প্রথম পাতা
বিশ্ব নেতাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
মানবজমিন ডেস্ক
৪ এপ্রিল ২০২৫, শুক্রবার
বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধকে আরও তীব্র করে তুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। অন্যান্য দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের বিপরীতে রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ বা পারস্পরিক শুল্কের একটি ধারা চালু করেছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সকল পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ বেসলাইন ট্যারিফ এবং দেশটির বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর উচ্চতর শুল্ক আরোপ করার কথা জানিয়েছেন ট্রাম্প। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে শুল্ক বিভিন্ন করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে শতকরা ৩৭ ভাগ। এর মধ্যদিয়ে ট্রাম্প ইচ্ছে পূরণের সবচেয়ে বড় জুয়া খেলছেন। অনলাইন বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক দশক ধরে রাজনীতির ধরন পাল্টে দিয়েছেন ট্রাম্প। এ জন্য ১৯৮০’র দশক থেকে ধারাবাহিকভাবে একটি কাজ করে এসেছেন ট্রাম্প। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে শুল্ককে বানিয়েছেন হাতিয়ার। এখন তিনি সেই টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে নিজের প্রেসিডেন্সিকে বাজি রেখেছেন। তার এই কর্মকাণ্ডে বিশ্বনেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বলছেন, এর ফলে ইউরোপের সঙ্গে ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট শুল্ক আরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ বলে উল্লেখ করেছেন। লক্ষ্য করার বিষয় হলো তিনি চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। তবে এ থেকে রেহাই পেয়েছে রাশিয়া। এ ছাড়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং জাপানের ওপর যথাক্রমে ২০ এবং ২৪ শতাংশ শুল্ক দেয়া হয়েছে। আর ভারতকে আমদানি শুল্ক দিতে হবে ২৬ শতাংশ। এদিকে ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ। অস্ট্রেলিয়ার গরুর মাংসের ওপর ট্রাম্পের কঠোর বাধা-নিষেধের সমালোচনা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। মার্কিন প্রেসিডেন্টের পদক্ষেপকে অন্যায় উল্লেখ করে আলবানিজ বলেছেন, এই অন্যায় পদক্ষেপের জন্য আমেরিকান জনগণকে আরও চড়া মূল্য দিতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, ট্রাম্পের অযৌক্তিক শুল্কের জন্য সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে আমেরিকার জনগণকে। এ কারণেই আমাদের সরকার রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ আরোপ করবে না। আমরা এমন কোনো প্রতিযোগিতায় যোগ দেবো না যা উচ্চমূল্য এবং ধীর প্রবৃদ্ধির দিকে ধাবিত করবে।
ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। বলেছেন, বিশ্ববাণিজ্য এই ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটাবে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের তুলনায় কানাডার জন্য ট্রাম্পের শুল্ক কিছুটা সীমিত ছিল। কিন্তু কার্নি বলেছেন- অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত এবং গাড়ির ওপর মার্কিন শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে লাখ লাখ কানাডিয়ান। পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিরুদ্ধে লড়াই করার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। কিছুটা নিরুত্তাপ প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। বলেছেন, কারওই বাণিজ্যযুদ্ধের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। পার্লামেন্টের বক্তব্যে স্টারমার আরও বলেন, আমরা সকল পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত আছি। আমরা কোনো কিছুকেই উড়িয়ে দিচ্ছি না। বাণিজ্যযুদ্ধের বিষয়ে সতর্ক করে জার্মানি জানিয়েছে, এই বাণিজ্যযুদ্ধ উভয় পক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। নিজ দেশের কোম্পানি এবং কর্মীদের রক্ষা করার অঙ্গীকার করেছে স্পেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, তার দেশ কোম্পানি এবং কর্মীদের রক্ষা করবে এবং একটি উন্মুক্ত বিশ্বের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। বাণিজ্যে কোনোরকম বাধা চায় না সুইডেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী উল্ফ ক্রিস্টারসন উল্লেখ করেছেন যে, তার দেশ বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান কোনো বাধা চায় না। তিনি বলেছেন, আমরা বাণিজ্যযুদ্ধ চাই না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও সহযোগিতার পথে ফিরে যেতে চাই। যেন এ দেশের মানুষ আরও ভালো জীবন উপভোগ করতে পারে।
আইরিশ বাণিজ্যমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস বলেছেন, আয়ারল্যান্ড এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে পেতে প্রস্তুত। আলোচনা এবং সংলাপ সর্বদাই এগিয়ে যাওয়ার সর্বোত্তম উপায় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ট্রাম্পের মিত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও বলেছেন, পশ্চিমাদের দুর্বল করে দেবে এমন বাণিজ্যযুদ্ধ এড়াতে নতুন চুক্তি অনুসন্ধান করবে তার দেশ। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জর্জিয়া। তিনি বলেছেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি নিয়ে কাজ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। যার লক্ষ্য হচ্ছে বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ানো। ফ্রান্স সরকারের মুখপাত্র বলেছেন, এপ্রিলের মধ্যেই ট্রাম্পের নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। ২৭ দেশের এই ব্লকের প্রাথমিক পদক্ষেপ হবে ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়ামের ওপর মার্কিন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করা। এরপর খাত-ভিত্তিক ব্যবস্থা নেয়া। এদিকে বুধবার ট্রাম্পের আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্কের বিরুদ্ধে একটি আইন পাস করেছে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিল। তবে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে গত সপ্তাহে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেছিলেন, তার দেশ শুল্কের মুখে স্থির থাকতে পারবে না।
ইচ্ছে পূরণে সবচেয়ে বড় জুয়া: হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেনে বন্ধু, কনজারভেটিভ রাজনীতিক ও মন্ত্রীদের পরিবেষ্টিত অনুষ্ঠানে ট্রাম্প এ দিনকে বর্ণনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’ হিসেবে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এই দিনের জন্য অপেক্ষা করছে দীর্ঘদিন ধরে। বিবিসি লিখেছে, অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের দেয়া বক্তৃতার অর্ধেক ছিল উদ্যাপন, বাকি অর্ধেক ছিল আত্মপ্রশংসা। নিয়মিত বিরতিতে চলছিল হাততালি। ট্রাম্প তার বক্তৃতায় শুল্ক নিয়ে নিজের দীর্ঘদিনের বিশ্বাসের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি নাফটার মতো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা নিয়ে নিজের শুরুর দিকের সমালোচনার কথা স্মরণ করেন। প্রেসিডেন্ট মানছেন, নতুন শুল্ক ঘোষণার কারণে আগামী দিনে তাকে ‘বিশ্ববাদী’ আর ‘বিশেষ স্বার্থবাদীদের’ চাপের মুখে পড়তে হবে। তবে তিনি নিজের বিশ্বাসের ওপর আমেরিকানদের ভরসা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তার কথায়, ভুলে গেলে চলবে না, গত ৩০ বছর ধরে বাণিজ্য নিয়ে আমাদের বিরোধীরা যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, তার প্রত্যেকটিই সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বিবিসি লিখেছে, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পকে যেমন সমমনা উপদেষ্টারা ঘিরে রেখেছেন, তেমনি কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির হাতে। এ অবস্থায় বাণিজ্য নীতির মাধ্যমে নতুন আমেরিকা গড়ার দীর্ঘদিনের দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তবে পরিণত করার সুযোগ ট্রাম্পের সামনে এসেছে। তার ভাষ্য, এসব নীতিই যুক্তরাষ্ট্রকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে একটি সম্পদশালী দেশে পরিণত করেছিল এবং আবারো করবে। ট্রাম্প বলেন, কঠোর পরিশ্রমী মার্কিনিরা বছরের পর বছর ধরে দর্শকসারিতে বসে থাকতে বাধ্য হয়েছে; কারণ অন্যান্য দেশ ধনী ও শক্তিশালী হয়েছে, যার বেশির ভাগ খরচ গুনতে হয়েছে আমাদের। বিবিসি লিখেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি অপেক্ষা করছে। সব দেশের অর্থনীতিবিদরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, চীনের ওপর ৫৩ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ২০ শতাংশ এবং সব দেশের ওপর অন্তত ১০ শতাংশের যে শুল্ক ঘোষণা করা হয়েছে, তা আখেরে আমেরিকান ভোক্তাদেরই ভোগাবে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে, সেই সঙ্গে বৈশ্বিক মন্দারও ঝুঁকি তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কেন রগফ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, নতুন শুল্ক ঘোষণার পর বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের মন্দায় পড়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে।