ঢাকা, ৪ অক্টোবর ২০২২, মঙ্গলবার, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিঃ

দেশ বিদেশ

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হবে কবে?

নূরে আলম জিকু
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার

সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ঢাকার যানজট নিরসনে এটিই সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর মাধ্যমে ঢাকার উত্তর-দক্ষিণে যুক্ত হবে সংযোগ সড়কসহ ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার এলাকা। তবে এক দশক সময় ধরে চলছে প্রকল্পের কাজ। একাধিক বার বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। এই সময়ে বেড়েছে ব্যয়ভারও। প্রকল্প শেষ করতে সংশ্লিষ্টরা একাধিকবার সময়সীমা নির্ধারণ করে দিলেও প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন তারা। আগামী ডিসেম্বরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ খুলে দেয়ার কথা রয়েছে। এই সময়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়া নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। স্বয়ং প্রকল্প সংশ্লিষ্টরাই এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

বিজ্ঞাপন
তারা বলছেন, ডিসেম্বরে বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত চালুর লক্ষ্য রয়েছে। তবে বনানী থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত এখনো কমপক্ষে ৫০ শতাংশ কাজ বাকি রয়েছে। যা আগামী ৩ মাসের মধ্যে সমাপ্ত করা সম্ভব হবে না। এখন দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা চলছে নির্মাণকাজ। ডিসেম্বরে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের চালুর সময়সীমা আবারো পরিবর্তন হবে এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও উন্নয়নের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হবে কবে-এমন প্রশ্ন করেছেন অনেকেই। 

 জানা যায়, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী অংশে রয়েছে নানা জটিলতা। নকশা অনুযায়ী কাজ শেষ করতে প্রয়োজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সমন্বিত অনুমতি। জমি অধিগ্রহণ নিয়েও আছে জটিলতা। তেজগাঁও থেকে একটি পথ কাওরান বাজার সংলগ্ন হাতিরঝিলের উপর দিয়ে যেতে দরকার হবে রাজউকের অনুমতি। কমলাপুর এলাকায় টোলপ্লাজা ও পথ নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হবে রেলওয়ের অনুমতি। এসব জটিলতা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। সমস্যা সমাধানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের সহায়তা চেয়েছেন তারা। ফলে কুতুবখালী পর্যন্ত কাজ শেষ হতে আরও কয়েক বছর লেগে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রকল্প নেয়ার আগে টেকনিক্যাল হিসাব-নিকাশ করেই নিতে হয়। এরপর যাদের দিয়ে কাজ করানো হয়, তাদেরকে সুনির্দিষ্ট করে টার্গেট দিতে হয়। যাতে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারে। আমাদের দেশে বড় বড় প্রকল্প নেয়া হলেও টেকনিক্যাল হিসাব-নিকাশ করা হয় না। অনুমানের ভিত্তিতে প্রকল্প নেয়া হয়। এতে বছরের পর বছর কাজ পড়ে থাকছে। প্রকল্প থেকে তেমন একটা সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।

 ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আবদারে বার বার সময় ও খরচ বাড়ানো হয়। কারণ এখানে কোনো জবাবদিহিতা নেই। সে কারণেই ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে। এ ধরনের মেগা প্রকল্পে নির্মাণকালে আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অনুসরণ করা জরুরি। অন্যথায় সুফলের চেয়ে ভোগান্তিই বাড়বে। এ ছাড়া প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা ও  সদিচ্ছা না থাকায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। তাদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রকল্পে ব্যয় ও সময় লাগছে। যে গতিতে কাজ চলছে তাতে আগামী ৩-৪ বছরেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শেষ হবে না। সরকারের উচিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসা। তা না হলে প্রত্যাশিত ফলাফল আসবে না।  প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিমানবন্দর থেকে বনানী পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার। এই অংশের ভৌত অগ্রগতি প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। এখন চলছে স্লাবের উপর ঢালাইয়ের কাজ। বনানী থেকে তেজগাঁওয়ে উঠেছে ভায়াডাক্ট। কয়েকটি অংশে পিলার বসানোর কাজ এখনো বাকি। বনানী এলাকায় কাজের গতি বাড়লেও মহাখালী থেকে তেজগাঁও অংশে তেমন একটা গতি নেই। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিমানবন্দর থেকে বনানী পর্যন্ত এক হাজার ৪৮২টি পাইল বসানো হয়েছে। ৩২৫টি পাইল ক্যাপ বসানোর কাজ শেষ পর্যায়ে। ইতিমধ্যে সবক’টি কলাম বসানো হয়েছে। 

ক্রস বিম বাকি রয়েছে কয়েকটি। পরের অংশ বনানী থেকে তেজগাঁওয়ের কাজ এগিয়েছে প্রায় ৩৫ ভাগ। পাইল, টি-পাইল ক্যাপ ও কলামের কাজ এগিয়ে গেলেও এই অংশের সাড়ে ৪ হাজারটি আই গার্ডারের মধ্যে বসেছে মাত্র ৫শ’টি। বাকিগুলো বসালে দ্রুত কাজ শেষ হবে। তবে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া অপর অংশের কাজ এখনো শূন্যের কোঠায়।  প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঢাকা শহরের উত্তর-দক্ষিণ অংশের সংযোগ ও ট্রাফিক ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এশিয়ান হাইওয়ে করিডোর এ উন্নত পর্যায়ের সেবা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এটি আঞ্চলিক সংযোগকে উন্নতকরণ ও যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন, যোগাযোগ ব্যয় এবং যানবাহন পরিচালন খরচ হ্রাস করতে ২০১১ সালে নেয়া হয় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ২০১৬ সালে এই প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা। তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ৪৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার প্রকল্প নেয়া হয় ৩ ভাগে। এরমধ্যে মূল উড়াল সড়কের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা বদল, অর্থের সংস্থানসহ নানা জটিলতায় ৪ বার পিছিয়ে দেয়া হয় নির্মাণকাজ শেষ করার সময়সীমা। এই সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। 

প্রথমে প্রকল্পের কাজ ২০১৬ সালে শেষ করার কথা থাকলেও সেটি পিছিয়ে ২০১৮ সালে করা হয়। পরে আবার ২০২২ সাল করা হয়। সর্বশেষ কাজ শেষ করার সময়সীমা পিছিয়ে ২০২৩ সালের জুন নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এই সময়ে মোট কাজের ৫০ শতাংশও সম্পন্ন হবে না- এমনটা বলছেন অনেকেই। গত আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিমানবন্দর থেকে বনানী অংশে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বনানী থেকে তেজগাঁও রেলগেট পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৩৮ শতাংশ। সার্বিকভাবে প্রকল্পের অগ্রগতি ৫২ শতাংশ। মগবাজার রেলক্রসিং থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী অংশে মাটি পরীক্ষা ও পিলার বসানোর কাজ চলছে। এদিকে কাজের গতি বাড়াতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বলা হলেও কাজে গতি বাড়ছে না। প্রকল্পের নির্মাণ শ্রমিকদের কয়েক দফা ছাঁটাইয়ের অভিযোগ করেছেন ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের শ্রমিকরা। এতে প্রকল্পে বাড়তি সময় লাগছে বলে মনে করেন তারা। পিপিপি’র আওতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে কোম্পানি লিমিটেড। কোম্পানির মালিকানার ৪৯ শতাংশ ব্যাংকভিত্তিক যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠান ইটালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির হাতে। 

বাকি অংশের মধ্যে ৩৬ শতাংশের মালিকানা চায়না শ্যাংডং ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল করপোরেশনের এবং ১৫ শতাংশের মালিক আরেক চীনা কোম্পানি সিনো হাইড্রোর। টোল দিয়ে উঠতে হবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে। প্রতিদিন প্রায় ৮০ হাজার যানবাহন চলাচল করবে এই এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে। থাকবে ১১টি টোলপ্লাজা।  বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক মানবজমিনকে বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে একাধিকবার সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে এর একাংশ খুলে দেয়ার কথা। এই সময়ে খুলে দিতে পারলে তাদেরকে স্বাগতম। তবে বাস্তবে যে গতিতে কাজ চলছে দেখেছি তাতে ডিসেম্বরে খুলে দেয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এর উপর দিয়ে গাড়ি চলবে। নিরাপত্তার বিষয়টি দেখতে হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে অনেক জটিলতা রয়েছে। যেটি আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। পিপিপি’র আওতায় নির্মাণাধীন প্রকল্পটি টেকনিক্যাল হিসাব-নিকাশ করে কাজ শেষ করতে হবে। কাজে অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের জন্য ঠিকাদারদের জবাবদিহির আওতায় আনতে কবে। তবে সার্বিক বিষয়ে মনে হচ্ছে এবারো নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না।  ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম শাখাওয়াত আকতারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি অসুস্থ। হাসপাতালে আছি। অন্য সময় এই বিষয়ে কথা বলবো।

দেশ বিদেশ থেকে আরও পড়ুন

আরও খবর

দেশ বিদেশ থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং স্কাইব্রীজ প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, ৭/এ/১ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status