ঢাকা, ১৩ জুন ২০২৪, বৃহস্পতিবার, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৬ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

প্রথম পাতা

সাক্ষাৎকার

এটা স্যাংশনের চেয়েও ব্যাপক এবং প্রভাবশালী

তারিক চয়ন
২৭ মে ২০২৩, শনিবার
mzamin

বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি স্যাংশনের চেয়েও ব্যাপক আর অনেক বেশি প্রভাবশালী। এটা দেশের জন্য মর্যাদাকর কিছু নয়। এ বিষয়ে আগে থেকে জেনেও জনগণকে না জানিয়ে সরকার অনেক বড় অন্যায় করেছে। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বললেন, নিকট অতীতে কেবল উগান্ডা বা নাইজেরিয়ার মতো অত্যন্ত অনুন্নত গণতন্ত্র কিংবা স্বৈরতান্ত্রিক দেশের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। গণতন্ত্র, নির্বাচন এসব ক্ষেত্রে উগান্ডা বা নাইজেরিয়ার কাতারে নেমে আসাটা নিশ্চয়ই মর্যাদাকর কিছু নয়। প্রচণ্ড বিতর্কিত নির্বাচন করার পর ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে, আরও একটি বিতর্কিত নির্বাচনের পথে অগ্রসর হয়ে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে সরকার। তারা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যে, (বাংলাদেশকে নিয়ে) যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের ভিসা নীতি প্রণয়ন করাকে অমর্যাদাকর মনে হলেও এখন আর বেঠিক বা অযৌক্তিক মনে হয় না।

বেশ কিছুদিন ধরেই একটি কানাঘুষা চলছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিদের উপর স্যাংশন দিতে যাচ্ছে। সেদিক বিবেচনায়, অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে হতাশ। আবার অনেকেই বলছেন, ‘এটি স্যাংশন না হলেও ফাদার অফ অল স্যাংশনস।’ স্যাংশনের চেয়ে এর প্রভাব অনেক বেশি ব্যাপক হবে বলেই মনে করছেন আসিফ নজরুল, ‘স্যাংশন কেবল ক্ষমতা কাঠামোর উপরের দিকের কাউকে দেয়া যায়। কিন্তু, ভিসা নীতি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নয়। 

এটা একটা সর্বজনীন পলিসি, যে কারণে এর প্রভাব অনেক বেশি হওয়ার কথা।

বিজ্ঞাপন
এখানে যেভাবে নির্বাচন সংক্রান্ত অনিয়মকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তার পরিসর অত্যন্ত ব্যাপক। বলা হয়েছে: মত প্রকাশে বাধা দিলে, নির্বাচনী সমাবেশে বাধা দিলে, ভোটারদের ভয় দেখালে, উদাহরণস্বরূপ: গায়েবি মামলা দিলে অর্থাৎ যেকোনো পদ্ধতিতে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করলে...শুধু নির্বাচনের দিনই নয়, আমার মনে হয় ভিসা নীতি ঘোষণার পরদিন থেকেই এটা শুরু হয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে এটা আরও অনেক বেশি ব্যাপক, অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, অনক বেশি প্রভাবশালী একটা পদক্ষেপ। কাজেই এটা স্যাংশন না, স্যাংশনের চেয়ে অনেক বড় কিছু। নির্বাচনে কারচুপির সঙ্গে বহুলোক জড়িত থাকতে পারে, তাদের প্রত্যেকের উপর এর ফলে এক ধরনের ভীতি জন্মাবে। বাংলাদেশের অনেক মানুষ আমেরিকা যেতে চায়, এটাতো অস্বীকার করার কিছু নেই। এখন রেমিট্যান্স এর দিক থেকেও দেশটি শীর্ষস্থানীয়। অনেকে হয়তো আমেরিকা যেতে চায় না, কিন্তু চায় তাদের সন্তান যেন সেখানে পড়তে যেতে পারে। এই ধরনের সমস্ত ক্ষেত্রে যখন ভিসা নীতিটি আরোপ করা হবে তখন নির্বাচনে কারচুপির সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে, যারা অগ্রণী ভূমিকা রাখবে; তাদের মনে এটা ভয়ঙ্কর ভীতি ধরাবে। এসব কারণেই এটা স্যাংশনের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর প্রভাবশালী হবে।’

বিরোধী দলগুলো যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজপথে তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতির মাধ্যমে তাদেরকে এই সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যেতে প্ররোচিত করা হচ্ছে- এমনটিও মনে করছেন কেউ কেউ। আসিফ নজরুল অবশ্য সে দলে নেই। তিনি মনে করেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই’ এটাও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ। ‘এটা করতে গিয়ে বিএনপি যদি কোনো বাধার সম্মুখীন হয়, সেটাওতো ভিসা নীতির প্রয়োগ করতে গিয়ে আমেরিকান অ্যাম্বাসি অন্যভাবে নিতে পারে। এটা ঠিক, কীভাবে এগুলো ব্যাখ্যা করা হবে তা আমরা জানি না। তবে, এই ভিসা নীতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনকে বাদ দেয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে, এটা আমি কোনোভাবেই মনে করি না। বরং, বিএনপি যদি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হয়, যদি তারা কৌশলগতভাবে জিনিসটি বুঝতে পারে, তারা বরং এটা বলতে পারে যে- আমরা নির্বাচনে অবশ্যই যেতে চাই, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করো বা দলীয় সরকার প্রধানকে পরিবর্তন করে নির্বাচনকালীন সরকার কায়েম করো।’ এজন্য যদি তারা সভা-সমাবেশ করে, এটাওতো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অংশ হবে। তারা এটাকে কীভাবে কাজে লাগাতে পারে, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বলা হয়েছে, নতুন ভিসা নীতির বিষয়ে তারা গত ৩রা মে বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছিল। যদিও সরকার জনগণকে এ বিষয়ে কিছুই জানায়নি। এ বিষয়ে আসিফ নজরুল বলেন, এটা সরকারের অযৌক্তিক আর অনেক বড় অন্যায় পদক্ষেপ। এ রকম একটা খবর ৩রা মে’তে জানার পর তারা সেটা জনগণকে জানানোর প্রয়োজন অনুভব করেনি! তারপর তারা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে! প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমেরিকা আমাকে ক্ষমতায় রাখতে চাচ্ছে না। তিনি বলেছেন, আমেরিকা থেকে কিছু আমদানি করবো না। যেখানে আমেরিকাতেই আমরা সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করি! তারপর আমেরিকাসহ কিছু দেশের রাষ্ট্রদূতদের নিরাপত্তা প্রটোকল প্রত্যাহার করা- এসবকিছুই অত্যন্ত অপরিপক্ক প্রতিক্রিয়া দেখানোর উদাহরণ। এসব প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই ভিসা নীতি তাদের জন্য প্রচণ্ড অসুবিধার সৃষ্টি করেছে। এখন চাপে পড়ে, জনগণ জেনে যাওয়ার পর তারা এটা বলার চেষ্টা করছে যে, ‘না, এটা আমাদের জন্য ভালোই হয়েছে, আমরাতো সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চাই।’ তাদের আগের যে প্রতিক্রিয়া তার সঙ্গেতো এখনকার প্রতিক্রিয়ার মিল নেই! তারা পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি। জনগণকে এতবড় একটা বিষয়ে তথ্য জানানো থেকে দূরে রেখে তারা যা করেছে, তা কোনো দায়িত্বশীল সরকারের কাজ বলে আমি মনে করি না।

আসিফ নজরুলের প্রশ্ন, সরকারের সত্যিকার প্রতিক্রিয়া আসলে কোনটা? ৩রা মে (ঘটনাটি) জানার পর প্রধানমন্ত্রী যে বললেন আমেরিকা আমাকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না, সেটা? রাষ্ট্রদূতদের পুলিশ প্রত্যাহার, সেটা? নাকি জনগণ জানার পর আওয়ামী লীগ যে বলছে, আমরাতো সুষ্ঠু নির্বাচন করতেই চাই, এই ভিসা নীতিতে আমাদের কোনো সমস্যা নাই, এটা? সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে আসিফ নজরুল বলেন, যতটুকু মনে হয়েছে- তারা একদিকে খুশি যদি নিজেদের ভোটাধিকার ফেরত পায়। কারণ, এদেশের তরুণ প্রজন্ম ভোট দেয় না। কয়েকটা প্রজন্ম ভোট দেয় না। এটা একটা অদ্ভূত ব্যাপার। তারাতো এই নীতিতে অবশ্যই আশাবাদী হবে এই ভেবে যে, যদি আমাদের ভোটাধিকার ফেরত পাই। আবার অনেকেই দুঃখ পেয়েছে এই ভেবে যে, আমরা আমাদের সমস্যা সমাধান করতে পারিনি দেখে, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারিনি দেখে, মানবাধিকার রক্ষা করতে পারিনি দেখে, রাষ্ট্রীয় যেসব প্রতিষ্ঠান আছে: পুলিশ, বিচার বিভাগ এসবের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারিনি দেখে, প্রশাসন সরকারের অঙ্গ হিসেবে কাজ করে দেখে; যেই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেই পরিস্থিতির কারণে এই ধরনের ভিসা নীতি আরোপ করার সুযোগ হয়েছে, বাংলাদেশকে উগান্ডা আর নাইজেরিয়ার কাতারে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ফেসবুকে আমরা অনেক সময় মজা করে লিখতাম ‘উগান্ডা নামক দেশে’, বাংলাদেশ বললে যদি মামলা খাই এই ভয়ে। এখন ভিসা নীতির মধ্যদিয়ে আমরা ওই উগান্ডার কাতারেই নেমে এসেছি।

যুক্তরাষ্ট্রের নয়া পদক্ষেপের পর সরকার এবং বিরোধীদের নিজেদের মধ্যে সংলাপ তথা আলোচনার কোনো সুযোগ তৈরি হলো কি? আসিফ নজরুল বলেন, সংলাপের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয়তাতো সমসময়ই ছিল। আমি সবসময়ই বলি, সৎ নিয়ত থাকলে যেকোনো সমস্যাই সমাধান করা সম্ভব। সৎ নিয়ত থাকলে সব পক্ষকে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটাতো প্রমাণিত যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত ভালো নির্বাচন হয়। অথবা নতুন পদ্ধতি হিসেবে, যা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে- আপনি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে পারেন সেখানে নতুন কেউ ওই সরকারের প্রধান হবেন। কারণ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যদি সরকার প্রধান থাকেন তাহলেতো ওই নির্বাচনকালীন সরকারের প্রতি অনেকের আস্থা না আসার কথা। 

সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান ৩০/৪০ বছর আগে বিএনপি করতেন বলে তার অধীনে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে চায়নি? তাহলে, রাজনীতিতে প্রবেশলগ্ন থেকে যিনি আওয়ামী লীগের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, আওয়ামী লীগের প্রধান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের অধীনে বিএনপিরতো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার কথা না, বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর। আমি মনে করি, মাঝামাঝি অবস্থা হিসেবে আমরা বিকল্প ভাবতে পারি। উদাহরণস্বরূপ: জাতীয় পার্টির জিএম কাদের সাহেব আছেন। তিনি মন্ত্রী থাকার সময়ওতো যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সুশিক্ষিত একজন মানুষ। এলাকাতেও জনপ্রিয় একজন মানুষ? উনার মতো মানুষ যেখানে আছেন...উনাদের মতো কাউকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান করে আমরা একটা বিকল্প ভাবতে পারি কিনা? আমি একটা উদাহরণ দিলাম। সরকার এবং বিরোধী দলের যদি আত্মমর্যাদাবোধ থাকে, দেশপ্রেমবোধ থাকে তাহলে এ রকম আরও কোনো বিকল্প আছে কিনা এই সমস্ত বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
 

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

   

প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status