ঢাকা, ৫ এপ্রিল ২০২৫, শনিবার, ২২ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৫ শাওয়াল ১৪৪৬ হিঃ

প্রথম পাতা

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপ

বাংলাদেশকে এখনই আলোচনায় যেতে হবে

অর্থনৈতিক রিপোর্টার
৫ এপ্রিল ২০২৫, শনিবারmzamin

যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানি করে, তাদের ওপর রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এতে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানি করতে হলে ৩৭ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে; যা আগে ছিল গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ। নতুন এ শুল্ক নীতি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নিয়ে করা শুল্ক সংস্কারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জরুরিভিত্তিতে তুলে ধরা। এ ছাড়া, বাংলাদেশকে এখনই ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। 

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ এতে মার্কিন বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি উদ্বেগ ব্যক্ত করে জানান, শুল্ক বাড়ানোর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় বাজারে সামগ্রিকভাবে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে; যা দেশটিতে পণ্যের চাহিদা কমবে। আর চাহিদা কমলে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এ শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের বাজার অন্য দেশের দখলে চলে যাওয়ার সুযোগ নেই বা খুব বেশি পরিবর্তন হবে না বলে জানান তিনি। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে সমজাতীয় প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে। কিছু দেশ আছে, যা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। অন্য দেশে গেলে আরও বেশি শুল্ক দিতে হবে। ফলে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশগুলোও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, কোনো বাড়তি সুবিধা পাবে না। 

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপরে যেসব কারণে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, সেগুলো দূর করে এ শুল্ক কমিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারলে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন ড. জাহিদ। তিনি পরামর্শ দেন- বাংলাদেশকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে আলোচনা করতে হবে যে পরোক্ষ শুল্ক হিসাবের ভিত্তিগুলো যথাযথ কিনা। পাশাপাশি সরকার ইতিমধ্যে এনবিআরের যে শুল্ক সংস্কারগুলো করেছে, সেগুলো তুলে ধরা জরুরি।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে রপ্তানি ভর্তুকি কমিয়েছে এবং সরকার সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। তার মতে, বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা করে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেয়া। এ ছাড়া, সরকারের পাশাপাশি রপ্তানিকারকদেরও সম্মিলিতভাবে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। 

ড. জাহিদ বলেন, তৈরি পোশাক খাতের ওপর ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। তাই এ খাতের উদ্যোক্তাদের উচিত যৌথভাবে ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি করে বাড়তি শুল্ক তাদের পরিশোধ করার অনুরোধ জানানো। 
এ নিয়ে তিনি বলেন, এই বাড়তি শুল্ক সরবরাহকারীরা নয়, ক্রেতারা পরিশোধ করবে- এই বিষয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দরকার। যেমনটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবসায়ীরা করছে। বরং ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মতোই এই ব্যয় ক্রেতাদের ওপর স্থানান্তর করা উচিত। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থেকে বের হতে হবে। অর্থাৎ পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে কেউ যেন এই বাড়তি শুল্ক নিজের ওপরে চাপিয়ে না নেয়। বাড়তি শুল্ক ক্রেতাদের ওপরই চাপাতে হবে। তিনি আরও বলেন, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-কে একটি যৌথ নীতি নির্ধারণ করতে হবে, যাতে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতার কারণে নিজ উদ্যোগে পণ্যের দাম কমিয়ে এই বাড়তি শুল্কের চাপ নিজের ওপর না নেন। যদি কেউ এই কৌশল না মানে, তাহলে তার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও রাখা উচিত।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ছাড় দিচ্ছে, যেমন ওষুধ, লো প্রাইস এবং এসেন্সিয়াল আইটেম (নিত্য প্রয়োজনীয়)। চীনও এই ছাড় পাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এই তালিকায় নেই। বাংলাদেশের উচিত- যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো যে, দেশটি কম দামের পোশাকসহ এসেন্সিয়াল পণ্য রপ্তানি করছে। এ কারণে এসব পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়ের দাবি করা যেতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্য অনুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে, বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৮০০ মিলিয়ন ডলার; যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫.৯৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৭.৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল, যা আগের বছরে ছিল ৭.২৮ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি ১.৫ শতাংশ কমে ২.২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৬.২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যে বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসছে, তা সহজেই অনুমেয়।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রধান ৫টি রপ্তানি পণ্য: বোনা পুরুষদের স্যুট: ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই পণ্যের রপ্তানি মূল্য ছিল ১.৯ বিলিয়ন ডলার। বোনা মহিলাদের স্যুট: একই বছরে এই পণ্যের রপ্তানি মূল্য ছিল ১.০৯ বিলিয়ন ডলার। বোনা পুরুষদের শার্ট: ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই পণ্যের রপ্তানি মূল্য ছিল ৭০৫ মিলিয়ন ডলার। বোনা পোশাক: ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৩০% ছিল বোনা পোশাক, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। বোনা টেক্সটাইল পণ্য: বাংলাদেশের রপ্তানির একটি অংশ বিভিন্ন টেক্সটাইল পণ্য নিয়ে গঠিত, যা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। এই পণ্যগুলোর মধ্যে প্রধানত তৈরি পোশাক এবং টেক্সটাইল পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির শীর্ষে রয়েছে।

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত

   
Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status