ঢাকা, ১৯ আগস্ট ২০২২, শুক্রবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০ মহরম ১৪৪৪ হিঃ

প্রথম পাতা

সিলেটে ভারী বৃষ্টি নির্ঘুম রাত

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে
৩০ জুন ২০২২, বৃহস্পতিবার

বন্যায় ভোগান্তিতে সিলেটের মানুষ- নিজস্ব ছবি

চারদিকে এখনও থৈ থৈ পানি। তবে কিছুটা কমায় বাসা-বাড়ি ভেসে উঠছে। ফিরতে শুরু করেছেন বাসিন্দারা। কিন্তু বৃষ্টির চোখ রাঙানি ফের বিপদের আভাস দিচ্ছে। নিদ্রাহীন রাত কাটে। মালপত্র নিয়ে গোছগাছ করে রাখেন বাসিন্দারা। যদি পানি আসে ফের ছাড়তে হবে বাসা। আবারো ছুটতে হবে অজানার   আশ্রয়ে। এমনই পরিস্থিতি ছিল গতকালের সিলেটে। মঙ্গলবার রাত ১০টা।

বিজ্ঞাপন
ফের ভারী বর্ষণ। সেই সঙ্গে বজ্রপাতও। কোলাহলমুখোর নগরে অস্থিরতা। বৃষ্টি থামছে না। জলাবদ্ধ হচ্ছে বিভিন্ন এলাকা। তালতলা, উপশহর, যতরপুরসহ কয়েকটি এলাকায় পানি ঢুকছে। এ অবস্থায় বিচলিত নগরের মানুষ। ব্যবসাপাতি গুছিয়ে বাড়ির পানে ছুটেছেন যে যেভাবে পেরেছেন। বৃষ্টি থামে মধ্যরাতে। ততক্ষণে বন্যা নিয়ে ফের শঙ্কা বেড়ে যায়। তালতলার ব্যবসায়ী ওয়াদুদ আহমদ। টানা দুই বারের বৃষ্টিতে দোকানের ভেতরে কোমর পানি। প্রথমবার বন্যায় অনেক ক্ষতি। মে মাসে প্রথম দফা পানি নামার পর গোছগাছ করছিলেন। জুনে ফের পানি আঘাত হানে। এবার পানি বুক সমান। আরো ক্ষতি। 

দুই সপ্তাহ পর রোববার দোকানে গিয়ে দেখলেন পানি নেমেছে। ধুয়ে-মুছে সব পরিষ্কার করছিলেন। মঙ্গলবার রাতের পানি ফের তাকে শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। রাতের বৃষ্টিতে তালতলায় পানি জমেছে। দোকানের সামনেও পানি। উপশহরের বাসিন্দা কামাল আহমদ। বন্যার পানি নিচতলায় উঠে যাওয়ায় তিন তলায় উঠেছিলেন। পানি নেমে যাওয়ার পর সোমবার থেকে ধোয়ামুছার কাজ করছিলেন। রাতের বৃষ্টি তাকে ফের শঙ্কায় ফেলে দেয়। পরিবার নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। বিছানাপত্র গোছগাছ করে রেখেছিলেন। সকাল পর্যন্ত বাসা পর্যন্ত পানি ঢুকেনি। সড়কে উঠেছে। দিনে সামান্য পরিমাণ কমেছে। কিন্তু বিকালের বৃষ্টি ফের কামাল আহমদকে শঙ্কায় ফেলে দেয়। কী করবেন- বুঝে উঠতে পারছেন না। যতরপুরের বাসিন্দা সুমন আহমদ। রাতের বৃষ্টিতে ঘরের সিঁড়ি পর্যন্ত পানি। পরিবার নিয়ে ছিলেন শঙ্কায়। টানা দুই সপ্তাহ বাড়ির বাইরে ছিলেন। এই সময়ে ঘরের জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে। বাসায় ফিরে সব গোছগাছ করছিলেন। কিন্তু রাতের বৃষ্টি তাকেও চিন্তিত করে তোলে।

 পরিবার নিয়ে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। জানালেন, ‘পানি উঠে গেছে বাসা ছাড়তে হবে। প্রস্তুত ছিলাম। রাতে ঘুমাইনি। বাড়ির রাস্তা পানিতে টুইটুম্বুর। বুধবার বিকালের বৃষ্টিতে ফের বাসার সিঁড়ি পর্যন্ত পানি।’ সিলেটে চোখ রাঙাচ্ছে বৃষ্টি। আবহাওয়ার বার্তায়ও সুখবর নেই। আগামী তিনদিন বৃষ্টি হবে। ভারী বর্ষণেরও সম্ভাবনা। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সিলেটের সুরমা পানি বিপদসীমার নিচে নেমে এসেছিল। বৃষ্টির কারণে ফের বিপদসীমা ছুঁইছুঁই। সিলেটের মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কুশিয়ারাও গত তিন দিন পানি কমেছিল। কিন্তু মঙ্গলবার রাত থেকে ফের বাড়তে শুরু করে। উজান থেকে আসছে ঢল। সরকারি হিসাব মতে; সিলেট জেলার প্রায় ৪৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র। এখনো এসব কেন্দ্রে বসবাস করছে ৩৮ হাজার মানুষ। পানি নামায় খানিক স্বস্তি ছিল। বাড়ি ফিরে নতুন শুরুর পরিকল্পনায় ছিলেন আশ্রয়হারা মানুষজন। কিন্তু বর্ষণ ও উজানের ঢল নতুন করে শঙ্কা বাড়াচ্ছে। ঘাষিটুলা এলাকার ফরিদ আহমদ জানিয়েছেন, সিলেটের এবারের বৃষ্টি ভিন্ন। ভারী বর্ষণ হয়, সেই বজ্রপাত। ফলে পানিবন্দি মানুষ ঘর থেকে বের হওয়া দুষ্কর।

 এই অবস্থায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে সিলেটের মানুষ। স্থানীয় কাউন্সিলর তারেক আহমদ তাজ জানিয়েছেন, ‘প্রায় দুই সপ্তাহ পর তার ওয়ার্ডের আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মানুষজন বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন। অনেকেই বাড়ি ফিরে নতুন করে গোছগাছ শুরু করেন। কিন্তু বৃষ্টি নতুন শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে।’ তিনি জানান- ‘পানি বাড়লে ফের আশ্রয়কেন্দ্র খোলে দেয়া হয়েছে। এজন্য প্রস্তুতিও রয়েছে।’ এদিকে- ১৬ই জুন থেকে সিলেটে ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢল নামে। এতে করে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, সিলেট সদর ও বিশ্বনাথের বিস্তীর্ণ এলাকা রাতারাতি ঢলের তোড়ে তলিয়ে যায়। উদ্ধারে নামানো হয় সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর সদস্যদের। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যরাও উদ্ধার শুরু করেন। উজানের ঢলে ৫টি উপজেলার হাজারো মানুষ বাড়িঘর হারিয়েছেন। স্রোতে ভেসে গেছে গবাদিপশু। এই অবস্থায় শুক্রবার থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছিল ওই উপজেলাগুলোতে। 

বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাত থেকে জাফলংয়ের ডাউকী, পিয়াইন, কোম্পানীগঞ্জের ধলাই, জৈন্তাপুরের সারি নদী দিয়ে উজান থেকে ঢল আসছিল। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার কারণে ঢল নামে। তবে ঢলের তোড় বেশি তীব্র না হলেও সীমান্ত এলাকার বাড়িফেরা মানুষজন ছিলেন সতর্ক। নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। ২১শে জুন থেকে কুশিয়ারা তীরবর্তী এলাকায় আঘাত হানে উজানের ঢল। এতে করে জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরের ৮০ শতাংশ জায়গা পানিতে তলিয়ে যায়। পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। এখনো ওই উপজেলার মানুষজন আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। পানি নামায় বাড়ি ফেরার তাড়া ছিলো। কিন্তু নতুন করে ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় ফের পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ফলে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জের রুবেল আহমদ জানিয়েছেন, তার উপজেলার ৭০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে। উপজেলা সদরেও পানি। এখন পানি বাড়লে উপজেলার উঁচু স্থানগুলোও পানিতে তলিয়ে যাবে। এতে করে আরো দুর্ভোগ, আরো হাহাকার বাড়বে বলে জানান তিনি।

 নদীতে পানি বাড়ছে: মঙ্গলবার রাত থেকে ফের বাড়ছে সিলেট অঞ্চলের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি। গতকাল দুপুরে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য থেকে মিলেছে এমন তথ্য। পাউবো জানায়, সুরমা নদীর পানি সিলেট পয়েন্টে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় ছিল ১০.৫৯  েসন্টিমিটার। বুধবার দুপুর ১২টায় দাঁড়িয়েছে ১০.৭৫ সেন্টিমিটার।এ নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে সন্ধ্যায় ১৩.৩৫ সেন্টিমিটার ছিল। গতকাল দুপুরে হয়েছে ১৩.৬৪ সেন্টিমিটার। বিপদসীমার দশমিক ৮৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে পানি। কুশিয়ারা নদীর অমলসিদ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১.১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শেওলা পয়েন্টেও কুশিয়ারার পানি বিপজ্জনকভাবে বইছে। এখানে বিপৎসীমার দশমিক ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে পানি। কুশিয়ারার পানি  েশরপুর পয়েন্টে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছিল ৮.০২ সেন্টিমিটার; গতকাল দুপুরে হয়েছে ৮.০৩। এ নদীর পানি ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপদসীমার উপরে অর্থ্যাৎ ১০.৪৮ সেন্টিমিটার এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কানাইঘাট দিয়ে বয়ে যাওয়া লোভা নদীর পানি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছিল ১৩.৬০ সেন্টিমিটার। 

গতকাল দুপুরে হয়েছে ১৩.৯০ সেন্টিমিটার। পানি বেড়েছে গোয়াইনঘাটের সারি নদেও। এটায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় পানিসীমা ছিল ১০.৭৮ সেন্টিমিটার; গতকাল দুপুর ১২টায় হয়েছে ১১.৭৪ সেন্টিমিটার। বাড়তে পারে বৃষ্টি: সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। দক্ষিণ-পশ্চিমা মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে এই বৃষ্টির প্রবণতা বাড়বে, যা আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য মতে, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা অবধি সিলেট ও রংপুর অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি ছিল। এ সময়ে সিলেটে ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এদিকে, মঙ্গলবার সকাল থেকে সিলেটে বৃষ্টি হচ্ছে। রাত থেকে বৃষ্টির প্রবণতা বেড়েছে। অনেক জায়গায় ভারী বৃষ্টি হওয়ায় পানিও বেড়েছে। এতে মানুষের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি অবনতির শঙ্কা কাজ করছে।

পাঠকের মতামত

আল্লাহ্ সবাই কে বিপদ মুক্ত রাখ এবং ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা করে দাও । সরকার ও এদের ক্ষতি পূরণ দিয়ে সাহায্য করার অনুরোধ করছি ।

Kazi
২৯ জুন ২০২২, বুধবার, ৭:২২ অপরাহ্ন

প্রথম পাতা থেকে আরও পড়ুন

প্রথম পাতা থেকে সর্বাধিক পঠিত

প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী
জেনিথ টাওয়ার, ৪০ কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫ এবং মিডিয়া প্রিন্টার্স ১৪৯-১৫০ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮ থেকে
মাহবুবা চৌধুরী কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত।
ফোন : ৫৫০-১১৭১০-৩ ফ্যাক্স : ৮১২৮৩১৩, ৫৫০১৩৪০০
ই-মেইল: [email protected]
Copyright © 2022
All rights reserved www.mzamin.com
DMCA.com Protection Status