ঢাকা, ২৩ জুন ২০২৪, রবিবার, ৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলহজ্জ ১৪৪৫ হিঃ

ঈদ সংখ্যা ২০২৪

গণতন্ত্র-ভোটাধিকার-স্বেচ্ছাচার

ড. মাহফুজ পারভেজ
১০ এপ্রিল ২০২৪, বুধবারmzamin

এক খিলি পান, এক চুমুক চা, সিগারেটের একটানে ভোট বেচাকেনা করেন রাজনৈতিকভাবে অনগ্রসর মানুষ। টাকা, ক্ষমতা বা অস্ত্রের ভয়ে নিজের ভোট অকাতরে বিলিয়ে দেন অনেকেই। এতে গণতন্ত্রের প্রাণ ‘নির্বাচন‘ বেপথু হয়। নাগরিকের মৌলিক অধিকার বা ‘ভোটদান‘ ভূলুণ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রের ঘাড়ে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বেচ্ছাচার চেপে বসার মওকা পায়।

ভোট কেনাবেচার কুফল
নির্বাচন না হলে, হতে না পারলে, নির্বাচন ঘিরে বিতর্ক ও বিতণ্ডা হলে কিংবা নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ, অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য হলে পরিস্থিতি কতো শোচনীয় হতে পারে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার বহু জ্বলন্ত প্রমাণ রয়েছে। গণতন্ত্র তখন রুদ্ধ হয়। জননেতাদের কপাল খারাপ হয়। অনেকের আবাস হয় জেলে। অনেকে বেছে নেয় বিদেশের পলাতক জীবন। 
বিপন্ন গণতন্ত্রকে এবং কলুষিত নির্বাচন ব্যবস্থাকে উদ্ধার করতে বছরের পর বছর আন্দোলন করতে হয়। জেল-জুলুম, রক্ত ও জীবনদানের দীর্ঘ পর্যায় পেরিয়ে তবেই ফিরে আসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং এর সঙ্গে জড়িত ভোটাধিকার, বাক-ব্যক্তি-সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার ইত্যাদি। 
গণতন্ত্রের গভীরতা ও ভোটের মূল্য সম্পর্কে উদাসীন থাকাও বিপদের কারণ বটে।

বিজ্ঞাপন
যা বিশ্বের বহু অনগ্রসর ও ভঙ্গুর গণতন্ত্রের দেশে আকসার হয়।  এক খিলি পান, এক চুমুক চা, সিগারেটের একটানে, ভোট বেচাকেনা করেন রাজনৈতিকভাবে অনগ্রসর মানুষ। টাকা, ক্ষমতা বা অস্ত্রের ভয়ে নিজের ভোট অকাতরে বিলিয়ে দেন অনেকেই। এতে গণতন্ত্রের প্রাণ ‘নির্বাচন‘ বেপথু হয়। নাগরিকের মৌলিক অধিকার বা ‘ভোটদান‘ ভূলুণ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রের ঘাড়ে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বেচ্ছাচার চেপে বসার মওকা পায়।
এক খিলি পান, এক চুমুক চা, সিগারেটের একটানে দেশ ও মানুষের কতো বড় সর্বনাশ হয়, তা অনুধাবন করাও রাজনৈতিকভাবে অসতচেতা ও অসচেতনদের পক্ষে সম্ভব হয় না। কারণ, তারা ব্যক্তিস্বার্থ দেখতে পায়, জাতীয় স্বার্থ দেখে না।  

স্বৈরাচারের উত্থান, অধিকারহীন জনগণ
গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলে ক্ষমতা চলে আসে এমন কারও হাতে, যাদের গণতন্ত্রের প্রতি দায় নেই, নির্বাচনের প্রতি দায়িত্ব নেই। গণতন্ত্রকে হটিয়ে বা গণতন্ত্রের দুর্বলতার সুযোগে অতীতে নানা দেশে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই গণতন্ত্রের বারোটা বাজিয়েছে। এদের মধ্যে বহু নিন্দিত সামরিক স্বৈরাচার রয়েছেন। মোদ্দা কথায়, যখন গণতন্ত্র ও ভোট ব্যবস্থার পতন বা অবক্ষয় হবে তখন স্বৈরাচারের উত্থান ঘটবেই। 
অতীতে গণতন্ত্রকে অকার্যকর করে চক্রান্ত্রের পথে যারাই ক্ষমতায় এসেছেন, তারা সবাই ছিলেন সামরিক স্বৈরাচার। বন্দুকের নলে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন তারা। তারপর প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, অর্থের লেনদেন, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে রাজনীতিকে নিজের কব্জায় রাখে স্বৈরাচার। কঠোর দমন-পীড়ন করা হয় প্রতিবাদকারী ও বিরোধীদের।
কখনো দেশি-বিদেশি চাপে নামমাত্র গণতন্ত্র দেয়া হয়, যা আসলে এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের নামান্তর। দল ও নেতা তৈরি করা হয় ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে। প্রকাশ্যে ও গোপনে স্বৈরাচারী শাসকের স্বেচ্ছাচারী শাসনকেই সহযোগিতা করে এইসব দল ও নেতৃবৃন্দ। জনগণের মতামতের সুযোগ নেই। তাদের বক্তব্যের মূল্যও নেই। গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বৈরাচারের উত্থান হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনগণের। সবচেয়ে বেশি অধিকারহীন হয় সাধারণ মানুষ।

গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বৈরাচার
একটা সময় ছিল যখন গণতন্ত্রের মৃত্যু বলতে চিহ্নিত করা হতো সেনা অভ্যুত্থান বা ক্যু। গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটিয়ে সেনাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসে দেশি-বিদেশি কুচক্রী মহল। তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনে চিলিতে, পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে সেনা সদস্যরা অতীতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসেছে। সে নাটকের পুনরাভিনয় এখনো হয়ে চলেছে আফ্রিকার দেশ সুদান, বুরকিনা ফাসো বা মালিতে। দেখা যাচ্ছে রাস্তায় ট্যাংক, রাষ্ট্রপতি ভবনে সেনা অবরোধ, শাসনতন্ত্রের অবলুপ্তি, গণতন্ত্রের মৃত্যু। 
কিন্তু রাস্তায় ট্যাংক না নামলেও যে গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়, সাম্প্রতিক গবেষণায় তা প্রমাণিত হচ্ছে। যখন প্রথামাফিক নির্বাচিত হলেও ক্ষমতার কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি বা দলের হাতেই নাগরিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়, বাক‌স্বাধীনতা অপহৃত হয়, আইনের শাসন প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন আর গণতন্ত্র জীবন্ত থাকে না। 
এই ধরনের রাষ্ট্রে কাগজে-কলমে সবই তথাকথিত ‘আইনমাফিক’ হয়ে থাকে। যেমন, যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নাটক, যদিও সে নাটকের প্রস্তুতি হিসেবে বিরোধী দলের ওপর নেমে আসে কঠোর বিধিনিষেধ। আজকের অনেক দেশেই এমন হচ্ছে। এবং এর ফলে পৃথিবীতে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে স্বৈরাচার বাড়ছে। রাশিয়া বা নিকারাগুয়ার উদাহরণ দেখা যায় এক্ষেত্রে। রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট পুতিন তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আলেক্সেই নাভালনিকে প্রথমে বিষ খাইয়ে মারতে চাইলেন! তাতে ব্যর্থ হলে তাকে দুর্নীতির অভিযোগে জেলে ঢোকানো হলো। শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যাই করা হয়েছে বলে সকলের বিশ্বাস। 
নিকারাগুয়ায় প্রেসিডেন্ট দানিয়েল ওর্তেগা নির্বাচনের আগে একজন নয়, তার সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে জেলে ঢুকিয়েছিলেন। স্ত্রীকে ভাইস প্রেসিডেন্ট বানিয়ে গত নভেম্বরে চতুর্থবারের মতো তিনি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
পোল্যান্ডে আইন জারি হয়েছে, সরকার চাইলে যেকোনো বিচারককে পদচ্যুত করতে পারেন, যাকে খুশি যেকোনো আদালতে দায়িত্ব দিতে পারেন। হাঙ্গেরিতে প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের নামে শাসনতন্ত্র উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত ডিক্রির মাধ্যমে দেশ চালানোর অধিকার পেয়েছেন। সাংবাদিকেরা এই ব্যবস্থার নাম দিয়েছে ‘করোনা ক্যু’, যদিও কাগজে-কলমে দেশগুলো সবই গণতান্ত্রিক।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম হাউস মনে করে, হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডের মতো আপাত গণতান্ত্রিক দেশ আসলে একধনের ‘হাইব্রিড বা মিশ্র শাসন ব্যবস্থা, যা কিছুটা গণতান্ত্রিক-কিছুটা কর্তৃত্ববাদী। এই মিশ্র শাসন ব্যবস্থা রাতারাতি জায়গা করে নেয় না, এর জন্য সময় প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রশাসনের ও নাগরিক গোষ্ঠীর একাংশের সমর্থন। অন্য কথায়, গোপনে রাতের অন্ধকারে ট্যাংক নামিয়ে নয়, রীতিমতো নাগরিক সমর্থনেই ঘটে পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৃত্যু।

গণতন্ত্রের মৃত্যু
২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাটের সাড়া জাগানো বই হাউ ডেমোক্রেসিস ডাই। তখন যুক্তরাষ্ট্রে ডনাল্ড ট্রাম্প সদ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তার বিজয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দুই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এতটাই উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন যে ৩শ’ পাতার এই বই লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন। শুধু এই কথা বোঝাতে যে লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার সেনাশাসিত দেশগুলো নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশেও গণতন্ত্রের মৃত্যু হতে পারে। 
বইতে দাবি করা হয় যে, প্রতিদিন একটু একটু করে গণতন্ত্রের বিপদ বাড়ছে মার্কিন দেশে। ট্রাম্পের শাসনে এবং বর্তমানেও যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের মৃত্যু না হলেও তা ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে বলে মনে করেন গবেষকগণ। ডনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় নেই, কিন্তু ঘৃণা ও বিভক্তির যে রাজনীতি তাকে ক্ষমতায় এনেছিল, তা আরও পোক্ত হয়েছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্বর্গরাজ্য আমেরিকায়। তীব্র বিদ্বেষ ও বিভাজন দেশটিকে এক নতুন মানসিক গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। এ জন্য দায় একজন ডোনাল্ড ট্রাম্পের নয়, রিপাবলিকান পার্টি ও তার নেতৃত্বেরও, যারা নিজেদের ব্যক্তিগত আখেরের কথা ভেবে এই রাজনীতিককে সমর্থন করে যাচ্ছেন। এর ফলে তাদের আখের গোছানো সম্ভব হলেও অদূর ভবিষ্যতের দিনগুলোতে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঠেকানো যাবে না বলে সন্দেহ করেন বহু পণ্ডিত। 
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট তাদের বই হাউ ডেমোক্রেসিস ডাই-এ স্মরণ করেছেন, যত অগণতান্ত্রিক বা নিবর্তনমূলক হোক না কেন, জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার নামে সকল কাজই গণতান্ত্রিক নয়। আরও আগে, ১৯৯৭ সালে ফরেন অ্যাফেয়ার্স পত্রিকায় ফরিদ জাকারিয়া ‘ইললিবারেল ডেমোক্রেসি’ শিরোনামের প্রবন্ধে সতর্ক করেছিলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানেই তা গণতান্ত্রিক নয়। যেখানে নাগরিক অধিকারের কোনো স্থান নেই, নির্বাচনী ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ, সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ায় নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত, মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত, রাজনৈতিক বিরোধিতার ফল রাষ্ট্রীয় নিবর্তন, তা ‘ইললিবারেল‘ বা অনুদার গণতন্ত্র, যা পক্ষান্তরে গণতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টার নামান্তর।

ট্রাম্প মডেল
আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প গত নির্বাচনের ফলাফল মানেননি। নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দেয়ার জন্য সম্ভাব্য সব অশাসনতান্ত্রিক পথ বেছে নিতে চেয়েছিলেন। সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথাও ভেবেছিলেন। তিনি সফল হননি। সফল না হলেও গণতন্ত্রের পিঠে ছুরিকাঘাতের একটি নিকৃষ্ট মডেল রেখে গেছেন তিনি। 
কেন ট্রাম্প সফল হননি এবং আমেরিকার গণতন্ত্র বেঁচে গিয়েছিল, তার দুইটি প্রধান কারণ রয়েছে। 
১. একান্ত অনুগত হওয়া সত্ত্বেও ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স তার কথা শুনে শাসনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে নির্বাচনী ফলাফল প্রত্যাখ্যানে কোনো সমর্থন দেননি। 
২. সুপ্রিম কোর্টের অধিকাংশ সদস্য তার প্রতি আদর্শগতভাবে অনুগত হয়েও নির্বাচনী ফলাফলে কোনো কারচুপি আছে মর্মে ট্রাম্পের অভিযোগ বিশ্বাস করেননি। 
ফলে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তি ও বিচার ব্যবস্থার সংহতি দেশটির গণতন্ত্রের গায়ে আঁচড় লাগতে দেয়নি। ট্রাম্পের শত চেষ্টাতেও গণতন্ত্র ভেঙে পড়েনি। যদি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মডেল একটি কলঙ্ক চিহ্ন হয়ে রয়েছে। এই কলঙ্ক একেবারেই মুছেও যায়নি। আটলান্টিক মান্থলি পত্রিকায় এক দীর্ঘ নিবন্ধে মার্কিন সাংবাদিক বার্টন গেলম্যান লিখেছেন, ট্রাম্প সমর্থকদের দ্বারা ক্যাপিটল হিলে হামলা ছিল একটি ক্যু’র চেষ্টা। তারা ব্যর্থ হলেও আবারো ব্যর্থ হবে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।

 

বিভেদের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের ক্ষতি
যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির বিভেদাত্মক রাজনীতির মূল ভিত্তি বর্ণভিত্তিক বিদ্বেষ। বহিরাগত ও অশ্বেতকায়দের সংখ্যাধিক্যের কারণে দেশের সংখ্যাগুরু শ্বেতকায় মনে করে তাদের ঈশ্বর প্রদত্ত রাজনৈতিক অধিকার ও অবস্থান হুমকির মুখে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আকারের গণতন্ত্র নামে পরিচিতি ভারতেও ঠিক সেই একই আওয়াজ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার দল। তাদের চোখে সে দেশের মুসলিমমাত্রই বহিরাগত, ভারতের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রশ্নবিদ্ধ। অতএব তারা সবাই জাতীয় স্বার্থের প্রতি হুমকিস্বরূপ।
বিরোধী কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীসহ ভারতের সকল গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিক এই বিষয়ে একমত যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার দল ধর্মীয় বিভাজনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করায় সারা দেশে এক হিংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের মরণদশা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকগণ ভারতে গণতন্ত্রের অবনতির জন্য বিশেষভাবে দায়ী করেছেন বিজেপি-সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় স্বেচ্ছাসেবক দল আরএসএস ও হিন্দু মহাসভাকে, যার কারণে সমাজে ও রাজনীতিতে বিভাজন বাড়ছে। হিংসা ও আক্রমণ ছড়াচ্ছে। সংখ্যালঘুরা নিপীড়িত হচ্ছেন। ধর্মস্থানও রাজনীতির নোংরা খেলায় কলুষিত হচ্ছে। পরিণামে, কারও কারও, বিশেষত প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীর মতে, ‘আজকের ভারতে গণতন্ত্র মৃত।’
গবেষকদের মতে, যেদিন ট্রাম্পের মতো মোদিও পরাজিত হবেন, সেদিন গণতন্ত্র রক্ষা পাবে। কিন্তু সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। সুকৌশলে ধর্মীয় বিদ্বেষ এমনভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে, ঘৃণা ও প্রতিশোধস্পৃহা  রাজনীতিকে প্রতিনিয়ত ছোবল দিচ্ছে, গণতন্ত্র কমজোর হচ্ছে আর ধর্মান্ধ নেতারা অকাতরে ফায়দা লুটছে। ট্রাম্প ও মোদি উভয়েই বিভাজন ও ঘৃণাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এর ফলে গণতন্ত্রের মৃত্যু হবে তা জেনেই।

ঢাকার ‘কফি গ্রুপ‘
ঘটনাটি সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের। তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণতন্ত্রের দোলাচলে নানা খেলা চলতে থাকে। ঢাকার বিদেশি দূতাবাস পাড়ার অভিজাত কূটনৈতিক মহলে সংগোপনে তৎপর হয় একটি গোষ্ঠী, যাকে ডাকা হতো ‘কফি গ্রুপ’ নামে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে এই গ্রুপ নিয়মিত বৈঠকে বসতো। তার সদস্য ছিলেন আমেরিকা, বৃটেন, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানির রাষ্ট্রদূতরা। কখনো ডাকা হতো জাপানকেও। 
অনেক পরে উইকিলিক্স-এ প্রকাশিত আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটিনিসের গোপন তারবার্তা থেকে এ বিষয়ে সবিস্তারে জানা যায়। ২০০৭ সালের জুনে সেই সরকারের ভরা যৌবনে নামজাদা দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশের দুই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে প্যাট্রিসিয়া নাকি বলেছিলেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে।
নির্বাচন আটকে গেলে, গণতন্ত্র পথ হারালে অনেক কিছুর মতো ‘কফি গ্রুপ’ও তৈরি হয়ে যায়। গণতন্ত্র ও নির্বাচনের ক্ষেত্রে আশঙ্কা, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের মেঘ জমলেই পরাশক্তির নাড়াচাড়া শুরু হয়। সবাই যে গণতন্ত্রের স্বার্থে মাঠে নামে, তা কিন্তু হলফ করে বলা যায় না। শুধু নির্বাচন নয়, বিশ্বের নানা দেশেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সংকট এলেই তৎপর হয় সে দেশে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের। তার পেছন পেছন আসে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নামে প্রতিটি রাজনৈতিক ওঠাপড়ায়, কমবেশি সব নির্বাচনকে ঘিরে বিদেশি শক্তির সক্রিয়তা সর্বদা ইতিবাচক হয় না। অতএব সতর্কতার সঙ্গে গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখাই সবদিক থেকে নিরাপদ।

নির্বাচন ও গণতন্ত্র কষ্টকর অর্জন
নির্বাচন ও গণতন্ত্র বহু কষ্টে পাওয়া অর্জন। মানব সভ্যতাকে হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে গণতন্ত্রের জন্য, একটি সঠিক নির্বাচনের জন্য। ফলে গণতন্ত্র এবং এর অন্যতম পূর্বশর্ত নির্বাচণের পবিত্রতা ও নিষ্কলুষ চরিত্র রক্ষা করার বিষয়টি অতীব জরুরি। 
মনে রাখা দরকার, নির্বাচন বা ভোটের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। ভারতবর্ষে প্রথম ভোটের প্রচলনের খোঁজ মেলে খ্রিস্টপূর্ব ৬০০-৫০০ অব্দে। বৈদিক, জৈন ও বৌদ্ধ শাস্ত্রমতে ভারতে ষোলোটি রাষ্ট্র ছিল, যাদের মহাজনপদ নামে আখ্যায়িত করা হয়। এসব জনপদ হয় রাজতন্ত্র শাসিত, নয় গোষ্ঠীতন্ত্র শাসিত সরকার ব্যবস্থা ছিল। এসব জনপদের কোনো কোনোটিতে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ভোট ব্যবস্থা চালু ছিল।
কিন্তু সাধারণ মানুষ এ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ভোট হতো উচ্চবর্গীয় ক্ষত্রীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের দ্বারা। যেমনভাবে প্রাচীন গ্রিসের নগর রাষ্ট্রে গণতন্ত্র সীমিত ছিল কতিপয়ের হাতে। বহু সংগ্রাম ও সাধনার পর নির্বাচন ও গণতন্ত্র সকল মানুষের সমঅধিকারের বিষয় হয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এখন আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থা হলো জনগণের ভোটে সরকার নির্বাচন। 

সপ্তদশ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপে যখন প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠনের ধারণা এলো, এর আগে পর্যন্ত অবশ্য জনসাধারণকে দিয়ে সরকারি পদাধিকারী বাছাইয়ের এ আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থাটির আবির্ভাবই হয়নি। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সংস্কৃতিতে প্রভাবশালী গোষ্ঠী ছিল পুরুষরাই, নির্বাচকমণ্ডলীতেও তাই তাদেরই প্রাধান্য থাকতো। অন্যান্য বহু দেশেও এ একই ধারা চলে আসছিল। গ্রেট বৃটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতেও শুরুর দিকের নির্বাচনগুলোতে জমিদার অথবা শাসক শ্রেণির পুরুষদের প্রাধান্য ছিল। কোথাও প্রাধান্য ছিল শ্বেতাঙ্গদের। কালো মানুষ ও নারীরা ছিল ভোটাধিকার বঞ্চিত। বঞ্চিত ছিল উপনিবেশিক শাসনাধীন দেশগুলোর কোটি কোটি মানুষ।  
অতীতের পরিস্থিতি আজ আর নেই। সবাই আজকে নিজ নিজ ভোটের মালিক। তারপরেও নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে ঘিরে স্বৈরতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারের নগ্ন পদধ্বনি থেমে নেই। দ্য স্পিরিট অব লজ নামক রাজনীতি বিজ্ঞানের ঐতিহাসিকভাবে সুবিখ্যাত গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় অধ্যায়ে মন্টেসকিউই বলেছেন, প্রজাতন্ত্র অথবা গণতন্ত্র যে কোনো ক্ষেত্রের ভোটেই একজন ভোটারকে সক্রিয়ভাবে থাকতে হয়। কেউ যদি নিজে দেশের প্রশাসক হয় অথবা প্রশাসনের অধীনে থাকে, তাহলে এই দুটি অবস্থার মধ্যেই পর্যায়ক্রমে ভোটারদের থাকতে হয়। নিজেদের দেশে কোন সরকার আসবে তা বাছাই করার মালিক বা মাস্টার হিসেবে কাজ করে ভোটাররাই। ভোট দিয়েই একটি সার্বভৌম সরকার ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু রাখে জনসাধারণই। 
এই সারসত্য কথাটি নির্বাচন তথা ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রসঙ্গে স্বেচ্ছাচারের বিপদের সময় প্রতিটি ভোটারকেই মনে রাখা বাঞ্ছনীয়। Í
লেখক: প্রফেসর, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

 

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ থেকে আরও পড়ুন

   

ঈদ সংখ্যা ২০২৪ সর্বাধিক পঠিত

Logo
প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2024
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status