ঢাকা, ২৮ মে ২০২৪, মঙ্গলবার, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৯ জিলক্বদ ১৪৪৫ হিঃ

আপন আলোয় মানবজমিন

‘সাম্বাদিক কই? কিজানি জিগাইবো’

আজহার মাহমুদ, এডিটর ইন চিফ ক্যাম্পাসলাইভ২৪ডটকম
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, বুধবার
mzamin

প্রিয় মানুষ মতি ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জয়েন করলাম। ফারাবী ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন তিনি। আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন ফারাবী ভাই। বুঝিয়ে দিলেন আমার কাজ। সঙ্গে আরও নানান কথা। আমার বসার জায়গাটাও দেখিয়ে দিলেন। হয়ে গেলাম মানবজমিন নামের ব্যতিক্রমী এক দৈনিকের স্টাফ রিপোর্টার। মতি ভাইয়ের ব্যাপারে না বললেই নয়। তিনি হলেন বাংলাদেশের আধুনিক সাংবাদিকতার প্রাণপুরুষ। মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর লেখনি আর আইডিয়ার তুলনা হয় না।

বিজ্ঞাপন
তার মাধ্যমে ব্যাতিক্রমী ট্যাবলয়েড দৈনিকের ধারণা এদেশের মানুষ প্রথম পেয়েছে। শত শত সাংবাদিক তৈরির কারিগর তিনি। আর সম্পাদক মাহবুবা চৌধুরী অসম্ভব সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হৃদয়ের অধিকারীনী। তিনি তার সহকর্মীদের আপন ভাইয়ের মতো দেখেন। সকলের বিপদের এগিয়ে আসেন হর-হামেশাই।
নিউজ এডিটর ছিলেন আহমেদ ফারুক হাসান। ভীষণ শক্ত মনের মানুষ। সহজ, সরল যোগ্য এই মানুষটি ছিলেন উদার মানসিকতার। সকল প্রশাসনিক মার প্যাঁচের ঊর্ধ্বে। তার সরলতায় আমি যতখানি মুগ্ধ হয়েছিলাম তার চেয়ে বেশি ভীত হয়েছিলাম এত রাগ-ঢাক ও সরলতা নিয়ে উনি টিকতে পারবেন কিনা?
তবে তিনি ছিলেন কাগজের জন্য নিবেদিত প্রাণ সৈনিক। এ ভদ্রলোক একসময় বাংলাবাজার পত্রিকায় ছিলেন; ওখানেও বার্তা সম্পাদক ছিলেন তিনি। চাকরি করতে হলে অফিসের বস সম সকলকে সমীহ করে চলতে হয়। আর এ নিয়মটা মানতে আমার ভীষণ বেগ পেতে হয়েছিল। নিজেকে চরমভাবে অপমানিত মনে হয়েছিল। তারপরেও সব দিক সামলে নিয়েছি। তখন মানবজমিনে ছিলেন জাহেদ চৌধুরী ভাই, কাঞ্চন ভাই,আনসারী ভাই, শামীম ভাই, মনোয়ার ভাই, সালেহ ভাই ও কিছুদিন পর যোগ দিলেন মিজানুর রহমান খান ভাই ও এমদাদুল হক মিলন ভাই। তখন সিটি এডিটর ও নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন শওকত মাহমুদ ভাই। এরপর আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হলো কূটনৈতিক প্রতিনিধি সেলিম ওমরাও খানের  সঙ্গে। তার সঙ্গেই কাজ শুরু করলাম। বিদেশিদের সঙ্গে কাজ আর হিসাব-নিকাশ করে লেখা বেশ কষ্টসাধ্য। আমার লেখা তো লিড হয় না। ভাবনাটা বেড়ে গেল। পত্রিকার পাতায় অনেকের লেখা লিড হয়। এসবে আমার ব্যাপক ব্যাকুলতা। অস্থিরতা। আমিও পারি তবে কেন এমনটি হচ্ছে। এক সময় পেরে উঠেছি।
কূটনৈতিক বিভাগে ৬ মাস পার হয়ে গেল। ইতিমধ্যে ক্রাইম বিভাগের চিফ ফখরুল আলম ভাইসহ মুজিব মাসুদ, শহীদুল ইসলাম ও বিশ্বজিৎ দত্তের সঙ্গে পরিচয় হলো। আমিও ক্রাইমে কাজ করতে আগ্রহ দেখালাম। মতি ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনার পর যোগ দিলাম ক্রাইমে। প্রথম প্রথম সিটি রাউন্ড আপ বেশি করতে হতো। অন্যরা তাদের স্টাইলে কাজ করতে থাকলেন। আমি তাদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চেষ্টা করছি। ওই ফিল্ডে অসহায় আমি নীরবে নিভৃতে দেখতে থাকলাম সহনীয়সহ্য শক্তিকে আলিঙ্গন করে। আমি ক্রাইম রিপোর্টিং শিখছি খুবই মনযোগ দিয়ে। পেরেও উঠলাম। এক সময় বিভাগীয় প্রধান পদত্যাগ করলেন। যোগ দিলেন অন্য দৈনিকে। আমার দায়িত্ব অনেকটা বেড়ে গেল। ক্রাইম বিভাগের চিফ হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো।
ট্যাবলয়েড দৈনিক মানবজমিনে কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমাজের অপরাধচিত্র আমি তুলে ধরবো জন-মহলে। সে সময়ে দেশে যে পরিবেশ বিরাজ করছিল তাতে সংবাদ ও সাংবাদিকতার গুণগত মান বজায় রাখার ব্যাপারে সচেতন ও সচেষ্ট হবার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে বুঝেছিলাম। তাই কাজটাকেই বেশি গুরুত্ব দিতাম। অ্যাসাইনমেন্ট আসলে সাদরে তা করে দিতাম।
এলোমেলো পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে কিছুদিনের মধ্যে আমিও বনে গেলাম ক্রাইম রিপোর্টার। সারোয়ার আলম ডেপুটি চিফ থেকে চিফ রিপোর্টার হলেন। একটু কড়া হলেও লেখনিতে ছিলেন বেশ ভালো। সজ্জন হিসেবে উনার সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করতাম। এরপর যোগদান করেন রংপুরের প্রতিনিধি কেরামত উল্লাহ বিপ্লব, চাঁদপুর প্রতিনিধি মিজান মালিক ও কুষ্টিয়ার প্রতিনিধি নাজমুল ইমাম।
একবার আমাকে মতি ভাই তার কক্ষে ডাকলেন। আমি প্রধান সম্পাদকের কক্ষে প্রবেশ করলাম। বসতে বললেন। বসলাম। তখন তিনি চা বিস্কুট খাচ্ছিলেন। আমাকে অফার করলেন। কিন্তু আমি নিচ্ছিলাম না। পর পর দু’বার বললেন বিস্কুট নিতে.... নিলাম কিন্তু সংকোচে খেতে পারছিলাম না....... একটু আনইজি লাগছিল। সান্নিধ্যের সুযোগটা হাত ছাড়া না করে কথা শুনলাম মনোযোগ সহকারে। পুরান ঢাকার হাজী সেলিমের ওপর একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন। ভয় পাচ্ছিলাম। নিজেকে সংযত করলাম। ধৈর্য ধারণ করেই কাজে নামলাম।
পুরান ঢাকায় দুইদিন গেলাম। তেমন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অবশেষে দেখা হলো এক সাবেক ছাত্রনেতার সঙ্গে। তিনি পরবর্তীতে এমপি হন আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়ে। এবার তার সঙ্গে কয়েক দফায় দেখা করলাম তিনি কিছু সোর্স দিলেন। বেশকিছু তথ্য দিলেন। সেগুলো নিয়ে ক্রসচেক করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছি বেশ ক’বার।  কিন্তু হাল ছাড়িনি। লেগেই ছিলাম আমার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে।
সকল তথ্য মিলিয়ে লেখা শেষ করে মুখোমুখি হলাম অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছে। সকালে হাজী সেলিম সময় দিলেন। আমি যথারীতি তার বাড়িতে যাই। সে কী দৃশ্য বুঝানো বড় দায়। চারদিকে ছোট ছোট চুলের ৭/৮ জন লোক বসে আছেন। লম্বা টেবিল। সবার সামনেই নামি-দামি অস্ত্র। এর মাঝে বসে আছেন সেই আলোচিত হাজী সেলিম। তিনি আমাকে দেখেই বললেন ‘সাম্বাদিক কই? কি জানি জিগাইবো’ আমি আমার পরিচয় ও কার্ড দিলাম। কার্ড দেখেই বললেন আপনি সাম্বাদিক? কন ক্যান আইছেন। আমি বললাম উনারা কারা?। ‘এরা আমার ক্যাডার নয়, ভক্ত।’ তার উক্তি ছিল ‘বেশি পরসনো করবেন না কইছি।’
আমি অনেকটা ভয়ে ভয়ে তার বিরুদ্ধে প্রাপ্ত প্রশ্নের জবাব মিলাচ্ছিলাম। বুড়িগঙ্গা নদী দখল, নানান জায়গা-জমি দখল, বিভিন্ন জায়গাতে তার নামে চাঁদাবাজি, কোকাকোলাসহ পানীয় নকল, বিকল্প আদালত, এসএসসি পাস না করেও (তৎকালীন) জগন্নাথ কলেজের ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক পদ দখল, কুলি থেকে কোটিপতি এসব নানান প্রশ্ন।
স্কুলের ছাত্র হয়ে জগন্নাথ কলেজের সমাজসেবা সম্পাদক কীভাবে হলেন জানতে চাইলে তিনি বললেন ‘এরশাদ স্যার বলছেন সেলিম তুমি ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক হইবা? আমি বলছি স্যার আপনি যা বলেন। এমতেই সমাজসেবা সম্পাদক হইয়া গেছি।’
নানান প্রশ্ন প্রসঙ্গে হাজী সেলিম বললেন, ‘তো পরসনো কইরেন না কলাম। এসব লিকক্যা-ট্যাইক্কা কি হইবো। ট্যাকা লইয়া যান। কাজে লাগবো।’ তৎকালীন সময়ে তিনি আমাকে ৪ লাখ টাকার অফার দিলেন। কিন্তু নানান কথা বলে বুঝিয়ে ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে আসলাম। তিনি নবম শ্রেণি পাস ও জগন্নাথ কলেজের ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক কীভাবে হলেন এসব নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশের পর তিনি আমাকে ফোন করে বললেন ‘আবে আজার সাব আমাকে এক কেলাস নিচে নামাইয়া দিছেন। আমি বি দশম শ্রেণি পযন্ত পড়ছি। আর আপনি লেখছেন নবম শ্রেণি পাস।’ এসব আরও অনেক কিছু...।
আমার ৭ বছরের দীর্ঘ সুদীপ্ত কর্মজীবনের অধ্যায় মানবজমিনের অঙ্গনে-প্রাঙ্গণে কেটেছে। সংবাদকর্মী ও সহপাঠীদের বিচিত্র আচরণ আমাকে বিস্মিত করতো মাঝে মধ্যে। আবার ভালোবাসার দোলনায় দোল খাওয়াতেও পিছপা হয়নি।
 

আপন আলোয় মানবজমিন থেকে আরও পড়ুন

   

আপন আলোয় মানবজমিন সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status