ঢাকা, ১৮ মে ২০২৪, শনিবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ জিলক্বদ ১৪৪৫ হিঃ

বিশ্বজমিন

ইরান ও ইসরাইল সংঘাতের পরিণতি এখন কোনদিকে যেতে পারে?

বিবিসি
১৬ এপ্রিল ২০২৪, মঙ্গলবার
mzamin

বিবিসি’র নিরাপত্তা সংবাদদাতা ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনারের মতে, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান সংঘাতের পরিণতি কী হতে পারে তা এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ইসরাইল ঠিক কীভাবে শনিবার রাতে চালানো হামলার জবাব দেয়, তার ওপর। তিনি আরও জানাচ্ছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ও বিশ্বের অন্যত্রও বহু দেশই কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সংযম দেখানোর আহ্বান জানাচ্ছে। এর মধ্যে এমন অনেক দেশও আছে, যারা ইরানের সরকারকে ঘোরতর অপছন্দ করে। কিন্তু এখন তারাও চাইছে ইসরাইল যেন নতুন করে এই হামলার জবাব দিতে না যায়। অন্যদিকে ইরানের মনোভাবটা অনেকটা এই ধরনের:  ‘অ্যাকাউন্ট সেটলড- মানে শোধবোধ হয়ে গেছে। ব্যাস, বিষয়টার এখানেই ইতি টানলেই ভালো। তবে হ্যাঁ, যদি আবার আমাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানতে যাও সে ক্ষেত্রে আমরা কিন্তু অনেক বেশি শক্তিশালী হামলা চালাবো- যেটা প্রতিহত করা তোমাদের সাধ্যে কুলাবে না’- ইরানের মানসিকতা ব্যাখ্যা করে এভাবে জানাচ্ছেন ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার। বিবিসি’র পার্সিয়ান বিভাগও বলছে, শনিবার রাতের হামলার পরিণতিতে ইরানের কর্তৃপক্ষ তো বটেই, দেশের সাধারণ মানুষও বেশ খুশি। তেহরানের রাস্তায় নেমে তারা উল্লাসও করেছেন। ইসরাইল যদি নতুন করে আর হামলা না চালায়, তাহলে ব্যাপারটা এখানেই মিটে যাওয়া ভালো- এমন একটা মানসিকতাও তেহরানে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন
কিন্তু ইসরাইল ইতিমধ্যেই ‘রীতিমতো কড়া জবাব’ দেয়ার অঙ্গীকার করে বসে আছে। 
ইসরাইলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে এই মুহূর্তে যে সরকার ক্ষমতায় আছে, তাকে অনেকেই সে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ‘কট্টরপন্থি’ বা হার্ডলাইন সরকার বলে বর্ণনা করে থাকেন। গত ৭ই অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের চালানো অতর্কিত হামলার জবাব দিতে ইসরাইল সময় নিয়েছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। তারপর ছ’মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা একটানা গাজা ভূখণ্ডে তীব্র অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে গাজাকে যেন তারা প্রায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চাইছে।

এখন ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল কী পদক্ষেপ নিতে পারে?
ফ্র্যাঙ্ক গার্ডনার মনে করেন, ইসরাইলের ‘ওয়ার কেবিনেট’ বা যুদ্ধ-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা ইরানের এই প্রত্যক্ষ হামলার কোনো জবাব না দিয়ে হাত গুটিয়ে থাকবে, এই সম্ভাবনা আসলে খুব ক্ষীণ। তাহলে ইসরাইলের সামনে এখন কী কী রাস্তা বা ‘অপশন’ খোলা আছে? প্রথমত, হতে পারে তারা ওই অঞ্চলে তাদের প্রতিবেশীদের কথায় আমল দেবে এবং একটা ‘স্ট্র্যাটেজিক পেশেন্স’ বা ‘কৌশলগত ধৈর্য প্রদর্শনের’ রাস্তায় হাঁটবে। এর অর্থ হলো, সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা হামলা না-চালিয়ে তারা ওই অঞ্চলে ইরানের যে সব ‘প্রক্সি অ্যালাইজ’ বা শরিকরা আছে তাদের ওপর অভিযান চালিয়ে যাবে। এর মধ্যে আছে লেবাননের হিজবুল্লাহ্‌র মতো গোষ্ঠী কিংবা সিরিয়াতে ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ কেন্দ্রগুলো- যার বিরুদ্ধে ইসরাইল বিগত বহু বছর ধরেই হামলা চালিয়ে আসছে।

দ্বিতীয়ত, ইরান যে ধরনের হামলা চালিয়েছে ইসরাইলও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা ঠিক সেই ধরনের ‘সাবধানে ও মেপে মেপে’ (‘কেয়ারফুলি ক্যালিব্রেটেড’) হামলা চালাতে পারে- যার নির্দিষ্ট লক্ষ্য হবে ইরানের সেই মিসাইল ঘাঁটিগুলো, যেখান থেকে শনিবার রাতের হামলা চালানো হয়েছিল। তবে ইসরাইল যদি এই অপশনটা বেছে নেয়, তাহলে ইরান সেটাকেও ‘এসক্যালেশন’ বা যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা হিসেবেই দেখবে। কারণ বহু বছরের বৈরিতা সত্ত্বেও ইসরাইল ইতিপূর্বে কখনোই সরাসরি ইরানের ভূখণ্ডে কোনো হামলা চালায়নি। বরং তারা ওই অঞ্চলে ইরানের সঙ্গী বা প্রক্সি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে আক্রমণেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে।

তৃতীয় পথ হতে পারে, ইসরাইল যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টায় আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল এবং ইরান যেভাবে হামলা চালিয়েছে তার চেয়ে অনেক শক্তিশালী পাল্টা হামলা চালালো। সে ক্ষেত্রে তারা শুধু নির্দিষ্ট মিসাইল ঘাঁটিগুলোই নয়, ইরানের অত্যন্ত শক্তিশালী রেভ্যুলুশনারি গার্ডসের ঘাঁটি, প্রশিক্ষণ শিবির ও কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টারগুলোকেও আক্রমণের নিশানা করবে। ইসরাইল যদি এই শেষ দুটো অপশনের কোনোটা বেছে নেয়, তাহলে ইরানকেও অবশ্যই আবারো পাল্টা আঘাত হানার পথে যেতে হবে।

আর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই সংঘাতে কি আমেরিকাও জড়িয়ে পড়তে পারে?
পরিস্থিতি কি এমন দাঁড়াতে পারে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী আর ইরানের মধ্যেও পুরোদস্তুর গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়? মনে রাখতে হবে, উপসাগরীয় (গালফ) আরব অঞ্চলের ছ’টি দেশেই কিন্তু মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আছে। এ ছাড়াও তাদের সামরিক ঘাঁটি আছে সিরিয়া, ইরাক ও জর্ডানে। বহু বছরের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান যে ব্যালিস্টিক ও অন্য নানা ধরনের মিসাইলের বিপুল ভাণ্ডার তৈরি করেছে, মার্কিন এই সামরিক ঘাঁটিগুলো সেই সব ক্ষেপণাস্ত্রের নিশানায় পরিণত হতে পারে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরেই আর একটা হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছে- তারা যদি আক্রান্ত হয় তাহলে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথটি যদি ইরান মাইন, ড্রোন ও ফাস্ট অ্যাটাক ক্র্যাফট দিয়ে বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত রুটটি অচল হয়ে পড়বে এবং বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের এক-চতুর্থাংশ স্থবির হয়ে যাবে। অবধারিতভাবে সেটা হবে একটা দুঃস্বপ্নের মতো পরিস্থিতি এবং সে কারণেই বিশ্বের প্রায় সব শক্তিধর দেশ সেই পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরানের মানুষজন কী ভাবছেন?
ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) ইসরাইলের ওপর ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালানোর পর ইরানে সরকারের সমর্থক বহু মানুষ তেহরানের রাজপথে নেমে এসে আনন্দোল্লাস করতে থাকেন, জানাচ্ছেন বিবিসি’র পার্সিয়ান বিভাগের সাংবাদিক জিয়ার গোল। মধ্যপ্রাচ্যে যে সব দেশ ইরানের মিত্র বা শরিক হিসেবে পরিচিত, তাদের মধ্যে এবং ইরানের ভেতরেও সমর্থকদের মধ্যে আইআরজিসির গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখার জন্য এই হামলা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি জানান, ইসরাইলের অভ্যন্তরে যে সব নিশানাকে লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়েছেন তার মধ্যে সে দেশের নোটাম বিমান বাহিনী ঘাঁটিও (এয়ারফোর্স বেস) ছিল। দু’সপ্তাহ আগে যে ইসরাইলি এফ-৩৫ বিমানগুলোর চালানো হামলায় দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে সাতজন আইআরজিসি কমান্ডার নিহত হয়েছিলেন, সেই যুদ্ধবিমানগুলো এই ঘাঁটি থেকেই উড়ে গিয়েছিল। মেজর জেনারেল বাঘেরি এটাও জানিয়েছেন, ইরান তাদের ‘লক্ষ্য অর্জন করেছে’ এবং অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কোনো অভিপ্রায় তাদের নেই। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রইসি ইসরাইলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নতুন করে (ইরানের বিরুদ্ধে) কোনো হামলা চালানো হলে ইরান তার অনেক কঠোর প্রত্যুত্তর দেবে। সংবাদদাতা জিয়ার গোল জানাচ্ছেন, সার্বিকভাবে মনে হচ্ছে ইরানের ‘মুড’ এখন ডি-এসক্যালেশন বা উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষেই। সে দেশের শীর্ষ সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের কথাবার্তা থেকে মনে হচ্ছে তারা গত রাতের হামলার পরিণামে ‘সন্তুষ্ট’। তাছাড়া ইরান যেভাবে ইসরাইলকে তাদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা সংহত করার জন্য প্রচুর সময় দিয়েছে তাতেও মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, তারা নতুন করে আর কোনো হামলা চালাতে ইচ্ছুক নয়, যাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি হতে পারে।

কিন্তু ইরান-ইসরাইল সংঘাতের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কোনদিকে যায়, তা যেহেতু কোনো একটি পক্ষের ওপর নির্ভর করছে না- তাই আপাতত সারা দুনিয়াকেই পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখতে হবে।

 

পাঠকের মতামত

ইসরাইল একটা জাযাবর জাতি, তারা কোন স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক না। জোর জবর দখল করে ফিলিস্তিনিদের জায়গা দখল করে ইসরাইল নামক ইহুদী রাষ্ট্র গঠন করার চেষ্ট্রা করতেছে, তাদেরকে সমর্থন দিচ্ছে, অন্যান্য ইহুদী রাষ্ট্রগুলি সাথে আছে মুসলমান নামধারী কয়েকটি রাষ্ট্র। বিশ্বের সকল মুসলমান রাষ্ট্রের উচিত সকল ইহুদী রাষ্ট্রে পন্য বয়কট করা, ইহুদী রাষ্ট্র বয়কট করা, মুসলমান রাষ্ট্রের ভিতর র্ওক্য গড়ে তোলা। সবাইকে বুঝার তৌফিক দান করুক। আমিন।

Md Nurul Amin
১৬ এপ্রিল ২০২৪, মঙ্গলবার, ৯:০৭ পূর্বাহ্ন

বিশ্বজমিন থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

   

বিশ্বজমিন সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status