প্রথম পাতা
ট্রাম্পের ‘নিউক্লিয়ার বোমার’ প্রভাব কী?
জিয়া হাসান
৪ এপ্রিল ২০২৫, শুক্রবার
বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপরে ট্রাম্পের নিউক্লিয়ার বোমা হামলা নিয়ে, আমাদের প্রথম প্রশ্ন আরএমজিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা এবং দীর্ঘমেয়াদে চায়না বা ভিয়েতনামের বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসবে কিনা, বাংলাদেশ বেনিফিটেড হবে কিনা এবং আমাদের করণীয় কি?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ, কিন্তু কন্টেক্সচুয়াল। কারণ আগামী দিনগুলোতে বিভিন্ন রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে রিয়াক্ট করবে। এই রিয়াকশন কীভাবে করতেছে তার ওপরে নির্ভর করবে আরএমজিতে প্রভাব পড়বে কিনা।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশ সেই বেনিফিট নিতে পারবে কিনা, তা আমাদের রাজনৈতিক গতির ওপরে নির্ভর করবে। রাজনীতির যে অবস্থা দেখতেছি তাতে আমি দেখি না, বাংলাদেশ কীভাবে চাইনিজ ম্যানুফ্যাকচারিং এক্সোডাসের সুযোগ নিতে পারে, যেখানে ট্যারিফের পূর্বের সময়েই এই সুযোগটা আমরা নিতে পারিনি। মধ্যম মেয়াদে আমার ধারণা সবচেয়ে বেশি বেনিফিটেড হবে ইন্ডিয়া। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটা আমেরিকান হেজেমনির সমাপ্তির সূচনা ও চাইনিজ যুগের আবির্ভাব ঘটবে।
আমাদের করণীয় কি সেটা নির্ধারণ করতে হলে, বুঝতে হবে যে, এই ট্যারিফের ডিক্লারেশনে ট্রাম্প অনেকগুলো ব্লাফ দিয়েছে। ফলে ব্লাফগুলো ধরা জরুরি। বলা হচ্ছে এটা রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ। অর্থাৎ আমেরিকার পণ্য আমদানিতে বেশি ট্যারিফ নির্ধারণ করেছে, তাদের ওপরে বেশি ট্যারিফ আরোপিত হয়েছে। এটা একটা ব্লাফ।
বাংলাদেশ আমেরিকান পণ্যে মোটেও ৭৮% ডিউটি নাই বা ভিয়েতনাম ৯০% বা শ্রীলঙ্কা ৮৮% ট্যারিফ রেটে মার্কিন পণ্য আমদানি করে না।
মূলত প্রতিটা রাষ্ট্রের সঙ্গে যে ট্রেড ডেফিসিট বা ঘাটতি, সেটাকে আমেরিকার আমদানির সঙ্গে ভাগ করে তাকে ১.২ বা ১.৫ বা বিভিন্ন রকম কোয়ালিফায়ার দিয়ে গুন করে এই ট্যারিফ রেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এই কোয়ালিফায়ারগুলো কিসের ভিত্তিতে ধরা হয়েছে, তা নিয়ে একটা পলিসি পেপার আছে, সেখানে বাংলাদেশের বাণিজ্য নিয়ে ৫ পাতার বিবরণ আছে।
মোদ্দা কথা হলো- আপনার আমেরিকার সঙ্গে ট্রেড ডেফিসিট বেশি, আমেরিকা বেশি ডিউটি আরোপ করেছে যেন আপনি আমেরিকা থেকে বেশি পণ্য কিনেন।
বাংলাদেশের যে আমদানি তার মধ্যে আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য কটন আর গম, যা অন্য সাপ্লাইয়ার থেকে সরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু বাকি পণ্যগুলো ক্রয় করাতে আমেরিকার কোনো কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ নাই। ফলে সেটা কেনা অসম্ভব। কিন্তু ট্রাম্পকে খুশি করার জন্য বাংলাদেশ বিভিন্ন আমেরিকান পণ্যের ডিউটি কমাতে পারে। কারণ তাতে কোনো ক্ষতি নাই। ভিয়েতনাম অলরেডি বেশ কিছু পণ্যে ডিউটি কমিয়েছে। কিন্তু এটাতে লাভ হবে কিনা জানি না। কারণ ইফেক্টিভলি এই ডিউটি রিসিপ্রোক্যাল বা পাল্টাপাল্টি ট্যারিফ ডিউটি না। এটা ট্রেড ডেফিসিটের ডলার ভ্যালুর ওপরে নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমেরিকা যেসব পণ্য উৎপাদন করে, তার তেমন কোনো চাহিদা আমাদের নেই। ফলে এই ট্রেড ডেফিসিট কমিয়ে আনার কোনো প্র্যাক্টিকাল উপায় নাই। ফলে জাস্ট সিগনালিংয়ের জন্য সরকারের উচিত বিভিন্ন পণ্যে ডিউটি রেট কমিয়ে নিয়ে আসা।
এখন আসেন আরএমজি নিয়ে আলোচনা: ট্রাম্পের শুল্কহার রিসিপ্রোক্যাল শুল্ক নয় বরং বাণিজ্য ঘাটতি ও জিও পলিটিক্স। যদিও ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, পাল্টাপাল্টি হারে শুল্ক ও অশুল্ক বাধার উপরে রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফের ভিত্তিতে এই শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমেরিকা হিসাব করেছে তার সঙ্গে কোনো দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কতো, সেই ঘাটতিকে আমেরিকার উক্ত দেশ থেকে আমদানির পরিমাণ দিয়ে ভাগ করে একটি কোয়াফিশিয়েন্ট দিয়ে গুন করে শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
অধিকাংশ দেশের জন্য এই কোয়াফিশিয়েন্ট ০.৫। কিন্তু আমেরিকা যাকে শাস্তি দিতে চায়, তার জন্য কোয়াফিশিয়েন্টের হার বেশি রাখা হয়েছে। যেমন চীনের জন্য কোয়াফিশিয়েন্ট ০.৮ কিন্তু পাকিস্তানের জন্য ০.৪১। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিছুটা আনফেভারেবল হারে ডিউটি নির্ধারণ করা হয়েছে ০.৫৪ হারে কোয়াফিশিয়েন্ট ধরে।
০.৫ কোয়াফিশিয়েন্ট হিসাবে ধরে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট বেশি সুবিধা পাচ্ছে এবং পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে ১.৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি সুবিধা পাচ্ছে।
হিসাবটা এভাবে হচ্ছে, আমেরিকার বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ সালে রপ্তানি ছিল ২.৩ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ৭.৪ বিলিয়ন ডলার, যার ফলে ট্রেড ডেফিসিট ভাগ আমদানি দাঁড়িয়েছে ৬৯%, কিন্তু বাংলাদেশের ডিউটি নির্ধারিত হয়েছে ৩৭% কারণ ০.৫৪ কোয়াফিশিয়েন্ট দিয়ে গুন করা হয়েছে।
এই কোয়াফিশিয়েন্ট হিসাবটা এক্সেক্টলি কীভাবে করা হয়েছে সেটা কেউ জানে না। তবে ধরে নেয়া যেতে পারে যে, আমেরিকার ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ অফিস আমেরিকার ট্রেড ব্যারিয়ার নিয়ে একটি গ্লোবাল রিপোর্ট প্রকাশ করেছে মাত্র দুইদিন আগে, সেখানে বিভিন্ন দেশের ব্যারিয়ারগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা ধরে নিতে পারি, সেই রিপোর্টের মূল ইস্যু এবং আমেরিকার জিও-সিকিউরিটি মাথায় রেখে এই কোয়াফিশিয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। এই রিপোর্টে বাংলাদেশ নিয়ে ৫ পাতার বিবরণ আছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সেটা দেখতে পারে।
বর্তমানে ট্রাম্প যে নীতি অনুসরণ করছেন তা হচ্ছে- আমার থেকে বেশি আমদানি করো, তাহলে তোমার শুল্কের হার কমবে। তা না হলে আমার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখো বা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করো, তাহলে আমি কোয়াফিশিয়েন্টে ছাড় দেবো।
পাঠকের মতামত
If you want to be world leader, if have to sacrifice something. Nobody will bother you, if you will be a miser. So in short time USA will loose it's supremacy over the world.