ঢাকা, ৪ অক্টোবর ২০২২, মঙ্গলবার, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

দেশ বিদেশ

শ্রম আদালতে বিচারাধীন মামলা ২৫০৮১

শ্রম আদালতে মামলা জটের ৭ কারণ

রাশিম মোল্লা
১৮ আগস্ট ২০২২, বৃহস্পতিবার

দেশে চালু আছে ১০টি শ্রম আদালতের কার্যক্রম।  বিদ্যমান শ্রম আদালতগুলোতে বিচারাধীন আছে ২৫০৮১ মামলা। যার মধ্যে শ্রম আপীল ট্যাইব্যুনালে ১৪২২, ঢাকায় ১ম শ্রম আদালত ৮১২৫, ২য় শ্রম আদালতে ৭৪৬২, ৩য় শ্রম আদালতে ৪৬৬৬। চট্টগ্রামর ১ম শ্রম আদালতে ১৭২৮ ও ২য় শ্রম আদালতে ৬৩৫টি মামলা। খুলনার শ্রম আদালতে ১৭১, রাজশাহীর শ্রম আদালতে ১৬৮, রংপুর শ্রম আদালতে ৫৬, সিলেট শ্রম আদালতে ৬৯ এবং বরিশাল শ্রম আদালতে ৬৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. ফারুকের (এম ফারুক) এক প্রবন্ধে এ তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকায় অবস্থানরত ৩টি আদালতের মামলার সংখ্যাই ২০ হাজার ৫৭২টি এবং বাকি ৭টি শ্রম আদালত আর শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল মিলিয়ে মামলার সংখ্যা ৪ হাজার ৫০৯টি। যে কারণে শ্রম আদালতে মামলা জট  শ্রম আদালতে মামলা জটের কারণ হিসেবে তার প্রবন্ধে ৭টি কারণ চিহ্নিত করছেন। শ্রম আইনের জটিলতা, শ্রম আদালতের বিচারকগণের বদলিজনিত কারণ, শ্রম আদালতের সদস্য উপস্থিতি সংক্রান্ত, অধিক্ষেত্রজনিত জটিলতা, সহায়ক কর্মচারীদের অদক্ষতা, শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অভাব, শ্রম আদালত এবং শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের স্থান সংকট। শ্রম আদালতে মামলা জটের কারণ হিসেবে শ্রম আইনের জটিলতাকে দায়ী করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
এতে বলা হয়, ২০০৬ সালে প্রবর্তিত শ্রম আইনে ২০০৬, ২০০৮, ২০১৩, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে বেশকিছু সংশোধনী আনা হলেও কার্যকর সংশোধনী এখনো আসেনি। 

গুরুত্বপূর্ণ এই আইনে শ্রম আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিলের সুযোগ না থাকায় সংক্ষুব্ধ পক্ষ হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করে। এর ফলে শ্রম আদালতে শুরু হওয়া মামলা স্থবির হয়ে পড়ে। উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়েরজনিত কারণে শুধুমাত্র শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালেই স্থবির মামলার সংখ্যা ৩৫২। মামলা জটের আরেকটি কারণ হচ্ছে শ্রম আদালত এবং শ্রম ট্রাইব্যুনালে বিচারক নিয়োগের দীর্ঘসূত্রিতা। প্রায় সময়ই বিচারক নিয়োগ, বদলি অথবা অবসরজনিত কারণে শ্রম আদালতের বিচারকের পদ শূন্য হয়। দেশের একমাত্র শ্রম আপিল ট্রাইবুন্যালের চেয়ারম্যান পদটি এক বছর বা দুই বছরের জন্য নিয়োগ প্রদান করা হয়। কিন্তু পদটি শূন্য হওয়ার পর চার থেকে ৯ মাস পর্যন্ত সময় লাগে বিচারক নিয়োগে। যে কারণে মামলা জট আরও বাড়ে। মামলা জটের তৃতীয় কারণ শ্রম আদালতের বিচারকগণের বদলিজনিত কারণকে দায়ী করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী শ্রম আদালতের বিচারকগণ প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। স্বাভাবিকভাবেই শ্রম আদালতের বিচারকার্য সম্পর্কে পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে কিছুটা সময় লেগে যায়। অপরদিকে যখন একজন বিচারক শ্রম আদালত পরিচালনায় দক্ষতা প্রদর্শন শুরু করেন ঠিক তখনি স্বাভাবিক নিয়মেই অন্যত্র বদলি হয়ে যান। তার স্থলে শ্রম আদালত সম্পর্কে অনভিজ্ঞ একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। এর ফলশ্রুতিতে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি হয়। শ্রম আইনের বেশকিছু ধারার মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে মালিক এবং শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধির সমন্বয়ে আদালত গঠন করতে হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ধার্য তারিখে নির্দিষ্ট প্রতিনিধির অনুপস্থিতের কারণে মামলা নিষ্পত্তি করা যায়না। এছাড়া, অধিক্ষেত্রজনিত কারণে বেশিরভাগ মামলাই হয় ঢাকার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রম আদালতে। ফলে একজন বিচারকের পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ মামলার চাপ সামলানো কষ্টকর হয়। 

এতে করেও বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। মামলা জটের কারণ হিসেবে সহায়ক কর্মচারীদের অদক্ষতাকেও দায়ী করা হয়েছে। শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল এবং বিদ্যমান শ্রম আদালতের কর্মচারীদের কোনোরূপ পদোন্নতি এবং বদলির সুযোগ নেই। ফলে খুব বেশি যোগ্য এবং দক্ষ কর্মচারীরা ধীরে ধীরে উদ্যম হারিয়ে ফেলে। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অভাবকেও ট্রাইব্যুনালে মামলা জটের কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন বিচারপতি মো. ফারুক। তিনি বলেন,  শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হলেও দেশের স্বাধীন বিচার বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ শ্রম আইন-২০০৬ এর ২১৮ ধারা। এই ধারা অনুযায়ী শ্রম আদালত সমূহের তত্ত্বাবধান এবং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের। অথচ আমাদের মন্ত্রণালয় বার বার বার্তা দিচ্ছে, শ্রম আদালতের প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্ষমতা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের। শ্রম আইন-২০০৬ এর ধারা ২১৮ (১৫) অনুযায়ী সকল শ্রম আদালতের উপর ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকিবে। বিচারিক আর প্রশাসনিক ক্ষমতা এক সূত্রে গাঁথা। শ্রম আদালতের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে না পারলে অধস্তন শ্রম আদালতসমূহে কী আদৌ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব? ফলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণেও মামলাজট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দেশের শ্রম আদালত সমূহ এবং শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত ভবনে অবস্থিত। যে কারণে সহায়ক কর্মচারী, সুপরিসর এজলাস, আইনজীবী এবং পক্ষদ্বয়ের পর্যাপ্ত বসার স্থান এবং উপযুক্ত পরিবেশ নেই, যা বিচারকার্য দীর্ঘায়িত করতে সহায়ক।   

মামলা জট কমাতে করণীয় এই অবস্থা থেকে উত্তরণ পেতে দ্রুততার সঙ্গে শ্রম আইনের কার্যকর সংশোধন আনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। শ্রম আদালতের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষকে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করার সুযোগ দেয়া প্রয়োজন। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রায় বা আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়েরের পরিবর্তে প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের ন্যায় সুপ্রীম কোর্টে আপিল করার বিধান প্রণয়ন একান্ত জরুরি। এতে করে ট্রাইব্যুনালে আপিলের সংখ্যা বাড়লেও মামলাজট কমবে। কারণ শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল স্বল্প সময়ে মামলা নিষ্পত্তি করে থাকে। এছাড়া, শ্রম আদালত এবং শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে বিচারকের পদ শূন্য হওয়ার পর দ্রুততার সঙ্গে শূন্যপদে বিচারক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। শ্রম আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্বে শ্রম আদালতে নিয়োজিত ছিলেন এমন বিচারকগণকে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। শ্রম আদালত সমূহের জন্য উপযুক্ত বিচারিক পরিবেশের স্বার্থে মানসম্মত ভবনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে নারায়াণগঞ্জ এবং গাজীপুরে দুইটি শ্রম আদালত চালু হওয়াতে ঢাকার শ্রম আদালতগুলোর চাপ কমতে শুরু করেছে। দ্রুততার সঙ্গে শ্রম আদালত এবং শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের কর্মচারীদের পদোন্নতি এবং বদলির বিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন। শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালকে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রম আদালত সমূহের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রদান করা প্রয়োজন। শ্রম আদালত এবং শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে অনেক সময় মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তরের প্রধান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এতে আদালতের সহায়ক কর্মচারীদের প্রশাসনিক ক্ষমতা যদি মন্ত্রণালয়ের হাতে নাও থাকে তবে বিচারকার্য প্রভাবিত হবার সম্ভাবনা থাকে।

 স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার বিঘ্নতায় সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। শ্রম আইন ২০০৬ এর ২১৮ ধারা অনুযায়ী শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালকে যে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তা দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। সর্বশেষ শ্রম আইন সংশোধন, শ্রম আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। কারণ আইনের অসামঞ্জস্যগুলো এখানেই ধরা পড়ে। এছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বার্থে সারা দেশের শ্রম আদালতগুলোর শূন্যপদে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের হাতে দ্রুততার সঙ্গে ন্যস্ত করা প্রয়োজন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, মামলা জট কমাতে শিগগিরই ৩টি নতুন শ্রম আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। মন্ত্রী তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, তিনি তার প্রাকটিস জীবনে দেখেছেন শ্রম আদালতে দুপুর ১২টা-১টার পর আর কোনো কাজ হয় না। এটি একটা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।  এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। এ থেকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে হবে। মানুষের পারসেপশনটা বদলানোর জন্য আমাদেরকে আরও ক্রিয়েটিভ পদক্ষেপ নিতে হবে। ২টার পরে সাক্ষ্যগ্রহণ করা যেতে পারে। তাহলে যেসব মামলা একটু জটিল সেগুলো কম সময়ে শেষ করা সম্ভব হবে বলে মনে করি। মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর সময় না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদেরকে কাজ বন্ধ রেখে আদালতে আসতে হয়। ছুটি নিয়ে তাদেরকে আসতে হয়। মালিকদেরকে কিন্তু তা করতে হয় না। তারা একজন অফিসার পাঠিয়ে দিলেই হয়। শ্রমিকরা বার বার আদালতে আসতে পারে না। মামলায় বেশি সময় নিলে শ্রমিকরা মামলা চালাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বিচারকদের দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

দেশ বিদেশ থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

দেশ বিদেশ থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status