বাংলারজমিন
বাবা খুনের চার মাসের মধ্যে সন্তানও খুন হলো মুছার
স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে
৫ এপ্রিল ২০২৫, শনিবার৯ বছরের শিশু মারিয়া। আদর করে সবাই ডাকেন ফাহিমা। হাসিখুশি মেয়েটি হাওরের প্রত্যন্ত গ্রাম কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার ঢাকী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের দিনমজুর মুছা মিয়ার মেয়ে। স্থানীয় গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাবার সঙ্গে বাড়ির অদূরে একটি দোকানে যায় চিপ্স কেনার জন্য। মেয়েকে চিপ্স কিনে দিয়ে বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে বাবা মুছা মিয়া হাঁটেন স্থানীয় বাজারের পথে। রাত ৯টার দিকেও মেয়েটি বাড়ি না ফিরলে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। কিন্তু কোথাও তার কোনো খোঁজ মিলছিল না। শিশুটির খোঁজে মসজিদ থেকে গ্রামজুড়ে ও বাজারে মাইকিং করা হয়। রাত যতই বাড়ে, উদ্বেগ বাড়ে পরিবারে। রাত ১১টার দিকে ফাহিমাকে না পাওয়ার বিষয়টি জানানো হয় মিঠামইন থানা পুলিশকে। এরও একঘণ্টা পর রাত ১২টার দিকে গ্রামেরই একটি পুকুরের পাড়ে গ্রামবাসীর নজরে পড়ে শিশুটির ক্ষত-বিক্ষত নিথর দেহ। গলায়, পেটে ও হাতে উপর্যুপরি আঘাতের চিহ্ন। স্বজনদের কান্নার রোল পড়ে যায়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে তাদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে গোবিন্দপুর গ্রাম। শিশুটিকে এমন নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা হতবাক করে গ্রামবাসীকে। এ ঘটনার মাত্র মাসচারেক আগে শিশুটির দাদা হোসেন আলী (৬৫) হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। বাবার খুনের চার মাসের মধ্যে সন্তান খুনের ঘটনায় মুষড়ে পড়েন মুছা মিয়া।
মুছা মিয়ার ছোট ভাই ইসহাক মিয়া জানান, তাদের পরিবারের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজনের কিছু জায়গা নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধের দুই থেকে আড়াই মাস পর তার বাবা হোসেন আলী খুন হন। গত ৭ই ডিসেম্বর তার বাবা হোসেন আলী বাড়ির পশ্চিম পাশে মেশিন দিয়ে পুকুর শুকানোর কাজ করছিলেন। এ সময় প্রতিপক্ষের লোকজন হামলা চালিয়ে পিটিয়ে তাকে হত্যা করে। এ ঘটনায় তার বড় ভাই মুছা মিয়া বাদী হয়ে ১৪ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলার পর পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করলেও মরম আলী, তার ছেলে ইকবাল ও স্বপন মেম্বার এই তিন আসামি হাইকোর্ট থেকে বর্তমানে জামিনে রয়েছে। মামলা দায়েরের পর থেকে আসামিপক্ষ তাদের নানাভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। হুমকি দেয়ার ভিডিও-ও তার কাছে রয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার রাতে তার ভাতিজি ফাহিমা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলো। ইসহাক মিয়া তদন্ত করে তার ভাতিজির হত্যাকারীদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে মিঠামইন থানার ওসি মো. শফিউল আলম জানান, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে শিশু ফাহিমার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপরও পুলিশ বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করছে। তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে জানিয়ে ওসি মো. শফিউল আলম বলেন, বুধবার শিশুটির লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। এর আগে শিশুটির দাদা মারামারির একটি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন। সেই মামলার চারজন আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। আগের ওই ঘটনার সঙ্গে এই ঘটনাটির কোনো সংযোগ আছে কি-না সেটিও পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। তবে যারাই এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকুক না কেন তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ কাজ করছে।
পাঠকের মতামত
হত্যাকারীরা বাইরের কেউ নয়, প্রতিপক্ষরা অবশ্যই নয়, নিহতের স্বজনেরাই প্রতিপক্ষকে ফাসানোর জন্য এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে।