ঢাকা, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, বুধবার, ১১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৪ শাওয়াল ১৪৪৫ হিঃ

আপন আলোয় মানবজমিন

স্মৃতির ভেলায়

সিরাজুল ইসলাম কাদির, নির্বাহী সম্পাদক, আমেরিকান চেম্বার্স জার্নাল
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, বুধবার
mzamin

দিনক্ষণটা ঠিক ঠিক মনে করতে পারছি না। আমরা এক দল তরুণ তারুণ্যের তেজ আর উদ্দীপনা নিয়ে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতার পেশায় নিমগ্ন। মাথার উপরে দেশের অন্যতম সেরা সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী। ছাতা যেভাবে পথিককে রোদ বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে তিনি সেভাবে স্নেহের সুশীতল ছায়া হয়ে আমাদের মাথার উপর বর্ষাতি হয়ে রয়েছেন।
তিনি তখন পেশাদারি দায়িত্ব পালনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে। এই সময় অভ্যন্তরীণ চক্রান্তের শিকার হয়ে বাংলাবাজার পত্রিকার বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে তৎকালীন মালিক কর্তৃপক্ষ চাকরিচ্যুত করেন। এই ঘটনার পর পত্রিকার অফিসজুড়ে একটা গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছিল। চাকরিচ্যুতির এই ঘটনার কিছুদিন পর পত্রিকার সম্পাদক, সাংবাদিকদের অভিভাবক মতিউর রহমান চৌধুরী দেশে ফেরেন। বিমানবন্দরে পত্রিকার মালিক নিজেই সম্পাদককে স্বাগত জানান। তৃতীয় কোনো উৎস থেকে তাঁর কাছে চাকরিচ্যুতির এই খবর পৌঁছার আগে তিনি সম্পাদককে তাঁর মতো করে অবহিত করেন। তবে শতকরা ১০০ ভাগ পেশাদার সাংবাদিক জনাব চৌধুরী এই চাকরিচ্যুতির পদক্ষেপকে সেদিন যে একেবারেই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি তার প্রমাণ আমরা অচিরেই পেয়ে যাই।

বিজ্ঞাপন
তিনি দেশে ফেরার অব্যবহিত পরেই পদত্যাগ করেন। তাঁর যুক্তি ছিল: একজন সম্পাদকের অনুপস্থিতিতে তাঁর অজ্ঞাতে একদল সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা ভারী অন্যায় এবং অনাকাক্সিক্ষত। বরং সম্পাদক হিসেবে এটি তাঁর জন্য অসম্মানজনক। সম্পাদকের পদত্যাগের পর একযোগে প্রায় শতভাগ সাংবাদিক-কর্মচারী পদত্যাগ করেন। এই সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য মালিক নিজে সম্পাদকের কাছে অনুশোচনা প্রকাশ করে চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের পুনর্বহালের ওয়াদা করেন। তবে এতে সম্পাদক সাহেব তাঁর অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। মালিকপক্ষ এই আকস্মিক সংকট মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হন। যতদূর মনে পড়ে এরপর একটানা দু’দিন কাগজ প্রকাশিত হয়নি। একটি জনপ্রিয় দৈনিক এভাবে দু’দিন প্রকাশিত না হওয়া বাংলাদেশে সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক বিরল ও ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা।
এরপর আমরা বাংলা মোটরের কাছে ওয়ালসো টাওয়ারের নিচ তলায় সাপ্তাহিক মানবজমিন পত্রিকা অফিসে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতাম। আড্ডা দিতাম। গল্পে মশগুল হতাম। আমাদের কাছে এ সময় মতিউর রহমান চৌধুরী উষ্ণ প্রাণের স্পন্দন হয়ে প্রতিদিন উপস্থিত হতেন। স্মিত হাস্যোজ্জ্বল এই উপস্থিতি আমাদেরকে একেবারেই হতাশ হতে দিতো না। বলতেন: আপনাদের চাকরি বহাল আছে। মাস শেষে মাইনে পাবেন। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
আমরা সাপ্তাহিক পত্রিকায় লিখছি। ইতিমধ্যে সম্পাদক সাহেব আমাদের কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে ঘন ঘন বৈঠক করছেন। এরমধ্যে জালাল ফিরোজের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। সাপ্তাহিককে দৈনিক কাগজে রূপান্তরের আলাপ আলোচনা চলছে। নতুন ধ্যান-ধারণা নিয়ে এটি হবে ভিন্নধর্মী দৈনিক। একটি ট্যাবলয়েড দৈনিক। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা এক নতুন অধ্যায়। বাংলাদেশের ধর্মীয় চেতনা, কৃষ্টিগত মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য- এসব বিবেচনায় একটি ট্যাবলয়েড কতোটা পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করতে পারবে- সেই বিষয় নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। সম্পাদক সাহেব তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। তাঁর বিশ্বাসের দেয়াল এতই শক্ত যে, আমরাও এ ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠি। তিনি আমাদের সঙ্গে বৈঠক করে বলেন: বাংলাদেশের মূল্যবোধকে আঘাত না করে এই ট্যাবলয়েড প্রকাশিত হবে। পশ্চিমা জগতের ট্যাবলয়েডের তৃতীয় পাতার মতো কোনো সংবেদনশীল, আপত্তিকর বিষয়বস্তু নিয়ে তৃতীয় পাতা সংযুক্ত হবে না। তাঁর এই আশ্বাস আমাদেরকে সাহস জোগায়।
এরপর সত্যি সত্যি আমাদের জন্য একটি বেতন কাঠামো তৈরি করা হয়। পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার আগে আমরা নিয়োগপত্র পেয়ে যাই। বেতনের অঙ্ক দেখে আমরা একটু অবাক হই। আমাদের অন্যতম সহকর্মী মিলান ফারাবী আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘কাদির ভাই এ তো আমাদের প্রত্যাশার চেয়ে ঢের বেশি।’ বলাই বাহুল্য আমাদের বেতন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ নির্ধারণ করা হয়।
একটু একটু করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি এগিয়ে আসে। সত্যি সত্যি একদিন সাপ্তাহিক মানবজমিন দৈনিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। আমরা সেই অধ্যায়ের অনুষঙ্গ হতে পেরে গর্বিত, উদ্বেলিত, অহংকৃত।
১৯৯৮ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি। ২৫ বছর। মহাকালের মহাযাত্রায় এই পথ হয়তো দীর্ঘ নয়। কিন্তু নানা ঘাত-প্রতিঘাত, অভিঘাতকে নিজের শরীরে আপন করে নিয়ে এই ২৫ বছর পথ চলা এক দুঃসহ অভিযাত্রীর যাত্রার সমতুল্য। এই ২৫ বছরে মানবজমিন এখন অনেক স্থিত, যুগপৎ অচঞ্চল ও বহমান। 
শয়ন কক্ষের বিস্তৃত, শুভ্র আর পরিপাটি শয্যা জীবনের জন্য সমগ্রতা নয়। এই জীবনে রয়েছে সড়কের অমসৃণ পথ।
বিশ্বব্যাপী প্রকাশনা শিল্প আজ কোণঠাসা। নানা উত্থান পতন এখানে প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে। রক্ত ঝরাচ্ছে। কিন্তু তারপরও আমরা এই শিল্পের জন্য যারা নিবেদিত প্রাণ- বিশ্বাস করি, একদিন এই অভিঘাত দু’পায়ে ঠেলে আমরা স্বচ্ছ নীল আকাশে সূর্যের আলো দেখতে পাবো। আর সেই আলোয় পারবো অবগাহন করতে। এই বিশ্বাসকে পাথেয় করে আমার মতো মানবজমিনের সকল সহকর্মী সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন- সেই কামনা আজকের এই শুভ দিনে। সত্যের জয় হোক। জয় হোক সত্য বলার সাহসিকতার। অন্ধকার ভেদ করে উদয় হোক নির্মল আকাশে সোনালী সূর্যের- যে সূর্যের স্বপ্ন নিয়ে আজ থেকে ২৫ বছর আগে দৈনিক মানবজমিনের সূচনা হয়েছিল সেই স্বপ্ন সুন্দরে ভরে উঠুক।

লেখক: মানবজমিনের অর্থনৈতিক সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি রয়টার্সে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি আমেরিকান চেম্বার্স জার্নালের নির্বাহী সম্পাদক

 

আপন আলোয় মানবজমিন থেকে আরও পড়ুন

   

আপন আলোয় মানবজমিন সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status