ঢাকা, ১৬ জুলাই ২০২৪, মঙ্গলবার, ১ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৯ মহরম ১৪৪৬ হিঃ

বিশ্বকাপ ম্যাগাজিন

যেভাবে বিশ্বকাপ কাতারে

তালহা বিন নজরুল, সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক, মানবজমিন

(১ বছর আগে) ১৪ নভেম্বর ২০২২, সোমবার, ৭:৩৬ অপরাহ্ন

সর্বশেষ আপডেট: ৩:৫৯ অপরাহ্ন

mzamin

ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে। অবিরাম, অবিরত। ঘুরছে তো ঘুরছেই। একদম নিজস্ব গতিতে। বিশ্বজুড়ে একই নিয়ম, একই গতি। একটুও হেরফের নেই। আজ অব্দি কোনো শক্তির ক্ষমতা হয়নি তাকে থামায়। পল পল করে এগিয়ে চলা ঘড়ির কাঁটা অনুসরণ করে চলেছে সবাই, কয়েকশ’ কোটি মানব সন্তান। তবে এই সময়যন্ত্রের দিকে ফুটবল বিশ্বের নজর এখন আরও গভীর। ক্ষণ গণনায় ব্যস্ত সবাই।

বিজ্ঞাপন
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে তাদের প্রস্তুতি। কেউ যাবে খেলতে, কেউ খেলাতে। আর বাকি বিশ্ব অধীর অপেক্ষায় প্রিয় তারকাদের লড়াই দেখার। নিজ দেশ খেলুক বা না খেলুক, নিজস্ব দল আছে সবারই।

আর মাত্র ক’টা দিন। প্রস্তুতি প্রায় শেষ। তারপরেই মাঠে গড়াবে লড়াই। এক যুগ বা ১২ বছরের অপেক্ষার অবসান। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত আসর কোথায় বসবে তা ঠিক হয় ২০১০ সালের ২রা ডিসেম্বর। নানা জল্পনা-কল্পনা আর সমালোচনার ঢেউ ঠেলে নির্ধারিত বন্দরে জাহাজ ভেড়ানোর অপেক্ষা। হ্যাঁ, সাগরঘেরা ছোট্ট দেশ কাতার তো বিরাট এক বন্দরই। খেলার সংখ্যা আর খেলোয়াড় সংখ্যায় অলিম্পিক গেমসই গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। কিন্তু দর্শক সংখ্যায় সবচেয়ে বড় আসর এই বিশ্বকাপ ফুটবল।  আর এবারের আসরটি বসছে এমন এক দেশে যার জনসংখ্যা আগের সব আয়োজক দেশের চেয়ে কম। আরব বিশ্বেও ফুটবল বিশ্বকাপ এবারই প্রথম।

প্রতি চার বছর পর পর যা মাঠে গড়ায়। প্রায় শতবর্ষী এই ফুটবল প্রতিযোগিতায় এবার অনেক নতুনের অপেক্ষা। শুরুর সময় দিয়েই ব্যতিক্রমের শুরু। এবারের আসর শুরু হচ্ছে নভেম্বরের শেষ দিকে। এ সময় কাতারের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। দিন তারিখের হিসাবে কয়েক মাস আগেই শেষ হয়ে যেতে পারতো বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২-এর আসর। সাধারণত বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয় জুনে আর শেষ হয় জুলাইতে। বিভিন্ন দেশের ফুটবল লীগের ওপর যেন কোনো প্রভাব না পড়ে সেজন্যই এ নিয়ম। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে লীগ তখন শেষ হয়ে যায়। নতুন লীগ শুরু হয় আগস্টে। পৃথিবীর বেশির ভাগ অঞ্চলে এই সময় আবহাওয়াও থাকে সহনীয় মাত্রায়। কিন্তু এবার আয়োজক দেশের আবহাওয়ার কারণেই সময়ের অনেক হেরফের। জুন- জুলাইতে কাতারের আবহাওয়া থাকে চরম গরম।  তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে চলে যায়। শীতপ্রধান দেশগুলোর জন্য তা যেন নরকসম। কিন্তু এবার যে সময় বিশ্বকাপ হচ্ছে তাতে ফুটবলপ্রধান দেশগুলোর প্রতিটিতেই লীগের খেলা বাধাগ্রস্ত হবে। তাই প্রায় একযুগ আগে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক হিসেবে কাতারের নাম ঘোষণার পর থেকেই নানা বিতর্কের জাল ফেলা শুরু হয়। আর সেসব জাল ছিন্ন করেই এগিয়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এই দেশটি। ইচ্ছা থাকলে টাকায় কী না হয় তার একদম জ্বলন্ত উদাহরণ এই কাতার বিশ্বকাপ।

ক্রীড়া জগতের ইতিহাসে এর আগে এত ছোট দেশ কখনো এত বড় কোনো প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারেনি। কেউ আয়োজক হওয়ার সাহসও দেখায়নি। কাতার অবশ্য এর আগে সামর্থ্য প্রমাণের জন্য এশিয়ান ফুটবল প্রতিযোগিতা ও এশিয়ান গেমস আয়োজন করে সফল হয়। ১২ হাজার বর্গ কিলোমিটারের কম আয়তন যে দেশটির, যে দেশের রাজধানী থেকে সবচেয়ে দূরের স্টেডিয়ামটির দূরত্ব ৫০ কিলোমিটারের মতো। যেন ঢাকা থেকে ধামরাই, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ বা গাজীপুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে এবারের বিশ্বকাপ। এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে যেতে সড়ক পথই যথেষ্ট। অর্থের জোরেই সম্ভব বিশ্বমানের ১০টি স্টেডিয়াম বানানো তাও আবার মাত্র ১০ বছরের মধ্যে ৫টি। গরম নিয়ে যেন কোনো হৈচৈ না হয় সেজন্য স্টেডিয়ামের বিরাট অংশজুড়েই থাকছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। 

এই কাতার কীভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেলো? যারা ফুটবল নিয়ে তেমন খবর রাখেন না তাদের কাছে এমন প্রশ্ন স্বাভাবিক। যেমনটা রটে তার কিছু না কিছু নাকি বটে। যদি এই অতি প্রচলিত কথাটি সত্য হয় তবে বলতেই হয় কাতারের আয়োজক হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে অর্থ সেটা টেবিলের ওপর দিয়েই হোক আর নিচ দিয়েই হোক। এনিয়ে লেখালেখি আর খোঁচাখুঁচি হয়েছে অনেক। অভিযোগ আর তদন্ত চলেছে সমানতালে। অভিযুক্ত হয়েছেন ফিফার অনেক কর্মকর্তা, পদও হারিয়েছেন অনেকে। ফিফার তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্লাটারও বাদ পড়েননি অভিযোগের তীর থেকে। 

তেল বিক্রির এত ডলার কোথায় খরচ করা যায়? রাজতান্ত্রিক শাসকদের কাছে এটা একটা সমস্যাই। আন্তর্জাতিক হিসাব বলছে, বিশ্বের ১৩ ভাগ তেল নাকি সরবরাহ করে কাতার। তো এই অর্থ না জমিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করলে মন্দ হয় না। এ ছাড়া প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাত খেলার মাধ্যমে বিশ্বে অনেক পরিচিতি অর্জন করে ফেলেছে যা তাদের ঈর্ষার কারণও বটে। ক্রিকেট বিশ্বে তো আরব আমিরাত এখন যেন সবার নিজের দেশ। ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিকে ঢেলে সাজিয়ে ফুটবল বিশ্বেও তাদের পরিচিতি ব্যাপক। তাই বেশি অর্থের মালিক হয়েও তারা পিছিয়ে থাকবে কেন? লড়াইটা আবার এমিরেটস ও কাতার এয়ার লাইন্সেরও।

 

 

এসব দিক সামনে রেখে কাতারের শাসক গোষ্ঠী হাতে নেয় বিশাল এক পরিকল্পনা। এর নাম ভিশন-২০৩০। এর আলোকে দেশজুড়ে বিশাল বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের দিকে নজর তাদের। আমাদের মতো খাওয়া- পরার চিন্তা তো আর নেই। এক ঢিলে দুই পাখি মারা চাই। এজন্য খেলাধুলার বিকল্প নেই। খেলার দিকে বিশ্ববাসীর আগ্রহটা তারা ভালো পড়তে পেরেছে। ফুটবলপ্রেমীদের নজর কাড়তে তারা প্রথম বিশাল অঙ্ক বিনিয়াগ করে বিশ্বের শীর্ষ জনপ্রিয় ক্লাব স্পেনের বার্সেলোনাতে, প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। এরপর জার্মান ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেই ক্লাবও তারা কিনে নেয়।     

যেভাবে কাতারে বিশ্বকাপ
১৯৩০ সালে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ নিয়ে বিতর্ক সেই প্রথম থেকেই। উরুগুয়েতে প্রথম আসর বসবে এটি মেনে নিতে পারেনি ইউরোপের অনেক দেশই। ফলে অনেকেই অংশ নেয়নি। এরপরের বার ইতালিতেও বয়কট করে অনেক দেশ। তবে এরপরে ১৯৩৮ সালে আসর বসে ফ্রান্সে। ১৯৫০-এ ব্রাজিল হয় আয়োজক। এভাবে ইউরোপ আর আমেরিকার দেশগুলো পালাক্রমে বিশ্বকাপ আয়োজন করে আসছিল। কিন্তু বিশ্বায়নের এ যুগে এসে ফিফার তৎকালীন সভাপতি সেপ ব্লাটার এ ধারা ভাঙার উদ্যোগ নেন। আর এর ফলশ্রুতিতে এশিয়ায় বিশ্বকাপ আয়োজন করার সুযোগ হয়। শতাব্দীর প্রথম আসর ২০০২-এ যৌথভাবে আয়োজন করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়া আয়োজন করেছিল অলিম্পিকের মতো আসর। এরপরে ২০১০ সালে প্রথম আসর বসে আফ্রিকার মাটিতে। ২০০৭-এর ২৯শে অক্টোবর পালাক্রমে সব মহাদেশে আয়োজন করার রীতিতে আবার পরিবর্তন আনা হয়। দৃশ্যমান কারণ যাই থাক এটি হলফ করে বলা যায় কাতারের উচ্চাবিলাসিতাই এর অন্যতম কারণ। কাতারের রাজাদের এ ব্যাপারে যিনি উদ্বুদ্ধ করেন তিনি হলেন মোহাম্মদ বিন হামাম। ২০০২ থেকে তিনি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের প্রধান ছিলেন ২০১১ সাল পর্যন্ত। ২৪ সদস্যের ফিফা কার্যনির্বাহী কমিটিতে প্রভাবশালী ছিলেন তিনি। ফিফা সভাপতি হওয়ার দৌড়েও এগিয়ে গিয়েছিলন। কিন্তু কাতার বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে নানা দুর্নীতির অভিযোগে সরে দাঁড়াতে হয় তাকে।

২০১৮ আর ২০২২ এর আয়োজক ঠিক করা হয় এক সঙ্গে। এর আগে ২০১০ আসর দক্ষিণ আফ্রিকা আর ২০১৪ বিশ্বকাপ ব্রাজিলে হওয়ায় ২০১৮ আসরের জন্য আফ্রিকা আর দক্ষিণ আমেরিকা অযোগ্য ছিল। ২০১৮ আসর রাশিয়া আয়োজক হওয়ায় ২০২২-এর জন্য অযোগ্য ছিল ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকা। ২০২২ এর জন্য আবেদন করেছিল অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্র। ২০১০-এর ২রা ডিসেম্বর ফিফা কার্যনির্বাহী কমিটি ২০১৮ ও ২০২২-এর আয়োজক নির্বাচন করে। মজার ব্যাপার হলো রাশিয়া ছিল প্রথম পূর্ব ইউরোপিয়ান দেশ এবং আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড়। কাতার হলো প্রথম আরব দেশ আর এ যাবৎ যত আয়োজক হয়েছে তাদের মধ্যে সবার ছোট। চার দফা ভোটাভুটির পর যুক্তরাষ্ট্রকে ১৪-৮ ভোটে পরাস্ত করে কাতার। 

আরব ও মুসলিম প্রধান দেশে বিশ্বকাপ ফুটবল এবারই প্রথম বসলেও এর আগেও কয়েকবার আরব মুসলিম দেশ আয়োজক হওয়ার চেষ্টা করেছিল। মুসলিম প্রধান দেশের মধ্যে প্রথম ১৯৯০ আসরের জন্য আবেদন করে ইরান। ১৯৭৮ সালের আসরের চূড়ান্ত পর্বে খেলেছিল তারা। কিন্তু ভোটের আগে নাম প্রত্যাহার করে নেয় ইরান। সেবার ভোটাভুটিতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে আয়োজক হয় ইতালি। তবে আরব দেশগুলোর মধ্যে আয়োজক হওয়ার জন্য টানা চেষ্টা করে হতাশ হয়েছে মরক্কো। তারা ১৯৯৪ এর আয়োজক হওয়ার লড়াইয়ে প্রথম হার মানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ১০-৭ ভোটে। এর পর ১৯৯৮ এ হার মানে ফ্রান্সের কাছে ১২-৭ ভোটে। ২০০৬-এ চেষ্টা করে তেমন সুবিধা করতে পারেনি। আর ২০১০-এ তারা ১৪-১০ ভোটে হেরে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। তবে সেবার যে মরক্কো ষড়যন্ত্রের শিকার হয় তা প্রকাশ পায় ২০১৫তে। মরক্কোর পক্ষেই নাকি বেশি ভোট পড়েছিল কিন্তু ফিফার কয়েকজন কর্মকর্তা দক্ষিণ আফ্রিকানদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে ফল পাল্টে দেয়। ২০২৬ আসরের জন্যও একমাত্র আফ্রিকান দেশ হিসেবে মরক্কো আবেদন করেছিল। কিন্তু তারা হেরে যায় ত্রিমুখো প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে। ২০১৮ সালের ১৩ই জুন মস্কোতে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত ভোটে জয়ী হয় কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র আর মেক্সিকো। প্রথমবারের মতো তিন দেশে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ মূল পর্ব। আর মেক্সিকো হচ্ছে প্রথম দেশ যারা আয়োজকের তালিকায় তৃতীয়বারের মতো নাম লেখালো। দেখা যাক মরক্কোতে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ আসর বসে কিনা। তবে তার আগে এবারের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে কাতারকে। অবশ্যই শুভ কামনা থাকবে তাদের জন্য।

বিশ্বকাপ ম্যাগাজিন থেকে আরও পড়ুন

   

বিশ্বকাপ ম্যাগাজিন সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status