ঢাকা, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, বুধবার, ১১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৪ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

আপন আলোয় মানবজমিন

মানবজমিন ও রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাণী

শওকত মাহমুদ, সাবেক সভাপতি, জাতীয় প্রেস ক্লাব
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, বুধবার
mzamin

ফ্রান্সের শীর্ষ দৈনিক ল্য মোন্দ-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক উবের দ্য ব্যোভ  মেরি ১৯৮০ সালে সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক এক প্রশিক্ষণ সমাবেশে বলেছিলেন- সংবাদপত্র এমনই এক স্বপ্ন যা আমরা  দেখি দিনের পর দিন সমবেতভাবে। ওইখানে উপস্থিত পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক শঙ্কর লাল ভট্টাচার্য তাঁর লেখায় সম্মিলিত স্বপ্নের ব্যাখ্যাটা ওই সম্পাদককে উদ্ধৃত করে বলেন- যে রিপোর্টার খবরের খোঁজে ঘুরছে সে মনে মনে একটা ছবি তোলে ঘটনা বা ঘটনাক্রমের। রিপোর্টার মনশ্চক্ষে ঘটনাটা সাজায়, কীভাবে লিখবে তারও ভাবনা-বুনন চলে। আর এও  দেখে পত্রিকার কোন পাতায় কীভাবে তা ছাপা হবে। সর্বোপরি পাঠকের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াও ভেবে বসে থাকে। এই রিপোর্ট নিয়ে  ডেস্কেরও একটা স্বপ্ন তৈরি হয়- ট্রিটমেন্ট কেমন হবে। চূড়ান্তভাবে সম্পাদক তা নিয়েও স্বপ্নে পড়ে যান। রিপোর্ট পড়ে বা দেখে পাঠকও এক ধরনের স্বপ্নে নিক্ষিপ্ত হন- সামাজিক ও ব্যক্তিগত ভালো-মন্দ ভাবনায়। 

এই স্বপ্নচক্রটি মাথায় রেখে আমরা যদি বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোর কর্ম ও কর্মীদের মনে জাগিয়ে তুলি, তবে তার সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্যতা পাবো ‘মানবজমিন’ পত্রিকা ও তার প্রাণপুরুষ প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান  চৌধুরীর ক্ষেত্রে। বাংলা ভাষায় প্রথম রঙিন এই ট্যাবলয়েডে কাজ করে   দেখেছি- রিপোর্টারের আগে সম্পাদকই স্বপ্নে আবিষ্ট হয়ে আছেন, উদ্দিষ্ট খবরটিকে তিনি কীভাবে সাজাবেন, চোখ আটকানো কেমন শিরোনাম  দেবেন আর কোন রঙের জমিনে পত্রিকার পাতায় তা ভাসিয়ে তুলবেন। এই মানুষটার মধ্যে প্রতিভা আছে আর প্রতিভাটার মধ্যে মানুষ আছে।

বিজ্ঞাপন
মন মগজে সর্বক্ষণ খবরের তাড়না এবং রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণ জ্ঞান। 

মানবজমিন-এর ২৫ বছর  কোনো হেলাফেলা ঘটনা নয়। এর দুঃসাহসী অভিযাত্রা এবং টিকে থাকা আমাদের সমকালীন সাংবাদিকতার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য ঘটনা এবং যে কোনো পিএইচডি গবেষণার অভিন্দর্ভও হতে পারে। শুরুর দিকে মনে হয়েছিল- মানবজমিন টিকবে  তো! ট্যাবলয়েডের একটা চরিত্র আমরা মনে মনে আঁকি- এটা রমরমা, রগরগে, সুড়সুড়ি সাংবাদিকতার পথে হাঁটে। বিলাতি সান, মিরর-এর মতো। কিন্তু আমরা দেখি ইভেনিং স্ট্যান্ডার্ড এর মতো। ট্যাবলয়েড জাতীয় সান্ধ্য  দৈনিক কিন্তু জাতীয় পত্রিকার গুরুত্ব বহন করে। ‘মানবজমিন’ আমাদের মতো ‘সাপের গালে ব্যাঙ এবং ব্যাঙের গালে সাপ মারার সমাজ’- এর ভ্রƒকুটি মুছে দিয়ে প্রমাণ করেছে এটি অবশ্য আলোচিত জাতীয়  দৈনিক। মতি ভাই মূলধারার প্রথম সারির সাংবাদিক। সংবাদ, ইত্তেফাক, আজকের কাগজ, ভয়েস অব আমেরিকায় ম্যালা হই-চই  ফেলা রিপোর্ট করেছেন। খবরের তাড়নায় জীবনকে যাপন করেন। সত্যের সন্ধানে ও প্রকাশে বেপরোয়া। অন্তর্গত চেতনায় ওই অর্থে নির্বান্ধব। স্ত্রী ও সম্পাদক মাহবুবা চৌধুরী এবং একমাত্র সন্তান মিশুর সমর্থনে উজ্জীবিত। অধিকমাত্রায় বিনয়ী, নম্রভাষী, টকশো’র জনপ্রিয় উপস্থাপক; কম কথায় আলোচকদের উস্কে  দেন। ‘মানবজমিন’ মূলত ‘মতিজমিন’। ‘সম্পাদক যা মনে করেন তাই খবর’- এই মন্ত্রটা কারও অজানা নয়। মতিউর রহমান চৌধুরীর মানুষটায় একটা মধ্যবিত্তের নীতি-নৈতিকতা, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতা, সভ্যতার সীমা- এসব টনটনে হয়ে কাজ করে। অতএব তাঁর ওপর ভরসা করাই যায়। গত এক দশকের ফ্যাসিবাদে তাঁকে এবং ‘মানবজমিন’কে ঢের গঞ্জনা, চোখ রাঙানি সইতে হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু তিনি অভীষ্ট লক্ষ্যে অটল, অনড়। এ জমানার অনেক ভালো তরুণ রিপোর্টারও তাঁর হাতে  তৈরি।

শঙ্কর লাল ভট্টাচার্যের একটা পর্যবেক্ষণ খুব মনে পড়ে। তিনি বলছেন “ব্যোভ মেরি কথিত স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্ন  দেখানো ছাড়া সাংবাদিকতার লক্ষ্যে তৃতীয় ও শেষ স্বপ্ন যদি কিছু থেকে থাকে তবে  সেটা সমাজ ও জীবনের প্রবাহে এক ধরনের হস্তক্ষেপের অর্থাৎ intervention এর, প্রায়শই যা intereption বা বাধা দানের প্রতি কিছু হয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু স্বপ্নটা থাকে...।” আমাদের উপ-মহাদেশে সাংবাদিকতার শুরু হয়েছিল হিকির বেঙ্গল  গেজেট দিয়ে, যার মূল লক্ষ্যই ছিল ইংরেজ দুঃশাসনকে নগ্ন করা। খবর সংগ্রহ, ছাপা বা প্রচারের পাশাপাশি আরও কিছু করার দায়িত্বটা আমাদের পূর্বসূরিরা সেই নজরুল-এর ধূমকেতু থেকে শুরু করে পাকিস্তান, বাংলাদেশ হয়ে বর্তমান প্রজন্মও লালন করে চলেছে। করবেই- দুঃশাসন, ফ্যাসিবাদকে মেনে নেয়নি। ১৯৫৪ সালে গঠিত জাতীয়  প্রেস ক্লাবের গঠনতন্ত্রে তাই তো ‘জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম’ শব্দ তিনটা ঠায় বসে আছে। 

কিছু করার তাগিদ এর বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের একটা বাণীকে স্মরণ করতেই হয়। ১৯৪০ সালের মার্চ মাসে আনন্দবাজার পত্রিকার উনবিংশ বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে দেয়া কবির আশীর্বাণী ছিল এমন-“নববর্ষে আনন্দবাজার পত্রিকার অভিনন্দন করি।  সেই সঙ্গে এই কামনা করি যে, বাংলাদেশে সর্বজনপাঠ্য সংবাদপত্রের যে প্রধান কর্তব্য তাহা যেন এই পত্রিকার দ্বারা সুসম্পন্ন হইতে পারে। বাঙালিকে আত্মবিস্তৃত জাতি বলা হইয়াছে, বস্তুত বাঙালি আত্মঘাতী জাতি। তীব্র অহমিকার উত্তেজনায় আমরা পরস্পরকে আঘাত করিতে সর্বদা প্রস্তুত। এই ব্যক্তিগত বিরুদ্ধতার আঘাত সমস্ত  দেশের মর্মস্থানকে বিক্ষত করিয়া তাহার প্রাণশক্তিকে নিরন্তর ক্ষয় করিতে থাকে অন্ধ আবেগে, এ কথা আমরা মনে করি না। কর্মনাশা  ভেদবুদ্ধির সর্বনাশা বিস্তারে সমগ্র ভারতবর্ষের সভায় বাঙালির আসন আজ সদ্বীর্ণ ও অসম্মানিত। পরস্পর সম্মিলনের ক্ষমাপরায়ণ  ধৈর্যশীল সমবায় শক্তির দ্বারাই বাঙালি ক্রমপরিবর্ধমান দুর্গতি হইতে আপনাকে রক্ষা করিতে পারিবে- অন্য উপায় নাই। আমাদের সংবাদপত্রগুলো এই উদার মিলনের পথে বাঙালিকে উৎসাহ না দিয়া যদি তাহার বিচ্ছেদ সাধনের প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দিতে থাকে তবে তাহার পরাভব নিঃসংশয়িত। এই অসংযত আত্মবিনাশমত্ততা হইতে বাঙালিকে রক্ষা করিবার ব্রত গ্রহণ করুক, আনন্দবাজার পত্রিকাকে দুর্ভাগ্যগ্রস্ত বাংলাদেশের হইয়া এই আমার নিবেদন জানাইতেছি।”
সুপথে চলার অভিযাত্রায় মানবজমিনকে অভিনন্দন।

আপন আলোয় মানবজমিন থেকে আরও পড়ুন

   

আপন আলোয় মানবজমিন সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status