ঢাকা, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, শুক্রবার, ৬ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

আপন আলোয় মানবজমিন

ভালো-মন্দের সন্ধিক্ষণের সাক্ষী

সুদীপ্ত আনন্দ, সিনিয়র স্পোর্টস ইন-চার্জ, দেশ রূপান্তর
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, বৃহস্পতিবার
mzamin

প থে-ঘাটে, হকারের হাতে, চায়ের টেবিলে কিংবা বসার ঘরে- মানবজমিন দেখলেই ফিরে যাই ঠিক এক যুগ আগে। মার্চ ২০০৮ থেকে মে ২০১০। দু’টি বছর কাটিয়ে আসা আমার প্রিয় কর্মক্ষেত্র। প্রিয় অনেক কারণেই। মানবজমিন আমার কঠিন সময়ের আশ্রয়স্থল। ভালো লাগার আরও অনেক কারণই আছে। 
একটু অতীতে ফিরে যাই। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরের এক সকালে হঠাৎ আমার বাসার ল্যান্ড ফোনে ফোন এলো। তখনো মুঠো ফোনের চল সেভাবে ছিল না। ফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে দৈনিক আজকের কাগজের রিসিপশনিস্টের গলা। ভাবলাম, হয়তো কোনো কারণে সাত সকালে সম্পাদক কাজী সাহেদ আহমেদের সভায় ডাক পড়েছে (যেটা প্রায়ই পড়তো)।

বিজ্ঞাপন
তবে রিসিপশনিস্ট যা বললেন তাতে আকাশ মাথায় ভেঙে পড়ার জোগাড়। মুখস্ত বুলি আওড়াতে লাগলেন, ‘পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুত এসে নিজের ডেস্কের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে যান।‘ সদ্য বিয়ে করেছি। তখনো নতুন সংসারের আবহটা ফিকে হয়ে যায়নি। এর মাঝে এ আমি কী শুনলাম! যা হোক, রিসিপশনিস্টের বলা কথাগুলো অগ্রাহ্য করার সাহস অন্য অনেকের মতো আমারও ছিল না। ছিল না হুট করে মালিকের পত্রিকা বন্ধ করে য়োর ঘোষণার বিরোধিতা করার অবস্থা। মেনে নিয়ে ধানম-ির অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বের হয়ে আসলাম। এর পরের ৬টি মাসের কথা আজও মনে থাকবে। ওয়ান-ইলেভেনের সময়। চাকুরি গেলে পাওয়াটা আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো ব্যাপার। ছ’মাস একটি নতুন মাসিক পত্রিকার মার্কেটিং বিভাগে বড্ড কম মাইনের একটা কাজ জুটে গেল। প্রতিদিনের দায়িত্ব ছিল কাঁধে শ’খানেক ম্যাগাজিন বয়ে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজে বিলি করা, বিল জমা দেয়া আর বিলের টাকা তোলার তাগিদ দেয়া। সে সময় বুঝেছি, জীবনটা কতো কঠিন। দু’জনের ৩ কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে সংসার চালানোই তখন কঠিন ব্যাপার। এভাবেই চললো কিছুদিন। হঠাৎ ম্যাগাজিন ফেরি করতে করতেই পেলাম তালহা ভাইয়ের (মানবজমিনের স্পোর্টস এডিটর) ফোন। দেখা করতে যেতে বললেন। তখনো মানবজমিনের অফিস কারওয়ান বাজারে স্থানান্তরিত হয়নি। আর্মি শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংবাদপত্রগুলোর তখন অস্তিত্বই হুমকির মুখে। এই অবস্থায় ক্রিকেট বিটে কাজ করার জন্য একটা রিপোর্টার খুঁজছে মানবজমিন। তালহা ভাইয়ের ফোন পেয়েই দে ছুট। তখনো সেভাবে পরিচিত হয়ে উঠিনি এই অঙ্গনে। একটু ভাইবা নিয়ে তালহা ভাই প্রায় পরিত্যক্ত একটা কম্পিউটারে বসিয়ে দিয়ে একটা লিখিত পরীক্ষাও নিয়ে নিলেন। সেইসব পরীক্ষার ফল মিললো দু’দিন পরে। শ্রদ্ধেয় সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী (আমাদের প্রিয় মতি ভাই) প্রথম দেখায় একটু ঝালিয় নিলেন আমাকে। সেই পরীক্ষা উতরে ছ’মাসের দুর্বিষহ জীবন থেকে ফিরলাম কক্ষপথে। মানবজমিনের অবস্থা তখন এখনকার মতো ছিল না। মতি ভাই বড্ড লড়াই-সংগ্রাম করেই এগিয়ে নিচ্ছিলেন প্রিয় সৃষ্টিটাকে। তিনি হাল ছেড়ে দেননি। নিজেই লড়াই করে আমাদের শিখিয়েছেন। তার কাছ থেকেই শিখেছি কী করে ঝড় সামলে ঘুড়ে  দাঁড়ানো যায়। লড়াই করে গিয়েছি। একটা সময় বেতনের একটা অংশ কম নেয়ার সিদ্ধান্ত হলো। সেটাও মেনে নিয়েছি। কারণ জানতাম এই সময়টার শেষ হবে। কারণ মতি ভাইয়ের ওপর আমাদের সবার বিশ্বাস ছিল। জানতাম, তিনি নিরাশ করবেন না। আঁধারের পর সুর্য হাসবেই।  
সেই সুর্যটা ঠিকই হেসেছে। পুরানো জরাজীর্ণ ঠিকানা ছেড়ে মানবজমিন এসেছে নতুন ভবনে, ঝকঝকে চকচকে অফিসে। সেই সন্ধিক্ষণের সাক্ষী হয়েছিলাম আমি। পুরানো ঝেড়ে আমরা ভীষণ উদ্যোমে কাজ শুরু করি নতুন অফিসে। তাতে সাহসটাও যেমন বেড়ে যায়, তেমনই বেড়ে যায় মতি ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা। অনেক সাহস, অনেক শিক্ষা, অনেক অভিজ্ঞতার সঙ্গী তখনি ছাড়তে হয় প্রিয় ঠিকানা। 
এরপর ৩টি ঠিকানা ঘুড়ে এখন কাজ করছি দৈনিক দেশ রূপান্তরে। অথচ একটিবারের জন্যও মনে হয় না, আমি মানবজমিনের অংশ নই। সেটা মনে হওয়ার সুযোগও যে নেই। মতি ভাই নিজেই সেই সুযোগ রাখেননি। যেদিন বিদায় নিতে গিয়েছিলাম, নিজের চেয়ার ছেড়ে এসে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তার চোখে ছিল পানি। বলেছিলেন, ‘মানবজমিনের দরজা আপনার জন্য আজীবন খোলা।’ এতবড় মাপের একজন মানুষ আমার মতো নগণ্য একজনকে যে সম্মান সেদিন দিয়েছিলেন, সেটাই ছোট্ট জীবনের বড় প্রাপ্তি হয়ে থাকবে।

আপন আলোয় মানবজমিন থেকে আরও পড়ুন

   

আপন আলোয় মানবজমিন সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status