রিসেট

নির্বাচনে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নেই, বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে দৃঢ় সমর্থনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তাগিদ

প্রকাশিত: ৫ জানুয়ারি (শুক্রবার), ২০২৪ Archive 2022Source: মানবজমিন ডিজিটাল

০৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দ্য এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল)। এশিয়ায় গণতন্ত্র প্রচার, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে কাজ করা থাইল্যান্ডভিত্তিক স্বধীন এই সংস্থা শুক্রবার (০৫ জানুয়ারি) নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলেছে: প্রকৃত নির্বাচন এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার অভাবের ঝুঁকিতে থাকা এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক নির্বাচনী মানদণ্ড (যেগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতা মূল্যায়ন করে) সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হচ্ছে।

আনফ্রেল বিশ্বাস করে যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা, ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তির অনুপস্থিতির কারণে প্রকৃত নির্বাচন এবং নির্বাচনী প্রতিযোগিতার অভাবের ঝুঁকি উদ্ভূত হয়েছে। এতে বিরোধীদের উপর দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা, নিরপেক্ষ তথ্যে সীমিত প্রবেশাধিকার এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ব্যাপকতার মতো উল্লেখযোগ্য নির্বাচনী চ্যালেঞ্জের জন্ম হয়েছে।

নির্বাচনী সহিংসতায় বিধ্বস্ত বর্তমান নির্বাচনী পরিবেশ মূলত বিরোধী দলসমূহ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের টার্গেট করছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন দেওয়া, হাতবোমা নিক্ষেপ এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এই সংঘর্ষের ফলে অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন এবং দুঃখজনকভাবে প্রাণহানিও হয়েছে। তার উপর, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ অপর্যাপ্তভাবে মোকাবেলা করেছে। নির্বাচনী সহিংসতা এবং নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘনের মাত্রাকে কম গুরুত্ব দেওয়া বিবৃতিগুলো নিরপেক্ষতা এবং তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা সম্পর্কে উদ্বেগকেই বাড়িয়ে তোলে।

ক্ষমতাসীন সরকার, পক্ষপাতদুষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচনের বিরুদ্ধে করা মিছিলগুলোতে জোরপূর্বক বাধা দেওয়া এবং বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার কথা জানা গেছে। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আয়োজিত শান্তিপূর্ণ সমাবেশ পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের জোরপূর্বক বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। ওই ঘটনার সময় ঢাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও পুলিশ জোরপূর্বক তালা দিয়েছিল। যেটি আজও তালাবদ্ধ রয়েছে।

বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করার জন্য চাপ দিতে গণ-সংযোগ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ছয়-দলীয় রাজনৈতিক জোট- গণতন্ত্র মঞ্চকে গত ২২ ডিসেম্বর মিছিল করতে বাধা দেয় পুলিশ। ঢাকাসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে । ২৮ অক্টোবর থেকে সরকার কর্তৃক ২১,০০০ এরও বেশি বিএনপি নেতা-কর্মীকে বেআইনিভাবে আটক করা গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কারা হেফাজতে নয়জন বিএনপি নেতা-কর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যুর কারণে যেটি আরও বেড়েছে।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সুরক্ষা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে এই পরিস্থিতি জরুরি মনোযোগ এবং ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার দাবি রাখে।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ১৮ অক্টোবর বাংলা টিভির সংবাদদাতা আরিফুল ইসলামকে লাঞ্ছিত করে পুলিশ তার ক্যামেরা নষ্ট করে দেয়। পরবর্তীকালে, ২৮ অক্টোবর একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ওইদিন বিএনপির মহাসমাবেশের পর পুলিশের সাথে বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা কাভার করার সময় ৩০ জন সাংবাদিক  পুলিশ এবং আ.লীগ সমর্থক উভয়ের দ্বারা হামলার শিকার হন।

আরেকটি অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটেছিল গত ২০ নভেম্বর। সেদিন এক সাংবাদিক পূর্ব-পরিকল্পিত স্থানে স্থানীয় জনৈক ছাত্রলীগ নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়ার চেষ্টা করার সময় ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের ২০-২৫ জন সদস্য তার উপর হামলা চালায়। ৩০ নভেম্বর সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের হাতে তিনজন সাংবাদিক লাঞ্ছিত হন, তাদের মালামালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৩ সাল জুড়ে মোট ১৮৩ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। আরও ৬১ জন সাংবাদিক লাঞ্ছিত হয়েছেন।

২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং বিরোধী নেতাকর্মীদের আক্রমণ এবং ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে এটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি অনলাইন স্পেসে সাধারণ মানুষের সুস্থ আলোচনার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে ১,৪১০ টি মামলার ৭৭.৭৮ শতাংশই আওয়ামী লীগ রাজনীতিবিদদের দ্বারা দায়ের করা হয়েছে।

এ ধরনের সহিংসতা এবং ভয় দেখানোর কাজগুলো ভয়ভীতি এবং সেন্সরশিপের পরিবেশ তৈরি, সমালোচনামূলক কণ্ঠ দমিয়ে রাখা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহে বাধা দিতে ভূমিকা রাখে।

অধিকন্তু, ভোটারদের শিক্ষামূলক কর্মসূচি বিক্ষিপ্তভাবে পরিচালিত হয়েছে, মূলত নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে। ক্রমাগত সমস্যা দেখা দেয়ার কারণ: কেবল কয়েকটি সুশীল সমাজ সংগঠন ভোটারদের শিক্ষা এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করে থাকে। স্বাধীন উদ্যোগের এই অভাব নির্বাচন সম্পর্কে শিক্ষিত ভোটার গড়ে তোলা এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বজায় রাখার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

বাংলাদেশে বহুদলীয় ব্যবস্থা থাকলেও রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ মূলত দুই প্রধান দল- আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির আধিপত্য দ্বারা সংজ্ঞায়িত, জাতীয় পার্টিও বিগত বছরগুলোতে নির্বাচনী সাফল্য অর্জন করেছে। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান সরকার বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীকে বিশেষভাবে ফোকাস করে বিরোধী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে এবং তাদের দমন করছে বলেই মনে হচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলী অনুযায়ী, বিএনপি, বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং গণতন্ত্র মঞ্চসহ অনেক প্রার্থী এবং বিরোধী দল ও জোট নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন সহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক অনুভূত পক্ষপাত, আসন্ন নির্বাচন সুস্পষ্টভাবে একতরফা হতে যাওয়া এবং বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের উপর ক্র্যাকডাউন চালানোকে তারা (নির্বাচন) প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন। একই ধরনের উদ্বেগের প্রতিধ্বনিতে অনেক প্রার্থীও নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে এসেছেন।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীদার উভয় পক্ষ কর্তৃক সংলাপের আহ্বান সত্ত্বেও, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পূর্বশর্ত আরোপ করে (সংলাপে) অংশ নিতে অস্বীকার করেছে। এই অচলাবস্থা নির্বাচনী ল্যান্ডস্কেপকে আরও জটিল করে তোলে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে।

আমাদের আহবান
উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলোকে আমলে নিয়ে আনফ্রেল অংশগ্রহণমূলক শাসনের ভিত্তি হিসেবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মৌলিক গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অখণ্ডতায় আসন্ন হুমকির স্বীকৃতি দিয়ে এই জটিল বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ আনতে অটল সতর্কতা বজায় রাখে সংগঠনটি। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষা এবং প্রচারে নিজ ম্যান্ডেট পূরণে আনফ্রেল অবিচল।

গণতান্ত্রিক সরকারসমূহ এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করার জন্য আনফ্রেল আন্তরিকভাবে আহ্বান জানায় যা সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছাকে প্রতিফলন করবে। সংস্থাটি বাংলাদেশে এমন একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে যা জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, অন্তর্ভুক্তি এবং সত্যিকারের প্রতিযোগিতা দ্বারা চিহ্নিত।

উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের (২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর) আগেও নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে (২৩ ডিসেম্বর) 'দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের প্রতি নির্বাচন কমিশনের আচরণ এবং আসন্ন নির্বাচনের সুষ্ঠুতা' নিয়ে সন্দেহ এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল আনফ্রেল। নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সময়ে অ্যাক্রেডিটেশন (অনুমতিপত্র) প্রদান না করায় আনফ্রেল সে সময় তাদের পর্যবেক্ষণ মিশনও বাতিল করেছিল।