ঢাকা, ১৬ জুন ২০২৪, রবিবার, ২ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

প্রথম পাতা

জেসমিনকে ধরার আগে আরেক নারীকে উঠিয়ে নিতে চেয়েছিল র‌্যাব

নাজমুল হুদা ও সাদেকুল ইসলাম, নওগাঁ থেকে
২৯ মার্চ ২০২৩, বুধবারmzamin

র‌্যাবের হাতে আটকের পর সুলতানা জেসমিনের মৃত্যুর ঘটনায় থমথমে অবস্থা নওগাঁয়। মৃত্যুর পরদিন সুলতানাকে নওগাঁ শহরের একটি কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যরা ওইদিনই অভিযোগ করেন র‌্যাব হেফাজতে নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। আটকের আগে জেসমিনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। জেসমিন যখন হাসপাতালের আইসিইউতে তখন র‌্যাব সদস্যদের উপস্থিতিতে থানায় মামলা করেন যুগ্ম সচিব এনামুল হক। এ ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন জেসমিনের স্বজনরা। তারা এখন এ বিষয়ে খুব বেশি কথা বলতে চাইছেন না। কথা বলতে চান না জেসমিনের প্রতিবেশী ও সহকর্মীরাও। গতকাল সরজমিন জেসমিনের বাসা, কর্মস্থল, তাকে আটকের স্থান ঘুরে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছে মানবজমিন। 

নওগাঁ শহরের জনকল্যাণপাড়ায় জেসমিনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায় বাসাটি খালি পড়ে আছে। ওই বাড়ির মালিক দেলোয়ার হোসেন দুলাল বলেন, জেসমিন অনেক ভালো মেয়ে ছিলেন।

বিজ্ঞাপন
তার টাকার কোনো লোভ ছিল না। নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করতেন। তার সঙ্গে কারও কখনো কোনো ঝগড়া-বিবাদ হয়নি। সুলতানার বাসা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে তার অফিস। সেখানে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের মুখেও শোনা যায় জেসমিনের কথা। তার মৃত্যু স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না কেউ। তারা জানান, সর্বদা হাসিমুখে থাকতেন তিনি। জেসমিনের অফিসে গিয়ে কথা হয় তার সহকর্মীদের সঙ্গে। সুলতানার এই মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তারা। 

২০২২ সালের ১৯শে জানুয়ারি থেকে চণ্ডীপুর ইউনিয়নের ভূমি অফিসে অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন সুলতানা জেসমিন। একই অফিসে উপ সহকারী হিসেবে কাজ করেন মোমেনা খাতুন। তিনি জানান, আমি চার মাস ধরে তার সঙ্গে কাজ করছি। এই চার মাসে তাকে খুবই ডিসিপ্লিনভাবে কাজ করতে দেখেছি। সব ধরনের কাজে তার সহযোগিতা পেয়েছি। এই সময়ে তার সম্পর্কে কোনো অভিযোগ পাইনি। একজন ভালো কর্মচারী যেমন হওয়া উচিত জেসমিন তাই ছিলেন। মোমেনা খাতুনের মতো একই কথা জানিয়েছেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কাজী রফিউল আলম। তিনি বলেন, মানুষ হিসেবে তিনি খুবই ভালো ছিলেন। সময়মতো অফিস করতেন। এখন পর্যন্ত কর্মক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি।   

স্থানীয় সরকার রাজশাহী বিভাগ এর পরিচালক যুগ্ম সচিব মো. এনামুল হকের করা অভিযোগ প্রসঙ্গে জেসমিনের মামা নাজমুল হক মন্টু জানান, ছোটবেলা থেকেই জেসমিনের জীবন সুন্দরভাবে গড়ে উঠেছে। সে টিউশনি করেছে, শিক্ষকতা করেছে। তারপর তার এই সরকারি চাকরি হয়েছে। ১৫ বছর ধরে ভূমি অফিসে চাকরি করে। তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ কতটুকু সত্য তা আমরা জানি না। সে খুবই ভালো মেয়ে ছিল। কখনও কেউ তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও করেনি। অফিসে কাজ করার সময় সে কাউকে হয়রানিও করেনি।  আটকের একদিন পর সুলতানা জেসমিনের বিরুদ্ধে এনামুল হকের মামলার বিষয়টি জেনে অবাক হয়েছেন বলে জানান নাজমুল হক মন্টু। তিনি বলেন, জেসমিনকে আটকের ঘটনা ঘটেছে ২২ তারিখ। কিন্তু মামলা হয়েছে ২৩ তারিখ। অভিযোগকারী এনামুল হককে কোনোদিন আমরা দেখিনি। এনামুলের সঙ্গে তার কোনো ধরনের পরিচয় ছিল কিনা সেটিও জানা নেই। 

ঘটনার দিনের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে মন্টু বলেন, জেসমিনকে ধরার ৩০ মিনিট আগে ওইদিন আরও এক নারীকে উঠিয়ে নিতে চেয়েছিল র‌্যাব। তখন ওই নারী বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে। তখন এলাকার মানুষ সবাই সেখানে যায়। পরে ওই নারীকে আর র‌্যাব নিয়ে যায়নি। এরপর জেসমিন সুলতানাকে ধরে নিয়ে যায়। যারা ওখানে দেখেছে তারা আমাকে এসব কথা বলেছে। আটকের কয়েকদিন আগে থেকেই জেসমিনের বাসায় র‌্যাব’র পর্যবেক্ষণ ছিল বলেও ধারণা তার। 

তিনি বলেন, তাকে আটকের দিন আমি একটা টেলিফোন পেয়েছিলাম। আমাকে বলেছিল, আমার ভাগ্নিকে কেউ ধরে নিয়ে গেছে। তখন বিশ্বাস করিনি। তারপর জেসমিনের ছেলে আমাকে কল দিয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা জানায়। তখন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজা-খুঁজি করেছি। থানায় গেলাম, ডিবি অফিসে গেলাম। কিন্তু আমাকে জানায়, তারা কেউ এই বিষয়টি জানে না। পরে দুপুর পৌনে ২টার দিকে সৈকত (জেসমিনের ছেলে) কল দিয়ে জানায়, জেসমিনকে সদর হাসপাতালের ৬ তলায় ভর্তি করা হয়েছে। ওই কলটি জেসমিনের ফোন থেকেই সৈকতকে করা হয়েছিল। জেসমিন আটক হওয়ার পর লাশ হয়ে আমাদের কাছে এসেছে। এর মধ্যে তার গায়ে আমরা হাত দিয়েও দেখতে পারিনি। র‌্যাবের তত্ত্বাবধানে লাশ সুরতহাল হয়েছে, পোস্টমর্টেম হয়েছে। ধোয়া ও কফিন হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, জেসমিনের আগে থেকে কোনো অসুস্থতা ছিল না। সে সবসময় ব্যস্ততার মধ্যে ছিল। তার সঙ্গে কারও কোনো সম্পর্কও ছিল না। তাকে অনেকবার বিয়ের কথাও বলেছি। কিন্তু সেটিতেও রাজি হয়নি। ছেলের লেখাপড়া শেষ হলে তাকে বিয়ে দিবে বলে আমাদের জানিয়েছিল। 

তিনি বলেন, র‌্যাবের হেফাজতে নেয়ার সময়ে তার গায়ে ৩ ভরির মতো স্বর্ণ অলঙ্কার ছিল উল্লেখ করে জেসমিনের মামা মন্টু বলেন, তার হাতে স্বর্ণের চিকন দুইটা বালা ছিল, দুইটা কানের দুল ছিল, ১ ভরি ওজনের গলার চেইন ছিল, ২টা আংটি ছিল। এ ছাড়া ২টা মোবাইল ফোন ছিল। এই মালামালের কোনো খবর পাই নাই আমরা। 

জেসমিনকে আটকের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী মৌসুমি সুলতানা। তিনি জানান, আমি রিকশায় সদর হাসপাতালে যাচ্ছিলাম। তখন দেখি র‌্যাবের নারী সদস্যরা জেসমিনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে ২টা হায়েস গাড়ি রাখা ছিল। 

মৃত্যুর কারণ নিয়ে যা বললেন চিকিৎসক: রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) ফরেনসিক চিকিৎসকরা সুলতানার মৃত্যুর একদিন পর ময়নাতদন্ত করেছেন। তার ফলাফল এখনো আসেনি। তবে সুলতানা জেসমিনের মাথার ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়েছে সেটি মৃত্যু সনদে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া সুরতহাল রিপোর্টে উচ্চ রক্তচাপ, ডান হাতের কনুইয়ের উল্টাপাশে কালশিরার চিহ্ন ও কপালে ঘষা লাগার মতো আঘাত  উল্লেখ রয়েছে বলে জানান ময়নাতদন্তের জন্য গঠিত ৩ সদস্যের বোর্ডের প্রধান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক কফিল উদ্দিন। তিনি বলেন, জেসমিনের ময়নাতদন্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। এই ফলাফল এখনো আসেনি। আরও ৪ থেকে ৫ দিন সময় লাগতে পারে রিপোর্ট আসতে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এফ এম শামীম আহাম্মদ বলেন, উচ্চ রক্তচাপ বিভিন্ন কারণে হতে পারে। বয়সের কারণে কিংবা কিডনিতে সমস্যা থাকলেও হতে পারে। 

র‌্যাব-৫ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার বলেন, আমরা তার মোবাইল পেয়েছি। সেটি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। স্বর্ণের বিষয়টি আমাদের জানা নেই। কারণ তিনি আমাদের কাছে এক ঘণ্টা ছিলেন বাকি সময় হাসপাতালে ছিলেন। এ ছাড়া তার পোস্টমর্টেম, ধোয়ানো হয়েছে। এই অবস্থায় স্বর্ণ কোথায় আছে বা কার কাছে গিয়েছে সেটি খতিয়ে দেখা হবে। 

ওদিকে র‌্যাব হেফাজতে নওগাঁর সুলতানা জেসমিনের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ নওগাঁ জেলা শাখা। গতকাল বিকালে শহরের মুক্তির মোড়ে ঘণ্টাব্যাপী এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। 

হদিস নেই বাদীর: স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, র‍্যাবের হাতে আটকের পর শুক্রবার সকালে নওগাঁ ভূমি কার্যালয়ের অফিস সহকারী সুলতানা জেসমিনের (৪৫) মৃত্যুর ঘটনায় ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। যার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ওই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেই যুগ্ম সচিব এনামুল হকের সন্দেহজনক আচরণ ও মামলার এজহার বিশ্লেষণ করে বেশকিছু প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। হদিস পাওয়া যাচ্ছে না মামলার বাদীরও। রহস্যজনকভাবে ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে তার মুঠোফোন নম্বর।

জানা গেছে, মামলার বাদীর নাম মো. এনামুল হক। তিনি রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব। গত বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের রাজপাড়া থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তিনি একটি মামলা করেন। 

এনামুল হকের রহস্যজনক আচরণের বেশকিছু প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। উঠে আসছে ভিন্ন প্রশ্ন। ঘটনার পর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। এনামুলের কর্মস্থল রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ওয়েবসাইট ভিজিট করে দেখা গেছে, সাইটটি গতকাল মঙ্গলবার ১২টা ৩৭ মিনিটে সবশেষ হালনাগাদ করা হয়। যেখানে কর্মকর্তাদের তালিকায় থাকা এনামুলের নামের পাশ থেকে তার মোবাইল নম্বর সরিয়ে সেখানে টেলিফোন নম্বর বসানো হয়েছে। অথচ তালিকায় সব উপরে বিভাগীয় কমিশনার ও নিচে অন্যান্য কর্মকর্তাদের মুঠোফোন নম্বর রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ধুম্রজাল।

এনামুল হকের দায়েরকৃত মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়, এনামুল হক ২০শে মার্চ তার অফিসের উচ্চমান সহকারী জামালের মাধ্যমে জানতে পারেন যে, কে বা কারা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় ও পদবি ব্যবহার করে ফেসবুক আইডি খুলে চাকরি দেয়ার নাম করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আগের দিন অর্থাৎ ১৯শে মার্চ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা টাকা নিয়েছে বলেও জানতে পারেন তিনি। এনামুল হক নিজে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে জানতে পারেন চাঁদপুরের হাইমচরের মো. আল আমিন (৩২), সুলতানা জেসমিনসহ (৪০) অজ্ঞাত আরও দু-তিনজন এ কাজে জড়িত। এরপর ২২শে মার্চ তিনি দাপ্তরিক কাজে নওগাঁর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। রাস্তায় নওগাঁ বাসস্ট্যান্ডে র‍্যাবের একটি টহল দলকে দেখতে পান তিনি। দায়িত্বে থাকা ডিএডি মাসুদকে নিজের অভিযোগ জানান। সেই দল এমন অপরাধ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারার মধ্যে পড়ে বলে তাকে জানায়। তাৎক্ষণিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ওই টহল টিম অবস্থান নির্ণয় করে মুক্তির মোড় থেকে সুলতানা জেসমিনকে আটক করে বেলা সোয়া ১১টার দিকে।

মামলায় এনামুলের দাবি, আটকের পর জেসমিন তার নামে ফেসবুক আইডি খুলে চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেন। তার সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে লেনদেনের বিষয়টি জানা যায়। প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এই কার্যক্রমের একপর্যায়ে মামলার ১ নম্বর আসামি ও অজ্ঞাত আরও দু-তিনজনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় জেসমিন অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে এজাহারে উল্লেখ করেন এনামুল। এরপর তাকে নওগাঁ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে অবস্থার অবনতির কারণে সেখানকার চিকিৎসকরা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলেন।

এ বিষয়ে এনামুল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার কার্যালয় থেকেও জানানো হয়নি কোনো তথ্য।

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

   

প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status