দেশ বিদেশ
ঈদ আনন্দ ২০২৫
সাকুরার দেশে
রাহমান মনি
৪ এপ্রিল ২০২৫, শুক্রবার
বিশ্বে জাপানকে পরিচয় করিয়ে দেয়া বা বোঝানোর জন্য বিশেষণের কোনো কমতি নেই। সূর্যোদয়ের দেশ, দ্বীপপুঞ্জের দেশ, কুংফু কারাতের দেশ, সামুরাইয়ের দেশ, ইলেক্ট্রনিক্স সরঞ্জাম তৈরির দেশ কিংবা ভদ্র, সৎ এবং পরিশ্রমী জাতির দেশ।
সূর্যোদয়ের দেশ বললে যেমন জাপানকে বোঝায় তেমনি জাপানকে সাকুরা (Japanese cherry)’র দেশ বললেও ভুল হবে না। সাকুরা বা চেরি ফুলের সঙ্গে জাপানি ঐতিহ্য কথাটি জড়িত। চেরি ব্লসম জাপানের জাতীয় ফুল।
‘সাকুরা’ জাপানিদের কাছে খুব-ই জনপ্রিয় একটি নাম। বছরের একটি বিশেষ সময়ে এই বিশেষ ফুলের দেখা পাওয়া যায়। জাপানের বিভিন্ন স্থানে যা স্থানীয়দের কাছে ‘চেরি ব্লসম’ নামে পরিচিত। সারা বিশ্বেও এই ফুলের কদর রয়েছে। কারণ, এটা দেখতে এতটাই সুন্দর যে কেউ বিমোহিত না হয়ে পারবে না। এটার জনপ্রিয়তা এতোই বেশি যে অনেক পর্যটক জাপানে আসেন শুধুমাত্র চেরি ব্লসম বা সাকুরা দেখার জন্য। আজকের লেখা এই বিশেষ ফুল এবং একে নিয়ে না জানা কিছু কাহিনী নিয়ে।

প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে জাপানিরা এই ফুল নিয়ে উৎসব পালন করে আসছে, যাকে ‘হানামি’ উৎসব বলা হয়। জাপানিজ ভাষায় ‘হানা’ যার অর্থ ফুল এবং ‘মি’ অর্থ দেখা/দর্শন বা এখানে যার অর্থ উপভোগ করা। তাই, হানামি অর্থ হচ্ছে সাকুরা ফুল উপভোগ করা।
ঐতিহাসিক হেইয়ান (৭৯৬-১১৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) শাসনামল থেকে বসন্ত বরণের এই হানামি উৎসব অতি জনপ্রিয় হওয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে এই হানামি উৎসব, জাপানিদের কাছে ‘সাকুরা হানামি’ নামে সমাদৃত হয়। অনেক সময় পাম জাতীয় এক ধরনের ‘উমে’ গাছ, যা চেরি ফুলের মতো একই সময় ফুল দেয়, তার সঙ্গে মিলে ‘উমে’ উৎসব হিসাবেও সাকুরা উদ্যাপিত হয়। অনেক বিদেশিরাই সাকুরা এবং উমে একাকার করে ফেলেন। এমনকি জাপানে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকরা পর্যন্ত উমে ফুলকে সাকুরা মনে করে ভুল করে থাকেন।
সাকুরা’র বিমুগ্ধ সৌন্দর্যকে উপভোগ করার জন্য যখন সারা জাপানে সপ্তাহব্যাপী উৎসব হিসেবে পালিত হয়। তখন মনে হয়, সপ্তাহব্যাপী এই সাকুরা উৎসব যেন কর্মব্যস্ত জাপানিদের অবসর উদ্যাপন ও বিনোদনের একান্ত উপলক্ষ। কর্মব্যস্ত জাপানিদের জীবন যে কতো উৎসবমুখর হতে পারে, তা এই সাকুরা উৎসব দেখলে অনুধাবন করা যায়। জাপানিরা পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব মিলে পার্ক বা চেরি বাগানের ফুলেল চেরি গাছের নিচে বসে হরেক রকমের জাপানিজ খাবার, বিশেষ করে তৈরি খাবারের সঙ্গে হরেক রকমের পানীয়’র পানাহারের মাধ্যমে জাপানিদের মধ্যকার হাসি-ঠাট্টা, নাচ-গান আর আড্ডাবাজিতে মুখরিত থাকে পুরো চেরি বাগান। খাওয়া-দাওয়া, খোশ-গল্প, ঐতিহ্যগত পোশাক পরিধান আর প্রিয় চেরি ফুলের সঙ্গে ছবি তুলে কেটে যায় তাদের পুরো সপ্তাহ। চেরি ফুলের সঙ্গে বিভিন্ন আঙ্গিকে ছবি তুলে মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দি করার যে অভিলাষ, সেটা দেখলেই বোঝা যায় ‘চেরি উৎসব’ বা ‘সাকুরা’র প্রতি জাপানিদের আবেগ ও ভালোবাসা। চেরি উৎসব যেন জাপানিদের এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। আর এর সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ প্রচার উৎসবে আনন্দের ভাগিদার এখন বিশ্ববাসী।
পিছিয়ে নেই জাপানে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকগণও। কখনো জাপানিদের সঙ্গে মিশে একাত্ম হয়ে, কখনো বা নিজ দেশীয় কিংবা নিজ ঘরানার লোকদের সঙ্গে। নতুন সংযোজন হিসেবে সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন সংগঠন সংঘবদ্ধভাবে সাকুরা উৎসব পালন করে আসছে। বর্তমানে জাপানে চলছে সাকুরা উৎসব। সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয়ে জুন অবধি জাপানের এলাকা ভেদে সাকুরা উৎসব চলমান থাকলেও কানতো (টোকিও, সাইতামা, চিবা, কানাগাওয়া, গুনমা, ইবারাকি এবং তোচিগি) এলাকার বৃহত্তর টোকিওতে উৎসব’র আমেজটা একটু বেশিই যেন নাড়া দেয়। হতে পারে রাজধানী বলে কথা।
ফেব্রুয়ারি মাসে ওকিনাওয়া থেকে সাকুরার প্রস্ফূটন শুরু হয়ে মার্চ এর শেষ এবং এপ্রিল এর প্রথম ভাগ বৃহত্তর টোকিও, কানতো এলাকা আলোড়িত করে জুনে উত্তর জাপানের হোক্কাইদো গিয়ে শেষ হয়। এ বছরও সারা জাপানব্যাপী সাকুরা কিছুটা আগেভাগেই প্রস্ফূটন শুরু হয়েছে। সাকুরা ফোটার সময়টাতে জাপানব্যাপী উৎসব শুরু হয়। আগেই বলেছি, স্থানীয় জাপানি ভাষায় ‘হানামি’(‘হানা’ অর্থ ফুল এবং‘মি’ অর্থ দর্শন বা দেখা) বলা হয়ে থাকে। আভিধানিক অর্থ যা-ই হয়ে থাকুক না কেন, ‘হানামি’ অর্থাৎ প্রস্ফূটিত ফুল উপভোগ বা ‘ফুল উৎসব’ জাপানিদের অতি প্রাচীন এক জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক উৎসব। অর্থাৎ ফুল ফোটা দেখার উৎসব বা গাছে ফুল ফোটা কেন্দ্রিক উৎসব হলো ‘হানামি’। এই উৎসবকে ঘিরে জাপানব্যাপী কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়ে থাকে। জাপানব্যাপী সাজ সাজ রব পড়ে যায়।
সরকার থেকেও ফুল দেখা উৎসবে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে জাপানে।
এ বছর জাপানের আবহাওয়া অধিদপ্তর বৃহত্তর টোকিও’তে মধ্য মার্চ থেকে চেরি ফুল অবলোকন মৌসুম শুরুর ঘোষণা দিয়েছে, তবে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার তাগিদ সংযোজন করে।
সরকারি সংবাদ সংস্থা এনএইচকে সূত্র মতে আবহাওয়া অধিদপ্তর কর্মকর্তারা ১৩ই মার্চ বৃহস্পতিবার বিকালে নিশ্চিত করেন যে, কেন্দ্রীয় টোকিও’র ইয়াসুকুনি মন্দিরের সোমেই-ইয়োশিনো প্রজাতির নির্ধারিত গাছটিতে কমপক্ষে ৫টি সাকুরা ফুল ফুটেছে, যেটির ফুল ফোটার ওপর নির্ভর করে এই ঘোষণা দেয়া হয়ে থাকে। এবছর ২২ মার্চ থেকে ২৮শে মার্চের মধ্যে টোকিওতে সপ্তাহব্যাপী সাকুরা শোভাবর্ধন করবে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে।
এই ঘোষণা গত সাত দশকের গড় ঘোষণার দিনের ১৩ দিন আগে করা হলো। এই ঘোষণা গত বছরের মতো একইদিনে করা হয় এবং ১৯৫৩ সালে এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রথম রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে দ্রুত করা হলো।
সাকুরা দেখতে অনেকটা দোপাটি ফুলের মতো। সাকুরা অনেক প্রকার আছে। এলাকা ভেদে লোকমুখে হাজার রকমের হলেও উইকিপিডিয়া তথ্য মতে প্রকৃতপক্ষে জাপানে ২০০টিরও বেশি প্রজাতির সাকুরার অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এর মধ্যে ১০টি প্রজাতি জাপান জুড়ে দেখা যায়। এগুলো হচ্ছে সোমেই ইয়োশিনো, ইয়ামাজাকুরা, শিদারেজাকুরা, এদোহিগান, কানজান, ইচিয়োউ, কানহিজাকুরা, ইউকন, কিকুজাকুরা এবং ফুগেনজু ।
ফুল কোন মাসে ফুটছে, সমতলে ফুটছে নাকি পাহাড়ি অঞ্চলে ফুটছে এবং ফুলের রঙ ও আকার এই সমস্ত কিছুর ওপর ভিত্তি করে আবার সাকুরার শ্রেণিবিভাগ হয়ে থাকে। হাল্কা গোলাপি, ঘন গোলাপি, সাদা, কমলা, ধবধবে সাদা, দুধে আলতা এইরকম প্রায় দশ রকমের সাকুরা জাপানে ফোটে। তবে সবগুলো প্রজাতি এমন কি একই গাছের সবগুলো ফুলও এক সময় ফোটে না। আবার একই গাছে একাধিক রঙের ফুল ফোটার অপরূপ সৌন্দর্য ভাষায় লিখে বোঝানোর মতো নয়। কেবল মাত্র দেখেই অন্তর দিয়ে উপভোগ করতে হয়।
সাকুরা কেবল দেখার সৌন্দর্যেই মন কাড়ে না রসনা বিলাসেও নজর কাড়ে। তারকা সমৃদ্ধ হোটেলের বিভিন্ন ডেজার্ট-এ সাকুরা ফুলের ব্যবহার এবং রকমারি খাদ্যসামগ্রীতে সাকুরার ব্যবহার ভোজন বিলাসি মাত্রই জানেন। সাকুরা ফোটাকালীন সময়ে জাপানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সমাবর্তন এবং বর্ষশুরুর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। জাপানে এপ্রিল থেকে শিক্ষা বর্ষ শুরু হয়ে মার্চে শেষ হয় এবং প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে সাকুরা ফুলের গাছ অবধারিত।
বিশ্বব্যাপী সাকুরা নিয়ে গবেষণারও শেষ নেই। অন্যকে আলোকিত করার ক্ষমতা না রাখলেও সাকুরার রয়েছে নিজস্ব উজ্জ্বলতা। মেঘাচ্ছন্ন দিন কিংবা গভীর রাতে দূর থেকেও সাকুরার অবস্থান জানা যায়।
সাকুরা নিয়ে নানা দর্শন
জাপানিদের সাকুরা ফুল দর্শন কয়েক হাজার বছরের পুরনো হলেও এর স্বপক্ষে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। খ্রিষ্টপূর্ব সাত শতক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুল দর্শন শুরুর ইতিহাস উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়। নারা জিদাই (৭১০-৭৯৪) এ সম্রাট গেনমেই হেইজোকিও শহরে উমে প্লাজম (উমে) ব্লোজম স্বল্প পরিসরে শুরু করেন। এই সময় চীন থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বিভিন্ন কালারের উমে (উমে) গাছ সারিবদ্ধভাবে হেইজোকিও শহরের শোভাবর্ধন করতে থাকে। এরপর হেইআন জিদাই (৭৯৪-১১৮৫) এর সময় সম্রাট কামমো হেইআনকিও শহরে নতুনভাবে উমে এবং পাশাপাশি সাকুরা গাছ রোপণ করে ফুল দর্শন উপভোগ করেন এবং ফুল দর্শনের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মদ সেই সঙ্গে বিভিন্ন খাবার গ্রহণ করা শুরু করেন। তবে তা কেবল একটি শ্রেণির লোকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। অন্য কথায় বলা যায়, অনুমতি ছিল না। হেইয়ান যুগে সম্রাট সাগা কিয়োটো এম্পেরিয়াল গার্ডেনে সভাসদদের নিয়ে সাকুরা ফুল দর্শন, পানাহার করার সময় সাকুরাকে নিয়ে কবিতা, গান রচনা করা হয়। আলোকোজ্জ্বল সৌন্দর্যমণ্ডিত ক্ষণস্থায়ী স্বল্পকালীন এই অনুভূতিকে হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী করে রাখার জন্য মূলত এই আয়োজন। সেই থেকেই সাকুরা ফুল দর্শন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু বলে প্রচলিত ধারণা। তবে ভিন্নমতও আছে। এলিট শ্রেণির হাত ধরে খুব শিগগিরই তা সামুরাই সমাজে বিস্তার লাভ করে এবং এদো যুগে তা সাধারণ মানুষের উদ্যাপনের সুযোগ করে দেয়া হয়। তোকুগাওয়া ইয়োশিমুনে নামক স্থানে সাকুরা গাছের নিচে বসে দুপুরে লাঞ্চ এবং সেই সঙ্গে মদপানরত অনুভূতি নিয়ে সাকুরা ফুলের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করে। সেই হিসেবে সম্রাট সাগাকে আধুনিক সাকুরা দর্শন (চেরি ব্লসম) এর জনক বললেও ভুল হবে না। এরপর আঘুচি-মোমোয়ামা যুগে (১৫৬৮-১৬০০) হিদোয়োশি তোয়োতোমি সাকুরা ফুল দর্শনে বড় ধরনের পার্টির আয়োজন করে ফুল দর্শনকে জনপ্রিয় করে তোলেন এবং সেই সঙ্গে জাপানিরা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে সীমাবদ্ধ না রেখে নদীর পাড়, পার্ক, লেকের ধার, রাস্তার ধার যেখানেই সাকুরা গাছের ছড়াছড়ি সেখানেই এই আয়োজন করে আসছে।
বর্তমানে সাকুরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে, যেমন: ইউরোপ এর বিভিন্ন দেশগুলোতে, পশ্চিম সাইবেরিয়া, ইন্ডিয়া, চীন, কোরিয়া, কানাডা এবং আমেরিকাতে।
দেশে দেশে সাকুরা উৎসব
সাকুরা উৎসব বা চেরি ব্লসম এখন জাপান ছাড়াও বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে পালন করা হয়। যদিও ব্যাপক আকারে নয়, তবুও হচ্ছে। দেশগুলো হচ্ছে তাইওয়ান, কোরিয়া, ফিলিপিন, ম্যাকাও, জর্জিয়া, ইউরোপের ফিনল্যান্ড এবং আমেরিকায় নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি। ১৯১২ সালে শুভেচ্ছা নিদর্শন হিসেবে জাপান আমেরিকাকে ৩০০০ সাকুরা গাছের চারা উপহার হিসেবে দেয়। ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই দেশের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে গাছগুলো শোভা পেতে থাকে। এরপর ১৯৬৫ সালে আরও ৩৮০০ চারা উপহার হিসেবে পাঠানো হয়।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিতে প্রতি বছর মধ্য মে’তে ১৯৮৯ থেকে সাকুরা ফেস্টিভ্যাল পালিত হয়ে আসছে। ব্রুকলি বোটানিক্যাল গার্ডেন আয়োজিত উৎসবগুলোর মধ্যে সাকুরা উৎসব খুবই জনপ্রিয় একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে।
ফিনল্যান্ডের হেলসিংকির Roihuuvori নামক স্থানেও মে মাসে সাকুরা উৎসব হয়ে থাকে। সেখানে বসবাসরত জাপানি জনগণ এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত কোম্পানি ২০০টি চারা উপহার হিসেবে দেয়।
মোটকথা সাকুরা ফুল দর্শন জাপানি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী একটি উৎসব। রূপকথা, গল্পে, কবিতায়, পানাহারে, ব্যবসায় সব স্থানেই সাকুরা ফুল দর্শন স্থান দখল করে আছে এবং ধীরে ধীরে তা বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। হয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও।
প্রবাসী বাংলাদেশিরাও নিজ দেশে সাকুরা নেয়ার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। জাপানের ইচিগো (স্ট্রবেরি), কাকি (পার্সিমন) বাংলাদেশে প্রবাসীরা নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে স্বমহিমায় টিকে আছে, বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ এবং ভালো ফলনও দিচ্ছে। সেই সাফল্যে আশান্বিত হয়ে প্রবাসীরা উৎসাহ দেখাচ্ছেন সাকুরার মাইগ্রেশনে।
কোভিড-১৯ ভাইরাস যা করোনা নামেই সমধিক পরিচিত হয়ে গোটা বিশ্ব দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এমন কোনো খাত নেই যেখানে করোনার প্রভাব পড়েনি। কম অথবা বেশি, পার্থক্য কেবল এটুকুই। তবে পর্যটন শিল্প এবং হোটেল ব্যবসায় এর প্রভাব প্রকট। আর এই দুইটার সঙ্গেই রয়েছে জাপানের সাকুরা উৎসব বা ‘চেরি ব্লসম’ এর সরাসরি সম্পর্ক। তাই, ‘সাকুরা উৎসবে’ যে করোনার প্রভাব পড়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ঘটা করে সাকুরা উৎসব কোথাও পালিত হয় নাই। ছিল না কোনো উচ্ছ্বাস। কারণ সেই একটাই, কোভিড-১৯। স্থানীয় প্রশাসনগুলো এ ব্যাপারে খুবই সচেতনতার সঙ্গে জনগণকে উদ্যানগুলোতে সমবেত হওয়ার জন্য নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। কিছু কিছু উদ্যান সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হলেও বেশির ভাগ উদ্যানই নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে লোক সমাগমের। কিছু কিছু উদ্যান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়োগকৃতদের সাবধানতা অবলম্বন করার তাগিদ দিয়েছে।
সাকুরা উৎসব নিয়ে প্রতি বছরের মতো ব্যবসায়ীরা ছক আঁকতেন, পসরা নিয়ে বসতেন তাদের সকলের উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েছে সেই সময়ে। আগের বছরের ক্ষতিটা এ বছর পুষিয়ে নিতে চেয়েছিলেন তাদের চিন্তায় বাগড়া সেধেছে করোনার দীর্ঘ অবস্থান। তারা ভাবতেও পারেননি যে করোনা এতটা লম্বা সময় ধরে স্থায়ীভাবে গেড়ে বসবে।
শুধুই যে স্থানীয়দের মধ্যেই যে সাকুরা উৎসবে ভাটা পড়েছে তা কিন্তু নয়। করোনার কারণে এবং সংক্রমণ রোধে জাপান সরকারের নেয়া পদক্ষেপের কারণে ওই বছরগুলোতে বহির্বিশ্ব থেকে পর্যটক আসতে না পারাটাও অন্যতম একটি কারণ।
তবে এই ফুল দেয়া চেরি গাছ থেকে চেরি ফল পাওয়া যায় না, চেরির আর এক প্রজাতির গাছ থেকে চেরি ফল পাওয়া যায় যা জাপানি ভাষায় ‘সাকুরামবো’ বলে জাপানের ১০০ ইয়েনের মুদ্রায় এক পিঠে এই সাকুরার ফুল অঙ্কিত আছে।