ঢাকা, ১৯ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

দেশ বিদেশ

ছোড়া হচ্ছে গোলা

কার্যত অবরুদ্ধ তাইওয়ান

মানবজমিন ডেস্ক
৫ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার

তাইওয়ানের চারদিকে সামরিক মহড়া শুরু করেছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি’র তাইওয়ান সফরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই মহড়ার ঘোষণা দিয়েছিল দেশটি। এটি হচ্ছে সমুদ্রে চীনের ইতিহাসের সব থেকে বড় সামরিক মহড়া। তাইওয়ানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে দুটি চীনা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। ব্যবহার করা হয়েছে তাজা গোলাবারুদ। এর ফলে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে তাইওয়ান। স্থানীয় সময় বুধবার দুপুর ১২টায় গোলা ছুড়ে এই মহড়া শুরু হয়। তাইওয়ানের ১২ মাইলের মধ্যে প্রবেশ করে মহড়া করছে দেশটি। চীনের এমন আগ্রাসী আচরণের নিন্দা জানিয়েছে তাইওয়ান। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।

বিজ্ঞাপন
এর আগে বুধবার তাইওয়ানে খুব অল্প সময়ের এক সফরে যান পেলোসি। এ নিয়ে চটেছে চীন। দেশটি তাইওয়ানকে নিজের অংশ বলে মনে করে। পেলোসির এই সফরকে চীন তাই সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই সামরিক মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে বেইজিং। তবে একইসঙ্গে তাইওয়ানের সঙ্গে বাণিজ্যেও বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। দেশটির তরফ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘপাল্লার গোলা ছোড়া হবে এই মহড়া থেকে। মহড়ার জন্য ব্যস্ত জলপথকে বেছে নিয়েছে দেশটি। তাইওয়ানের আশপাশে মোট ৬টি এলাকায় মহড়া চলছে। 

এর মধ্যে ৩টি এলাকা তাইওয়ানের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে। বেইজিং মহড়া এলাকায় জাহাজ ও বিমান চলাচল এড়িয়ে চলতে বলেছে। তাইওয়ান বলছে, চীনের এই মহড়ার কারণে তারা আকাশ, ভূমি ও সাগরে অবরুদ্ধ হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রও এই মহড়ার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। যদিও তাইওয়ানের সামরিক বাহিনী সহজেই পাল্টা হামলা চালাবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এমন কঠিন উস্কানিতে যুদ্ধ লেগে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। এ নিয়ে বিশ্লেষক বনি লিন বলেন, চীন যদি তাইওয়ানের উপর দিয়ে যুদ্ধবিমান পাঠায় তাহলে তাইওয়ান সেটিকে ধ্বংস করে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। এরপর পরিস্থিতি কী হবে তা কেউ বলতে পারে না। তাইওয়ান আরও বলেছে, যেভাবে তার জলসীমায় ও আকাশপশে বিমান ও জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তাতে পুরো বিষয়টি এক ধরনের অবরোধ বলে মনে হচ্ছে। যা তার স্বাধীনতার বিপক্ষে যায়। যেখানে তাইওয়ানের কাছে ধরা চীন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের পর দ্বীপটিকে শায়েস্তা করতে উঠে পড়ে লেগেছে চীন। তাইওয়ান থেকে আমদানিতে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নিজেদের মোট রপ্তানির ৩০ ভাগই চীনে পাঠায় তাইওয়ান। তাই চীনের যেকোনো নিষেধাজ্ঞাই বড় প্রভাব ফেলে দেশটির উপরে। চীনও দফায় দফায় তাইওয়ানের একের পর এক পণ্যের উপরে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চলেছে। 

কিন্তু তাইওয়ানের সব থেকে মূল্যবান রপ্তানি সেমিকন্ডাক্টরের উপরে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি চীন। আর এখানেই তাইওয়ানের কাছে ধরা চীন। মূলত সেমিকন্ডাক্টরের কারণেই বিশ্বের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তাইওয়ান। চীন নিজেও তাইওয়ানের উপরে নির্ভরশীল। দেশটি তাইওয়ানের উপর থেকে এই নির্ভরশীলতা দূর করতে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে নিকট ভবিষ্যতে এই নির্ভরশীলতা যাচ্ছে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।  বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টরের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য চলে তাইওয়ানের। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান, সব জায়গায় দরকার পড়ে এই সেমিকন্ডাক্টর। বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টরের যে বাজার তার ৬৪ শতাংশই তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রণে। শুধুমাত্র তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কো বা টিএসএমসি বিশ্বের অর্ধেকের বেশি সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করে। এরপরেই রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। তারা তৈরি করতে পারে মাত্র এক পঞ্চমাংশ। তাও আবার সর্বাধুনিক সেমিকন্ডাক্টরের বাজারে তাইওয়ান একাই সরবরাহ করে ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ তাইওয়ানকে ছাড়া চীনসহ গোটা বিশ্বই অচল। তাইওয়ানকে মাত্র ১৩টি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু এর উপরে নির্ভর করে গোটা দুনিয়া। শুধু অর্থনীতিই নয়, তাইওয়ানের নিরাপত্তায়ও বড় ভূমিকা রাখে এই সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি। দেশটির রপ্তানির ৪০ শতাংশই আসে সেমিকন্ডাক্টর থেকে, জিডিপিরও ১৫ শতাংশ নির্ভর করে এর উপর। এই সেমিকন্ডাক্টরের কারণেই কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর কাছে তাইওয়ান গুরুত্বপূর্ণ। এর হাত ধরেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবে দেশটি। 

বেইজিং যদি এর উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাহলে তাইওয়ান ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিন্তু বেইজিং নিজেও নিজের অর্থনীতিতে ধস নামিয়ে আনবে।  এরইমধ্যে এই ইন্ডাস্ট্রির পেছনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। কিন্তু তারপরেও সেমিকন্ডাক্টরের বৈশ্বিক বাজারের মাত্র ১০ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তার কাছে। তাছাড়া চীনে উৎপাদিত সেমিকন্ডাক্টর তাইওয়ানের মতো অত্যাধুনিক নয়। সমপ্রতি চীন ৭ ন্যানোমিটার চিপ তৈরি করেছে কিন্তু তারপরেও একে ধরে নেয়া হচ্ছে প্রাথমিক ধাপ। টিএসএমসি কিংবা স্যামসাং এর থেকে অনেক এগিয়ে আছে। তাই শত্রু দেশ থেকে নানা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও, সেমিকন্ডাক্টরকে এড়িয়ে গিয়েছে দেশটি।  তবে নিজেদের এই নির্ভরশীলতা কাটাতে উঠে পড়ে লেগেছে চীন। সেমিকন্ডাক্টরের বাজারে তাইওয়ান কতোদিন রাজা হয়ে থাকতে পারবে তা অনিশ্চিত। এই নির্ভরশীলতাকে বড় বিপদ বলে আখ্যায়িত করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি তাই যত দ্রুত সম্ভব চীনের এই নির্ভরশীলতা দূর করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া গ্রহণ করা হয়েছে ‘মেড ইন চায়না’ উদ্যোগ। এর অধীনে হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিতে ৫ বছরে ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এ ছাড়া প্রতি বছরই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ছে দেশটিতে। তবে এখনো আরও কয়েক বছর চীনকে অপেক্ষা করতে হবে তাইওয়ানের উপর থেকে নির্ভরশীলতা দূর করতে। ততদিন তাইওয়ানের কাছে অনেকটাই ধরা চীন।

দেশ বিদেশ থেকে আরও পড়ুন

দেশ বিদেশ থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status