ঢাকা, ১২ জুন ২০২৪, বুধবার, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৫ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

প্রথম পাতা

টানাহেঁচড়ার মধ্যে না পড়লে আরও কাজ করতে পারতাম

স্টাফ রিপোর্টার
২৪ মে ২০২৪, শুক্রবার
mzamin

শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের করা মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনের জামিনের মেয়াদ আগামী ৪ঠা জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার ঢাকার শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) এমএ আউয়াল এই আদেশ দেন। মামলার অপর তিন আসামি হলেন- গ্রামীণ টেলিকমের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুরজাহান বেগম ও মো. শাহজাহান। আদালতে জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন। অপরদিকে কলকারখানা পরিদর্শক অধিদপ্তরের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। এর আগে সকাল ১১টার দিকে কাকরাইলে অবস্থিত শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পরে আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে ড. ইউনূসের আইনজীবী আদালতে স্থায়ী জামিন আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। আদালতকে তিনি বলেন, আপিল মামলায় আসামির হাজিরার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু এখানে আমরা প্রতি ডেটে হাজিরা দিচ্ছি। আজকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান বাতিল করে উনাকে এখানে হাজিরা দিতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
পরে স্থায়ী জামিনের বিরোধিতা করেন কলকারখানার আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত স্থায়ী জামিন আবেদন নাকচ করে জামিনের মেয়াদ ৪ঠা জুলাই বৃদ্ধি করে আদেশ দেন। 

আমাকে নানাভাবে টানাহেঁচড়ার মধ্যে রাখা হচ্ছে: ড. ইউনূস বলেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, ব্যবসাকে উদ্বুদ্ধ করা, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষও আমার কথা গ্রহণ করছেন। এই একটা লেভেলে আমরা আসতে পেরেছি, এ ছাড়া আরও কাজ করতে পারতাম যদি না এসব টানাহেঁচড়ার মধ্যে পড়তাম। তারপরও জীবনে যা করার তা করার চেষ্টা করেছি। শেষ বয়সে এসেও আরও করতে চেয়েছিলাম, তবে সেই সুযোগ আমাকে দেয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমাকে নানাভাবে টানাহেঁচড়ার মধ্যে রাখা হচ্ছে। নতুন কিছু করতে পারলে অন্য দেশের মানুষরা বলতো এটা বাংলাদেশ থেকে আমরা শিখেছি। সেই সুযোগটা হলো না, এটাই দুঃখের বিষয়। এই দুঃখ থেকে যেন আমি মুক্তি পেতে পারি, সেজন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। আপনি দেশের জন্য কাজ করছেন, তাহলে আপনার প্রতি বিদ্বেষ কেন?- এমন প্রশ্নে ড. ইউনূস বলেন, আপনি যেমন আগ্রহ নিয়ে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন, ঠিক সেভাবেই আমিও আপনাদের কাছে এর উত্তর জানতে চাইলাম। কে আমার ওপর রাগ করলো, কেন রাগ করলো এটা আমি জানি না। এত রাগ করলো যে আমাকে কাজকর্ম থেকে বিচ্যুত করে দিতে হবে, আমাকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরিয়ে দিতে হবে ইত্যাদি, ইত্যাদি। কী সেই রাগের কারণ, এটা আমারও প্রশ্ন।

শ্রমিকেরা মামলা করে নাই: আদালত থেকে বেরিয়ে ড. ইউনূস সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,  সরকার বারবার বলছে, সকল পর্যায় থেকে বলছে এই মামলা সরকার করে নাই। আপনারা (সাংবাদিক) তো সাক্ষী। এটা কি সরকার করলো নাকি শ্রমিক করলো? আমাকে একটু জবাবটা দেন। এটা আবারো বলেন, যে এটা মিথ্যা কথা। এটা কলকারখানা অধিদপ্তর, সরকারের অধিদপ্তর করেছে। শ্রমিকেরা করে নাই। শ্রমিকেরা এর কিছুর মধ্যে নাই। ড. ইউনূসের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ মহল থেকে আরম্ভ করে সব জায়গায়, বিদেশিদের কাছেও বলা হচ্ছে সরকার মামলা করে নাই। এটা করেছে শ্রমিকরা। কিন্তু ঘটনা সঠিক না। আপনারা জানেন এই মামলা করেছে সরকার। তার প্রতিষ্ঠান কলকারখানা অধিদপ্তরের মাধ্যমে। মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে যে শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ীকরণ করা হয় নাই, অর্জিত ছুটি দেয়া হয় নাই এবং লভ্যাংশের পাঁচ পার্সেন্ট দেয়া হয় নাই। এই মিথ্যা মামলা সরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি নির্দেশে করেছে। এই মামলারই রায় হয়েছে। এই রায়টা যেটা হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ। ড. ইউনূস সব সময় আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তাই আন্তর্জাতিক সকল অনুষ্ঠান বাতিল করে উনি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেন।

তিন শূন্যের পৃথিবী গড়তে চাই: ড. ইউনূস বলেন, আমরা তিন শূন্যের পৃথিবী গড়তে চাই। যেখানে নেট কার্বন এমিশন জিরো, জিরো পভার্টি এবং জিরো আনএমপ্লয়মেন্ট আরেকটা হলো ওয়েলথ কনসেনট্রেশন। সমস্ত সম্পদ মালিক ওপরের দিকে হচ্ছে। নিচের দিকের মানুষ বঞ্চিত হয়ে যাচ্ছে। সম্পদ একদিকে ছোটে, সেটা হলো বড়লোকের পেছনে। সমস্ত প্রতিষ্ঠান, আইন, সমস্ত নীতি-নির্ধারণ, সব স্ট্রাকচার সবকিছু তার জন্য সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। কাজেই আমরা সেই তিন শূন্যের পৃথিবী গড়তে চাই। সেটা আমাদের কমিটমেন্ট।

আমরা একটা স্বপ্নের পেছনে ছুটেছি: কেন আপনি এই পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা একটা স্বপ্নের পেছনে ছুটেছি। এই স্বপ্নের মধ্যে পড়ে গিয়ে কারও বিরক্তিভাজন হয়েছি। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,  কেন এই মামলা তা আমি বলতে পারবো না। এই সব জিনিস আপনাকে বিচলিত করতে পারবে না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আশাকরি পারবে না। যে কয়দিন সময় আছে কাজগুলো করার। আমাদের সামনে অসম্পূর্ণ কাজ অনেক। আমরা দেখছি পৃথিবীব্যাপী তার একটা বড় রকমের সমর্থন আসছে। তরুণরা আসছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে আসছে। এখন ১০৭টা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার সৃষ্টি করা হয়েছে। পৃথিবী জুড়ে ৩৭টি দেশে ইউনূস সেন্টার আছে। এখন রাশিয়াতে সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার শুরু হচ্ছে। কাজেই হেন দেশ নাই যেখানে সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থাৎ একাডেমিক জগৎ যেটা সবচেয়ে কঠিন জগৎ সেখানে একাডেমিকরাই এই সমস্যার সৃষ্টি করেছে একাডেমিকদেরকেই এর সমাধান দিতে হবে। নাহলে এটা পাল্টাবে না। সেজন্য আমরা একাডেমিকদের সঙ্গে কাজ করছি।

অলিম্পিক ফ্রেমওয়ার্ক আমাদের আইডিয়ায় হচ্ছে: প্যারিস অলিম্পিক ফ্রেমওয়ার্ক আমাদের আইডিয়ার ভিত্তিতে তৈরি হচ্ছে জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ভালো লাগার একটা বিষয় হলো বাংলাদেশ থেকে একটা আইডিয়া, একটা ধারণা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আগ্রহের সঙ্গে নিচ্ছে। কিছু কিছু জিনিস আমার কাছে অদ্ভুত লাগে যেটা কখনো চিন্তা করিনি এমন একটা কাজের সঙ্গে যুক্ত হবো। প্যারিস অলিম্পিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে আমাদের কথার ভিত্তিতে। আমি যা বলেছি, তারা এটা গ্রহণ করেছে। ১০০ বছর পর তাদের এই মহা আয়োজন। এটা আমার কাছে অনেক পাওনা। এতে দেশের তরুণরা উদ্বুদ্ধ যে, আমাদের ধারণা নিয়ে একটা মহাকর্মকাণ্ড হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, টোকিও অলিম্পিকেও আমাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়েছে। এটা মহাসম্মান। এটা শুধুমাত্র আমার একার নয়, এটা আমার দেশেরও সম্মান। আরেক প্রশ্নের জবাব ড. ইউনূস বলেন, অবশ্যই বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। লোকেরা আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষায় আছেন, অথচ আমি আদালতে হাজিরা নিয়ে ব্যস্ত আছি। এটা তারা দেখছে না?

ড. ইউনূস কিন্তু একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি: কলকারখানা অধিদপ্তরের পক্ষে এডভোকেট খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, উনি (ড. ইউনূস) আপিল করেছেন, উনি সাজাপ্রাপ্ত। একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি কীভাবে বলেন, বাংলাদেশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। শ্রম আদালতের আইন ভঙ্গের জন্য ওনার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এটা তো নতুন কিছু না। এখনো লেবার কোর্টে প্রচুর মামলা পেন্ডিং আছে। বাংলাদেশকে নিয়ে কথা বলার ঔদ্ধত্য ওনার নেই। তিনি বলেন, আমি মনে করি একটি আপিলকে নিয়ে শুনানি করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে নিয়ে কথা বলার ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ। এটা উনি বলার অধিকার রাখেন না। আপনাকে মাথায় রাখতে হবে ড. ইউনূস কিন্তু একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। দণ্ড মাথায় নিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করা আইনের দৃষ্টিতে সমীচীন নয়। ওনাকে মাথায় রাখতে তিনি সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে আপিল করেছেন। এডভোকেট খুরশীদ আলম খান বলেন, ড. ইউনূসের সাজা হয়েছে, উনি মামলা নিয়ে কথা বলুক, এতে আমাদের আপত্তি নেই। সেখানে তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলছেন, বাংলাদেশের ইমেজের কথা বলছেন। তাহলে কি বাংলাদেশের ইমেজ ডিপেন্ড করে প্রফেসর ইউনূসের ওপর? মোটেও না, যিনি একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি, তিনি কেন বাংলাদেশকে নিয়ে কথা বলবেন? সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে খুরশীদ আলম বলেন, আগামী ৪ঠা জুলাই পর্যন্ত ওনার জামিন হয়েছে, এসময়ের মধ্যে যদি বিদেশ যেতে চান তাহলে আদালতকে অবহিত করে যেতে পারবেন। সেখানে কোনো আইনি বাধা নেই।

২০২১ সালে গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ প্রতিষ্ঠানটির চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। গত ১লা জানুয়ারি ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতের বিচারক শেখ মেরিনা সুলতানা ড. ইউনূসসহ চারজনকে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের প্রত্যেককে শ্রম আইনের ৩০৩ ও ৩০৭ ধারায় ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন। একইসঙ্গে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রায় ঘোষণার পরই জামিন আবেদন করা হলে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার শর্তে তাদের এক মাসের জামিন দেয় বিচারক। জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন তারা। 
 

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

   

প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status