ১৯৮ টাকা তাদের বিদেশি অ্যাকাউন্টে রেখে দেয়। 

এখন আমদানি-রপ্তানি কিন্তু ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। তারমানে কতো টাকার আয় বা ব্যয় হলো, সেটা জানা সম্ভব। আবার একটা জিনিসের দাম কোন সময় কতো ছিল, আসলেই সেই মালই আনা বা পাঠানো হয়েছে কিনা- এসব একটা জবাবদিহিতার দেশে নিশ্চয় নজরে রাখা অসম্ভব কিছু না। 

এর বাইরে কিছু পাচার হয় সম্পদের নিরাপত্তার জন্য, কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে। অনেক ব্যবসায়ী আছেন, তাদের সৎ উপার্জন বাধ্য হয়ে দেশে আনেন না। কারণ দেশে জানমালের নিরাপত্তা নাই। মানুষের কোনো অধিকার নিশ্চিত নাই। জুলুমের আশঙ্কা সবসময় থাকে। আবার কেউ কেউ ভবিষ্যতে সৎ ব্যবসার প্রয়োজনে বা প্রয়োজনীয় কেনাকাটার সময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতেও বিদেশে কিছু সম্পদ পাচার করতে বাধ্য থাকেন। 
তার মানে কিছু সঠিক ব্যবস্থা নিয়ে পাচার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দরকার কেবল সঠিক একটা জবাবদিহিতার, স্বচ্ছতার ব্যবস্থা। 

কাজেই বাজেটে কোন খাতে কতো বরাদ্দ দিলো, কোন খাতে দিলো না- এসব বিশ্লেষণ নিশ্চয় আমাদের লাগবে। তবে সবার আগে লাগবে বাজেটটা যেন তারা জনগণের পক্ষে করতে বাধ্য থাকে, জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী করতে বাধ্য থাকে এবং খরচের সঠিক হিসাব যেন জনগণ মিলায়ে নিতে পারে ঠিক; তেমন একটা বন্দোবস্ত।

 

লেখক: অর্থনৈতিক সমন্বয়ক, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন

নির্বাচিত কলাম থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

নির্বাচিত কলাম সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ/ তাসে কি তবে টোকা লেগেছে?

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status