ঢাকা, ১২ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৩ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

দেশ বিদেশ

৫ মাসে ৭ হাজার ২৮২ মামলা

ভিন্ন ব্যবসার আড়ালে মাদক বিক্রি, অধরা মূল হোতারা

ফাহিমা আক্তার সুমি
২ জুলাই ২০২২, শনিবার

দিনে লোকে লোকারণ্য। রাত হলেই বদলে যায় চিত্র। বাড়তে থাকে ভাসমান মানুষের সংখ্যা। গভীর রাত পর্যন্ত চলে মাদক বিক্রি। খুচরা বিক্রেতারা ভিন্ন ব্যবসার আড়ালে চালাচ্ছে মাদক কারবার। তারা ফুল, সিগারেট ও পানের পসরা সাজিয়ে বসে পছন্দমতো জায়গায়। চলে গাঁজা ও ইয়াবা বেচাবিক্রি। মাদক কিনতে আসে বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকে খোলা জায়গায় বসে মাদক সেবন করে। সাধারণ লোকজন থাকেন আতঙ্কে।

বিজ্ঞাপন
রাতে ফুটপাথের মাদকসেবীরা হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর ছিনতাইকারী। মাদক কারবারের মূল হোতা, পৃষ্ঠপোষক ও সরবরাহকারীরা থাকে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ডিএমপি’র তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মোট মাদক মামলার সংখ্যা ৭ হাজার ২৮২ এবং গ্রেপ্তার হয় ৯ হাজার ৯৮১ জন।   রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, কাওরান বাজার, পান্থকুঞ্জ, ফার্মগেট, রায়ের বাজার, হাজারীবাগ, হাতিরঝিল, গুলিস্তান, কমলাপুরসহ বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির চিত্র দেখা গেছে। সামনে ফুল, সিগারেট, পানের পসরা সাজিয়ে চলে গাঁজা ও ইয়াবার বেচাবিক্রি। কেউ কেউ কোনো ব্যবসা ছাড়াই এ সব এলাকায় মাদক বিক্রি করে। এ সব বিক্রেতারা পাগলের বেশে রাস্তার পাশে ফুটপাথে শুয়ে বসে থাকে। তাদের দেখলে সহজে বোঝা যায় না তারা মাদক বহন করছে। বিকাল হলেই ক্রেতারা পায়চারি করে। একটি গাঁজার পোটলা ১শ’ টাকা দরে বিক্রি হয়। 

শ্রমিক ও অল্প বয়সীরা এই পোটলা বেশি ক্রয় করে। কিন্তু ভাসমান মানুষ ও শ্রমিকরা ফুটপাথেই মাদক সেবনে বসে যায়। নারী-পুরুষ উভয়ই এ ব্যবসায় নিয়োজিত। এ সব বিক্রেতাদের পিছনে রয়েছে বড় বড় গড ফাদার। ভাসমান মাদকসেবী ও বিক্রেতাদের কাছে থাকে ছুরি, ব্লেড। মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বে অনেকে রক্তাক্তও হয়। কখনো খুনের মতো ঘটনাও ঘটে। মাদক সেবন ও মাদককে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বে পথচারীরা আতঙ্কে থাকেন।  ডিএমপি’র তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত মোট মাদক মামলার সংখ্যা ৭ হাজার ২৮২ এবং মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয় ৯ হাজার ৯৮১ জন। সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। রাজধানীতে গড়ে প্রতি মাসে দেড় হাজারের বেশি মাদকসক্রান্ত মামলা হয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক কারবারিদের মূল শক্তি রাজনীতি ও দুর্নীতি। নুরুন্নাহার বেগম বলেন, ৩০ বছর ধরে ঢাকায় থাকি। বাসাবাড়িতে কাজসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুল বিক্রি করি। আমার ছেলে ও তার স্ত্রীও ফুল বিক্রি করে সংসার চালাতো। তারা ফুল বিক্রির পাশাপাশি মাদকও বিক্রি করতো। মাদক বিক্রি নিয়ে অপর এক মাদক বিক্রেতার সঙ্গে কথা কাটাকাটি পর রক্তাক্ত হয়। গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় ছেলের বউকে নিয়ে কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। 

তাদের অনেক নিষেধ করতাম শুনতে চাইতো না। এখন তারা একটি মামলায় কারাগারে। পথচারী বেল্লাল বলেন, প্রতিদিনই কাজ শেষ করে ফুটপাথ থেকে হেঁটে আসার একটি গন্ধ ভেসে আসে। বুঝতে আর বাকি থাকে না এটি গাঁজার গন্ধ। খুব অস্বস্তি লাগে। গন্ধটা মনে হয় নাকের মধ্যে লেগে থাকে। এভাবে ফুটপাথে বসে গাঁজা সেবন করলে এর গন্ধ তো সাধারণ মানুষদের অস্বস্তিতে ফেলে। এটা আমাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। অফিস শেষ করে কাওরান বাজারের ফুটপাথ দিয়ে প্রায়ই হেঁটে বাসায় যান লাবনী আক্তার। তিনি বলেন, হেঁটে আসার সময় খুব অস্বস্তিকর একটা গন্ধ পাই। রাস্তার পাশে দেখি ভ্যানে বসে কয়েকজন মিলে সিগারেটের ধুয়া উড়ায়। সেখান থেকেই গন্ধটা বেশি আসে। কখনো কখনো তারা আজেবাজে কথা বলে। বিজিবি’র জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, গত মে মাসে দেশের সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৩১ কোটি ৪১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন প্রকারের চোরাচালান পণ্যসামগ্রী অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং মাদকদ্রব্য জব্দ করেছে। জব্দকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে ১২ লাখ ১৩ হাজার ১৭১ পিস ইয়াবা, ৭ কেজি ৮৯৮ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইস, ১ কেজি ৮৮৫ গ্রাম হেরোইন, ৩ কেজি ১৫০ গ্রাম আফিম, ২২ হাজার ৬৭ বোতল ফেনসিডিল, ১২ হাজার ৫৮৮ বোতল বিদেশি মদ, ৩ হাজার ৯৬০ ক্যান বিয়ার, ২ হাজার ১৪৮ কেজি গাঁজা, ২ লাখ ৮০ হাজার ৬৩৯ প্যাকেট বিড়ি ও সিগারেট, ৮৩৫ কেজি তামাক পাতা, ৫১ হাজার ১৩৭টি ইনজেকশন, ৫ হাজার ৬৯৬টি ইস্কাফ সিরাপ, ১ হাজার ৩১ বোতল এমকেডিল, ৬ লাখ ৫২ হাজার ১৬২ পিস বিভিন্ন প্রকার ওষুধ, ৪ হাজার ৪০০টি সেনেগ্রা ট্যাবলেট এবং ৬৮ হাজার ৯৬৩টি অন্যান্য ট্যাবলেট। জব্দকৃত অন্যান্য চোরাচালান দ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ১৪ কেজি ৫৮৫ গ্রাম স্বর্ণ, ৩৫ কেজি ২৭৪ গ্রাম রূপা, ৭১ হাজার ৯৫৯টি কসমেটিকস সামগ্রী, ১৮ হাজার ৭৮৬টি ইমিটেশন গহনা, ৯ হাজার ৫২৬টি শাড়ি, ১ হাজার ৮০০টি থ্রিপিস, ৪৬৬টি তৈরি পোশাক, ১ হাজার ৯৪২ ঘনফুট কাঠ, ২৬ হাজার ১৯২ ঘনফুট পাথর, ৫ হাজার ৫৩৬ কেজি চা পাতা, ৪৯ হাজার ৬০০ কেজি কয়লা, ১১১ কেজি কারেন্ট জাল, ১টি কষ্টি পাথরের মূর্তি ৫টি ট্রাক, ৪টি প্রাইভেটকার, ৭টি পিকআপ, ২৫টি সিএনজি এবং ৮৪টি মোটরসাইকেল। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার ৩১টি অস্ত্র, ২টি ম্যাগাজিন, ৮৪ রাউন্ড গুলি এবং ১১৬ কেজি বিস্ফোরক জাতীয় সালফার জব্দ করা হয়। 

এ ছাড়াও সীমান্তে ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক পাচার ও অন্যান্য চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগে ২২৭ জন চোরাচালানীকে এবং অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ১৬৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক ৯ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ১ জন আফগান নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, দেশে মাদক মামলায় বিভিন্ন সময় যাদের গ্রেপ্তার করা হয় তারা মাদকের খুচরা বিক্রেতা ও বাহক। এই বাণিজ্যের মূল কারিগরদের নাম মামলায় থাকলেও তাদেরকে গ্রেপ্তার বা বাণিজ্য বন্ধে কোনো পদক্ষেপ খুব একটা নজরে আসে না। এর মূল কারণ হলো রাজনীতি ও দুর্নীতি। যারা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন তাদেরকে এ সব পৃষ্ঠপোষকরা অর্থ বা অন্য কোনো অবৈধ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান মানবজমিনকে বলেন, মাদক চক্ররা বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে মাদক পাচার করছে। ব্যবসায়ী সেজে সুকৌশলে মাদক বিক্রি করে খুচরা বিক্রেতারা। 

একটি গ্রুপ বিক্রয়ে এবং আরেকটি গ্রুপ ক্রয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে। সীমান্ত পথে এগুলোকে থামাতে না পারলে আরও বেড়ে যাবে। প্রতি মাসে লাখের বেশি ইয়াবা জব্দ করে পুলিশ। কারবারিরা মাদক চোরাচালানে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) হাফিজ আল আসাদ বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ডিলার, বিনিয়োগকারী বা মূল জোগানদাতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। কিছু ব্যবসায়ী কাটআউট পদ্ধতিতে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে। এ ক্ষেত্রে যারা খুচরা মাদক ব্যবসায়ী তারা গ্রেপ্তার হয় কিন্তু মূল জোগানদাতাদের সবসময় তথ্য পাওয়া যায় না। মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্নভাবে নিজেদের আড়াল করতে চায় সেজন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার আড়ালে তারা মাদক বহন করে। মাদকের মূল ডিলাররা অনেক সময় ধরা পড়লেও আবার জামিনে বেড়িয়ে এসে আবার এই ব্যবসায় যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। মাদক নির্মূলে সীমান্তে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে যাতে দেশে মাদক প্রবেশ না করে। মাদকের বিভিন্ন রুটে বহনকারীদের যখনই তথ্য পাচ্ছি আমরা তাদের গ্রেপ্তার করছি।

দেশ বিদেশ থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

দেশ বিদেশ থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status