ঢাকা, ২৪ মে ২০২২, মঙ্গলবার, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২২ শাওয়াল ১৪৪৩ হিঃ

অর্থ-বাণিজ্য

ঈদের বাজারে ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট! অসাধু ব্যবসায়ীদের থামাবে কে?

আলতাফ হোসাইন

(৩ সপ্তাহ আগে) ২ মে ২০২২, সোমবার, ৭:৩২ অপরাহ্ন

করোনার কারণে টানা দুইটি বছর ঘরবন্দী ঈদ পালন করতে হয়েছে। তবে এবার করোনা সংক্রমণ কমায় দীর্ঘদিন পর খোলা মাঠে বিধিনিষেধ বিহীন এক ভিন্ন মাত্রার ঈদ উদযাপন করতে যাচ্ছি আমরা। রাত পোহালেই সেই আনন্দ ক্ষণ। ঈদের এই আনন্দ হয়তো ধনী-গরিব সব শ্রেণির মানুষই কমবেশি উপভোগ করবে। কয়েকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি, কেনাকাটার বাজার বিগত ঈদগুলোর চেয়ে এবার অনেকাংশে বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে। বোঝা গেল নানা সংকটের মধ্যেও মানুষ সাধ্যমতো কেনাকাটা করেছেন। তবে, বড় মার্কেট কিংবা শপিংমলের চেয়ে ফুটপাতে মানুষের ভিড় বহুলাংশে বেশি। দেশে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যাই বেশি, যারা সীমিত আয় করেন এবং খরচ করেন খুব হিসাব করে; ফুটপাতের এই চিত্র তার আরেকটি উদাহরণ মাত্র।

যাই হোক, সেটি পুরোনো হিসাব। কিন্তু এই যে দেশের কম আয়ের মানুষগুলো- মাস শেষে যে পরিমাণ বেতন পান বা ছোটখাটো কোনো কাজ করে যা আয় করেন, বর্তমান বাজারে তাদের ঈদটি এবার আসলে কেমন কাটছে? ঈদের আনন্দ তো দূরের কথা, মানুষ এক দুর্বিষহ পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এমনিতেই বাজারের প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী

বিজ্ঞাপন
চাল-ডাল কিনতেই যেখানে হাত খালি হয়ে যায়। এরমধ্যে আবার যদি শুধু ঈদ উপলক্ষে সব পণ্যের দাম দুই তিন গুন বাড়ানো হয়, তাহলে অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। আর এর নেপথ্যে রয়েছে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী। সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম তো অতিরিক্ত নিচ্ছেই, তারসঙ্গে আবার সাধারণ ক্রেতাদের সাথে যা-তা ব্যবহার। এনিয়ে অবশ্য তেমন কোনো আলোচনা নেই, প্রতিবাদ নেই। তবে, সাধারণ মানুষ এর ফলটা ঠিকই ভোগ করছে।

 

আজ দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ রাজধানীর ইব্রাহিমপুর বাজারের চিত্র। এখানে ৬-৭টি গরুর মাংসের দোকান রয়েছে। আশপাশের সবাই এখান থেকেই বাজার করেন। যাই হোক, গরুর মাংসের দাম জিজ্ঞেস করলাম। দাম চাইলেন প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা। যা গতকালও বিক্রি হয়েছে ৭০০ টাকায়। অথচ সরকারি সংস্থা টিসিবির বাজার দরে গরুর মাংসের দাম ৬৫০ টাকা ধরা হয়েছে। তবে আজ কোনো দামাদামি নেই। এক দাম ৭৫০ টাকা কেজি। তার ওপর আবার শর্ত হলো- পিস পিস করে টাঙানো আছে, এক পিসে যতোটুকু আছে সম্পন্নটাই নিতে হবে। প্রতি পিসে সর্বনিম্ন ২ কেজির উপরে। কিনছেন অনেকেই। কিন্তু দুই একজনকে দেখলাম অনেকক্ষণ ধরে মাংসের দোকানের আশপাশে ঘুরাঘুরি করছেন। এরমধ্যে একজনকে একটু সাইডে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম- ভাই প্রায় ১০-১৫ মিনিট ধরে আশপাশে ঘুরছেন। মাংস কিনবেন নাকি? নাকি কোনো সমস্যা? ৩০-৩৫ বছর বয়সী এই লোকটিকে জিজ্ঞেস করতেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন- 'কি আর সমস্যারে ভাই, সমস্যা কিছুই না। এমনি দেখতেছি, দাম জিজ্ঞেস করতাছি। ৭৫০ ট্যাকা কেজি করে মাংস কিনার সামর্থ্য নাই আমার। তাও আবার মিনিমাম ২ কেজির উপরে কিনতে হইবো। আলাদা করে এক কেজি কেউ দিচ্ছে না। এক পিসে দুই কেজির উপরে থাকে। তাই ঘুরতেছি অনেকক্ষণ হলো। ৩-৪ দোকানে বললাম কেউ এক কেজি দেবো না। ট্যাকা দিয়া মাংস কিনুম তাও যদি না কিনতে পারি... আবার কিছু বললে ঝাড়ি শোনায়।

লিয়াকত নামে এই ব্যক্তি ভ্যানে করে কাঁচা শাক-সবজি  বিক্রি করে জীবীকা নির্বাহ করেন। আমি তাকে বললাম- ভাই দুই কেজিই নেন। একটু বেশি করে খান ঈদ উপলক্ষে। পোলাপান আছে না বাসায়? তিনি বললেন, 'এতো নিয়ে কি করবো? পোলাপান আর কয়ডা খাইবো? বাসায় তো ফ্রিজও নাই যে রাইখা কয়েকদিন ধইরা খামু। আর ট্যাকাওতো ওতো নাই'। আমি বললাম- আচ্ছা ভাই বুঝতে পারছি। তাহলে এক কাজ করি। আমিও মাংস কিনবো। আমি তাহলে এক কেজি বেশি করে নেই। পরে এখান থেকে আপনাকে এক কেজি মেপে দেই। সমস্যা তো নাই? লোকটি মুচকি হাসি দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন, 'ভাই যে কি কন?.... আচ্ছা ঠিক আছে তাইলে লন, আপনের যদি সমস্যা না থাকে। ওই রাস্তার পাশে আমার সবজির ভ্যান আছে মাইপা লমু এককেজি। কথামতো আমরা একটা পিস নিলাম। এক পিসে ৩ কেজির উপরে হলো। পরে সেখান থেকে তাকে এক কেজি মেপে দিলাম।

এরআগে এখানেই আরেকটি ঘটনা নজরে পড়লো। একজন মাংস কিনেছেন দুই কেজি। কিন্তু ওজনে কম হয়েছে। এর প্রতিবাদ করলে ওই দোকানদার তাকে ইচ্ছামতো শাসাতে শুরু করলো। কিন্তু লোকটি তেমন কিছু বলার সাহস পেলেন না। শুধু একবার বললেন, 'ভাই ওজনটা একটু সঠিকভাবে দেবেন তো'! এ কথা শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো মাংস বিক্রেতা। হাতে চাপাতি দিয়ে যেন কোপ দেয় দেয় অবস্থা! সাথে অকথ্য ভাষায় গালাগালি। অবাক হচ্ছি দেখে! তারা এখানে ব্যবসা করছে। আর একজন কাস্টমারের সাথে তাদের এ কেমন ব্যবহার! লোকটি হতভম্ব হয়ে কিছু না বলেই চলে গেল। সত্যি বলতে মাংস বিক্রেতার যে চাহুনি আর যে ব্যবহার দেখলাম তাতে কিছু বলার রুচি আমার হলো না। আমার মতো বাকিরাও এই দৃশ্য শুধু দেখলেন। পরে তার ব্যাপারে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এলাকায় ব্যবসা করে মানে এই এলাকা উনাদের। তার পাওয়ার আছে বলেই এভাবে বলতে পারছে। সে তো একা না৷ এলাকার নেতারাই সব এখানে ব্যবসা করে। কেউ কিছু বলার নাই। ওজনে কম দিলে কিংবা দাম বেশি নিলেও করার কিছু নাই। অভিযোগ দেয়ার জায়গাও নেই। সাধারণ মানুষ এদের কাছে অসহায়।

 

 

আজ সোমবার ঈদের আগেরদিন অন্যান্য বাজারের কি চিত্র বলতে পারছি না। তবে ইব্রাহিমপুর বাজারের এমন চিত্র দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। বজারে প্রবেশ করতেই শোনা গেল- বাজার থেকে সয়াবিন তেল উধাও! শুধু একটি মাত্র কোম্পানির তেল দুই একটা দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। তাও সীমিত। আর দাম লিটারে ২২০ টাকা। দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিনের দাম নেয়া হচ্ছে ৪৪০ টাকা। বোতলের গায়ে দেয়া মূল্য ঘষে তুলে ফেলা হয়েছে। আবার শর্ত দেয়া হচ্ছে সাথে ২ কেজি আটা কিনতে হবে। একটু দামাদামি করতে গেলেই কাস্টমারদের সাথে যা-তা ব্যবহার করছে দোকানদারেরা। বলছে 'দামাদামি করলে তেলই পাবেন না'। বাধ্য হয়ে কিনছেন যারা, তাদের হয়তো ভালো ইনকাম আছে। তাই খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু লক্ষ্য করলাম অনেকেই তেল না কিনে চলে যাচ্ছেন। এরমধ্যে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম- চাচা তেল নিবেন না? বয়োবৃদ্ধ চাচা প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে উত্তর দিলেন 'বাবা এতো ট্যাহা দিয়া তেল না কিন্না আমগো বিশ কিন্না খায়া মইরা যাওয়া উচিত। ট্যাহা দিয়া জিনিস কিনুম, ভিক্ষা করতে তো আহিনাই গা। দোকানদারগো লগে কতা কওনই যায় না! একবারের জায়গায় দুইবার দাম জিজ্ঞেস করলেই পুরা ক্ষেইপা যায়। ওগো মাথা এতো গরম ক্যান এইডাই বুঝি না। আরে গরম তো আমগো হওন উচিত আছিল। ২২০ ট্যাহা লিটার তেল কিন্না খাইতে হইবো কহনও ভাবি নাই। এক লিটার তেল কিনতে দুই তিনবার কইরা বাজারে আসতাছি। সবাই কয় তেল নাই। গতকাইল রাইতেও আইছিলাম তহনও একই অবস্থা আছিল।

চাচার কথা শুনে বাজার ঘুরে দেখলাম প্রতিটি পণ্যের দাম ১০-২০ টাকা করে বেশি নেয়া হচ্ছে। ক্রেতাদের কেউই প্রতিবাদ করতে পারছেন না। কেউ কেউ বাধ্য বেশি দামেই কিনছেন। কেউ আবার বাগবিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন বিক্রেতাদের সাথে। এক্ষেত্রে উল্টো লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন ক্রেতারাই৷ কারণ, এসব বাজারের ব্যবসায়ীরা সবাই যেন একেকজন তুমুল ক্ষমতার অধিকারী! এদের কথাবার্তা শুনলে আদতে তা-ই মনে হয়। আসলে এদের ক্ষমতার উৎস কি? কিসের বলে এরা সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে? আবার ভোক্তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে? এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না কেন? মাঝে মাঝে গণমাধ্যমে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের খবর পাওয়া যায়। কিন্তু এই ইব্রাহিমপুর বাজারে নাকি কখনো কোনো অভিযান কেউ চোখে দেখেনি। এখানে সবাই ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম নেয়। দেখলাম, ১৬০ টাকা লিটারের তেল ২২০ টাকা নেয়ায় একজন ক্রেতা প্রশাসনের ভয় দেখালেন। কিন্তু ওই দোকানদার উল্টো তাকে হুমকিধামকি দিলেন। বললেন, 'কোনো প্রশাসনের এই খানে টাইম নাই। দূরে ভাগেন। আপনে না কিনলে অনেক মানুষ আছে৷ কথা না কয়া ভাগেন কইতাছি'। লোকটি বুঝতে পারলেন আর একটু বললেই তাকে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। তাই চুপ করে চলে গেলেন।

বিষয়টি নিয়ে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে কথা হলো। তিনি বললেন, 'ভাই সবখানে এই অরাজকতা চলছে। কিছু করার নেই। ভোক্তা অধিকার সব জায়গায় তো অভিযান চালাতে পারে না। তাদের লোকবলের অভাব। যদি কেউ কোনো অভিযোগ দেয় তারপরও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। ঈদ চলে গেলে হয়তো এখন যেমন চলছে তা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে এসব অসাধু ব্যবসায়ীরা কখনোই ভালো হবে না। একমাত্র আইনপ্রয়োগ করা ছাড়া এদেরকে দমানো যাবে না। কিন্তু সরকার কি আদৌ এসব বন্ধ করতে চায়? যদি চেয়েও থাকে তাহলে দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না কেন? এই অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের খুব খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে।'

পাঠকের মতামত

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের চরিত্র এত অধঃপতন হয়েছে যতই মূল্য বৃদ্ধি সরকার মেনে নিক, তারা কৃত্রিম সংকট তৈরী করে নির্ধারিত মূল্যে কখনও ব্যবসা করবে না । এটা এক ধরনের রোগ ব্যবসায়ীদের ।

Kazi
৯ মে ২০২২, সোমবার, ১:৪৫ পূর্বাহ্ন

২৯ তারিখ যাত্রাবাড়ী পাইকারি বাজারের প্রায় সবগুলো দোকান ঘুরে তেল পাইনি। পরে এক দোকানে বসুন্ধরার দুই লিটার তেলের বোতল দেখে নিতে চাইলে দোকানের লোক জানায় তেলের সাথে একই কোম্পানীর ২ কেজি আটাও নিতে হবে। তারাও নাকি এভাবেই এনেছে। বাধ্য হয়ে সেই প্যাকেজ কিনেছি ৪১০/- টাকায়। পরে দেখলাম আটার প্যাকেটের মূল্য এভাবে ঘষে উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। তেলের গায়ের মূল্য ৩১৮/- টাকা।

নেওয়াজ শরীফ
৩ মে ২০২২, মঙ্গলবার, ৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

বিশ্বে দাম বেড়েছে ব্যাস, এ বক্তব্যটি দিয়ে আমাদের বুঝ দেয়া হবে। রবি মৌসুমে দেশের প্রায় জমি খালি ছিল। মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পও বিদ্যমান। কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ভ্রমণ, সম্মানী সবই ঠিক আছে। শুধু ঠিক নেই কৃষক পর্যায়ে সুব্যবস্থাপনা। রক্ষকই যেখানে ভক্ষক কার উপর বা নির্ভর করা যায়? কে বা অন্তুত সরকারি সুবিধা ভোগ করে দেশের জন্য কাজ করবে?

তৌহিদ
২ মে ২০২২, সোমবার, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন

অর্থ-বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com